প্রচ্ছদ

শাহ আবদুল হান্নান : এক কর্মবীর নক্ষত্রের বিদায়

2021/06/02/_post_thumb-2021_06_02_19_16_22.jpg

মুহাম্মাদ মঈনুল ইসলাম

কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদি থানাধীন কুড়িখাই গ্রামের ঐতিহ্যবাহী শাহ পরিবারের সদস্য শাহ আবদুল হান্নান ৪ এপ্রিল ১৯৪০ সালে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা শাহ আবদুল মান্নানের কর্মসূত্রে নেত্রকোণা ও নারায়ণগঞ্জে প্রাথমিক ও হাইস্কুল পর্যন্ত পড়াশুনার পর ১৯৫৫ সালে যশোর জিলা স্কুল থেকে মেট্রিকুলেশন, ১৯৫৭ সালে ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন। ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যাল থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ১ম স্থানসহ মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন। এ সময়ে তিনি Muslim News International, Karachi, Pakistan - এর ঢাকা করেসপন্ডেন্ট ছিলেন।

কর্মজীবনে অধ্যাপনা দিয়ে শুরু করে কিছুদিন পর ১৯৬৩ সালে পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে যোগ দেন। অর্থ বিভাগ থেকে শুরু করে তিনি শুল্ক  ও মূল্য সংযোজন বিভাগের কালেক্টর, দুর্নীতি দমন ব্যুরোর মহাপরিচালক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদস্য ও চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭১ পরবর্তী সময়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সম্পূর্ণ নতুন করে প্রতিষ্ঠার শুরু থেকে বর্তমান অবস্থান পর্যন্ত আনতে তাঁর অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। স্বাধীনতার পর তিনি এর প্রথম দ্বিতীয় সচিব হিসেবে যোগ দেন এবং অল্প কিছুদিনের মধ্যেই এর প্রথম সচিবের দায়িত্ব পান। এদেশের যুগান্তকারী মূল্য সংযোজনী কর ব্যবস্থা তাঁর হাত দিয়েই প্রবর্তিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৯৭ সালে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন। এর আগে ১৯৯২ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর নিযুক্ত হন। ১৯৯৫ সালে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের, ১৯৯৬ সালে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংকিং বিভাগের এবং ১৯৯৭ সালে আভ্যান্তরীণ সম্পদ বিভাগের সচিবের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৮ সালে তিনি সরকারের সচিব পদ থেকে পদত্যাগ করেন। তিনি ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড এর চেয়ারম্যান হিসেবে চার বছর দায়িত্ব পালন করেন। এদেশে ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তিনি একজন স্বপ্নদ্রষ্টা।

তাঁর চিন্তা চেতনা সবসময় দেশ ও ইসলাম কেন্দ্রিক থাকায় সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন ছাড়াও তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, সামাজিক সংস্থার সাথে জড়িত ছিলেন। এখনও তিনি সেসব প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে গেছেন।

তিনি কিছুদিন এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ও দারুল ইহসান ইউনিভার্সিটির ভাইস চ্যান্সেলরের দায়িত্ব পালন করেন। আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম (IIUC) এর উপদেষ্টা ছিলেন। এছাড়াও তিনি মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, দারুল ইহসান ট্রাস্ট, Bangladesh Institute of Islamic Thought (BIIT), Islamic Economics Research Bureu, Central Sariah Board for Islamic Banks of Bangladesh, Islamic Banks Consultative Forum সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত ছিলেন। এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশেরই প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের অধিকারী শাহ আবদুল হান্নান একজন সফল আমলার পাশাপাশি একজন ইসলামী চিন্তাবিদ ও গবেষক ছিলেন।  সমাজ সংস্কারেও তিনি নিজেকে বিশেষভাবে নিয়োজিত ছিলেন। সমাজ সচেতনতা তাঁকে সমাজেও তীক্ষ্ণ দিকগুলো নিয়ে ভাবিয়ে তোলে। তিনি নিজের একাডেমিক ও প্রফেশনাল বিষয় ছাড়াও কুরআন, হাদীস, তাফসির, উসূলুল ফিকহ, রাজনীতি, অর্থনীতি সহ বিভিন্ন বিষয়ে তিনি পারদর্শী ছিলেন।

গ্রন্থ রচনা ছাড়াও তিনি বিভিন্ন সংবাদপত্র ও ম্যাগাজিনে লিখে যাচ্ছেন। দেশ, জাতি কিংবা আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে সমসাময়িক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও তিনি তাঁর প্রেক্ষাপটে সমসাময়িক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও তিনি তাঁর সুস্পষ্ট মতামতসহ দিক-নির্দেশনা দিয়েছেন। 

ছাত্রজীবন থেকেই তিনি ইসলামের প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট ছিলেন। জীবনের একটি মুহূর্তও তিনি অপব্যবহারের পক্ষপাতি ছিলেন না। প্রতিটি মুহূর্তের সদ্ব্যবহারই তাঁকে একজন সফল মানুষ হিসেবে মর্যাদা দিয়েছে। ব্যক্তি জীবনে এমন অমায়িক, নিরহঙ্কারী ও চালচলনে অত্যন্ত সাদাসিধে শাহ আবদুল হান্নান সবসময় আশা আর বিশ্বাসের স্বপ্ন দেখেছেন। সমাজে ইসলাম কায়েম ও বাংলাদেশকে একটি সুখী, সমৃদ্ধশালী ও কল্যাণ রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা তাঁর সারাজীবনের স্বপ্ন ছিল। আর সে স্বপ্ন বাস্তবায়নে তিনি সময়কে নিরলসভাবে কাজে লাগিয়েছেন। প্রকৃত কর্মবীর মানুষের উদাহরণ তিনি। সদা হস্যোজ্জল দাওয়াতী চরিত্র নিয়ে ছুটেছেন দ্বীন প্রতিষ্ঠার মনজিলের দিকে। আজ তার সে পথচলার অবসান হলো। তিনি এখন মহান রবের সান্নিধ্য লাভের অপেক্ষায়। মহান রব্বুল আলামীন তাঁর নেক আমলগুলো কবুল করুন। বিনিময়ে তাঁকে এমন জান্নাত দিন যা আসমান জমীনের সমান দূরত্বের মত প্রশস্ত।

লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট

(লেখাটি লেখকের ফেসবুক প্রোফাইল থেকে সংগৃহীত)

মন্তব্য