আওয়ামী আমলে ভোট এলে বেড়ে যেত গুম: গুম কমিশনের প্রতিবেদন
- আপডেট সময় ০২:০৪:১১ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৭ জানুয়ারী ২০২৬
- / ২৮ বার পড়া হয়েছে
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে ২০১২ সালে গুমের ঘটনা ঘটেছিল ৬১টি, তার পরের বছরে এই সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি হয়ে যায়। আবার ২০১৮ সালে গুমের ঘটনা তার পরের বছরের চেয়ে বেশি ছিল।
বছরভিত্তিক ঘটনা তুলে ধরে গুম–সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনের আগে গুমের ঘটনা বেড়ে যেত, বেছে বেছে লক্ষ্যবস্তু করা হতো বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতা–কর্মী, সমর্থকদের।
আওয়ামী লীগের ১৬ বছরের শাসনে গুম নিয়মিত ঘটনা হয়ে উঠেছিল। ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালে এই সরকারের পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার গুম–সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন গঠন করে। বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের এ কমিশন ৪ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টার কাছে তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়।
প্রতিবেদনের ১৬ নম্বর পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, নির্বাচনের আগে আগে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতা–কর্মীদের গণহারে আটক করা ও বেছে বেছে গুম করা হতো।
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে বিরোধীদের ওপর দমন–পীড়ন চলার মধ্যে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে যে তিনটি নির্বাচন হয়েছিল, তার সব কটি ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। ২০১৪ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন অধিকাংশ দল বর্জন করেছিল। ২০১৮ সালের নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ থাকলেও ভোটের আগেই ব্যালট বাক্স ভর্তি করে রাখায় তা ‘রাতের ভোট’ নামে পরিচিতি পায়।
প্রতিবেদন বলা হয়, গুমের ঘটনা বাড়া আর কমার সঙ্গে ঘটনাবহুল রাজনৈতিক সন্ধিক্ষণ, নিরাপত্তা–সংকট ও নির্বাচনের সংযোগ ছিল। ২০১৩ সালে গুমের ঘটনা বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে পরের বছর (২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি) নির্বাচনের একটা সম্পর্ক আছে। একই প্রবণতা দেখা যায় ২০১৮ সালের নির্বাচনকে ঘিরে।
২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪–এর নির্বাচনের আগে বিএনপি ও জামায়াতের নেতা–কর্মীরা গুমের শিকার বেশি হয়েছিলেন। কমিশন বলেছে, এ ছাড়া বড় কোনো রাজনৈতিক সমাবেশ ও বিক্ষোভের আগে বিরোধী দলের নেতা–কর্মীদের তুলে নিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজনৈতিক পরিচয়ে গুম হয়েছেন ৯৪৮ জন। আর নিখোঁজের মোট সংখ্যা ১৫৭।
গুমের পর যাঁরা নিখোঁজ রয়েছেন এবং যাঁরা ফিরে এসেছেন, সবাইকে মিলিয়েই ৯৪৮ জন। গুমের শিকারদের মধ্যে জামায়াত এবং এর সহযোগী সংগঠনের নেতা–কর্মীদের সংখ্যা বেশি। তবে গুমের পর ফিরে না আসা অর্থাৎ নিখোঁজ বেশি বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা–কর্মী।
মোট নিখোঁজের মধ্যে ৬৮ শতাংশ বিএনপি ও যুবদলের নেতা–কর্মী, আর ২২ শতাংশ জামায়াত-শিবিরের নেতা–কর্মী।
গুমের ঘটনা বুঝতে রাজনৈতিক পরিচয়টা জরুরি উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজনৈতিক পরিচয়ের মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, কাদের ঝুঁকি বেশি ছিল। গুম কি সাধারণ কোনো আইনশৃঙ্খলাজনিত বিষয় ছিল, নাকি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য–উদ্দেশ্যে এটি পরিচালিত হয়েছে।
কোন বছরে কত গুম
আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে ক্ষমতায় যাওয়ার পর বিরোধী মত দমনে গুমকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার শুরু করে বলে অভিযোগ রয়েছে। কমিশন ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত মোট ১ হাজার ৫৬৪টি গুমের ঘটনা নথিভুক্ত করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুমের ঘটনা ঘটেছে ২০১৬ সালে।
২০১৬ সালে গুমের ২১৫টি ঘটনা ঘটে। দ্বিতীয় স্থানে আছে ২০১৭ সাল, ওই বছর গুমের ঘটনা ছিল ১৯৪টি। ২০১৮ সালে গুমের সংখ্যা ১৯২টি। ২০১৯ সালে ১১৮টি। ২০২০ ও ২০২১ সালে গুমের সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ৫১ ও ৫৬। পরের বছর ২০২২ সালে এটি আবার বেড়ে দাঁড়ায় ১১০টি। ২০২৩ সালে তা কমে এসে দাঁড়ায় ৬৫টিতে, ২০২৪ সালে সংখ্যাটি ছিল ৪৭। এই বছরের আগস্টেই ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান শেখ হাসিনা।
আওয়ামী লীগ যে বছর ক্ষমতায় ফিরেছিল, সেই ২০০৯ সালে গুমের ঘটনা ছিল ১০টি। এর পর থেকে তা বাড়তেই থাকে।
২০১০ সালে গুমের ঘটনা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৪টি। ২০১১ সালে সংখ্যাটি হয় ৪৭টি। ২০১২ সালে ৬১টি। এর পরের বছর ২০১৩ সালে ১২৮টি গুমের ঘটনা ঘটে। ২০১৪ সালে কিছুটা কমে গুমের ঘটনা দাঁড়ায় ৯৫টি। ২০১৫ সালে আবার বেড়ে হয় ১৪১টি।
তদন্ত কমিশনে মোট ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগ জমা পড়ে। এর মধ্যে যাচাই-বাছাই শেষে ১ হাজার ৫৬৯টি অভিযোগ সংজ্ঞা অনুযায়ী গুম হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এর মধ্যে ২৮৭টি অভিযোগ ‘মিসিং অ্যান্ড ডেড’ ক্যাটাগরিতে পড়েছে।
ব্যক্তির সঙ্গেও গুমের সম্পর্ক
বিভিন্ন সংস্থায় নেতৃত্ব বদলের সঙ্গেও গুমের হ্রাস–বৃদ্ধির সম্পর্ক খুঁজে বের করেছে কমিশন। প্রতিবেদনে বলা হয়, গুমের সঙ্গে জড়িত সংস্থাগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক ও নেতৃত্বে পরিবর্তনের সঙ্গে গুমের সংখ্যা কমে আসত।
উদাহরণ দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালে র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন্স) থেকে মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানকে সরানো হলে গুমের সংখ্যা কমেছে।
তার মানে এটা নয় যে এসব চর্চা বন্ধ হয়েছে। বরং এ সময় অল্পসংখ্যক মানুষ স্থায়ীভাবে নিখোঁজ হয়েছেন এবং অনেককে পরে হাজতে ও আদালতে পাওয়া গেছে, বলা হয় প্রতিবেদনে।
কমিশন বলছে, ২০২১ সালের ডিসেম্বরে অব্যাহত গুমের ঘটনায় র্যাবের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার পর গুমের ঘটনায় কিছুটা ব্যাঘাত তৈরি করে। কিন্তু সেটি বেশি দিন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। সন্ত্রাসবাদ দমন ও অপরাধ প্রতিরোধমূলক আটক আইনকে আওয়ামী লীগ সরকার বিরোধী মত দমনের অস্ত্রে পরিণত করেছিল।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে সমালোচনার মুখে পড়ে। একই বছর বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্যরাষ্ট্রের মানবাধিকার পরিস্থিতি মূল্যায়ন করতে ‘ইউনাইটেড নেশন ইউনিভার্সাল পিরিওডিক্যাল রিভিউ’তে অংশ নেয় বাংলাদেশ। মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক নজরদারির কারণে সরকার বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডশূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণ করুক, এমন চাপ তৈরি হতে থাকে। আন্তর্জাতিক এ চাপ কমাতে কৌশল পরিবর্তন করে আওয়ামী লীগ সরকার। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের পরিবর্তনে ভিন্নমতকে দমনে গুমকে বেছে নেয় তারা।


















