জুলাই বিপ্লবের ২ বছর
চিহ্নিত অস্ত্রধারী আওয়ামী ২০০ ক্যাডারের ১৭৫ জনই ধরাছোঁয়ার বাইরে
- আপডেট সময় ০১:৩৮:৪৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ২২ জুলাই ২০২৬
- / ২৪ বার পড়া হয়েছে
জুলাই বিপ্লবে ছাত্র-জনতার ওপর পুলিশের পাশাপাশি নির্বিচারে গুলি চালানো আওয়ামী অস্ত্রধারীরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। সারা দেশে বর্বরোচিত হামলায় জড়িত ২০০ সশস্ত্র ক্যাডারকে চিহ্নিত করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ ঘটনার দুই বছর হতে চললেও মাত্র ২৫ জনকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে পুলিশ। বাকিরা পলাতক। এদের বেশির ভাগই সীমান্ত পাড়ি দিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন ভারতে। তারা নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের সশস্ত্র ক্যাডার বলে শনাক্ত করে পুলিশ।
চব্বিশের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার ওপর পুলিশের সঙ্গে প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে গুলি করতে দেখা গেছে সাদা পোশাকের কিছু লোককে। আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের এসব ক্যাডার ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালায়। শুধু তাই নয়, লাঠি হাতে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের বেধড়ক পিটিয়েছে তারা।
২০২৪ সালের ৬ অক্টোবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি ফুটেজে দেখা গেছে, কলকাতার নিউ মার্কেট এলাকার সড়কে হাঁটতে হাঁটতে মোবাইল ফোনে কথা বলছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর আসিফ আহমেদ সরকার। তার পরনে রয়েছে গেঞ্জি ও জিন্স প্যান্ট। চব্বিশের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনি অবৈধভাবে দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান। তিনি জুলাই আন্দোলনে প্রকাশ্যে ছাত্রদের ওপর কাটা রাইফেল দিয়ে গুলি চালিয়েছেন। তার সঙ্গে আরো সাত জনকে অস্ত্র উঁচিয়ে গুলি করতে দেখা গেছে। আসিফ সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদের ভাতিজা। ওয়ার্ড কাউন্সিলরের সময় তিনি ওই এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব গড়ে তুলেছিলেন। আসিফের মতো অন্যরাও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন।
জুলাই আন্দোলনে অস্ত্রধারীদের আইনের আওতায় আনা হবে কি না, জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (জনসংযোগ ও মাল্টিমিডিয়া) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন আমার দেশকে জানান, ‘জুলাই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সংঘটিত অপরাধে বেআইনি সশস্ত্র কর্মকাণ্ডের অভিযোগগুলোর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠী অনেকেই পলাতক। তবে যেই হোক না কেন, তদন্তে প্রমাণসাপেক্ষে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া চলমান রয়েছে।’
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৪ আগস্টে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ওয়ার্ড কাউন্সিলর আসিফের নেতৃত্বে স্থানীয় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা আন্দোলনরত ছাত্রদের ওপর লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা করছেন। এ সময় আসিফকে গুলি করতেও দেখা গেছে।
মোহাম্মদপুরের বছিলার ৩০ জুলাইয়ের আরেকটি ফুটেজে দেখা গেছে, এক যুবক ছাত্র-জনতার ওপর গুলি করছেন। পরে জানা গেছে, ওই ব্যক্তি ডিএনসিসির ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের আরেক সাবেক কাউন্সিলর তারেকুজ্জামান রাজীব ওরফে দরবেশ রাজীব। এই দুজনই জুলাই বিপ্লবের পর দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। ৩ আগস্টের আরেকটি ফুটেজে দেখা গেছে, কারওয়ান বাজারে ছাত্র-জনতা মিছিল বের করেছে। তখন পুলিশের অস্ত্র কেড়ে নিয়ে গুলি করতে দেখা গেছে কয়েকজনকে।
জানা গেছে, জুলাই আন্দোলনের অন্যতম বড় স্পট ছিল রাজধানীর মিরপুরের ১০ নম্বর গোলচত্বর। ৪ আগস্ট এখানে রিভলবার দিয়ে গুলি করতে দেখা গেছে সাবেক সংসদ সদস্য এস এম জাহিদকে। তিনি ভারতে পালিয়ে আছেন বলে জানায় পুলিশ।
জুলাই আন্দোলনের আরেকটি ফুটেজে দেখা গেছে, ৪ আগস্ট ফেনীর মহিপাল এলাকায় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালায় একদল দুর্বৃত্ত। এ সময় একজনকে অত্যাধুনিক একে-৪৭ দিয়ে গুলি ছুড়তে দেখা যায়। পরে পুলিশ জানতে পারে, ওই অস্ত্রধারী ফেনী জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি জিয়াউদ্দিন বাবলু।
চট্টগ্রামের মুরাদপুরে ১৬ জুলাই পিস্তল হাতে এক ব্যক্তিকে দেখা গেছে। তিনি অনবরত গুলি করছিলেন। পরে পুলিশ জানতে পারে, তিনি যুবলীগ কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সাবেক উপ-অর্থ সম্পাদক হেলাল আকবর চৌধুরী। তিনি সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের অনুসারী। ১৭ জুলাই চট্টগ্রাম জামাল খান ওয়ার্ডে সাবেক কাউন্সিলর শৈবাল দাশ সুমনের নেতৃত্বে ছাত্র-জনতার ওপর হামলা করা হয়। তার পাশে অস্ত্রসহ ছিলেন ফরহাদুল ইসলাম। তিনি ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় উপ-সমাজসেবা সম্পাদক।
নারায়ণগঞ্জ শহরে ১৭ জুলাই শিক্ষার্থীদের মিছিলে হামলা চালায় ছাত্রলীগের ক্যাডাররা। ওই মিছিল থেকে গুলিও ছোড়া হয়। মিছিলের নেতৃত্বে ছিলেন সাবেক এমপি শামীম ওসমান। এ সময় তার ছেলে অয়ন ওসমান, শামীমের বড় ভাই নাসিম ওসমানের ছেলে আজমেরী ওসমানকে অস্ত্র হাতে মহড়া দিতে দেখা গেছে। এখন তারা সবাই পালিয়ে আছেন। শামীম ওসমান এখন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন।
আরেকটি ফুটেজে দেখা গেছে, গত বছরের ২১ জুলাই সাভারে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার ওপর অস্ত্র দিয়ে গুলি করছেন এক ব্যক্তি। পরে পুলিশ শনাক্ত করে যে, তিনি সাভার উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য মেহেদী হাসান তুষার। ২৩ জুলাইয়ের এক ফুটেজে দেখা গেছে, সাভারে ছাত্র-জনতার ওপর গুলি করছে এক যুবক। পরে জানা গেছে তিনি সাভার উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি আতিকুর রহমান আতিক। ৩ আগস্টের একটি ফুটেজে দেখা গেছে, ছাত্র-জনতার ওপর গুলি করছে এক ব্যক্তি। পরে পুলিশ শনাক্ত করে তিনি সাভার উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য সাইদুর রহমান সুজন।
চব্বিশের ১৯ জুলাই নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়া নূর মসজিদ, ডিআইটি মসজিদসহ বিভিন্ন স্থান থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার মিছিল বের হয়। জুমার নামাজের আগেই বঙ্গবন্ধু সড়কের নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের ভেতরে ও নির্মাণাধীন ভবনে অবস্থান নিতে শুরু করেন আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের সশস্ত্র নেতাকর্মীরা। জুমার নামাজ শেষ হওয়ার কিছুক্ষণ আগে সেখানে উপস্থিত হন শামীম ওসমান এবং তার ছেলে অয়ন ওসমান। ডিআইটি এলাকা ও চাষাড়া থেকে ছাত্র-জনতার মিছিল এগিয়ে আসতে থাকলে হঠাৎ নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের ভেতর থেকে হামলা চালানো হয়। এতে মিছিল ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় এবং মুহূর্তেই পুরো এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। সেদিন শামীম ওসমানের সঙ্গে তার ছেলে অয়ন ওসমান, শ্যালক তানভীর আহমেদ টিটু, বেয়াই সালাউদ্দিন লাভলু, অয়নের শ্যালক ভিকি, ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি হাবিবুর রহমান রিয়াদ অস্ত্রসহ ছাত্র-জনতার ওপর গুলি ছোড়ে। তাদের হাতে পিস্তল, শটগান ও অত্যাধুনিক অটোমেটিক অস্ত্র দেখা গেছে। এক পর্যায়ে তারা গুলি ছুড়তে ছুড়তে ডিআইটি এলাকার দিকে অগ্রসর হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিওতে শামীম ওসমানকে অস্ত্র হাতে দেখা যায়।
জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতাকর্মীরা ফেনীর মহিপাল ফ্লাইওভারের নিচে জড়ো হয়ে স্লোগান দেন। এক পর্যায়ে বেলা ১টার দিকে নিজাম হাজারীর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের সশস্ত্র কর্মীরা আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি ছোড়ে। গুলিতে ঘটনাস্থলেই মারা যান সাতজন। আওয়ামী অস্ত্রধারীদের গুলিতে নিহতরা হলেন শ্রাবণ মাহবুবুল হাসান, সারোয়ার জাহান, ওয়াকিল আহমেদ, ছাইদুল ইসলাম, জাকির হোসেন ও অটোরিকশাচালক মো. সবুজ। পরে পুলিশ একাধিক অস্ত্রধারীকে চিহ্নিত করে। এদের মধ্যে রয়েছেন যুবলীগ নেতা লুৎফর রহমান, নূর নবী, ছাত্রলীগ নেতা জিয়াউদ্দিন বাবলু, আওয়ামী লীগ নেতা আবদুর রউফ, হারুন মজুমদার, যুবলীগ নেতা দিদারুল কবির এবং যুবলীগ নেতা সম্রাটও রয়েছেন।
সূত্র জানায়, জুলাই আন্দোলনের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতাকর্মীদের ওপর প্রকাশ্যে গুলি ছোড়ার অভিযোগ রয়েছে শামীম ওসমানের ঘনিষ্ঠ যুবলীগ নেতা আশিকুর রহমানের বিরুদ্ধে। তার বিরুদ্ধে হত্যা মামলাও রয়েছে। কিন্তু এখনো পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। আশিকুর রহমান প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
জানা গেছে, রাজধানীর উত্তরা হাউস বিল্ডিং এলাকায় বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে ১৯ জুলাই ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালান আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। এ সময় গুলি শেষ হয়ে গেলে জনতার পিটুনিতে নিহত হন হামলাকারী হামিদুল ইসলাম মোল্লা ওরফে জুয়েল মোল্লা। তিনি ছিলেন গাজীপুর সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র জাহাঙ্গীর আলমের ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস)।
সূত্র জানায়, জুলাই আন্দোলনে ছাত্র-জনতার ওপর গুলিবর্ষণ করা আওয়ামী দুর্বৃত্তদের এখনো পর্যন্ত গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। তাদের অবৈধ অস্ত্রগুলোও জব্দ করা যায়নি। এসব অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার না হওয়ায় ভবিষ্যতে তা নাশকতার কাজে ব্যবহার হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
পুলিশ জানায়, জুলাই আন্দোলনে অবৈধ অস্ত্রধারীদের গ্রেপ্তার করার বিষয়টি চলমান প্রক্রিয়া। যখনই কারো বিষয়ে গোয়েন্দা তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তখনই অভিযান চালিয়ে জুলাই আন্দোলনে অবৈধ অস্ত্র ব্যবহারকারীদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশ।
জুলাই আন্দোলনের সময় পুলিশ ফাঁড়িসহ পুলিশের বিভিন্ন স্থাপনা থেকে বিপুল অস্ত্র ও গোলাবারুদ খোয়া গেছে। তবে সেসব অস্ত্রের মধ্যে এখনো এক হাজার ৩১৮টি উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ। এসব অস্ত্র দুর্বৃত্ত ও পালিয়ে থাকা আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের হাতে চলে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। উদ্ধার না হওয়া এসব অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে ২৯৬টি চায়না রাইফেল, আটটি বিডি রাইফেল, চায়না এসএমজি ৬০টি, এলএমজি ১১টি, চায়না পিস্তল ৫৪টি, ৯ বোরের পিস্তল ৬৫৩টি, এসএমজি একটি, ১২ বোরের শটগান ৬৫৩টি, সিঙ্গেল গ্যাস গান ১১৭টি, ৩৮ মিমি টিয়ারগ্যাস লঞ্চার পাঁচটি এবং সিগন্যাল পিস্তল দুটি। তবে এসব অস্ত্র উদ্ধারের জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশ।



















