গুম, নির্যাতন থেকে বেঁচে ফেরা এক নাগরিকের কণ্ঠ
“আমি কোনো দলের নই, তবু আমাকে জঙ্গি বানানো হলো”
- আপডেট সময় ০২:১৪:১২ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৪ জানুয়ারী ২০২৬
- / ২৫ বার পড়া হয়েছে
“আপনি কোন দল করেন?”
আমি বললাম, ‘স্যার, আমি কোনো দলের সদস্য নই। ব্যক্তিগতভাবে বিএনপিকে ভালো লাগে, কিন্তু রাজনীতিতে জড়িত নই।’ তিনি বললেন, ‘তাহলে আপনি জামায়াত।’
আমি অস্বীকার করলাম।
শেষে তিনি বললেন, ‘তাহলে আপনি নিশ্চয়ই কোনো জঙ্গি সংগঠনের সাথে যুক্ত।’
এই প্রশ্নোত্তর শুধু রাজনৈতিক পরিচয় খোঁজার নয়- এটি ছিল এক নাগরিককে অপরাধী বানানোর সূচনা। কথাগুলো বলছিলেন এমন একজন ব্যক্তি, যিনি দীর্ঘ কয়েক মাস আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন হেফাজতে নিখোঁজ ছিলেন। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে তিনি নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।
তার বর্ণনায় উঠে আসে এমন এক বাস্তবতা, যেখানে পরিচয়হীন আটক, চোখ বাঁধা অবস্থায় স্থানান্তর, অজানা কক্ষে বন্দিত্ব এবং মানসিক-শারীরিক চাপ ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। এর উল্লেখ করা হয় গুম কমিশনের প্রতিবেদনে।
অচেনা কক্ষ, অজানা সময় : প্রথমে তাকে চোখ বেঁধে নেয়া হয় ঢাকা পুলিশ সদর দফতরে। একটি ঘরে রাখা হয়- খাট নেই, মেঝেতে নামাজের মাদুরই শয্যা। জানালা বন্ধ, বাইরে কী হচ্ছে বোঝার উপায় নেই। দিন-রাতের হিসাব কেবল অনুমানের ওপর নির্ভরশীল।
সেখানে একাধিক কর্মকর্তা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। প্রশ্নের কেন্দ্রে ছিল- তিনি কার সাথে যুক্ত, কে তাকে ব্যবহার করছে, কোন রাজনৈতিক বা নিষিদ্ধ সংগঠনের সাথে তার সম্পর্ক আছে কিনা। তিনি বারবার বলেন, তিনি সাধারণ মানুষ, কোনো সংগঠনের সাথে যুক্ত নন। কিন্তু উত্তরে সন্দেহই বাড়তে থাকে।
এরপর তাকে নেয়া হয় বগুড়ায়। একটি বড় হলঘরের মতো জায়গায় একাধিক খাট বসানো। বাইরে মাঠ দেখা যায়, কিন্তু বের হওয়ার অনুমতি নেই। সেখানে প্রায় চার মাসের মতো তিনি নিখোঁজ অবস্থায় ছিলেন বলে জানান।
ভয় দিয়ে নিয়ন্ত্রণ : বগুড়ায় তার ওপর মানসিক চাপ আরো বেড়ে যায়। নিয়মিত হুমকি দেয়া হতো- ‘ক্রসফায়ার’, পরিবারের সদস্যদের তুলে আনার ভয়, মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর আশঙ্কা। তিনি বলেন, “সবচেয়ে ভয় ছিল পরিবারকে নিয়ে। আমার কিছু হলে তারা কী করবে- এই চিন্তাই আমাকে ভেঙে দিত।”
পরে তাকে আরো একটি বিশেষ বাহিনীর হেফাজতে নেয়া হয়। ছোট একটি কক্ষে রাখা হয়, যেখানে আলো জ্বালানো থাকত সবসময়। ঘুমাতে দেয়া হতো না নিয়মিত। কখনো কম্বল, কখনো বালিশ সরিয়ে নেয়া হতো। দীর্ঘ সময় বসিয়ে রাখা, হাতকড়া দিয়ে আটকে রাখা ছিল স্বাভাবিক শাস্তির অংশ।
তিনি জানান, পাশের কক্ষ থেকে অন্য আটক ব্যক্তিদের আর্তনাদ শোনা যেত। কাউকে টেনে নেয়া হচ্ছে, কাউকে আবার অসুস্থ অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হচ্ছে- এসব দৃশ্য তাকে মানসিকভাবে আরো বিপর্যস্ত করে তোলে।
“টার্গেট” সংস্কৃতি : তার ভাষায়, সেখানে আটক ব্যক্তিদের ‘মানুষ’ নয়, ‘টার্গেট’ বলা হতো। কোথা থেকে কাউকে আনা হলো, কেন আনা হলো- এই প্রশ্নের কোনো জবাব থাকত না। শুধু নির্দেশ আসত, “টার্গেট আছে, চল।”
এই সংস্কৃতি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ভেতরে এক ধরনের ভয়ঙ্কর অমানবিকতা সৃষ্টি করেছে বলে মনে করেন তিনি। একজন মানুষ ধীরে ধীরে শুধু একটি ফাইলে পরিণত হয়- যার ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় অদৃশ্য সিদ্ধান্তে।
বিচারহীনতার আতঙ্ক : এক সময় তিনি শুনতে পান, কোনো কোনো আটক ব্যক্তিকে এক এলাকা থেকে তুলে অন্য এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়, যাতে পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন হয়। এতে নিখোঁজের ঘটনা দীর্ঘস্থায়ী হয়, পরিবার কোনো খোঁজ পায় না।
তিনি আরো জানান, কিছু ক্ষেত্রে প্রকাশ্যে গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিকেও পরে গোপনে আবার তুলে নেয়া হয়েছে- কারণ “পরিষ্কারভাবে” আটক হয়নি, লোকজন দেখে ফেলেছে।
এই বাস্তবতা তার কাছে আইন ও বিচারের ধারণাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে।
মানুষের মতো বাঁচার আকুতি : দীর্ঘ বন্দিত্বে সবচেয়ে কষ্টের ছিল অনিশ্চয়তা। তিনি জানতেন না, তিনি আদৌ বাড়ি ফিরতে পারবেন কি না। দিনের পর দিন দেয়ালে দাগ কেটে সময় গুনতেন। বিমানের শব্দ, দূরের ট্রেনের আওয়াজ- এই সামান্য ইঙ্গিত থেকেই বাইরের পৃথিবীর অস্তিত্ব টের পেতেন।
তিনি বলেন, “আমি শুধু চাইতাম কেউ আমাকে মানুষ হিসেবে দেখুক। অপরাধ করলে আদালতে নিক। কিন্তু এভাবে অন্ধকারে রেখে বিচারহীনভাবে ভাঙা- এটা কোনো রাষ্ট্রের জন্য গর্বের নয়।”
প্রশ্ন রাষ্ট্রের জন্য : এই অভিজ্ঞতা শুধু একজন ব্যক্তির নয়। এটি বাংলাদেশের বহু গুম ও হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগের সাথে মিলে যায়। মানবাধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরেই বলছে, জবাবদিহির অভাব এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটাচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু যদি সেই নিরাপত্তাই ভয় ও অনিশ্চয়তার প্রতীক হয়ে ওঠে, তাহলে রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এই নাগরিকের প্রশ্ন খুব সাধারণ : “আমি যদি কোনো অপরাধ না করে থাকি, তাহলে আমাকে কেন এত মাস অদৃশ্য করে রাখা হলো? আমার পরিবার কেন জানত না আমি বেঁচে আছি কি না?”
এই প্রশ্নের উত্তর শুধু একজন ভুক্তভোগীর নয়- সমগ্র রাষ্ট্রের বিবেকের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
আইনের চোখে এই বন্দিত্ব কী?
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার নিশ্চিত। কাউকে গ্রেফতার করলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে হাজির করা বাধ্যতামূলক (ফৌজদারি কার্যবিধি, ধারা ৬১)।
এই ব্যক্তির ক্ষেত্রে তা হয়নি। তাকে মাসের পর মাস অদৃশ্য রাখা হয়েছে। কোনো মামলা দেখানো হয়নি। আইনজীবীর সাথে যোগাযোগের সুযোগ দেয়া হয়নি। পরিবারকে জানানো হয়নি।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলেন, এটি সরাসরি বেআইনি আটক এবং গুমের সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে।
জাতিসঙ্ঘের সংজ্ঞা অনুযায়ী, রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রের মদদে কাউকে আটক করে তার অবস্থান অস্বীকার করা বা গোপন রাখা হলে সেটি গুম হিসেবে গণ্য হয়।
নির্যাতন : আইনত সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ : বাংলাদেশ ১৯৯৮ সালে জাতিসঙ্ঘের ঈড়হাবহঃরড়হ অমধরহংঃ ঞড়ৎঃঁৎব (ঈঅঞ)-এ স্বাক্ষর করেছে। ২০১৩ সালে প্রণীত হয়েছে নির্যাতন ও হেফাজতে মৃত্যু (নিবারণ) আইন। এই আইনে স্পষ্টভাবে বলা আছে- কোনো সরকারি কর্মকর্তা হেফাজতে শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন করলে তা গুরুতর অপরাধ। শাস্তির বিধানও রয়েছে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো- এই আইনে মামলার সংখ্যা খুবই কম, দণ্ড আরো কম। ভুক্তভোগীরা ভয়, হুমকি ও প্রমাণের অভাবে মামলা করতে পারেন না। এই ব্যক্তি বলেন, “আমি চাই ন্যায়বিচার। কিন্তু আমি জানি, কথা বললেই বিপদ।”
মানবাধিকার দৃষ্টিতে কী বোঝায় এই ঘটনা?
মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গুম ও নির্যাতন শুধু ব্যক্তির ওপর হামলা নয়- এটি সমাজের ওপর সম্মিলিত আতঙ্ক সৃষ্টি করে। মানুষ কথা বলতে ভয় পায়, মত প্রকাশ সঙ্কুচিত হয়, গণতন্ত্র দুর্বল হয়।
বিশেষ করে রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে সন্দেহভাজন বানানো একটি বিপজ্জনক প্রবণতা। এতে বিরোধী মতকে দমন করার সংস্কৃতি সৃষ্টি হয়।
ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ রাষ্ট্রকে ধীরে ধীরে নাগরিকবিচ্ছিন্ন করে তোলে- এই ঘটনাও সেই বৃহত্তর কাঠামোর অংশ।
রাষ্ট্রের নৈতিক দায় : আইনশৃঙ্খলা বাহিনী রাষ্ট্রের সুরক্ষা দেয়। কিন্তু সেই সুরক্ষা যদি ভয়ের উৎসে পরিণত হয়, তাহলে রাষ্ট্র তার নৈতিক ভিত্তি হারায়।
এই ব্যক্তির প্রশ্ন খুব সাধারণ : “আমি যদি অপরাধী না হই, তাহলে আমাকে কেন এত মাস অদৃশ্য করে রাখা হলো?”
এই প্রশ্নের উত্তর শুধু একজন মানুষের নয়- এটি রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতার প্রশ্ন।
সামনে পথ কী?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন- গুমের অভিযোগের স্বাধীন তদন্ত কমিশন প্রয়োজন; হেফাজতে নির্যাতনের মামলায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা জরুরি; আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহি ও বেসামরিক নজরদারি বাড়াতে হবে; ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে; সবচেয়ে গুরুত্বপূণ- রাষ্ট্রকে স্বীকার করতে হবে যে সমস্যা আছে। অস্বীকার নয়, সংস্কারই পারে আস্থা ফেরাতে।
এই প্রতিবেদন কোনো প্রতিশোধের আহ্বান নয়। এটি ন্যায়বিচারের ডাক। একজন সাধারণ নাগরিক যেন রাষ্ট্রের ভেতরে অদৃশ্য হয়ে না যায়- এই নিশ্চয়তাই একটি সভ্য রাষ্ট্রের পরিচয়।
তিনি বলেন, “আমি বেঁচে ফিরেছি। কিন্তু অনেকেই ফেরেনি। আমি চাই, আমার কণ্ঠ যেন তাদের হয়ে কথা বলে।”


















