জাতীয়

ঋণের ভারে দিশেহারা সুন্দরবনের জেলেরা

2021/11/12/_post_thumb-2021_11_12_09_35_19.jpg

৩০ বছর ধরে সুন্দরবনের দুবলারচরে মাছ ধরার কাজ করেন সাইফুল সর্দার নামে এক জেলে। বছর দুয়েক আগে ব্র্যাকের কাছে ১৬ লাখ টাকা ঋণ নেন। বর্তমানে সুদে-আসলে এনজিওর পাওনা হয় প্রায় ৩০ লাখ টাকা। এখনো তিনি ঋণের টাকা পরিশোধ করতে পারেননি। তার নামে মামলাও হয়েছে। শুধু সাইফুল সর্দার নয়, সৈয়দ হামজা সর্দার নামে আরেক জেলে এনজিও আশার কাছ থেকে ২ লাখ টাকা ঋণ নেন। টাকা পরিশোধ করতে না পেরে বসতভিটার কিছু অংশ বিক্রি করতে হয়েছে তাকে। এভাবে অন্তত ২০ হাজার জেলে ঋণের ভারে এখন দিশেহারা জীবনযাপন করছেন। ঋণের জালে আটকা এসব জেলে জীবন চালাতে জড়িয়ে পড়ছেন বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকা-ে। সম্প্রতি সুন্দরবনের দুবলারচর সরেজমিন ঘুরে এসব জেলের অনেকের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

জেলেদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বছরে মাত্র পাঁচ মাসের জন্য কর্মচঞ্চল থাকে দুবলারচর এলাকা। এই সময়ে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, বাগেরহাট, পিরোজপুর, খুলনা, সাতক্ষীরা থেকে জেলেরা এসে ডেরা বেঁধে সেখানে সাময়িক বসতি গড়েন। তারা জীবনবাজি রেখে সমুদ্রে মাছ ধরেন। সেই সঙ্গে শুঁটকি শুকানোর কাজও চলে। মৌসুম শেষে কেউ কেউ লাভের মুখ দেখলেও অধিকাংশ জেলেই লোকসান বোঝা নিয়ে বাড়ি ফেরেন। একটা সময় জলদস্যু আতঙ্কে দিন কাটিয়েছেন সুন্দরবনের দুবলাচরের জেলেরা। সুন্দরবন দস্যুমুক্ত হলেও এখন সুদের ফাঁদ থেকে বের হতে পারছেন না জেলেরা। দুবলারচরে দৈনিক কোটি টাকারও বেশি কাঁচা মাছ ও শুঁটকির বাণিজ্য হয়ে থাকে। এতে অসহায় জেলেদের ভালো থাকা তো দূরের কথা, ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে চলে জেলেদের জীবন।

স্থানীয় জেলেরা জানান, বন বিভাগের কাছ থেকে অনুমতি নিয়েই দুবলারচরে মাস ধরেন জেলেরা। কিন্তু মৌসুম শেষে হাতে কোনো টাকা থাকে না। সরকার আমাদের দিকে একটু মুখ ফিরে চায় আর ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করে দেয় তাহলে জেলেরা সাহেবদের কাছ থেকে আর সুদে টাকা নিতে হতো না। কারণ ১ লাখ টাকা ঋণ নিলে পাঁচ মাসে তার সুদ দিতে হয় ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা। যেসব জেলে মহাজনের কাছ থেকে দাদন নিয়েছেন তারা পুরোই বিক্রি হয়ে গেছেন। ঋণের সুদ আর দাদন জেলেরদের খেয়ে ফেলছে। কেউ কোমর সোজা করে দাঁড়াতে পারেন না।

নাম প্রকাশ না করা শর্তে একাধিক জেলে জানান, দুবলার চরে এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করে বেশ কয়েকজন মাফিয়া। তাদের সঙ্গে আঁতাত করে অন্য সাহেবরা। জেলেদের ঋণ দেয় আবার তাদের শর্ত দেওয়া থাকে মাছ ধরলে বা শুঁটকি করলে নির্দিষ্ট মহাজনের কাছেই বিক্রি করতে হবে। আর যদি তাদের তালিকার লোক হয় তবে মাছ বিক্রি করে ভালো দাম পাওয়া যায়। নয়তো লস আর লস।

জেলে রহিম শেখ জানান, প্রতি বছরই প্রায় ৩০ হাজার পুরুষ মোংলা, রামপাল ও খুলনাসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে এসে মাছ ধরতে নামেন। স্ত্রী-সন্তান ও স্বজনদের ফেলে পাঁচ মাস গভীর সমুদ্রে চলে মাছ ধরার যুদ্ধ। তখন বাড়ির কথাও মনে থাকে না কারোর। সমুদ্রে যখন ঝড় শুরু হয় তখন আল্লাহ ও মা-বাবার কথা মনে পড়ে। এত যুদ্ধের পরও বছর শেষে শূন্যহাতে ফিরতে হয়। তিনি বলেন, ‘গত বছর ফেব্রুয়ারিতে মাছ ধরা শেষে বাড়ি ফেরার আগে সাহেবদের সঙ্গে হিসাব হয়। হিসাব শেষে দেখা যায় সাহেবরা আমার কাছ থেকে আরও ৫ লাখ টাকা পাবেন। গত বছর জালে মাছ অনেক কম ধরা হয়েছে। এ বছর শুরুতেই ভালো মনে হচ্ছে। প্রত্যাশা করছি এ বছর সব ঋণ পরিশোধ করে বাড়ি ফিরতে পারব।’ তিনি আরও বলেন, ‘জালে অনেক মাছ ধরা পড়ে। তবে মাছের সঠিক মূল্য পাই না। যে মাছের দাম ৭০০ টাকা তা ধরা হয় ৩০০ টাকা। আর ৩০০ টাকার মাছ ধরা হয় ১০০। এভাবেই পাঁচ মাস লোকসান দিয়ে মাছ বিক্রি করতে হয়।’

গত ১৮ বছর ধরে দুবলারচরে মাছ-শুঁটকির ব্যবসা করতে আসেন বাদল সরকার। তিনি খুলনার পাইকগাছা থানার মঠবাড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা। তার নিজেরই দুটি বোট ও মাছ ধরার জাল রয়েছে। সাহেবদের মাধ্যমে বন বিভাগকে বোট লাইসেন্স সার্টিফিকেট, ডিএফসি বা ডেইলি ফুয়েল কনজাম্পশন প্রক্রিয়ায় রাজস্ব-ভ্যাট দিয়ে তিনি দুবলার চরে মাছ ধরতে আসেন। কিন্তু তিনিও ঋণে জর্জরিত।

বাদল বলেন, ‘একটি বোটের জন্য ৩ হাজার এবং ঘরের জন্য ৩ হাজার করে ৬ হাজার টাকা বন বিভাগকে রাজস্ব-ভ্যাট দিতে হয়। পুরো মৌসুমের জন্য আমরা রয়্যালটি দিয়েই চরে মাছের ব্যবসা করতে এসেছি। ব্যবসা করার জন্য ঋণ নিতে হয়েছে। গত বছর ব্যবসা করেছি, কিন্তু লোকসান হয়েছে। এই বছরও কেবল শুরু। এখনো ভালো মাছ পাইনি। ঋণের বোঝা তো আছেই। গত মৌসুমেও ঋণের টাকা দিতে না পেরে সুদের অংশটা দিয়েছি। আশা করছি এ মৌসুমে মাছ বিক্রি করে সব ঋণ পরিশোধ করব। এই ঋণ আমাদের শেষ করে দিল। সরকারের কাছে আবেদন, দুবলার মৎস্যজীবী ও জেলে সম্প্রদায়কে বাঁচিয়ে রাখতে সুদমুক্ত ব্যাংক ঋণ দেওয়া ব্যবস্থা করতে হবে। যারা ঋণ নিয় মাছ ধরতে ও ব্যবসা করতে এসেছেন তাদের অনেকের নামেই চেকের মামলা রয়েছে। কারণ তারা ঋণ নিয়ে বছরে সুদের টাকা পরিশোধ করতে না পারলেই মামলা দিচ্ছে সাহেব-মহাজন বা এনজিওগুলো। এ ঋণ নিতে গেলে অগ্রিম তিনটি চেকের পাতায় স্বাক্ষর রেখে দেয়। এছাড়াও স্ট্যাম্প করে পাকা কাগজ করে রাখে। অনেক সময় সুদের টাকা পরিশোধ করলেও কোনো রসিদ দেয় না।’

আবদুর রহমান নামে আরেক জেলে বলেন, ‘পাঁচ মাস মাছ ধরে আমাদের জীবন-জীবিকা নির্বাহ করি। কামাই করি এই পাঁচ মাস। দুবলারচরে মাছ ধরে সারা বছর আমাদের এ দিয়ে চলতে হবে। কিন্তু আমরা এই চরে মাছ ধরার জন্য আসি। সুদ দিতে দিতে আমাদের হাতে কিছুই থাকে না। লাখে ৩০-৪০ হাজার টাকা করে সুদ দিতে হয়, আসল তো রয়েই গেল। সুদের টাকায় অনেক সময় আমরা জোগাতে পারি না। এক সিজনে শুধু সুদের টাকা দিয়ে বলতে হতো সামনের সিজনে এলে পুরোটাই দেব। আর এখানে ব্যবসা করতে এলে একটি চক্রকে ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা নিয়ে আসতে হয়। এসব বাস্তবায়ন না করলে এখানে ব্যবসা করা যায় না। আর তাদেরই প্রতি লাখে ৩০-৪০ হাজার টাকা সুদ দিতে হয়। এই বেল্টে বদ্দা যারা থাকেন সাহেবদের মাধ্যমে ঋণ দিয়ে থাকেন। সেখানেও স্ট্যাম্প স্বাক্ষর করতে হয়। না দিলে মামলা খেতে হয়।’

মজিবুর রহমান নামে আরেক জেলে বলেন, ‘মাছ ধরার পর থেকে দুবলার চরে শুঁটকি তৈরি ও বিক্রি পর্যন্ত এই প্রক্রিয়া সবকিছুই বিক্রি হয়। কাঁচা মাছ বিক্রি হয়, শুঁটকি তৈরির পর বিভিন্ন স্থান থেকে এই চরে ক্রেতারা আসেন, দাম-দর করে শুঁটকি নিয়ে যান। যে মাছগুলো বাদ পড়ে নষ্ট হয়ে যায়, এর সঙ্গে কাঁকড়া, চিংড়ি, এসব রাবিশ হিসেবে বিক্রি করা হয়। এগুলো মণ ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। এগুলো যারা কিনে নিয়ে যায় তারা খরচ দিয়ে নিয়ে যায়। এই চরে শুঁটকির ক্রেতা আলাদা, কাঁচা মাছের ক্রেতা আলাদা আবার রাবিশের ক্রেতা আলাদা।’

অন্য জেলেরা বলেন, গত বছর দুবলারচরে প্রতিটি বোটে ৩-৪ লাখ টাকা করে সবার লোকসান হয়েছে। গড় হিসাবে ৯০ ভাগ জেলেই লোকসানের বোঝা কাঁধে নিয়ে বাড়ি গেছে। কিন্তু যারা দাদন দিয়ে মাছ ধরতে এসেছিল তারা ক্রীতদাসই থেকে গেছে। আর সুদে ঋণ নিয়ে যারা ব্যবসা করতে এসেছে তারা লোকসান গুনে বাড়ি গেছে। কিন্তু অনেকে সুদের টাকা দিতে পারলেও আসল রয়েই গেছে। সাহেবরাও বলে তোরা গরিব মানুষ, আসল পড়ে দিস, এই মৌসুমে সুদের টাকা দিয়ে দে। কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু ব্যবসা করে এ সুদের টাকা দিয়ে আমাদের হাতে আর কোনো টাকা থাকে না। সুদ নিতে গেলেও আমাদের জিম্মি করে ফেলে সাহেবরা। তারা তিনটি চেক স্বাক্ষর করিয়ে রাখে। সুদে ঋণ দেবে বলে স্ট্যাম্প করে দেয়। যখন কেউ সুদের টাকার দিতে পারে না তাদের আবার মামলাও খেতে হয়। সেখানেও টাকা খরচ হয়।

মন্তব্য