ঢাকা ০৪:৩৪ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৭ জানুয়ারী ২০২৬, ২৪ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

দ্বৈত নাগরিকত্ব ইস্যুতে দ্বিমুখী আচরণ রিটার্নিং কর্মকর্তাদের, প্রশ্নবিদ্ধ নিরপেক্ষতা!

স্টাফ রিপোর্টার
  • আপডেট সময় ১২:১০:২৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ জানুয়ারী ২০২৬
  • / ২৪ বার পড়া হয়েছে

দ্বৈত নাগরিকত্ব ইস্যুতে দেশের বিভিন্ন আসনে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্তে ভয়াবহ অসঙ্গতি ও দ্বিচারিতার অভিযোগ উঠেছে। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী সবার জন্য আইন সমান হলেও, বাস্তবে ৬৪ জেলার রিটার্নিং কর্মকর্তারা মনোনয়ন বৈধ বা অবৈধ ঘোষণার ক্ষেত্রে একেক প্রার্থীর জন্য একেক ধরনের মানদণ্ড প্রয়োগ করছেন যার ফলে নির্বাচন প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দেশের একাধিক আসনে শুধু দ্বৈত নাগরিকত্ব বাতিলের আবেদনের কপি বা ইমেইল কনফার্মেশন জমা দিয়েই প্রার্থীরা বৈধ ঘোষিত হয়েছেন। অথচ অন্য কিছু আসনে একই ধরনের কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও প্রার্থীদের মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে।

যেসব আসনে আবেদনের কপি দিয়েই বৈধ ঘোষণা

দিনাজপুর-৫ আসনের বিএপি মনোনীত প্রার্থী ব্যারিস্টার এ কে এম কামরুজ্জামানের ইউকে হোম অফিসে দ্বৈত নাগরিকত্ব বাতিলের আবেদনের প্রমাণ দেখানোয় তার মনোনয়ন বৈধ ঘোষিত হয়েছে।

দ্বৈত নাগরিকত্ব বাতিলের আবেদনের কপি জমা দিয়েই সুনামগঞ্জ-৩ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ও বিএনপির সুনামগঞ্জ জেলা কমিটির সাবেক সহ-সভাপতি ব্যারিস্টার আনোয়ারুজ্জামানের মনোনয়ন বৈধ হয়েছে।

ঢাকা-১ আসনের জামায়াত মনোনীত প্রার্থী ব্যারিস্টার নজরুল ইসলাম একইভাবে আবেদনের প্রমাণ দিয়ে মনোনয়নপত্র উত্তোলন করায় মনোনয়নপত্র বৈধ দেখানো হয়েছে।

যশোর-২ আসনের জামায়াত মনোনীত ডা. মোসলেহ উদ্দিন ফরিদের মনোনয়নপত্র একইভাবে বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।

এদিকে ফরিদপুর-২ আসনের বিএনপির প্রার্থী সামা ওবায়েদেও শুধু ইমেইল কনফার্মেশনেই মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।

ফেনী-৩ আসনের বিএপি মনোনীত প্রার্থী আব্দুল আউয়াল মিন্টু মার্কিন দূতাবাসে পাঠানো ইমেইলের কপি দেখিয়ে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছে। এর ভিত্তিতেই তার মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে রিটার্নিং কর্মকর্তা ও ফেনী জেলা প্রশাসক মনিরা হক বলেন, ‘আবদুল আউয়াল মিন্টুর পূর্বে দ্বৈত নাগরিকত্ব ছিল। ২০২৫ সালের ৯ ডিসেম্বর তিনি দ্বৈত নাগরিকত্ব পরিত্যাগ করেছেন বলে হলফনামায় উল্লেখ করেছেন। প্রমাণ হিসেবে নাগরিকত্ব বাতিলের জন্য মার্কিন দূতাবাসে আবেদন করার তথ্য দাখিল করেছেন। সেক্ষেত্রে সংবিধানের সংশ্লিষ্ট ধারায় যেটি বলা আছে যে, দ্বৈত নাগরিকত্ব গ্রহণের ক্ষেত্রে বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ত্যাগ করলে এ অনুচ্ছেদের উদ্দেশ্য সাধনকল্পে তিনি বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করেছেন বলে গণ্য হবেন না। সেই হিসেবে তার মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।’

ইউকে বিএনপির সভাপতি এম এ মালেক (সিলেট-৩) অনলাইনের পরিবর্তে কাগজে দ্বৈত নাগরিকত্ব বাতিলের আবেদন করেছিলেন। নাগরিকত্ব বাতিলের চূড়ান্ত প্রমাণ দিতে না পারলেও তাকে বৈধ ঘোষণা করা হয়।

ইউকে বিএনপির সেক্রেটারি “দ্বৈত নাগরিকত্ব আছে কি নেই” এ প্রশ্নে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ কোনো স্পষ্ট উত্তর না দিয়েও বৈধ ঘোষিত হয়েছেন।

অন্যদিকে, কিছু আসনে দ্বৈত নাগরিকত্ব বাতিলের পূর্ণাঙ্গ সনদ ছাড়া কোনো কিছুই গ্রহণযোগ্য বলে দাবি করে মনোনয়নপত্র অবৈধ ঘোষিত হয়েছে।

গত ৪ জানুয়ারি, মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের শেষ দিনে জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী ব্যারিস্টার মাহবুবুল আলম সালেহির মনোনয়ন অবৈধ ঘোষণা করা হয়। অভিযোগ রয়েছে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে উপস্থিত হলেও সেগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে না দেখেই তার মনোনয়ন বাতিল করা হয় এবং আবেদনের কপিকে গ্রহণযোগ্য মনে করা হয়নি।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, যাচাইবাছাইয়ের সময় মাহবুবুল আলমের দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়টি উঠে আসে। তিনি যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্ব ত্যাগের জন্য আবেদন করলেও এসংক্রান্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কোনো প্রমাণপত্র দাখিল করেননি। সংবিধান ও নির্বাচন আইন অনুযায়ী দ্বৈত নাগরিকত্ব বহাল রেখে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ না থাকায় তাঁর মনোনয়ন স্থগিত করা হয়।

অথচ একইভাবে বৈধ ঘোষিত হয়েছে একাধিক মনোনয়নপত্র। এবিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সচেতন নাগরিক সমাজ। তাদের দাবি, একই আইনে এক নাগরিকের জন্য এক সিদ্ধান্ত, অন্য নাগরিকের জন্য আরেক সিদ্ধান্ত, এটি স্পষ্টতই বৈষম্যমূলক।

নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, এই দ্বিচারিতা চলতে থাকলে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়বে। একই সঙ্গে এটি আইনের শাসন ও সমান অধিকারের মৌলিক নীতির পরিপন্থী।

এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের কোন সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

সংবাদ ২৪৭/ এজে

নিউজটি শেয়ার করুন

দ্বৈত নাগরিকত্ব ইস্যুতে দ্বিমুখী আচরণ রিটার্নিং কর্মকর্তাদের, প্রশ্নবিদ্ধ নিরপেক্ষতা!

আপডেট সময় ১২:১০:২৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৬ জানুয়ারী ২০২৬

দ্বৈত নাগরিকত্ব ইস্যুতে দেশের বিভিন্ন আসনে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্তে ভয়াবহ অসঙ্গতি ও দ্বিচারিতার অভিযোগ উঠেছে। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী সবার জন্য আইন সমান হলেও, বাস্তবে ৬৪ জেলার রিটার্নিং কর্মকর্তারা মনোনয়ন বৈধ বা অবৈধ ঘোষণার ক্ষেত্রে একেক প্রার্থীর জন্য একেক ধরনের মানদণ্ড প্রয়োগ করছেন যার ফলে নির্বাচন প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দেশের একাধিক আসনে শুধু দ্বৈত নাগরিকত্ব বাতিলের আবেদনের কপি বা ইমেইল কনফার্মেশন জমা দিয়েই প্রার্থীরা বৈধ ঘোষিত হয়েছেন। অথচ অন্য কিছু আসনে একই ধরনের কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও প্রার্থীদের মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে।

যেসব আসনে আবেদনের কপি দিয়েই বৈধ ঘোষণা

দিনাজপুর-৫ আসনের বিএপি মনোনীত প্রার্থী ব্যারিস্টার এ কে এম কামরুজ্জামানের ইউকে হোম অফিসে দ্বৈত নাগরিকত্ব বাতিলের আবেদনের প্রমাণ দেখানোয় তার মনোনয়ন বৈধ ঘোষিত হয়েছে।

দ্বৈত নাগরিকত্ব বাতিলের আবেদনের কপি জমা দিয়েই সুনামগঞ্জ-৩ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ও বিএনপির সুনামগঞ্জ জেলা কমিটির সাবেক সহ-সভাপতি ব্যারিস্টার আনোয়ারুজ্জামানের মনোনয়ন বৈধ হয়েছে।

ঢাকা-১ আসনের জামায়াত মনোনীত প্রার্থী ব্যারিস্টার নজরুল ইসলাম একইভাবে আবেদনের প্রমাণ দিয়ে মনোনয়নপত্র উত্তোলন করায় মনোনয়নপত্র বৈধ দেখানো হয়েছে।

যশোর-২ আসনের জামায়াত মনোনীত ডা. মোসলেহ উদ্দিন ফরিদের মনোনয়নপত্র একইভাবে বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।

এদিকে ফরিদপুর-২ আসনের বিএনপির প্রার্থী সামা ওবায়েদেও শুধু ইমেইল কনফার্মেশনেই মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।

ফেনী-৩ আসনের বিএপি মনোনীত প্রার্থী আব্দুল আউয়াল মিন্টু মার্কিন দূতাবাসে পাঠানো ইমেইলের কপি দেখিয়ে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছে। এর ভিত্তিতেই তার মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে রিটার্নিং কর্মকর্তা ও ফেনী জেলা প্রশাসক মনিরা হক বলেন, ‘আবদুল আউয়াল মিন্টুর পূর্বে দ্বৈত নাগরিকত্ব ছিল। ২০২৫ সালের ৯ ডিসেম্বর তিনি দ্বৈত নাগরিকত্ব পরিত্যাগ করেছেন বলে হলফনামায় উল্লেখ করেছেন। প্রমাণ হিসেবে নাগরিকত্ব বাতিলের জন্য মার্কিন দূতাবাসে আবেদন করার তথ্য দাখিল করেছেন। সেক্ষেত্রে সংবিধানের সংশ্লিষ্ট ধারায় যেটি বলা আছে যে, দ্বৈত নাগরিকত্ব গ্রহণের ক্ষেত্রে বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ত্যাগ করলে এ অনুচ্ছেদের উদ্দেশ্য সাধনকল্পে তিনি বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করেছেন বলে গণ্য হবেন না। সেই হিসেবে তার মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।’

ইউকে বিএনপির সভাপতি এম এ মালেক (সিলেট-৩) অনলাইনের পরিবর্তে কাগজে দ্বৈত নাগরিকত্ব বাতিলের আবেদন করেছিলেন। নাগরিকত্ব বাতিলের চূড়ান্ত প্রমাণ দিতে না পারলেও তাকে বৈধ ঘোষণা করা হয়।

ইউকে বিএনপির সেক্রেটারি “দ্বৈত নাগরিকত্ব আছে কি নেই” এ প্রশ্নে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ কোনো স্পষ্ট উত্তর না দিয়েও বৈধ ঘোষিত হয়েছেন।

অন্যদিকে, কিছু আসনে দ্বৈত নাগরিকত্ব বাতিলের পূর্ণাঙ্গ সনদ ছাড়া কোনো কিছুই গ্রহণযোগ্য বলে দাবি করে মনোনয়নপত্র অবৈধ ঘোষিত হয়েছে।

গত ৪ জানুয়ারি, মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের শেষ দিনে জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী ব্যারিস্টার মাহবুবুল আলম সালেহির মনোনয়ন অবৈধ ঘোষণা করা হয়। অভিযোগ রয়েছে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে উপস্থিত হলেও সেগুলো পূর্ণাঙ্গভাবে না দেখেই তার মনোনয়ন বাতিল করা হয় এবং আবেদনের কপিকে গ্রহণযোগ্য মনে করা হয়নি।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, যাচাইবাছাইয়ের সময় মাহবুবুল আলমের দ্বৈত নাগরিকত্বের বিষয়টি উঠে আসে। তিনি যুক্তরাজ্যের নাগরিকত্ব ত্যাগের জন্য আবেদন করলেও এসংক্রান্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের কোনো প্রমাণপত্র দাখিল করেননি। সংবিধান ও নির্বাচন আইন অনুযায়ী দ্বৈত নাগরিকত্ব বহাল রেখে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ না থাকায় তাঁর মনোনয়ন স্থগিত করা হয়।

অথচ একইভাবে বৈধ ঘোষিত হয়েছে একাধিক মনোনয়নপত্র। এবিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সচেতন নাগরিক সমাজ। তাদের দাবি, একই আইনে এক নাগরিকের জন্য এক সিদ্ধান্ত, অন্য নাগরিকের জন্য আরেক সিদ্ধান্ত, এটি স্পষ্টতই বৈষম্যমূলক।

নির্বাচন বিশ্লেষকদের মতে, এই দ্বিচারিতা চলতে থাকলে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়বে। একই সঙ্গে এটি আইনের শাসন ও সমান অধিকারের মৌলিক নীতির পরিপন্থী।

এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের কোন সন্তোষজনক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

সংবাদ ২৪৭/ এজে