স্বামী হত্যার বিচার চাওয়ায় দেড় বছরের শিশুকে নিয়ে কারাগারে ফাতেমা, ৭ দিন পর মুক্তি
- আপডেট সময় ০২:৫৪:২০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ২৫ বার পড়া হয়েছে
কক্সবাজারে স্বামী হত্যার বিচার চেয়ে মামলা করায় প্রতিপক্ষের মামলায় দেড় বছরের শিশু সন্তান নিয়ে কারাগারে যেতে হয়েছে গৃহবধূ ফাতেমাকে। এ সময় তার স্কুলপড়ুয়া দুই মেয়েকে থাকতে হয়েছে এতিমখানায়।
এর আগে, ২০২৫ সালের ২৩ এপ্রিল মহেশখালী উপজেলার কুতুবজোম ইউনিয়নের কবির বাজারে ছিলেন ফিশিংবোট শ্রমিক মুহাম্মদ কাশেম। অভিযোগ রয়েছে, সেখান থেকে তাকে তাড়া করে বাড়িতে ঢুকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেন শাহেদ খান, আবদুল গফুর, রাসেলসহ আরো কয়েকজন।
পরদিন কাশেমের স্ত্রী ফাতেমা বেগম বাদী হয়ে মহেশখালী থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় রাসেলসহ ১০ জনকে আসামি করা হয়। পরে পুলিশ তথ্যপ্রযুক্তি ও পেকুয়া থানা পুলিশের সহযোগিতায় মধ্যম উজানটিয়ার একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে মামলার প্রধান অভিযুক্ত গফুরসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন কাশেমের আপন মামা গফুর মিয়া, তার ছেলে শাহেদ ও সাজ্জাদ হোসেন, গফুরের চাচাতো বোন শবে মেহরাজ ও মো. আলমগীর।
কাশেম হত্যার পর ফাতেমা বেগম ও তার পরিবার নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিলেন বলে তাদের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ করা হয়। মামলা তুলে নিতে, আপস করতে কিংবা আসামিদের বাদ দিতে চাপ ও ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগও করেন তারা। এ নিয়ে ২০২৫ সালের ৬ মে মহেশখালী থানায় জিডি করেন ফাতেমা। ওই জিডিতে পহেলা মে তাকে ভয়ভীতি দেখানো ও মিথ্যা মামলায় জড়ানোর হুমকির আশঙ্কার কথা উল্লেখ করা হয়।
আর সেটাই ফাতেমার জন্য কাল হয়েছে। সেই মামলার একমাস পর করা প্রতিপক্ষের পাল্টা মামলায় জেলে যেতে হয়েছে এই গৃহবধূকে।
যদিও সাত দিন কারাবাসের পর জামিনে মুক্তি পেয়েছেন মা ও শিশু। গত ৭ সেপ্টেম্বর দুপুরে কক্সবাজারের মহেশখালীর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ইমরান হোসাইনের আদালত ফাতেমা বেগমের জামিন মঞ্জুর করেন।
তার আইনজীবী মো. আনছার নিশ্চিত করেন, ১ হাজার টাকা বন্ডে তিনি ও স্থানীয় একজন গণ্যমান্য ব্যক্তির জিম্মায় জামিন দেওয়া হয়েছে। সোমবার সন্ধ্যায় কারাগার থেকে ফাতেমা বেগম মুক্তি পেয়েছেন।
কাশেম হত্যা মামলায় আসামি রাসেলের মা নুরজাহান বেগম ২০২৫ সালের ৩ আগস্ট মহেশখালী জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি নালিশি দরখাস্ত করেন। অভিযোগে বলা হয়, ওই বছরের ২৪ মে সকাল ৮টার দিকে কাশেমের স্ত্রী ফাতেমা, তার মা, তিন ভাই, মামা ও ছোট বোনসহ সাতজন রাসেলের মায়ের বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও মালামাল লুট করেন। আদালত অভিযোগটি আমলে নিয়ে মহেশখালী থানাকে তদন্তের দায়িত্ব দেন।
মামলাটির তদন্ত করেন মহেশখালী থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. মোজাহেরুল ইসলাম। তিনি ২০২৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর আদালতে প্রতিবেদন জমা দিয়ে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার কথা জানান।
তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, বাদীপক্ষের দেওয়া সাতজন সাক্ষীর বক্তব্য নেওয়া হয়েছে। তাদের বাইরে অন্য কোনো সাক্ষীর বক্তব্য নেওয়ার কথা উল্লেখ নেই।
প্রতিবেদনে ঘটনাস্থল পরিদর্শন, বাদীকে জিজ্ঞাসাবাদ এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬১ ধারায় সাক্ষীদের জবানবন্দি নেওয়ার কথাও বলা হয়।
তবে প্রতিবেদনে সাক্ষী হিসেবে থাকা নুরুন্নাহার, মুন্নি আকতার ও মোতাহারা বেগমের সঙ্গে কথা বলে পাওয়া যায় ভিন্ন তথ্য। তাদের প্রত্যেকের দাবি, তারা এই মামলায় কোনো সাক্ষ্য দেননি। এমনকি তাদের নাম সাক্ষী হিসেবে কীভাবে এসেছে, সেটিও তারা জানেন না।
তাদের ভাষ্য, ২০২৫ সালের ২৪ মে কোনো ঘরবাড়ি ভাঙচুর বা লুটপাটের ঘটনা ঘটেনি। কাশেম হত্যার দিন ২৩ এপ্রিল এলাকায় উত্তেজনা তৈরি হলে রাসেলের বাড়িঘরে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। এতে কাশেমের পরিবারের কেউ জড়িত ছিলেন না।
মিজানুর রহমান, আয়েশা বেগম ও মমতাজ বেগমসহ কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দাও ২৪ মে কোনো ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেনি বলে দাবি করেছেন। তাদের অভিযোগ, কাশেম হত্যার পর তার পরিবারকে চাপে রাখতে এবং প্রতিশোধ নিতে পাল্টা মামলা করা হয়েছে।
তবে ভাঙচুর ও মালামাল লুটের মামলার বাদী নুরজাহান বেগম বা তার পক্ষের কারও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে উপ-পরিদর্শক (এসআই) মোজাহেরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, আদালতে দেয়া অভিযোগের তদন্তের ক্ষেত্রে বাদীর দেয়া সাক্ষীদের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। তাই তাদের বাইরে অন্য কারো সাক্ষ্য নেয়া হয়নি।
তার ভাষ্য, ২৪ মে কোনো ঘটনা ঘটেছিল কিনা, সেটিই তদন্তে দেখা হয়েছে এবং সাক্ষীদের বক্তব্যের ভিত্তিতে ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেছে।
তদন্ত প্রতিবেদনে রাসেলকে কাশেম হত্যা মামলায় ‘অন্যায় ভাবে’ আসামি করা হয়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়। তবে নথিপত্রে রাসেলকে কাশেম হত্যা মামলার চার নম্বর আসামি হিসেবে উল্লেখ করা আছে।
এ বিষয়ে মোজাহেরুল ইসলাম বলেন, এমন কথা লেখার সুযোগ নেই। আগের ঘটনা হওয়ায় বিষয়টি তার মনে পড়ছে না।
মহেশখালী থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) প্রতুল কুমার শীল বলেন, থানার প্রতিটি মামলার তদন্ত তদারকি করা তার দায়িত্ব। তবে এই মামলার বিস্তারিত তাঁর মনে নেই। বিষয়টি জেনে পরে জানাবেন।
তবে সব সাক্ষীর জবানবন্দি একই ধরনের হয়ে থাকলে এবং বিষয়টি আদালতের নজরে এলে আদালত ব্যবস্থা নেবেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে পাল্টা মামলায় গত ৩১ আগস্ট রাতে ফাতেমা বেগম, তার শাশুড়ি রাশেদা বেগম এবং বেড়াতে আসা মেয়ে নাছিমা আকতারকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
রাশেদা বেগমের ভাষ্য, গ্রেপ্তারের সময়ই তারা জানতে পারেন, তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং তাদের নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে। পরদিন (১ সেপ্টেম্বর) আদালতে হাজির করা হলে রাশেদা বেগম ও নাছিমা আকতার জামিন পান। তবে ১৫ মাস বয়সী শিশুসহ ফাতেমাকে পাঠানো হয় কারাগারে।
রাশেদা বেগম বলেন, আমার ছেলেকে হত্যা করে আমাদের বিরুদ্ধেই উল্টো মিথ্যা মামলা করেছে। আমরা জানতেই পারিনি যে- আমাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, পুলিশ তদন্ত করেছে এবং ওয়ারেন্ট হয়েছে। এখন আমার পুত্রবধূকে কারাগারে পাঠিয়ে আসামিরা আমাদের হুমকি দিচ্ছে।
ফাতেমা বেগমের বাড়িটি কুতুবজোমে একটি ছোট্ট তিন কক্ষের ঘর। মাটির দেয়াল, টিনের চাল। স্বামীকে হারানোর পর শাশুড়ির সঙ্গে তিন সন্তান নিয়ে সেখানেই থাকতেন তিনি।
তার বড় মেয়ে রাজমিন আকতার চতুর্থ শ্রেণিতে এবং ছোট মেয়ে মিশকাত জান্নাত প্রথম শ্রেণিতে পড়ে। মা কারাগারে যাওয়ার পর দুই মেয়েকে কুতুবজোমের তাজিয়াকাটা সুমাইয়া (রা.) এতিমখানায় রাখা হয়।
কুতুবজোম ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মাহমুদুল হক বলেন, ২০২৫ সালের ২৪ মে এলাকায় কোনো ঘরবাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেনি।
তিনি বলেন, কাশেমকে হত্যার পর তার পরিবারকে দুর্বল করতে স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে এই মামলা করা হয়েছে। সেই মামলায় দেড়বছরের শিশুসহ ফাতেমাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল।
ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট শেখ কামাল জানান, কাশেম হত্যার পর উত্তেজিত লোকজন রাসেলের পরিবারের বাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাট করেন বলে তিনি জানতে পেরেছিলেন।
তার ভাষ্য, কাশেম ও রাসেল আত্মীয়। সামান্য টাকার বিষয় নিয়ে তাঁদের মধ্যে বিরোধের সূত্রপাত হয়। পরে রাসেলসহ কয়েকজন কবির বাজার থেকে কাশেমকে তাড়া করে বাড়ির দরজার সামনে কুপিয়ে হত্যা করেন।
চেয়ারম্যান শেখ কামাল বলেন, কাশেম হত্যার পর তার পরিবার শোকের মধ্যে ছিল। তখন উত্তেজিত লোকজন তাদের ঘরবাড়ি ভাঙচুর ও লুটপাট করেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করেই আসামিপক্ষ আদালতে মামলা করে।
অবশেষে গত সোমবার ফাতেমা বেগম জামিনে মুক্তি পেয়েছেন।
তার আইনজীবী মো. আনছার বলেন, প্রতিপক্ষের করা মিথ্যা মামলায় ১৫ মাস বয়সী শিশুসহ ফাতেমাকে সাতদিন কারাগারে থাকতে হয়েছে।
স্থানীয় সাংবাদিক এস.এম রুবেল বলেন, স্বামী হত্যার বিচার চেয়ে মামলা করায় স্ত্রী ফাতেমার সাতদিনের কারাবাস শেষ হলো আদালতের জামিনে। তবে কাশেম হত্যা মামলা ও এরপর করা পাল্টা মামলার অভিযোগের নিষ্পত্তি এখনো আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যেই রয়েছে।
তার মতে, একটি হত্যাকাণ্ডে স্বামীকে হারানো, নিরাপত্তার আশঙ্কায় সন্তানদের এতিমখানায় পাঠানো, এরপর পাল্টা মামলায় শিশুসহ কারাগারে যাওয়া ফাতেমার গত দেড় বছরের জীবন যেন একের পর এক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে গেছে।



















