অপরাধ

হুমকি দুই মাস আগে; হামলার নেতৃত্বে আ.লীগ সমর্থিত চেয়ারম্যান ও মেম্বাররা

2021/03/19/_post_thumb-2021_03_19_23_17_03.jpg

সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার একটি হিন্দু অধ্যুষিত গ্রামে হামলা ভাংচুর ও লুটপাট চালিয়েছে কয়েক হাজার মানুষ। এ হামলা পূর্বপরিকল্পিত বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। পূর্ব শত্রুতার জেরেই নাচনি চণ্ডিপুর গ্রামের ইউপি সদস্য স্বাধীন মিয়া সাম্প্রদায়িক উস্কানী দিয়ে হিন্দু অধ্যুষিত নোওয়াগাওয়ে এসে হামলা ও লুটপাট করেছে বলে সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে।

সুনামগঞ্জের শাল্লায় সংখ্যালঘু অধ্যুষিত নোয়াগাঁও গ্রামে হামলা, ভাংচুর ও লুটপাটে নেতৃত্ব দিয়েছেন স্থানীয় যুবলীগ সভাপতি স্বাধীন মিয়া। তার বাবা স্থানীয় আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা কেরামত আলী। দিরাই থানার সরমঙ্গল ইউনিয়নের নাচনী গ্রমের স্বাধীন মিয়া ওই ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের নির্বাচিত সদস্য (মেম্বার)ও। 

হামলা ও ভাংচুরের প্রায় ৩৬ ঘণ্টা পর যুবলীগ নেতা স্বাধীনকে প্রধান আসামি করে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় শাল্লা থানায় একটি মামলা হয়েছে। মামলাটি দায়ের করেছেন শাল্লা উপজেলার হাবিবপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিবেকানন্দ মজুমদার বকুল। চেয়াম্যানের নিজ বাড়ি ইউনিয়নের নোয়াগাঁও গ্রামে, যেখানে হিন্দুদের বাড়িঘরে বুধবার সকালে ব্যাপক হামলা, ভাংচুর ও লুটপাট করা হয়েছে। মামলার বাদিসহ ক্ষতিগ্রস্তরা জানিয়েছেন, স্বাধীন মিয়াসহ হামলায় অংশ নেয়া ৫০ জনের নাম উল্লেখ করে শাল্লা থানায় মামলা দায়ের করার প্রায় ৪৮ ঘণ্টা অতিক্রম হলেও মূলহোতাদেরকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।

বৃহঃস্পতিবার (১৮ মার্চ) বিকেলে নোয়াগাও গ্রামে গিয়ে দেখা যায় গ্রামের বাজার ও গ্রামের প্রবেশ মুখে পুলিশের টহল। র‌্যাব সদস্যরাও টহল দিচ্ছেন। গ্রাম থমথমে। অনেক পরিবারের নারী সদস্যদের বাড়িতে নিয়ে আসেননি স্বজনরা। তবে পুলিশ সুপার গ্রামবাসী যতক্ষণ অনিরাপদ মনে করেছেন ততক্ষণ গ্রামে পুলিশ টহল থাকবে বলে জানিয়েছেন।

এদিকে নোয়াগাও গ্রামবাসী ও এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে - তাদের গ্রামের পাশের একটি জলমহালের ইজারাদার স্বাধীন মিয়া। তিনি গত জানুয়ারি মাসে জলমহাল নীতিমালা উপেক্ষা করে ওই জলমহালটি সেচে মাছ ধরেন। এতে এলাকার কৃষকদের পানি সেচের সমস্যা দেখা দিলে নোয়াগাও গ্রামের ঝুমন দাস আপন স্বাধীন মিয়ার বিরুদ্ধে স্টেটাস দেন ও তার আইনবিরোধী কাজের সমালোচনা করেন। এতে প্রশাসন জলমহাল নীতিমালা উপেক্ষা করে মৎস্য আহরণ করায় স্বাধীন মিয়াকে আর্থিক জরিমানা করে। এতে ক্ষুব্দ হয়ে স্বাধীন মিয়া দুই মাস আগেই আপন দাসসহ গ্রামবাসীকে দেখে নেওয়ার হুমকি দেন। 

পরবর্তীতে গত বুধবার সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলায় হিন্দু পরিবারের উপর হামলা চালিয়ে যে  নির্যাতন, ভাঙচুর, লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে তাতে সর্বশেষ দেখা যায় ঐ উদ্দেশ্যমূলক সাম্প্রদায়িক হামলার নেতৃত্ব দেয় স্থানীয় শাল্লা উপজেলা চেয়ারম্যান ও আ.লীগ নেতা আল আমিন চৌধুরী এবং তার অনুসারী নাচনি চণ্ডিপুর গ্রামের ইউপি সদস্য ও যুবলীগ নেতা স্বাধীন মিয়া। মূলত ইউপি সদস্য স্বাধীন মিয়ার প্ররোচনায় উপজেলা চেয়ারম্যান ও আ.লীগ নেতা আল আমিন চৌধুরী হামলায় স্বশরীরে অংশগ্রহণ করে বলে জানা যায়। উক্ত হামলায় আনুমানিক ত্রিশহাজার লোক অংশ নেয়। উল্লেখ্য, আল আমিন চৌধুরী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। তিনি নিজের ক্যাডার বাহিনী নিয়ে স্বশরীরে হামলায় নেতৃত্ব দেয় যা বেশ কিছু স্থিরচিত্র তে স্পষ্টত দেখা যায়।

স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা অনিল চন্দ্র দাস বলেন, স্বাধীন মেম্বার জলমহাল শুকিয়ে মাছ ধরায় আমাদের গ্রামের লোকজন বাধা দিয়েছিল। প্রশাসন তাকে আর্থিক জরিমানাও করে। এ ঘটনায় প্রতিশোধ নেওয়ার হুমকি দিয়েছিল। সেই উপজেলা চেয়ারম্যান কে প্ররোচনা ও ধর্মপ্রাণ মানুষের আবেগকে কাজে লাগিয়ে আমাদের গ্রামে হামলা ও লুটপাট করেছে। 

স্থানীয় ইউপি সদস্য বিশ্বরূপ দাস জানান, "পুলিশ পুরো ঘটনা অনেক আগে থেকেই জানত৷ চণ্ডিপুর গ্রামের ইউপি সদস্য স্বাধীন মিয়ার অনুসারীরা যে রাতেও হামলা করতে এসে ফিরে গেছে তাও জানত৷ আর মেম্বারের বিরুদ্ধে পোস্ট দেওয়া জুমন তো পুলিশের হেফাজতেই ছিল৷ তারপরও আমাদের নিরাপত্তার কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি৷ পুলিশ মোতায়েন করা হলে তারা হামলা চলাতে পারত না৷"      

তিনি বলেন, শুধু তাই নয়, বুধবার সকালে হামলা শুরুর পর মাত্র ১০-১৫ জন পুলিশ আসে৷ তারা  দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হামলা দেখেছেন৷ তাদের নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেনি৷ ওই কয়জন পুলিশের পক্ষে সেটা সম্ভবও ছিল না৷ হামলাকারীরা এক-দেড়ঘন্টা পর চলে গেলে পুলিশ আসে৷  

সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান বলেন, ‘হামলার পর পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসন মিলে উত্তেজিত হামলাকারীদের শান্ত করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছে। তবে লুটপাট, আগুন দেওয়া বা শ্লীলতাহানির কোনো অভিযোগ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।’

অন্যদিকে এই অনুসন্ধান সম্পর্কে শাল্লা থানার ওসি নাজমুল হক কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, এ বিষয়টি আমাদের জানা নেই। 

মন্তব্য