মতামত

আওয়ামী জামানায় মিডিয়ার হাল

2022/06/18/_post_thumb-2022_06_18_10_44_45.jpg

মাহমুদুর রহমান

বাংলাদেশে মিডিয়ার সাথে সংশ্লিষ্ট সকল ব্যক্তিই জানেন যে, আওয়ামী লীগ স্বাধীন সাংবাদিকতার ঘোরতর শত্রু। এদের মধ্যে যারা আওয়ামী লীগ এবং হিন্দুস্থান সমর্থক তারা প্রকাশ্যে কথাটি স্বীকার না করলেও অন্তত স্ত্রীর সাথে একান্ত আলাপচারিতায় ব্যাপারটি মেনে নেন বলেই আমার ধারনা। মিডিয়াকে তাবেদারে পরিণত করার আওয়ামী চক্রান্তের ইতিহাসে ১৯৭৫ সালের ১৬ জুন তারিখটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান জামানার তরুন যারা বাংলাদেশের প্রকৃত ইতিহাস জানে না, জ্ঞান হওয়া থেকে শেখ মুজিবকে দেবতারূপে পূজা করার পৌত্তলিক সংস্কৃতি শিখেছে, তাদের ১৬ জুনের তাৎপর্য জানানোর জন্যেই আজকের সম্পাদকীয় লিখছি।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের জনগণ ভারতের সহায়তা নিয়ে পাকিস্তানের সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম করেছিল মুখ্যত গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করবার জন‍্য। স্বাধীনতার চেতনার যে নানারকম, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, বিচিত্র ব্যাখ্যা দিল্লির দালাল, চেতনাধারীদের কাছ থেকে শুনতে পাওয়া যায় সেসব মুক্তিযুদ্ধের অনেক পরে বানানো হয়েছে। এ সমস্ত ব্যাখ্যার আসল উদ্দেশ্য বাংলাদেশের বাঙ্গালী মুসলমানের নিজস্ব সংস্কৃতি ক্রমশ: হিন্দু ধর্মীয় আচার এবং সংস্কৃতির মধ্যে বিলীন করে দেওয়া। যাই হোক, আজকের লেখার বিষয়বস্তু ভিন্ন হওয়ায় চেতনা নিয়ে ঘাটাঘাটি অন্যদিনের জন্য তুলে রাখছি। স্বাধীনতা যুদ্ধকালে পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি শেখ মুজিবের নয় মাসের সশস্ত্র লড়াইয়ে কোনরকম ভূমিকা না থাকলেও তাকে নেতা মেনেই যে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ সেদিন যুদ্ধ করেছিল এতে কোন সন্দেহ নাই। ১৯৭১ এর ডিসেম্বরের ১৬ তারিখে বাংলাদেশ স্বাধীন হয় এবং শেখ মুজিব পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে স্বদেশে ফেরেন ১৯৭২ এর ১০ জানুয়ারি। মুক্তিযুদ্ধ কেমন করে হয়েছে, ভারত কিভাবে মুক্তিযুদ্ধকালিন প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারকে নিয়ন্ত্রণ করেছিল, জাতিকে প্রকৃতপক্ষে কি কি মূল্য চুকাতে হয়েছে, এসব সম্পর্কে শেখ মুজিবের কোন ধারনাই ছিল না। তিনি মহানায়কের মত দেশে ফিরেছেন এবং ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হওয়া পর্যন্ত স্বৈরাচারী কায়দায় দেশ শাসন করেছেন।

প্রায় সাড়ে তিন বছরের শাসনকালে শেখ মুজিবর রহমান বাংলাদেশে চরম দুর্নীতিপরায়ন, পারিবারিক এবং একদলীয় স্বৈরশাসন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। আজকের বাংলাদেশে তার কন্যা শেখ হাসিনা যে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠা করেছেন তার আদর্শিক জন্ম পিতা শেখ মুজিব, ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সময়কালেই দিয়ে গেছেন। শেখ মুজিব বাংলাদেশে সকল রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করে সোভিয়েত ইউনিয়নের মত বাকশাল নামক একদলীয় শাসনব্যবস্থা কায়েম করেছিলেন। স্বাভাবিকভাবেই, একদলীয় রাষ্ট্রব্যবস্থায় মিডিয়ার কোন স্বাধীনতা থাকে না। রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধের মতই শেখ মুজিব বাংলাদেশের সকল মিডিয়াও এক আদেশে বন্ধ করে দিয়েছিলেন। অবশ্য শেখ মুজিব ও তার পরিবারের দিবারাত্র গুণকির্তন করবার জন্য সরকারী খরচে চারটি পত্রিকা এবং একটি জাতীয় টেলিভিশন রেখে দেয়া হয়েছিল।

১৯৭৫ সালের ১৬ জুন শেখ মুজিব বাংলাদেশের মিডিয়ার স্বাধীন সত্তাকে খুন করেছিলেন। এই কারণেই ১৬ জুন তারিখটি মিডিয়ার সাথে সংশ্লিষ্ট সকলের স্মরণে রাখা উচিৎ। শেখ মুজিবের এক আদেশে সেদিন দেশের সকল মিডিয়ায় তালা ঝুলেছিল, হাজার হাজার সংবাদকর্মী বেকার হয়ে পরিবার নিয়ে পথে বসেছিলেন। তবে সকল যুগেই বাংলাদেশ দালাল জন্মের জন্য এক অতি উর্বর ভূমি। মিডিয়ার ভয়াবহ দু:সময়েও ১৯৭৫ সালের ১৬ জুন দালাল সাংবাদিকের অভাব হয় নাই। সাংবাদিক নামধারী দালালরা ঠিক বর্তমানের মতই শেখ মুজিবের পায়ের উপর “পিতা পিতা” রবে হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল। কবি আল মাহমুদ এবং এনায়েতুল্লা খানের মত প্রবাদতুল্য কবি, সম্পাদকরা যখন মুজিবের কারাগারে অত্যাচারিত হয়েছেন, তখন বজলুর রহমান (মতিয়া চৌধুরির মৃত স্বামী), তোয়াব খান, এবং ইকবাল সোবহান চৌধুরি গং মুজিবতোষণে ব্যস্ত থেকেছেন। সেই সব দালালদের মধ্যে অধিকাংশ লোকান্তরিত হলেও ইকবাল সোবহান চৌধুরি পিতা মুজিবের পদলেহন সমাপ্ত করে অদ্যাবধি কন্যার পদলেহন করে চলেছেন। শেখ মুজিব নিহত হওয়ার পর যথাক্রমে খন্দকার মুশতাক ও জেনারেল জিয়া ক্ষমতা গ্রহণ করে মিডিয়ার স্বাধীনতা ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। সামরিক শাসক এরশাদ আশির দশকে মিডিয়াকে পূনর্বার নিয়ন্ত্রনে নিয়েছিলেন। নব্বই এর গণ অভ্যুত্থানে এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালে বেগম খালেদা জিয়া নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী হলে মিডিয়া আবার তার স্বাধীনতা ফিরে পায়। আজকের তরুন এই সব ইতিহাসের কিছুই জানে না।

২০০৮ সালে ইন্দো-মার্কিন পরিকল্পনা অনুযায়ী শেখ হাসিনা ক্ষমতা গ্রহণ করেই স্বাধীন মিডিয়ার উপর আক্রমন শুরু করেন। ফ্যাসিস্ট সরকার একে একে ভিন্ন মতের সকল পত্রিকা এবং টেলিভিশন বন্ধ করে দিয়ে অসংখ্য দালাল মিডিয়া সৃষ্টি করে। পুরনো মিডিয়ার মধ্যে হিন্দুত্ববাদের সমর্থক পত্রিকা প্রথম আলো, ডেইলি স্টার, সংবাদ ইত্যাদিকে রেখে দেওয়া হয়। এ ছাড়া নয়া দিগন্ত, মানবজমিন, এবং নিউ এজ এর মত হাতে গোনা কয়েকটি কিছুটা ভিন্নধর্মী সংবাদপত্র চলতে দেওয়া হচ্ছে কেবল আন্তর্জাতিক মহলকে এই ধোঁকা দেওয়ার জন্য যে, শেখ হাসিনা সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতায় বিশ্বাস করেন। এই সব সংবাদপত্রকেও সরকারের সকল অনুশাসন মেনেই কোনক্রমে টিকে থাকতে হচ্ছে। তবে বহির্বিশ্ব ভাল করেই জানে যে, বাংলাদেশে মিডিয়ার কোন স্বাধীনতা নাই। সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচালিত সকল জরিপেই সংবাদপত্রের স্বাধীনতার নিরিখে শেখ হাসিনার বাংলাদেশ তলানিতে অবস্থান করছে। এই সব জরিপ অনুযায়ী যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানেও বাংলাদেশের তুলনায় সাংবাদিকরা অধিকতর স্বাধীনতার সাথে দায়িত্ব পালন করতে পারে। শেখ হাসিনা তার পিতার মত ঘোষণা দিয়ে দেশের সব পত্রিকা বন্ধ করার পরিবর্তে মুলা ঝুলিয়ে এবং লাঠির ভয় দেখিয়ে সাংবাদিকদের পদানত করতে সক্ষম হয়েছেন। স্বৈরাচারী শেখ মুজিব ১৯৭৫ সালের ১৬ জুন মিডিয়াকে তাবেদারে পরিণত করার যে সরকারি আদেশ দিয়েছিলেন তাকেই তার ফ্যাসিস্ট কন্যা সাফল্যের সাথে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছেন। গত শতাব্দিতে বাংলাদেশে মিডিয়ার স্বাধীনতা লাভের জন্য শেখ মুজিবের পতন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছিল। এই শতাব্দিতেও ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পতন ব্যতিত মিডিয়ার স্বাধীনতা ফিরে পাওয়ার কোন সুযোগ নাই।                  

সম্পাদক-আমার দেশ

১৭-০৬-২০২২     

মন্তব্য