এক সেট বইয়ে পড়াশোনা, এইচএসসিতে যমজ বোনের জিপিএ ৫
- আপডেট সময় ০১:০১:১০ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬
- / ২৮ বার পড়া হয়েছে
একই দিনে পৃথিবীতে এসেছে দুই বোন। বেড়ে ওঠা, পড়াশোনাও তাদের একই স্কুল-কলেজে। একই বই ভাগাভাগি করে পড়ে এসএসসিতে জিপিএ ৫ পেয়েছিলেন তারা। গত শনিবার প্রকাশিত এইচএসসির ফলেও দুজন পেয়েছেন জিপিএ ৫।
কৃতী দুই শিক্ষার্থী হলেন– আয়েশা আক্তার তোয়া ও খাদিজা আক্তার তানহা। তারা রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার আস্করপুর গ্রামের তুফান আলী ও সালমা বেগম দম্পতির মেয়ে। দুজন সরদহ সরকারি কলেজের মানবিক বিভাগ থেকে এবার এইচএসসিতে কৃতিত্বপূর্ণ এই ফল অর্জন করেছেন। তাদের সাফল্যে পরিবারের সদস্যরা একদিকে ভাসছেন আনন্দে, পাশাপাশি আছে একরাশ দুশ্চিন্তা। অভাবের সংসারে বেড়ে ওঠা দুই বোনের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ও উচ্চশিক্ষার খরচ কীভাবে জোগাড় হবে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন মা-বাবা।
তাদের বাবা তুফান আলী পেশায় রডমিস্ত্রি। পাঁচ সদস্যের সংসারে তিনিই একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। বাড়ির সামান্য ভিটা ছাড়া কোনো জমিজমা নেই। দিনমজুরির আয়েই চলে সংসার, সন্তানদের পড়াশোনা। এমন বাস্তবতায় যমজ দুই মেয়ের জিপিএ ৫ পাওয়া পরিবারটির জন্য বড় প্রাপ্তি। গতকাল রোববার সরেজমিন আস্করপুর গ্রামে তোয়া-তানহাদের বাড়িতে দেখা গেছে, ছোট্ট মাটির বাড়িতে পুরো পরিবারের বসবাস। অভাব-অনটন আর সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেই দুই বোন স্বপ্ন দেখেন আকাশছোঁয়ার। তাদের ইচ্ছা, একসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে বিসিএস (শিক্ষা) ক্যাডারে যোগ দেওয়া। সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করে একদিন মা-বাবার মুখ উজ্জ্বল করতে চান দুই বোন।
আয়েশা আক্তার তোয়া বলেন, ‘আমাদের পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। দুই বোন একই শ্রেণিতে পড়ায় একটি বই দিয়ে দুজনের পড়াশোনা হয়েছে। স্কুল-কলেজের শিক্ষকরাও আমাদের প্রতি আন্তরিক ছিলেন। সব সময় সহযোগিতা করেছেন। এখন আমাদের ইচ্ছা, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভালো কোনো বিষয়ে দুজন একসঙ্গে পড়াশোনা করা।’
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে বিসিএস (শিক্ষা) ক্যাডারে দুজনের যোগ দেওয়ার স্বপ্নের কথা উল্লেখ করে খাদিজা আক্তার তানহা বলেন, ‘সরকারি কোনো কলেজে শিক্ষকতা করতে চাই। অনেক প্রতিকূলতার মধ্যেও মা-বাবা আমাদের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে সহযোগিতা করেছেন। ভবিষ্যতে তাদের মুখ উজ্জ্বল করতে চাই। পাশাপাশি মা-বাবার পাশে দাঁড়াতে চাই।’
গৃহিণী মা সালমা বেগমের দুশ্চিন্তা ভবিষ্যৎ নিয়ে। তিনি বলেন, ‘আমার দুই মেয়ে সব সময় মিলেমিশে পড়াশোনা করে। প্রতিটি শ্রেণিতেই ভালো ফল করেছে। এইচএসসিতে দুজনই জিপিএ ৫ পাওয়ায় আমরা সবাই খুব খুশি। কিন্তু সংসারে ওদের বাবা ছাড়া আয়ের আর কেউ নেই। প্রতিদিন যা আয় হয়, তা দিয়ে তিন বেলা খাবারের খরচ চালাতেই শেষ হয়ে যায়। রাজশাহীর বাইরে কোথাও ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে পাঠানোর সামর্থ্য আমাদের নেই। তাই ওরা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করেই প্রস্তুতি নিচ্ছে। জানি না, সামনে পড়াশোনার সব খরচ কীভাবে চালাব।’
কাজের প্রয়োজনে বাড়ির বাইরে ছিলেন বাবা তুফান আলী। মোবাইল ফোনে তিনি বলেন, ‘বাড়ির সামান্য ভিটা ছাড়া আমাদের কোনো জমি নেই। রডমিস্ত্রির কাজ করে যা আয় করি, তা দিয়েই সংসার ও মেয়েদের পড়াশোনার খরচ চালাই। মেয়েরা ভালো ফল করেছে, এতে আমি অনেক খুশি। এখনও বাইরে কাজ করছি, ওদের ভবিষ্যতের কথা ভেবেই এত পরিশ্রম। আমার তিন মেয়ে আমার কাছে তিন রাজকন্যা। ওরা যেন ঠিকমতো পড়াশোনা শেষ করতে পারে, এটাই আমার চাওয়া।’
সরদহ সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. সামসুল হক বলেন, ‘তোয়া ও তানহা শিক্ষার্থী হিসেবে খুবই ভালো। তারা অত্যন্ত নম্র, ভদ্র, ধার্মিক ও বিনয়ী। ইচ্ছাশক্তি থাকলে আর্থিক সংকট যে পড়াশোনার পথে বাধা হতে পারে না, এই দুই বোন তার উদাহরণ। সরকারি পর্যায় থেকেও তাদের পাশে থাকা উচিত। আমরাও সহযোগিতার চেষ্টা করব। তাদের এ প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে।’
















