জুলাই আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ
শরীরে ১৫০টি গুলি নিয়ে দেড় বছর ধরে জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে মুন
- আপডেট সময় ০৩:০৩:০৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২৬
- / ২৩ বার পড়া হয়েছে
২০২৪ সালের ১৬ জুলাই যখন সারাদেশে চলছিল বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থীদের আন্দোলন, তখন দুপুর ১টা রংপুর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট মাঠে জড়ো হতে শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। সেখানে এসে উপস্থিত হয় ওই প্রতিষ্ঠানের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সপ্তম ব্যাচের শিক্ষার্থী জুলাই যোদ্ধা মো. মাহবুর আল হাসান মুনের ৷ সে নীলফামারী জেলার কিশোরগঞ্জের পানিয়াল পুকুর পূর্বপাড়া গ্রামের কৃষক আব্দুল খালেক ও গৃহিণী মুন্নী বেগম দম্পতির ছোট ছেলে।
সেদিন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের শিক্ষার্থীদের মিছিলে অংশ নেয় মুন। সবাই এক সঙ্গে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম গেটে পৌঁছালে সেখানে বাধা দেয় পুলিশ। এসময়ে শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠিচার্জ করা হয়। পরে গুলি ছুঁড়তে থাকে পুলিশ। এতে সামনের সারিতে থাকা মুন গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। পরে তাকে অন্য শিক্ষার্থীরা সেখান থেকে উদ্ধার করে মোটরসাইকেলে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করায়।
হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময়ে তার শরীরে ছিল প্রায় ২০০টির মতো ছররা গুলি। পরে চিকিৎসকরা শরীর থেকে ৪০টি মতো গুলি বের করা হয়। এখনো শরীরে অবশিষ্ট রয়েছে প্রায় ১৫০টির মতো ছররা গুলি। যার মধ্যে মাথায় ৫টি, মুখে ১০টিসহ রয়েছে শরীরের বিভিন্ন জায়গায়। এসব ছররা গুলি অপসারণ করে তাকে যন্ত্রণা ও কষ্ট থেকে মুক্তি দিতে চিকিৎসক বিদেশে উন্নত চিকিৎসার পরামর্শ দিয়েছেন।
তার পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, কৃষক বাবার স্বপ্ন ছিল মুন। তাকে নিয়ে স্বপ্ন পরিবারের, তবে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে এখনো শরীরে বয়ে বেড়াচ্ছে গুলি। চিকিৎসক বিদেশে গিয়ে উন্নত চিকিৎসার পরামর্শ দিলেও সামর্থ্য নেই কৃষক বাবার। যেখানে তাকে পড়ালেখা করানোই কষ্টসাধ্য সেখানে বিদেশে ছেলেকে নিয়ে গিয়ে উন্নত চিকিৎসা করা তাদের কাছে স্বপ্নের মতো। পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে বিদেশে যেতে পারছে না মুন। প্রায় দেড় বছর ধরে তীব্র মাথাব্যথা ও শরীর ব্যথা নিয়ে মুন সবসময় অসুস্থতা অনুভব করে। পড়ালেখায় মনোযোগ দিতে পারে না।ঠিকমতো ঘুমাতেও পারে না মাঝে মধ্যে তার শরীরে দেখা দেয় তীব্র যন্ত্রণা।
মুন জুলাই আন্দোলনের আহত হয়ে জুলাই যোদ্ধা হিসেবে সরকারি গেজেট ভুক্তও হয়েছে। তার গেজেট নাম্বার ৯৮৭ এবং জুলাই যোদ্ধা কার্ডের কেস আইডি নাম্বার ৩২৯০৪। মুনকে অন্তবর্তীকালীন সরকার উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানোর কথা থাকলেও সেটি এখনো হয়ে ওঠেনি।
জুলাইযোদ্ধা মুন বলেন, সেদিন দুপুরের দিকে শহরের পরিস্থিতি দেখতে বের হই। রাস্তায় হাজার হাজার শিক্ষার্থীর স্রোত দেখে নিজেকে সামলিয়ে উঠতে পারিনি তাদের সঙ্গে মিছিলে যোগ দেই। মোবাইল ফোনে কল দিয়ে ক্যাপটেনকে বলি সবাইকে নিয়ে বেগম রোকেয়ার গেটে আসতে। পরে সেখানে পৌঁছানোর কিছুক্ষণের মধ্যে পুলিশ আমাদের ওপর লাঠিচার্জ শুরু করে। তখন আমরা না সরে গেলে আমাদের ওপর গুলি করা শুরু হয় তখন আমি সামনে ছিলাম। আমার শরীরে দুইশ মতো ছররা গুলি লাগে এতে আমি আহত হয়ে রাস্তায় লুটিয়ে পড়ি। পরে আমাকে অন্য শিক্ষার্থীরা সেখান থেকে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করে তবে দূরে নিয়ে গিয়ে আমাকে রিকশায় উঠানোর চেষ্টা করলে কোনো রিকশাচালক আমাকে নিতে চায় না। পরে একজনের মোটরসাইকেলে আমাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে গিয়ে আমার শরীর থেকে প্রায় ৪০টি বুলেট বের করে। বাকি প্রায় ১৫০ বুলেট আমার আমার শরীরে এখনো আছে। আমাকে অন্তবর্তীকালীন সরকার বাইরের দেশে নিয়ে উন্নত চিকিৎসা করার কথা থাকলেও সেটা করেনি। আমি গরিব পরিবারে সন্তান, আমার বাবা একজন কৃষক। আমাকে বিদেশে নিয়ে এত টাকা ব্যয় করে চিকিৎসা করা সম্ভব না। আমার পরিবারের সবকিছু দিয়ে আমার চিকিৎসা করেছে। পরে আমাকে জুলাই যোদ্ধা গেজেট অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে সেখান থেকে পাওয়া সামান্য টাকা দিয়ে আমার উন্নত চিকিৎসা সম্ভব না।
জুলাইযোদ্ধা মুনের বাবা আব্দুল খালেক বলেন, আমি গরিব মানুষ। আমার ছেলেকে নিয়ে স্বপ্ন দেখি। তবে সে শরীরে এত গুলি নিয়ে কষ্টে আছে। আমি আমার সামর্থ্য মতো তাকে চিকিৎসা করার চেষ্টা করেছি কিন্তু এখন আর পারছি না। সরকার সহায়তা করলে আমার ছেলে স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপন করতে পারবে।
মুনের মা মুন্নি বেগম বলেন, আমার ছেলে আন্দোলন করতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়েছে। আমরা অনেক গরিব মানুষ ছেলের চিকিৎসা করাতে পারছি না। আমার ছেলে যন্ত্রণা সহ্য করছে মা হিসেবে আমার জন্য এটি খুব কষ্টের। আমি সরকারের কাছে সহায়তা চাই যাতে আমার ছেলে ভালো জীবন ফিরে পায়।
কিশোরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তানজিমা আঞ্জুম সোহানিয়া বলেন, সরকারিভাবে তাকে কীভাবে সহায়তা করা যায় উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সেটি করা হবে।



















