জাতীয়

সংকট কমেনি তিন দিনেও

2022/06/20/_post_thumb-2022_06_20_06_05_56.jpg

শতবছরের ভয়াবহ বন্যায় সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলায় মানবিক বিপর্যয় ঘটেছে। ঘরে ঘরে এখন হাহাকার। পানিতেই ভাসছে মানুষ, কিন্তু খাওয়ার জন্য এক ফোঁটা পানি নেই। নলকূপসহ সুপেয় পানির সব উৎস বন্যায় নষ্ট হয়ে গেছে। বাধ্য হয়ে বন্যার নোংরা পানিই পান করছেন অনেকে। খাবার সংকট দিনে দিনে তীব্র হচ্ছে। ঘরে থাকা শুকনো খাবার শেষ হয়ে গেছে। এখন শুধুই ত্রাণের অপেক্ষা। সরকারি ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত থাকলেও তা চাহিদার তুলনায় সামান্যই।


এদিকে সিলেটের আরেক জেলা হবিগঞ্জে বন্যার বিস্তৃতি বাড়ছে। গতকাল রবিবার পর্যন্ত জেলার ১০০ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। অন্য জেলা মৌলভীবাজারে তলিয়ে গেছে ৩০০ গ্রাম।


প্রশাসনের কর্মকর্তারাও বলছেন, সিলেট ও সুনামগঞ্জে বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ। লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দি। তাদের উদ্ধার ও পর্যাপ্ত খাবার পৌঁছে দেওয়া সত্যিই কঠিন চ্যালেঞ্জ। সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. মজিবর রহমান জানিয়েছেন, জলযান সংকটের কারণে অনেক এলাকায় উদ্ধারকাজ ও ত্রাণ বিতরণ ব্যাহত হচ্ছে। ভয়াবহ এ দুর্যোগ মোকাবিলায় সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী এবং বিজিবিসহ সরকারের সব সংস্থা সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।


সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল এসএম শফিউদ্দিন আহমেদ গতকাল সিলেটে বন্যাদুর্গত এলাকা পরিদর্শন ও ত্রাণ বিতরণ করেছেন। আগামীকাল মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও সিলেটে আসবেন বলে জানিয়েছেন সিলেটের বিভাগীয় কমিশনার ড. মুহম্মদ মোশাররফ হোসেন।


সিলেট নগরীর কিছু এলাকায় গতকাল পানি কিছুটা কমলেও বেশিরভাগ এলাকা এখনো প্লাবিত। এসব বাসাবাড়ির লোকজন অবর্ণনীয় দুর্ভোগে রয়েছে। অনেকে নগরীর আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে উঠলেও সেখানে গাদাগাদি করে দুর্বিষহ সময় কাটছে। আছে খাবারের সংকটও।


জেলার সীমান্তবর্তী কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর, কানাইঘাট, জকিগঞ্জ উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ। এছাড়া সিলেট সদর, বিশ্বনাথ, বালাগঞ্জ, গোলাপগঞ্জ, ফেঞ্চুগঞ্জসহ সব উপজেলাই এখন বন্যাকবলিত।


কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বিলাজুর গ্রামের এরশাদ মিয়া, আবদুল কাইয়ুম গতকাল বলেন, ‘আমাদের ঘরবাড়ি এখনো পানিতে ডুবে আছে। পরিবার নিয়ে খুব কষ্টে দিন যাচ্ছে, যা ছিল সবকিছু ভেসে গেছে। না খেয়েই দিন পার করছি। সাহায্য-সহযোগিতা নিয়ে কেউ আসছে না।’ গত ১০০ বছরেও এত পানি এলাকার কেউ দেখেনি বলে তারা জানান।


কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বর্নি, তেলিখাল, বিলাজুর, আঙ্গুরাকান্দি গ্রামের লোকজন জানিয়েছেন, রবিবার পর্যন্ত তাদের গ্রামগুলোতে কোনো প্রকার ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হয়নি। অনেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে রয়েছে কয়েক দিন ধরে। বন্যায় শেষ হয়ে গেছে তাদের ঘরবাড়ি, ধান, গরু, ছাগল, হাঁস-মুরগি। অনেকের ঘরবাড়ি রয়েছে পানির নিচে। পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে এসব ঘরবাড়ি ভেঙে পড়বে বলে তারা জানান। তখন শূন্য ভিটায় তাদের ফিরতে হবে। কোম্পানীগঞ্জের এসব এলাকা রবিবার পরিদর্শন করেছেন সেনাপ্রধান এবং সেখানে ত্রাণও বিতরণ করেছেন।


সুনামগঞ্জ পৌরশহর এখনো ৪ থেকে ৬ ফুট পানির নিচে। সুনামগঞ্জ জেলার প্রায় শতভাগ এলাকাই বন্যায় বিপর্যস্ত। চার দিন ধরে সারা দেশের সঙ্গে সুনামগঞ্জের সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। বিদ্যুৎ নেই, মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্কও কাজ করছে না। সুনামগঞ্জে হাসপাতাল, দোকানপাট, অফিস-আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যাংক সব জায়গায় পানি আর পানি। নৌকা ছাড়া যাতায়াতের নেই কোনো সুযোগ। খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাচ্ছে বানভাসি মানুষ।


সিলেট ও সুনামগঞ্জের বন্যাদুর্গত মানুষ জানিয়েছে, বানের পানি তাদের নিঃস্ব করে দিয়েছে। না খেয়েই তাদের দিন যাচ্ছে। মানবিক বিপর্যয় তৈরি হয়েছে দুর্গত এলাকায়। দুর্গত এলাকার বেশিরভাগ মানুষই দাবি করছে, তারা কোনো ধরনের ত্রাণ সহায়তা পাচ্ছে না। কেউ খোঁজও নিচ্ছে না।


সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার হরিপুর গ্রামের আবুল হোসেন জানান, তিন দিন ধরে তার ঘরে পানি। পরিবারের নারী-শিশুদের অন্যত্র পাঠিয়ে দিয়েছেন। ঘরের মধ্যে মাচা তৈরি করে সেখানে ধান তুলে রেখেছেন। পানি আর কয়েক ইঞ্চি বাড়লেই ধানও ভিজে যাবে। তবে গতকাল বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় পানি আর বাড়েনি। কিছু এলাকায় পানি কমছে বলেও জানান তিনি।


এদিকে সিলেট নগরীর সোবহানীঘাট, যতরপুর, উপশহর, মেন্দিবাগ, শিবগঞ্জ, মেজরটিলা, সাদাটিকর, তেরোরতন, মাছিমপুর, ছড়ারপাড়, কালীঘাট, তালতলা, জামতলা, মাছুদীঘিরপাড়, লামাপাড়, বেতেরবাজার, ঘাসিটুলা, বাগবাড়ি, শেখঘাট, টিকরপাড়া, কুয়ারপার, কাজিরবাজারসহ বিভিন্ন এলাকার রাস্তাঘাট, বাসাবাড়ি ও দোকানপাটে এখনো বন্যার পানি। সিলেট জেলা শহরের সঙ্গে সদর, গোয়াইনঘাট, কানাইঘাট, জৈন্তাপুর, কোম্পানীগঞ্জ ও জকিগঞ্জ উপজেলার সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। প্লাবিত এলাকার একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি-বেসরকারি কার্যালয়ের ভেতরে ঢুকে পড়েছে পানি। এর আগে গত ১৫ মে থেকে সিলেট নগরী ও ১৩টি উপজেলায় টানা বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলে বন্যা হয়েছিল। ওই বন্যায় প্রায় এক হাজার কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে জানায় জেলা প্রশাসন।


মৌলভীবাজারে ৩০০ গ্রাম প্লাবিত : উজান থেকে নেমে আসা বানের পানি এবং গত দুদিন ধরে টানা বৃষ্টিতে প্লাবিত হয়েছে বিভিন্ন ইউনিয়নের শতশত গ্রাম। জেলা প্রশাসনের হিসাবে যা তিনশোর বেশি।


জেলার বড়লেখা উপজেলায় কুশিয়ারা নদী ও হাকালুকি হাওরের পানি বেড়েছে। বড়লেখা পৌর এলাকা এবং ১০টি ইউনিয়নের ২০০টি গ্রাম তলিয়ে গেছে। প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে আছে।


পাহাড় ধসে উত্তর শাহবাজপুর ইউনিয়নের আয়েশাবাগ চা বাগানে একজন নিহত ও সদর ইউনিয়নের কেছরিগুল গ্রামে একজন আহত হয়েছেন। বিদ্যুতের সাবস্টেশন ইতিমধ্যেই পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে।


জুড়ী উপজেলায় ২৮টি গ্রামের প্রায় ১৬ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এসব গ্রামের অধিকাংশ রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে গেছে। এ পর্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ প্রায় ২৪টি পরিবারকে আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে আসা হয়েছে। এছাড়াও জায়ফরনগর ইউনিয়নের গৌরীপুর ও সাগরনাল ইউনিয়নের কাশিনগর গোয়ালবাড়ি পশ্চিম শিলুয়া গ্রামে জুড়ী নদীর বিভিন্ন স্থানে ভাঙন দেখা দিয়েছে।


মৌলভীবাজার সদরের খলিলপুর, মনুমুখ, আখাইলকুড়া, কনকপুর, কামালপুর, চাঁদনীঘাট ইউপি (আংশিক) প্লাবিত হয়েছে। বন্যাদুর্গত মানুষের সংখ্যা প্রায় সাড়ে সাত হাজার। রাজনগর উপজেলার চারটি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। বন্যাদুর্গত মানুষের সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার। শ্রীমঙ্গল উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নের ১২টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি প্রায় চার হাজার লোক। কমলগঞ্জ উপজেলার নয়টি ইউনিয়ন ও পৌর এলাকা বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে।


জেলা প্রশাসক মীর নাহিদ আহসান জানান, বন্যা পরিস্থিতিতে জেলা প্রশাসন কর্তৃক কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। এখন পর্যন্ত পরিস্থিতি অনুকূলে রয়েছে।


কুলাউড়ায় আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটছে বন্যার্তরা : বন্যাকবলিত এলাকার স্থানীয়রা জানান, বন্যায় হাকালুকি হাওর এলাকা ভূকশিমইলের সঙ্গে কুলাউড়া উপজেলা সদরের যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। এর মধ্যে নেই বিদ্যুৎ। মোবাইল নেটওয়ার্কও বন্ধের পথে। পরিস্থিতি ক্রমে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।


ভূকশিমইল ইউপি চেয়ারম্যান আজিজুর রহমান মনির জানান, ভূকশিমইলে গত দুদিন থেকে বন্যার পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। প্লাবিত হয়েছে অসংখ্য বাড়িঘর। সড়কে পানি ওঠায় উপজেলা সদরের সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থাও বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। তিনি জানান, হাওর এলাকার মানুষ বর্তমানে আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটছে। তিনি ভূকশিমইল ইউনিয়নকে দুর্গত এলাকা ঘোষণা করার দাবি জানান।


উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এটিএম ফরহাদ চৌধুরী জানান, বন্যাকবলিত মানুষদের নিরাপদ আশ্রয়ে নিতে জনপ্রতিনিধিসহ স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে তিনি কাজ করছেন। ত্রাণসামগ্রীও বিতরণ করছেন।


উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও ভারী বৃষ্টিপাতে কুলাউড়া উপজেলা পরিষদসহ পৌরবাসী পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। কুলাউড়া পৌরসভার মেয়র অধ্যক্ষ সিপার উদ্দিন আহমদ জানান, উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় পৌর এলাকায় দুটি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে।


কুলাউড়ার কর্মধায় ফানাই নদীর বাঁধে আবারও ভাঙন দেখা দিয়েছে। গত শুক্রবার বিকেলে কর্মধার মহিষমারা গ্রামে বাঁধটি প্রায় ২০ ফিট ভেঙে যায়। শনিবার সকালে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা বাঁধ মেরামতে কাজ শুরু করলে বিকেলে পানির স্রোতে বাঁধটি আবারও ভেঙে যায়। ফলে বাবনিয়া, মহিষমারা, কর্মধা, বেরী, হাসিমপুর, ভাতাইয়াসহ নানা গ্রামের কয়েক সহস্রাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। পাহাড়ি ঢলের ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।


হবিগঞ্জে ভেসে গেছে ১০০ গ্রাম : হবিগঞ্জে সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অবনতি হয়েছে। গতকাল বিকেল পর্যন্ত জেলার নবীগঞ্জ, আজমিরিগঞ্জ ও লাখাই উপজেলার ২১টি ইউনিয়নে বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। খোয়াই ও কুশিয়ারা নদীর পানি ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে পাউবো সূত্রে জানা গেছে।


নবীগঞ্জ উপজেলার ৯টি, আজমিরিগঞ্জ উপজেলায় ৫টি, লাখাই উপজেলায় ৪টি ও বানিয়াচং উপজেলায় ৩টি ইউনিয়নে বন্যার পানি প্রবেশ করায় অন্তত ১০০টি গ্রামের মানুষ দুর্দশার মধ্যে রয়েছে। ওই চার উপজেলার ৪ হাজার ৫৮১টি পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে বলে হবিগঞ্জ জেলা প্রশাসন অফিস সূত্র নিশ্চিত করেছে।

হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শাহনেওয়াজ জানান, ভারতের ত্রিপুরা থেকে নামা পাহাড়ি ঢলে খোয়াই নদীর পানি গতকাল বিকেল থেকে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিকেল ৪টায় কুশিয়ারা নদীর পানি বিপদসীমার ১৫ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এ নদীর পানি বাঁধ উপচে নবীগঞ্জের নিচু এলাকা প্লাবিত করছে। তবে বিবিয়ানা গ্যাসকূপ থেকে বন্যার পানি প্রায় ৩ ফুট নিচে রয়েছে বলে জানান তিনি।

আজমিরিগঞ্জ উপজেলার পিরোজপুর এলাকায় কুশিয়ারা নদীর হাওর রক্ষা বাঁধ ভেঙে যাওযায় বানিয়াচং নবীগঞ্জ ও আজমিরিগঞ্জ উপজেলায় বিভিন্ন এলাকায় পানি বৃদ্ধি পচ্ছে। উপজেলার জলসুখা, নোয়াগড় এলাকায় পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। বন্যা উপদ্রুত চারটি উপজেলার জন্য ৩৫ টন চাল ও ৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ।

মন্তব্য