প্রচ্ছদ

স্বপ্নের পদ্মাসেতু নিয়ে আরাফাতদের আয়নাবাজি

2022/06/18/_post_thumb-2022_06_18_09_52_55.jpg

মিনার রশিদ

আওয়ামীলীগের লোকজন যখন কোনে প্রশ্নের জবাব দিতে পারে না তখন তারা মুহাম্মদ এ আরাফাতের ভিডিও লিংক পাঠিয়ে দেয়। এভাবেই তার একটি ভিডিও ক্লিপ আমার হাতে পৌঁছেছে। পদ্মা সেতুতে মাত্রাতিরিক্ত খরচ বা দুর্নীতি নিয়ে যে অভিযোগ উঠেছে সেগুলোকে মিথ্যা অপ-প্রচার হিসাবে তুলে ধরতেই আরাফাতের এই মহৎ উদ্যোগ। খুবই আগ্রহভরে সেটি দেখলাম!

এটি দেখার পরে প্রথমেই এক পণ্ডিত সাবের গল্পটি মনে পড়ে গেল! সেই পণ্ডিত সাব ক্লাসের ছাত্রদের জন্যে বোর্ডে লিখেছিলেন, ‘কপাল ভিজিয়া গেল নয়নের জলে'। ক্লাসের ছাত্ররা এটা দেখে চেঁচিয়ে উঠল, এটা কীভাবে সম্ভব পণ্ডিতমশায়, নয়নের জল কপালে উঠবে কী করে? পণ্ডিত মশায় প্রশ্নকারীদের দিকে তির্যক দৃষ্টি হেনে (মনে মনে রাজাকার শাবক বলে) এবং একটু ভেবে দ্বিতীয় লাইনে যোগ করেন, ঠ্যাং দুটি বাঁধা ছিল গাছেরও ডালে!

আমাদের এই পণ্ডিত মশায়ের হাবভাবে দারুণ মিল রয়েছে। ঠ্যাং দুটি গাছের ডালে বাঁধবেন। তবুও কপোল (গাল) কে কপাল লিখে ফেলার ভুলটি স্বীকার করবেন না! এই পণ্ডিত মশায় কিংবা তাদের দল পুরো জাতির দুটি ঠ্যাং কীভাবে গাছের ডালে বেঁধে ফেলছে তার সামান্য এই আলোচনার মাধ্যমে ঠাহর করতে পারবেন। কাজেই একটু সময় নিয়ে পুরো লেখাটি পড়েন! সাথে একটা ক্যালকুলেটর নেন, হিসাবটি যাচাইয়ের জন্যে।

এক.

কানাডার আদালত কি আসলেই রায় দিয়েছে যে পদ্মা সেতুতে কোনো দুর্নীতির প্রমাণ পায় নাই?

এখানে যে বিষয়টি এই আরাফাতরা গুলিয়ে ফেলেন তাহলো, বিশ্বব্যাংক কিন্তু কানাডার আদালতে দুর্নীতি সংঘটনের মামলা করে নাই। বরং ভবিষ্যত দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের মামলা ছিল এটি! কানাডার একটি কোম্পানি এবং তাদের কয়েকজন অফিসারকে এই ষড়যন্ত্রের সাথে অভিযুক্ত করে এই মামলাটি করা হয়।

এ বিষয়ে স্বনামধন্য সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান তাঁর একটি অনুসন্ধানী রিপোর্টে বিস্তারিত লিখেছেন। সেখানে জানিয়েছেন, আলামত হিসাবে আড়িপাতার যে রেকর্ড তা আদালতে গ্রহণযোগ্য হতো না কারণ যে পদ্ধতিতে এই রেকর্ডটি করা হয়েছিল সেই পদ্ধতিটি আদালতের দৃষ্টিতে আইনানুগ ছিল না। আদালতের কাছে যেটি ‘আইনানুগ ছিল না' এটির অর্থ এই না যে আড়িপাতা ঐ রেকর্ডটি মিথ্যা ছিল! একারণে বিশ্বব্যাংক সেই মামলা থেকে পিছিয়ে যায়। এতে কিন্তু বিশ্বব্যাংক বলে নাই যে দুর্নীতির ষড়যন্ত্র হয় নাই। বিশ্বব্যাংক সেটা বিশ্বাস করলে তো পদ্মা সেতু প্রজেক্টেই আবার ফিরে আসত! আসলে চোর ধরা ব্যাংকের কাজ নয়। কাউকে জোর সন্দেহ হলে ঋণ দেয়া বন্ধ করে দেয়।

সরকারের ‘ক্যারট-অর-স্টিক’ পলিসির মধ্যে থাকা আমাদের গণমাধ্যম এই জটিল আইনি বিষয়টি জনগণকে না বুঝিয়ে সরকারের কথামত হুক্কা হুয়া রব তুলেছে। সেদিন গণমাধ্যম এ দায়িত্বটি পালন করলে সরকার আরও সতর্ক থাকতো এবং জাতির পকেট থেকে এতগুলি টাকা খসতো না।

আওয়ামীলীগের এই রেসকিউয়ার কিন্তু ডেভিড বার্গম্যানের সেই আর্টিকেল বা মূল পয়েন্টটি উল্লেখ না করে নিজেদের সেই টিয়া পাখির বুলিটিই আওড়ে গেছেন। এক্ষেত্রে ড. ইউনুস সহ কয়েকজন ব্যক্তি সম্পর্কে বিশ্বব্যাংকের লোন বন্ধের যে অভিযোগ করা হচ্ছে সেগুলির কি কোনো প্রমাণ এই আরাফাত বা অন্য কারও কাছে রয়েছে? বিশ্বব্যাংক কি এরকম কোনো ব্যক্তির সুপারিশে বা তদবিরে কাউকে লোন দেয় বা তা বন্ধ করে দেয় ? এই আরাফাতরা কি বিশ্বব্যাংককে দেশের সোনালী ব্যাংক বা ফার্মারস ব্যাংক বলে ঠাহর করেছেন? আসলে এখানে নিজেদের অপকীর্তি ঢাকতে বা নিজেদের গল্পটি বিশ্বাসযোগ্য বানাতে ড. ইউনুসের সঙ্গে হিলারি এবং ক্লিনটনের মধ্যকার সম্পর্কটিকে ব্যবহার করা হয়েছে।

দুই.

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসরের প্যাথেটিক পাটিগণিত!

জানি না ইনার কাছ থেকে ছাত্ররা চাপাবাজি ছাড়া অন্য কিছু শিখতে পারবেন কি না। এই ভদ্রলোকের পাটিগণিতের জ্ঞান দেখে শ্রোতারা সত্যিই তাজ্জব বনে যাবে!

পদ্মা সেতুতে খরচ বাড়ার একটি কারণ হিসাবে তিনি সেতুর দৈর্ঘ্য এক কিলোমিটার বেড়েছে বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, প্রাথমিক দৈর্ঘ্য ছিল ৫.৮ কিলোমিটার, সেটিকে পরে করা হয়েছে ৬.১৫ কিলোমিটার! এই দুটি ইনফরমেশন সঠিক। তবে এখানে প্যাথেটিক হয়েছে উনার বিয়োগ অংকটি! এতে তিনি পেয়েছেন দৈর্ঘ্য এক কিলোমিটার বেড়ে গেছে! অথচ ক্লাস ওয়ানের বাচ্চাও এটি বিয়োগ করে সঠিক অংকটি বলবে ০.৩৫ কিলোমিটার! সরকার যেখানে খরচ করেছে প্রতি কিলোতে ৫ হাজার কোটি টাকা সেখানে ০.৬৫ কিলোমিটারের এই হিসাবের তারতম্য অনেক! এই প্যাথেটিক পাটিগণিতের জ্ঞান নিয়ে তিনি করেছেন জটিল প্রকৌশল বিদ্যার হিসাবটি যেটি পরবর্তী প্যারায় আলোচনা করা হচ্ছে!

তিন.

ভূপেন হাজারিকা সেতুর পরিবহন ক্ষমতা (Weight Capacity) হয়ে পড়ল পাইল লোড!

যে ভদ্রলোক ৬.১৫ থেকে ৫.৮ বিয়োগটিই করতে জানেন না তিনিই এই জটিল প্রকৌশল বিদ্যার তুলনাটি করার অপচেষ্টা করেছেন। সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হলো শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি সহ আওয়ামীলীগের বহু নেতা ও বুদ্ধিজীবী হুবহু তার এই হিসাবটি অত্যন্ত তৃপ্তির সাথে অহরহ উল্লেখ করছেন! প্রকৃতপক্ষে ভূপেন হাজারিকা সেতুর পাইল লোড ৬০ টন নহে। বরং ৬০ টন ওজনের অর্জুন নামের আর্মির ট্যাংকগুলি এই সেতুর উপর দিয়ে যেতে পারবে এটি অনেক জায়গায় উল্লেখ রয়েছে! ৬০ টন হলো, সেতুটির নিরাপদ পরিবহন ক্ষমতা বা Weight capacity! যে কেউ গুগলে গিয়ে Weight Capacity of Bhupen Hazarika Bridge লিখে সার্চ দিলে এটি পাবেন!

এখন এক ব্রিজের পরিবহন ক্ষমতার সাথে অন্য ব্রিজের পাইল লোড তুলনা করে আরাফাত আবিষ্কার করে ফেলেছেন যে পদ্মা সেতু ভূপেন হাজারিকার চেয়ে ১৩৩ গুণ শক্তিশালী! ফ্যাক্টর অব সেইফটির কারণে একটি ব্রিজের ওয়েট ক্যাপাসিটির চেয়ে পাইল লোড অনেক অনেকগুণ বেশি রাখা হয়। এই জ্ঞান নিয়ে চাপাবাজ আরাফাত এসেছেন আওয়ামী লীগকে উদ্ধার করতে!

নিজেদের লুটপাটকে জাস্টিফাই করতে এই পণ্ডিত মশায় পুরো প্রকৌশল বিদ্যার ঠ্যাং দুটিকে কেমন করে গাছের ডালে বেঁধে ফেললেন! বুয়েট সহ পুরো দেশের প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলিও কোনোরূপ প্রতিবাদ করছে না। এদেশের মানুষ নিজেদের টাকা খরচ করে প্রকৌশলী নামের এই সব মূর্খ এবং ন-পুংশকদের কেন তৈরি করছে???

চার.

খরস্রোতা নদীর দোহাই: নদী শাসনের জন্যে এই অতিরিক্ত ব্যয়!

২০০৪/২০০৫ সালে জাইকার সমীক্ষাতেও নদী শাসনের ব্যাপারটি ছিল এবং রেললাইনের অপশনটিও সেখানে ছিল।

আরাফাতের মত চাপাবাজরা খরস্রোতা পদ্মা সেতুর কথা বলে মানুষের মাথা গুলিয়ে দিতে চায়! অ্যামাজনের পর পদ্মা সবচেয়ে খরস্রোতা নদী। মনে হয়, পদ্মা এরকম খরস্রোতা হয়েছে কেবল ২০০৭ সালের পরে। জাইকার মত প্রতিষ্ঠান পদ্মা সেতুর জন্যে নদীশাসনের এই ব্যাপারটি বোধ হয় জানতো না! প্রকৃত পক্ষে জাইকার সেই সমীক্ষায় নদী শাসনের এই বিষয়টিও খুব ভালোভাবেই উল্লেখ ছিল। সংযোগ সড়কের হিসাবটিও যথাযথ ছিল! আমি জাইকার সেই সমীক্ষা থেকে নদী শাসনের সেই অংশটুকু এখানে উল্লেখ করছি!

• River works: 16,300m long River works

• Mawa Side River works 6,000m bank protection

• Janjira Side River works; 10,300m bank protection

• Dredging volume of sand materials: 9,500,000 m3 of which 250,000,000 m3 will be approach road and 7,000,000 m3 for land reclamation

অর্থাৎ এখানে দেখতে পাচ্ছেন যে ১৬ কিলোমিটারের নদী শাসনের উল্লেখ সেই প্রথম সমীক্ষাতেই ছিল, যা নিয়ে এই পণ্ডিতমশায় চাপাবাজি করে যাচ্ছেন।

জাইকার সেই সমীক্ষার চেয়ে পরে কেন জমি অধিগ্রহণ বেশি করতে হলো (যদি হয়ে থাকে) এবং সেটা কি কারিগরি অপরিহার্যতা (Technical necessity) নাকি লুটপাটের অজুহাত- স্বাধীন গবেষণায় সেটিও হয়তো বেরিয়ে আসবে!

আরাফাত আরো যুক্তি দেখিয়েছেন তখনকার এক ডলারে ছিল ৬৮.৬৫ টাকার মত, পরে তা হয়েছে ৮৪.৮০ টাকা। এই হিসাবটি দিয়েও তার মত করে মানুষকে বিভ্রান্ত করতে চেয়েছেন! এখানে দেখুন আসল হিসাবটি।

টাকার অবমূল্যায়নের জন্যে ১০,১৩০ কোটি টাকা বেড়ে হবে ১২,৫০০ কোটি টাকা। ০.৩৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য বাড়ার জন্যে এই খরচ হবে ১৩,২৫৪ কোটি টাকা । এর বাইরে যা হয়েছে তা অদক্ষতা ও স্পষ্টতই দুর্নীতি ও লুটপাটের কারণে। পাবলিক ফান্ড কিছু মানুষের কাছে আপনি বেশি বিলাবেন কোন অধিকারে? সেখানে দুর্নীতির অংশ কত ছিল?

কাজেই এই হিসাব আজ হোক, কাল হোক জাতিকে দিতেই হবে। এরকম চাপাবাজি বা আয়নাবাজি করে এই মহা লুটপাটকে কখনোই ঢাকা যাবে না!

এখানে দেখুন আসল হিসাবটি।

টাকার অবমূল্যায়নের জন্যে ১০,১৩০ কোটি টাকা বেড়ে হবে ১২,৫০০ কোটি টাকা। ০.৩৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য বাড়ার জন্যে এই খরচ হবে ১৩,২৫৪ কোটি টাকা । এর বাইরে যা হয়েছে তা অদক্ষতা ও স্পষ্টতই দুর্নীতি ও লুটপাটের কারণে। পাবলিক ফান্ড কিছু মানুষের কাছে আপনি বেশি বিলাবেন কোন অধিকারে? সেখানে দুর্নীতির অংশ কত ছিল?

কাজেই এই হিসাব আজ হোক, কাল হোক জাতিকে দিতেই হবে। এরকম চাপাবাজি বা আয়নাবাজি করে এই মহা লুটপাটকে কখনোই ঢাকা যাবে না!


লেখক: মেরিন ইঞ্জিনিয়ার, কলামিস্ট-বুদ্ধিজীবী

মন্তব্য