ঢাকা ০২:৫৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ফিলিস্তিনিদের ওপর নির্যাতন ঢাকতে সেনাবক্তব্য সাজানো হতো, মুখ খুললেন ইসরাইলি সংগঠন ‘ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স’-এর মুখপাত্র

ডেস্ক রিপোর্ট
  • আপডেট সময় ১২:৫৮:০৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬
  • / ২৪ বার পড়া হয়েছে

ইসরাইলি সেনাবাহিনীর মুখপাত্রের দফতরের সাবেক নারী সদস্য আইয়েলেত ক্রয়জার স্বীকার করেছেন, গাজা ও অধিকৃত পশ্চিম তীরে সেনাবাহিনীর সামরিক অভিযান সম্পর্কে গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য বিকৃত করা হয়েছে। নিরীহ ফিলিস্তিনিদেরও ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে আখ্যা দেয়া হতো। জনসমর্থন আদায় এবং আন্তর্জাতিকভাবে সামরিক অভিযানের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে সেনাবাহিনীর বক্তব্য সাজানো হতো।

তুরস্কের বার্তা সংস্থা আনদুলু মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) জানায়, ইসরাইলি সংগঠন ‘ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স’-এর মুখপাত্র হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক পোস্টে এসব কথা বলেছেন ক্রয়জার। সংগঠনটি অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইলি সেনাদের নির্যাতন ও নিপীড়নের বিষয়ে সাবেক সেনাসদস্যদের সাক্ষ্য প্রকাশ করে।

ক্রয়জার লিখেছেন, ‘সেনাবাহিনীতে দায়িত্ব পালনের সময় গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের খুঁটিনাটি আমি নিজের মতো করে সাজিয়েছি। দেখেছি, নিরীহ ফিলিস্তিনিদের নামের সাথেও কীভাবে ‘সন্ত্রাসী’ তকমা জুড়ে দেয়া হতো। আর কাদের উদ্দেশে বক্তব্য দেয়া হচ্ছে এবং কী লক্ষ্য অর্জন করতে হবে, তার ওপর ভিত্তি করে সেনাবাহিনীর বিবৃতি তৈরি করা হতো।’

তিনি বলেন, পশ্চিম তীর ও গাজার বাস্তব পরিস্থিতি দেখার পাশাপাশি সেনাবাহিনী সাধারণ মানুষের সামনে সেসব ঘটনা কীভাবে তুলে ধরতে চায়, সেটিও কাছ থেকে দেখেছেন তিনি।

ক্রয়জারের ভাষায়, সেনাবাহিনীর মুখপাত্রের দফতর জনসংযোগ প্রতিষ্ঠানের মতো কাজ করত। জনসাধারণের কাছে জবাবদিহি করার বদলে ঘটনাগুলোর সত্য তুলে ধরার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখত তারা।

ইসরাইলের জনগণের উদ্দেশে দেয়া বক্তব্যের লক্ষ্য ছিল সেনাবাহিনীর ওপর আস্থা বাড়ানো। সেখানে সাধারণ মানুষের জানার অধিকারকে খুব সামান্য গুরুত্ব দেয়া হতো। আর আন্তর্জাতিক মহলের কাছে বক্তব্য দেয়ার লক্ষ্য ছিল ইসরাইলি সামরিক অভিযানের পক্ষে সমর্থন ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো। দুই ক্ষেত্রেই সত্যকে বলি দেয়া হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

একটি হামলায় বহু মানুষের মৃত্যুর খবর জানানোর অভিজ্ঞতাও তুলে ধরেছেন ক্রয়জার। তিনি বলেন, ‘একটি হামলায় কয়েক ডজন মানুষ নিহত হওয়ার খবর দেয়ার পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে যোগ করতাম, নিরীহ মানুষের ক্ষতি হওয়ায় আমরা দুঃখিত। দায়িত্ব পালনের সময় এটাই ছিল নিয়মিত চর্চা।’

তিনি আরো লেখেন, ‘অন্যায়ের সামনে নীরব থাকা কখনোই আমার স্বভাব ছিল না। অথচ এখানে আমাকে সেই অন্যায়ের পক্ষে জনসংযোগ চালাতে বলা হচ্ছিল।’

অতি-রক্ষণশীল ইহুদি সম্প্রদায়ের সদস্য হওয়ায় ইসরাইলে বাধ্যতামূলক সামরিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পাওয়ার সুযোগ ছিল ক্রয়জারের। কিন্তু তিনি সেই সুযোগ গ্রহণ না করে তিন বছর আগে ইসরাইলি সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। যুদ্ধের সময় তিনি সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। তাঁর ভাষায়, ‘তখন বিশ্বাস করতাম, দেশের প্রতিরক্ষায় অংশ নিতেই সেনাবাহিনীতে যোগ দিচ্ছি।’

কিন্তু দায়িত্ব শেষ করে ভ্রমণে যাওয়া কিংবা পড়াশোনা শুরু করার বদলে যে একদিন ‘ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স’-এ যোগ দেবেন, সে কথা কখনো কল্পনাও করেননি তিনি।

সংগঠনটি তাঁর নিয়োগকে স্বাগত জানিয়ে এক্সে লিখেছে, দখলদারিত্বের প্রকৃত চিত্র এবার সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরার সময় এসেছে।

পোস্টের শেষাংশে যুদ্ধের সময় সেনাবাহিনীতে দায়িত্ব পালন করা অন্যদেরও মুখ খোলার আহ্বান জানিয়েছেন ক্রয়জার। তিনি লিখেছেন, ‘আমি আর নীরব থাকব না। যুদ্ধের সময় যারা দায়িত্ব পালন করেছেন, আপনারাও নীরব থাকবেন না।’

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরাইলি হামলায় ৭৪ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১ লাখ ৭৫ হাজারের বেশি আহত হয়েছেন। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, এ যুদ্ধে গাজার প্রায় ৯০ শতাংশ বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

ফিলিস্তিনিদের ওপর নির্যাতন ঢাকতে সেনাবক্তব্য সাজানো হতো, মুখ খুললেন ইসরাইলি সংগঠন ‘ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স’-এর মুখপাত্র

আপডেট সময় ১২:৫৮:০৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬

ইসরাইলি সেনাবাহিনীর মুখপাত্রের দফতরের সাবেক নারী সদস্য আইয়েলেত ক্রয়জার স্বীকার করেছেন, গাজা ও অধিকৃত পশ্চিম তীরে সেনাবাহিনীর সামরিক অভিযান সম্পর্কে গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য বিকৃত করা হয়েছে। নিরীহ ফিলিস্তিনিদেরও ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে আখ্যা দেয়া হতো। জনসমর্থন আদায় এবং আন্তর্জাতিকভাবে সামরিক অভিযানের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে সেনাবাহিনীর বক্তব্য সাজানো হতো।

তুরস্কের বার্তা সংস্থা আনদুলু মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) জানায়, ইসরাইলি সংগঠন ‘ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স’-এর মুখপাত্র হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক পোস্টে এসব কথা বলেছেন ক্রয়জার। সংগঠনটি অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইলি সেনাদের নির্যাতন ও নিপীড়নের বিষয়ে সাবেক সেনাসদস্যদের সাক্ষ্য প্রকাশ করে।

ক্রয়জার লিখেছেন, ‘সেনাবাহিনীতে দায়িত্ব পালনের সময় গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের খুঁটিনাটি আমি নিজের মতো করে সাজিয়েছি। দেখেছি, নিরীহ ফিলিস্তিনিদের নামের সাথেও কীভাবে ‘সন্ত্রাসী’ তকমা জুড়ে দেয়া হতো। আর কাদের উদ্দেশে বক্তব্য দেয়া হচ্ছে এবং কী লক্ষ্য অর্জন করতে হবে, তার ওপর ভিত্তি করে সেনাবাহিনীর বিবৃতি তৈরি করা হতো।’

তিনি বলেন, পশ্চিম তীর ও গাজার বাস্তব পরিস্থিতি দেখার পাশাপাশি সেনাবাহিনী সাধারণ মানুষের সামনে সেসব ঘটনা কীভাবে তুলে ধরতে চায়, সেটিও কাছ থেকে দেখেছেন তিনি।

ক্রয়জারের ভাষায়, সেনাবাহিনীর মুখপাত্রের দফতর জনসংযোগ প্রতিষ্ঠানের মতো কাজ করত। জনসাধারণের কাছে জবাবদিহি করার বদলে ঘটনাগুলোর সত্য তুলে ধরার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখত তারা।

ইসরাইলের জনগণের উদ্দেশে দেয়া বক্তব্যের লক্ষ্য ছিল সেনাবাহিনীর ওপর আস্থা বাড়ানো। সেখানে সাধারণ মানুষের জানার অধিকারকে খুব সামান্য গুরুত্ব দেয়া হতো। আর আন্তর্জাতিক মহলের কাছে বক্তব্য দেয়ার লক্ষ্য ছিল ইসরাইলি সামরিক অভিযানের পক্ষে সমর্থন ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো। দুই ক্ষেত্রেই সত্যকে বলি দেয়া হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

একটি হামলায় বহু মানুষের মৃত্যুর খবর জানানোর অভিজ্ঞতাও তুলে ধরেছেন ক্রয়জার। তিনি বলেন, ‘একটি হামলায় কয়েক ডজন মানুষ নিহত হওয়ার খবর দেয়ার পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে যোগ করতাম, নিরীহ মানুষের ক্ষতি হওয়ায় আমরা দুঃখিত। দায়িত্ব পালনের সময় এটাই ছিল নিয়মিত চর্চা।’

তিনি আরো লেখেন, ‘অন্যায়ের সামনে নীরব থাকা কখনোই আমার স্বভাব ছিল না। অথচ এখানে আমাকে সেই অন্যায়ের পক্ষে জনসংযোগ চালাতে বলা হচ্ছিল।’

অতি-রক্ষণশীল ইহুদি সম্প্রদায়ের সদস্য হওয়ায় ইসরাইলে বাধ্যতামূলক সামরিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পাওয়ার সুযোগ ছিল ক্রয়জারের। কিন্তু তিনি সেই সুযোগ গ্রহণ না করে তিন বছর আগে ইসরাইলি সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। যুদ্ধের সময় তিনি সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। তাঁর ভাষায়, ‘তখন বিশ্বাস করতাম, দেশের প্রতিরক্ষায় অংশ নিতেই সেনাবাহিনীতে যোগ দিচ্ছি।’

কিন্তু দায়িত্ব শেষ করে ভ্রমণে যাওয়া কিংবা পড়াশোনা শুরু করার বদলে যে একদিন ‘ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স’-এ যোগ দেবেন, সে কথা কখনো কল্পনাও করেননি তিনি।

সংগঠনটি তাঁর নিয়োগকে স্বাগত জানিয়ে এক্সে লিখেছে, দখলদারিত্বের প্রকৃত চিত্র এবার সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরার সময় এসেছে।

পোস্টের শেষাংশে যুদ্ধের সময় সেনাবাহিনীতে দায়িত্ব পালন করা অন্যদেরও মুখ খোলার আহ্বান জানিয়েছেন ক্রয়জার। তিনি লিখেছেন, ‘আমি আর নীরব থাকব না। যুদ্ধের সময় যারা দায়িত্ব পালন করেছেন, আপনারাও নীরব থাকবেন না।’

২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরাইলি হামলায় ৭৪ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১ লাখ ৭৫ হাজারের বেশি আহত হয়েছেন। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, এ যুদ্ধে গাজার প্রায় ৯০ শতাংশ বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে।