মতামত

যে রিপোর্ট বদলে দিয়েছে জীবনের গতিপথ

2020/12/13/_post_thumb-2020_12_13_07_03_25.png

অলিউল্লাহ নোমান


দেখতে দেখতে ৮ বছর। মনে হচ্ছে এই তো সেদিনের ঘটনা। চাপা উত্তেজনায় ছিলাম বেশ কিছুদিন। কারো কাছে কিছু বলতেও পারছিলাম না। আবার অপেক্ষার পালাও শেষ হচ্ছিল না। অবশেষে ৮ ডিসেম্বর (২০১২) সন্ধ্যা ৭টায় ক্লিয়ারেন্স পাওয়া গেল। অপেক্ষার পালা শেষ হতে যাচ্ছে। এবার নূতন উত্তেজনা শুরু। নিউজ অ্যাডিটরকে জানানো হলো বিশেষ নিউজ যাচ্ছে আজ। অনেকদিন আগেই সম্পাদক মহোদয় দেখে অ্যাডিট করে দিয়েছেন। শুধু অপেক্ষা ছিল একটা ক্লিয়ারেন্সের। ৮ ডিসেম্বর রাতে প্রেসে গেল। ৯ ডিসেম্বর (২০১২) সকালের পত্রিকায় প্রকাশিত হল স্কাইপ স্ক্যান্ডালের প্রথম কিস্তি। 

প্রকাশের আগে প্রায় মাস খানেকের বেশি সময় ধরে সবাকিছু রেডি করে অপেক্ষায় ছিলাম। কবে প্রকাশ হবে তা অনিশ্চিত। অতি গোপনে বসে লিখছি। সম্পাদক মহোদয় ছাড়া অফিসের কেউ জানেন না বিষয়টি। যতটা সম্ভব গোপন রাখার চেষ্টা। কোন ব্যতিক্রম রিপোর্ট লেখা এবং প্রকাশের মাঝে একটা ভিন্ন রকমের আনন্দ থাকে। কতটা আনন্দ ও উত্তেজনা থাকে সেটা কেবল সংশ্লিষ্ট রিপোর্টারই ঠের পান। এরকম অনেক রিপোর্ট লিখেছি। চাকুরিদাতা প্রতিষ্ঠান দায়িত্ব নিয়ে প্রকাশ করেছে। ২০০০ সালে ইউনিসেফ পুরস্কারও পেয়েছিলাম একটি অনুসন্ধানী রিপোর্টের জন্য। তবে সেটা ছিল ভিন্ন আঙ্গিকের রিপোর্ট। আবার অনুসন্ধানী রিপোর্ট লিখে আওয়ামী সুপ্রিমকোর্টের রোষাণলে পড়তে হয়েছিল। যেতে হয়েছিল কারাগারেও। আমার লেখা রিপোর্টের জন্যই সম্পাদক মহোদয়কে (মাহমুদুর রহমান) ৭ মাস কারাভোগ করতে হয়েছিল ২০১০ সালে। আমাকেও দেড় মাস থাকতে হয়েছিল কারাগারে। এই জেলে যাওয়াটাও জীবনের জন্য কম প্রাপ্তি নয়। কারাবরণকেও কর্মের সফলতা হিসাবেই মনে করেছি। বাংলাদেশের ইতিহাসে রিপোর্ট লেখার জন্য এভাবে কাউকে কারাগারে যাওয়ার নজির নেই। সেই দিক থেকে কারাগারে যাওয়াটা আমার জন্য অন্যরকম গৌরবের বিষয়। কারাজীবনকে ইউনিসেফ পুরস্কারের চেয়েও বড় পুস্কার মনে করি আমি।

যে রিপোর্ট পাল্টে দিয়েছে জীবনের গতিপথ

ফিরে আসা যাক স্কাইপ স্ক্যান্ডালে। স্কাইপ স্ক্যান্ডালের বিষয়টি জানা গিয়েছিল অনেক আগেই। মাস ছয় আগেই সোর্স বললেন, এরকম একটা ঘটনা ঘটছে। সবকিছু আপনাকে দেব। এরপর থেকেই আমাদের পরস্পরের মধ্যে আলোচনা হয় নিয়মিত। অক্টোবরে (২০১২)পুরো রেকর্ড হাতে আসে। চরম উত্তেজনায় সম্পাদক মহোদয়ের কাছে উপস্থাপন করলাম। পেনড্রাইভটা সম্পাদক মহোদয়কে দিলাম। বললাম এখানেই আছে ১৭ ঘন্টার কথোপকথন। তিনি সেটা কম্পিউটারে ডাউনলোড করে শুনলেন। 

পরের দিন আমরা দুইজনে এনিয়ে আলোচনায় বসি। সম্পাদক মহোদয় বললেন ঘটনা তো সঠিক আছে। এখন বল দেখি এটা প্রকাশ করলে কি হতে পারে? 

৩টি অবশনের কথা বললাম-

 (১) আবারো আপনাকে নির্যাতন করা হতে পারে। সঙ্গে আমাকেও ধরা হবে। 

(২) আমার দেশ পত্রিকা আবারো জোর করে বন্ধ করে দিতে পারে সরকার। 

(৩) ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার রয়েছে, ট্রাইব্যুনাল মনে করলে অবমাননার জন্য সর্বোচ্চ দুই বছর জেল দিতে পারবে। এটা হচ্ছে যদি তারা আইনের অপপ্রয়োগ করে শাস্তি দিতে চায়। বাকী দুইটা অবশন সরকারের ইচ্ছার উপর নির্ভর করে। 

প্রথম অবশনের বিষয়ে তিনি বললেন, নির্যতানের বিষয়টি মাথা থেকে সরিয়ে ফেল। সেটা তারা চাইলে করতে পারবে যে কোন সময়। 

দ্বিতীয়টির প্রসঙ্গে বললেন, পত্রিকা বন্ধ করার বিষয় নিয়ে তোমার (আমাকে) চিন্তা করার দরকার নাই। এটা আমি (সম্পাদক মহোদয়) বুঝব। 

সবচেয়ে সফট অবশন, তৃতীয়টি সম্পর্কে তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ২ বছরের জন্য কারাগারে যেতে তুমি রাজি আছ? জবাবে বললাম, আপনার কোন বিষয়ে সমস্যা না থাকলে আমার আপত্তি নেই। 

সবশেষে তিনি বললেন, রেডি করতে থাক। ইনশাল্লাহ এটা আমরা প্রকাশ করবই। এতবড় ঘটনা বিনা চ্যালেঞ্জে ছেড়ে দেওয়াটা হবে আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় অন্যায়। জালিমদের ছেড়ে দেওয়া ঠিক হবে না। রিস্ক একটু নিতেই হবে। মনে মনে আলহামদুলিল্লাহ বলে রুম থেকে বের হয়ে আসলাম। শুরু করলাম লেখা। 

আরেকটি বিষয় ছিল এখানে। সম্পাদক মহোদয়কে জানালাম নিউ ইয়র্ক টাইমসে বিষয়টি ছাপা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তারা যেদিন প্রকাশ করবে আমরাও একই দিনে করব। নিউইয়র্ক টাইমস্ বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান করতেছে। আমাকে জানাবে তারা কবে প্রকাশ করতে যাচ্ছে। মাস খানেক এটা নিয়ে তারা অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষায় ছিল। এক পর্যায়ে এসে আরো সময় নিতে চাইল। কিন্তু কত সময় নিতে চায় বা কেন, এ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয় নিউ ইয়র্ক টাইমসের সাথে। 

শেষ পর্যন্ত ইকনোমিষ্ট রাজি হল প্রকাশের জন্য। তাদের নিজেদের উদ্যোগে এক্সপার্ট দিয়ে কন্ঠ টেষ্ট করিয়ে নিয়েছিল। এটা যে ট্রাইব্যুনাল চেয়ারম্যান নিজামুল হক নাসিম এবং আহমদ জিয়াউদ্দিনের কন্ঠ সেটা নিশ্চিত হওয়ার জন্যই এই কন্ঠ পরীক্ষা করে নেয় ইকনোমিষ্ট। তারা নিজেদের পক্ষ থেকে নিজামুল হক নাসিমকে ফোন করে কিছু বিষয় জিজ্ঞেস করেছিল। জবাব না দিয়ে নিজামুল হক নাসিম তাঁর ক্ষমতার অপপ্রয়োগ করেছিলেন। প্রকাশ্য আদালতে রুলিং দিয়ে এধনের কিছু প্রকাশে নিষেধাজ্ঞা দিলেন ইকনোমিষ্টের প্রতি। 

ইকনোমিষ্টের প্রতি নিষেধাজ্ঞার পর বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে গেল। জানা হয়ে গেল স্কাইপে এরকম ঘটনা ঘটেছে নিজামুল হক নাসিম ও আহমদ জিয়াউদ্দিনের মধ্যে। কিন্তু কি ঘটনা সেটা অন্য কেউ জানে না। যা ছিল আমার হাতের মুঠোয়। এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় আমরাও অন্তর্ভুক্ত হই কি না সেটা নিয়ে আইনি পরামর্শ নেওয়া হল। সবদিক পর্যালোচনা করে একজন সিনিয়র ব্যারিষ্টার অভিমত দিলেন নিষেধাজ্ঞাটা শুধু ইকনোমিস্টের প্রতি। স্পষ্ট করেই ইকনোমিষ্টের কথা বলা আছে নিষেধাজ্ঞার আদেশে। 

সবশেষে ইকনোমিষ্ট জানাল তারা একটা সামারি রিপোর্ট প্রকাশ করবে। সেদিনই আমরাও রিপোর্ট প্রকাশ করার প্রস্তুতি নেই। সন্ধ্যায় লন্ডন থেকে জানানো হল ইকনোমিষ্ট তাদের অ্যাডভান্সড একটি সামারি রিপোর্ট অনলাইনে ৮ ডিসেম্বর স্থানীয় সময় রাতে দিচ্ছে। সেদিনই আমরা বিস্তারিত প্রকাশ করলাম আমার দেশ পত্রিকায়। 

প্রথম দিন প্রায় ৪ পাতা জুড়ে ছিল এই রিপোর্ট। পরের দিন হকাররা একটি পত্রিকা ৫০০টা পর্যন্ত বিক্রি করেছে। সকালে সব পত্রিকা শেষ। তাই ১২ টার দিকে আবারো  ৪ পৃষ্টার বিশেষ সংখ্যা ছাপা হল শুধু এই নিউজটা দিয়ে। একটি বিশেষ নিউজ দিয়ে বাজারের চাহিদা মিটানোর জন্য দিনের বেলায় বিশেষ সংখ্যা ছাপানোর নজির মনে হয় দ্বিতীয়টি নেই। কোন ঘটনা ঘটলে জরুরী ভিত্তিতে বিশেষ সংখ্যা ছাপানোর নজির রয়েছে। তবে কোন স্পেশাল নিউজের জন্য বাজারের চাহিদা মেটাতে বিশেষ সংখ্যা মনে হয় দ্বিতীয়টি আর নেই সংবাদপত্রের জগতে। 

ধাবারহিক ৫ দিন

১৭ ঘন্টার কথোপকথন। এতো কম নয়। প্রতিদিন একপৃষ্টা করে ছাপা হয় বিশেষ নিউজ স্কাইপ স্ক্যান্ডাল। ৫ দিন ছাপা হওয়ার পর হাইকোর্ট বিভাগ থেকে আওয়ামী বিচারক শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক রুলিং দিলেন। আমার দেশ পত্রিকার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে মামলা করার জন্য বলা হয়। স্কাইপ স্ক্যান্ডাল আর প্রকাশ করা যাবে না বলে নির্দেশনা দেওয়া হল মানিকের পক্ষ থেকে। 

১৩ ডিসেম্বর (২০১২) রাতেই ট্রাইব্যুনালের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা হল সিএমএম আদালতে। 

নিজামুল হক নাসিমের পদত্যাগের পর পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনাল থেকে সরকারের প্রতি একটি আদেশ দেয়া হল। এতে বলা হল স্কাইপ স্ক্যান্ডালের বিষয়টি কিভাবে রেকর্ড করা হয়েছে সেটা খুঁজে বের করার জন্য। 

১৭ ডিসেম্বর বেলা আড়াইটা

সম্পাদক মহোদয় আমাকে তাঁর রুমে ডাকলেন। জিজ্ঞেস করলেন পাসপোর্টে কোন দেশের ভিসা আছে কি না। ইউকে’র ভিসা ছিল পাসপোর্টে। তবে ভিসার মেয়াদ ঘনিয়ে আসছিল। এর আগে আরো দুইবার ইউকে ভ্রমন করেছি। ভিসা আছে, শুনে তিনি বললেন,তোমাকে জরুরী কাজে লন্ডন যেতে হবে। জানতে চাইলাম কবে যাওয়া লাগবে। তিনি তখন বললেন, টিকেট পাওয়া গেলে আজই যেতে হবে। এত তাড়াতাড়ি কেন! জানতে চাইলাম আমি। বললেন, আগে যাও। ইউকে পৌঁছে কি করতে হবে, সেটা যাওয়ার পর বলব। দ্রুত পাসপোর্ট বাসা থেকে নিয়ে আসার জন্য নির্দেশ দিলেন তিনি। কিছুক্ষণের মধ্যেই জানালেন, রাত ৯টায় ফ্লাইট। টিকেট পাওয়া গেছে। ততক্ষণে বিকাল ৪টা হয়ে গেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই এয়ারপোর্টে রওয়ানা দিতে হবে। আমি তখন কিংকর্তব্যবিমূঢ়। 

বাসায় ফোন দিয়ে বললাম, আমি আসতেছি। ব্যাগটা একটু গুছিয়ে রাখ। লন্ডনে যেতে হবে। আমার স্ত্রী জানতে চাইলেন কবে? বললাম, বাসায় এসেই আমি রওয়ানা দেব। বললেন হঠাৎ করে লন্ডনে! আগে কিছুই বললে না যে! সম্পাদক মহোদয় এইমাত্রই আমাকে জানালেন। আমিও জানতাম না, এই বলে ফোন রেখে দিলাম। 

অফিসের একটা গাড়ি ব্যবহার করতাম তখন। ড্রাইভার কাসেমকে ডাকলাম। কাসেম জিজ্ঞেস করলেন কোথায় যাব স্যার? বললাম, বাসার দিকে চল। বাসায় পৌঁছে বললাম তুমি দাড়াও আমি এখনি আসতেছি। কাসেম গাড়ি নিয়ে রাস্তায় অপেক্ষায় থাকল। বাসায় গিয়ে সময় নাই বলে, ব্যাগ নিয়েই বের হয়ে আসলাম। এই তাড়াহুড়ার কারণ ছিল, অজানা আতঙ্ক তখন তাড়া করে বেড়াচ্ছে আমাকে।

এদিকে টিকেট নিয়ে গুলশানের রাস্তায় একজন অপেক্ষায়। কাসেমকে বললাম, আগে গুলশানের দিকে যাও। তারপর বলব কোথায় যেতে হবে। গুলশানে অপেক্ষমান ব্যক্তির সাথে দেখা করে টিকেট নিলাম। কাসেমকে বললাম, এবার এয়াপোর্টের দিকে চল। এয়ারপোর্ট পৌঁছে কাশেমকে জিজ্ঞেস করেছিল স্যার, অপেক্ষা করব বাইরে? বললাম, এবার তুমি অফিসে চলে যাও। আমি আবার ফোন দিলে এসো। 

এখানে একটা বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখ্য, সম্পাদক মহোদয় যখন আমাকে দেশ থেকে লন্ডনে পাঠান,তখন আমরা দুইজনেই ছিলাম অফিস বন্দি। আমরা অফিসে থাকতাম ১৩ ডিসেম্বর রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার পর থেকে। নিজের জীবনকে বিপন্ন অবস্থার মুখোমুখি রেখে অধিনস্ত রিপোর্টারকে বাঁচানোর জন্য বিদেশ পাঠিয়ে দেয়ার মত মানবিক গুলাবলী সম্পন্ন সম্পাদক দ্বিতীয়জন আছে কি না, আমার যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। নিজের জীবনের চিন্তা তিনি করেননি। অধিনস্ত সহকর্মীর জীবন নিয়ে তিনি ভেবেছেন আগে। 

পাল্টে গেল জীবনের গতিপথ

লন্ডনের জীবনধারা এত কঠিন আগে জানা ছিল না। লন্ডন মানেই মনে করতাম মহাকিছু। শুরু হল জীবনের তাগিদে নূতন যুদ্ধ। এই যুদ্ধে পাল্টে দিয়েছে জীবনের অনেক গতিপথ। এনিয়ে আরেকদিন লিখব ইনশাল্লাহ। 

ডিসেম্বর মাস আসলেই স্মৃতি গুলো ভেসে উঠে। তাই জীবনের স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা সবার সাথে শেয়ার করা। ২০১২ সালের এই ১২ ডিসেম্বরে স্কাইপ স্ক্যান্ডালের ছাপা হওয়া শেষ কিস্তি নিউজ অ্যাডিটরের হাতে দেওয়ার সুযোগ হয়েছিল আমার। এরপরই নিষেধাজ্ঞার কারণে আর প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। ১৭ ডিসেম্বর বিকালে শুধু অফিস ত্যাগ নয়, দেশও ছাড়তে হয়েছিল। কবে ফিরব সেটা এখনো অজানা। এর মধ্যে অনেক কিছুই ঘটে গেছে জীবনে। 

দেশের মাটি কবে স্পর্শ করার সুযোগ হবে বা আদৌ হবে কি না, সেটা আল্লাহই ভাল জানেন।

লেখকের ফেসবুক থেকে সংগৃহীত

মন্তব্য