বাজেট প্রসঙ্গে আখতার
ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পথের ফকির হতে আর দেরি হবে না
- আপডেট সময় ০৯:২৮:১৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬
- / ১৬ বার পড়া হয়েছে
প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা পথের ফকিরে পরিণত হবে বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির সদস্য সচিব ও রংপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আখতার হোসেন। মুদি দোকান, মিষ্টান্ন ভাণ্ডার, রড-সিমেন্টের দোকানসহ ১৬ ক্ষুদ্র ব্যবসার ওপর কর আরোপের সিদ্ধান্ত প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, আমাদের যত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আছে, তারা পথের ফকির হতে তাদের আর দেরি হবে না। তাদেরকে রুদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনের ১৫তম দিনে বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে দীর্ঘ বক্তৃতায় আখতার এসব কথা বলেন।
এমপি আখতার হোসেন তার বক্তব্যে অর্থ পাচার, ঋণ, খেলাপি ঋণ, মুদ্রাস্ফীতি, নিত্যপণ্যেল মূল্যবৃদ্ধি, ব্যাংকখাতসহ নানা বিষয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, আমরা যদি বিগতদিনে আওয়ামী লীগের সময়কালটা খেয়াল করে দেখি— একটা শ্বেতপত্র প্রকাশিত হয়েছে। সেই শ্বেতপত্র বলছে যে বাংলাদেশ থেকে আওয়ামী লীগের সময়কালে ২৪০ বিলিয়ন ডলার, প্রায় ৩০ লক্ষ কোটি টাকা বাংলাদেশ থেকে পাচার করা হয়েছে। এত বিশাল একটা অংক বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়ে গেছে।
আখতার বলেন, দেশের অর্থনীতিটা এখন একটা ঝুপড়ির মত আছে, যে ঝুপড়িতে আসলে টাকা-পয়সা নাই। একটা খালি জায়গার মধ্যে আমরা আছি। এটা আরো সত্য হয় সে সময়টাতে, যখন আমরা দেখি বাংলাদেশের আসলে ঋণের পরিমাণটা কত। এ সরকার যখন দায়িত্ব গ্রহণ করে তখন ঋণের পরিমাণ ছিল ২৩ লাখ কোটি টাকার মতো। কিন্তু এই কয়েক মাসেই এই ঋণের পরিমাণ আরো এক লাখ কোটি টাকার ওপরে বেড়ে এখন ২৪ লাখ কোটি টাকায় রূপান্তরিত হয়েছে। অর্থাৎ সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করার পরেই মাঝখানের এই চার মাস সময়কালে আরো এক লক্ষ কোটি টাকা ঋণের জালে দেশকে বেঁধে ফেলা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আমরা যদি খেলাপি ঋণের দিকে তাকাই, আমাদের লাখ লাখ টাকা খেলাপি ঋণের মধ্যে আছে। এমনকি এ অবস্থা হয়ে আছে যে আমাদের এই সংসদের দুইজন সদস্য এখনো পর্যন্ত শপথ গ্রহণ করতে পারেননি। কারণ তারা এখনো পর্যন্ত কোর্টে এই খেলাপি ঋণের ইস্যুর মধ্যে আটকে আছেন। এখনো পর্যন্ত সরকারি দলের তরফ থেকে সে ব্যাপারে কোন ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ আনা হয়নি। এই খেলাপি ঋণের বিষয়টা আমাদের অর্থনীতিকে একেবারে পঙ্গু অবস্থায় নিয়ে গেছে।
এমপি বলেন, আমরা আমাদের মূল্যস্ফীতি-মুদ্রাস্ফীতির দিকে যদি তাকাই, এটা দুই অংকের ঘরে আছে, পৌনে ১০ শতাংশের কাছাকাছি। আমরা আমাদের জিডিপির দিকে যদি তাকাই, আমাদের জিডিপি ৪ শতাংশের একটুখানি বেশি অবস্থায় আছে, প্রবৃদ্ধির হার।
আখতার বলেন, বাজেট ঘোষণা হওয়ার পরে জিনিসপত্রের দাম বাড়ে নাই, যেটা সরকারি দলের দাবি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই বাজেটটা ঘোষণা করার আগেই সরকার তার এই তিন মাসের সময়কালের মধ্যেই দুই দফায় বিদ্যুৎ এবং জ্বালানির দাম বৃদ্ধি করেছেন। যখন বিদ্যুৎ এবং জ্বালানির দাম বৃদ্ধি করা হয়, পাশাপাশি এই জিনিসটা পরিবহন সেক্টরে যেমন প্রভাব ফেলে, তেমনি করে উৎপাদনের ব্যয় বৃদ্ধি করে সমস্ত জিনিসপত্রাদিতে দামগুলো বৃদ্ধি হয়ে যায়। অর্থাৎ সরকার শুধু বাজেট ঘোষণা করার পরে জিনিসের দাম বেড়েছে ব্যাপারটা এমন নয়, সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করার পরেই বাজেট ঘোষণার আগে থেকেই জিনিসপত্রের দাম বাড়ানোর যে ম্যাকানিজম, সেটা শুরু করেই বাজেট ঘোষণায় বসেছে।
তিনি বলেন, আমরা দেখলাম সরকার আইএমএফের কাছ থেকে, বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে আসতে চায়। কিন্তু গত বসন্তকালীন বৈঠকে যখন আমাদের অর্থমন্ত্রী আমেরিকায় গিয়েছিলেন, সেখানে কিন্তু আইএমএফ কোন ঋণ ছাড় করতে চায়নি। কেন চায়নি? কারণটা হলো আইএমএফ চেয়েছিল বাংলাদেশের অর্থনৈতিক খাতগুলোতেও একটা বড় ধরনের সংস্কার আসুক। কিন্তু আমরা খেয়াল করে দেখলাম কি? অর্থনৈতিক খাতগুলোতে কোনো ধরনের সংস্কার, সেটা তো অন্য কোন বিষয়েও, তবে অর্থনৈতিক বিষয়ে কোনো ধরনের সংস্কারের ব্যাপারে বিএনপি সরকারের তরফ থেকে কোনো ইতিবাচক সাড়া ছিল না।
এতদিনে এসে সরকার এনবিআরের নীতি এবং ব্যবস্থাপনা— সেই জিনিসগুলোকে আলাদা করার কথা বলছে উল্লেখ করে আখতার বলেন, এই বিষয়টা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়টাতে একটা অধ্যাদেশ পাস করা হয়েছিল, সেই অধ্যাদেশ এই সংসদে প্রেজেন্ট করা হয়েছিল, কিন্তু সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পরে সেই অধ্যাদেশটাকে ল্যাপস করে দিয়েছে, সেই অধ্যাদেশটাকে কার্যকর করতে দেয় নাই। যদি সরকার সেই সময়টাতে সংস্কারের বিষয়গুলোকে মেনে নিত, আর্থিক ব্যবস্থাপনায় সংস্কারগুলো হয়ে যেত, সেক্ষেত্রে হয়তো বিদেশে যে ঋণের ক্ষেত্রে গিয়ে আমাদের অর্থমন্ত্রীকে খালি হাতে ফিরে আসতে হলো, সে ধরনের পরিস্থিতিতে আমাদেরকে নাও পড়তে হতো।
ব্যাংক খাতে এক ধরনের অরাজকতা চলছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, শুধু ইসলামী ব্যাংকের ব্যাপারে আমি বলবো না। ইসলামী ব্যাংকে কি ধরনের অরাজকতা চলছে এটা আপনারা সকলেই জানেন। এর বাইরে গিয়ে আরো পাঁচটি ব্যাংক আছে, যে ব্যাংকগুলোকে একীভূত করা হয়েছে। অত্যন্ত দুঃখের বিষয়— এই পাঁচটি ব্যাংক যেগুলোকে একীভূত করা হয়েছে, এই ব্যাংকগুলো যেসব আগের মালিকদের কাছে ছিল, তারাই সেখান থেকে লুটপাট করে, টাকা-পয়সা পাচার-টাচার করে এই ব্যাংকগুলোকে একেবারে দেউলিয়ার পর্যায়ে দিয়ে গেছে, খালির পর্যায়ে দিয়ে গেছে। সেই ব্যাংকগুলোতে যাতে পূর্বের বালিকারা আবারো বহাল হতে পারেন, এমন ধরনের একটা আইন এখানে পাস করা হয়েছে। যে ব্যাংক রেজুলেশন আইনটা পাশ করা হলো, সেই ব্যাংক রেজুলেশন আইনের ১৮ নম্বর ধারার মধ্যে এই জিনিসটা বলা হলো— এই ব্যাংকের মালিকেরা যারা আছেন, তারা যদি সাড়ে শতাংশ টাকা ব্যাক করতে পারেন, তাহলে তাদের কাছে আবারো ব্যাংকের মালিকানা বুঝিয়ে দেওয়া হবে।
প্রশ্ন রেখে আখতার হোসেন বলেন, যেসব মালিকেরা এই ব্যাংকগুলোকে দেউলিয়া করেছে, টাকা পাচার করেছে. এই ব্যাংকগুলো থেকে লুটপাট করেছে, সেই মালিকগুলোর কাছেই মাত্র সাড়ে সাত পারসেন্ট টাকার কথা বলে ব্যাক দেওয়ার কথা বলে আবারও সেই মালিকদের কাছেই ব্যাংকগুলোকে পুনরায় ফিরিয়ে দেওয়ার ফায়দা কী হতে পারে, সেটা আমাদের অর্থমন্ত্রী যদি আমাদেরকে বলেন, তাহলে আমরা এই সংসদে কৃতজ্ঞ থাকতে পারি।
বাজেট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকার ঋণ নিয়ে দেশের এই বাজেটটাকে সচল রাখার একটা পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। সরকার অভ্যন্তরীণ ব্যাংকগুলো থেকে ১ লক্ষ ১২ হাজার কোটি টাকার মত ঋণ গ্রহণ করবে। যদি ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ঋণ গ্রহণ করে, তাহলে প্রাইভেট সেক্টরে বিনিয়োগ হবে না। প্রাইভেট সেক্টরে লোন ডিসপার্স হবে না এবং যার কারণে অর্থনীতি একটা স্থবির অবস্থায় এসে দাঁড়াবে। একটা ক্রাউডিং ইফেক্ট তৈরি হবে। যার কারণে আমাদের এখানে বিনিয়োগ হবে না, কর্মসংস্থান হবে না।
কর আরোপ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি মধ্যবৃত্তের ওপরে প্রথম যে আয়কর, সে আয়করের ওপরে ৪৮ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে। এটা একটা মধ্যবৃত্তের উপরে মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে। আমরা যদি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের দিকে তাকাই, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপরে অগ্রিম কর চার্জ করা হয়েছে। গ্রামের দোকানদার যারা আছেন, তাদেরকে বলা হচ্ছে ০.২ শতাংশ কর প্রদান করতে হবে। এই কর কখন দেওয়া হবে? এটা অগ্রিম। অর্থাৎ যখনই তারা মালপত্র দোকানে নিয়ে আসছেন, ওই সময়টাতে যখন তারা ক্রয় করছেন, এক হাজার টাকার মালপত্র যদি তারা তাদের দোকানে নিয়ে আসেন, তখনই তাদেরকে সরকারকে দুই টাকা কর প্রদান করতে হবে। অর্থাৎ এখনো পর্যন্ত যে পণ্যটা বিক্রি করা হয় নাই, সে পণ্যটার উপরে যদি আপনি বিক্রি করার আগেই, কোন লাভ হওয়ার আগেই যদি ব্যবসায়ীদের উপর থেকে ট্যাক্স এবং ভ্যাট আদায় করে নিয়ে আসা হ,য় তাহলে আমাদের যত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী যারা আছে, পথের ফকির হতে তাদের আর দেরি হবে না। তাদেরকে রুদ্ধ করে দেওয়া হচ্ছে।



















