নিপাহ ভাইরাসের লক্ষণ ও প্রতিরোধে করণীয়
- আপডেট সময় ০৩:১৩:৩২ অপরাহ্ন, রবিবার, ১১ জানুয়ারী ২০২৬
- / ২৮ বার পড়া হয়েছে
খেজুরের কাঁচা রসকে নিপাহ ভাইরাসের প্রধান উৎস মনে করা হলেও কেবল এতেই সীমাবদ্ধ নয় এই ঝুঁকি। বাদুড়ের লালা বা প্রস্রাবে দূষিত যেকোনো আধা-খাওয়ার ফলের মাধ্যমেও এই প্রাণঘাতী ভাইরাস ছড়াতে পারে। এমনকি সাম্প্রতিক গবেষণায় আক্রান্ত মায়ের দুধের মাধ্যমে শিশুর শরীরেও নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
তাই নিপাহ ভাইরাস প্রতিরোধে খেজুরের কাঁচা রস এবং বাদুড়ের মুখ দেয়া ফল খাওয়া থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এক সাক্ষাৎকারে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিন-এর ভাইরোলজি বিভাগের প্রধান ডা. আরিফা আকরাম বর্না এসব তথ্য জানান।
সংক্রমণের উৎস ও লক্ষণ
ডা. আরিফা আকরাম বলেন, নিপাহ একটি প্রাণিবাহিত ভাইরাস। বাংলাদেশ ও ভারতে মূলত ফলভোজী বাদুড়ের প্রস্রাব বা লালার মাধ্যমে এটি ছড়ায়। আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এলে অন্যরাও এতে সংক্রমিত হতে পারেন এবং এভাবে রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। সাধারণত প্রতি বছর ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত দেশে এই ভাইরাসের প্রকোপ দেখা যায়।
নিপাহ ভাইরাসের লক্ষণ ও উপসর্গ
ডা. আরিফা আকরাম রোগের লক্ষণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানিয়ে বলেন, নিপাহ ভাইরাস মানুষের শরীরে প্রবেশের ৪ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে সাধারণত রোগের লক্ষণ প্রকাশ পায়। তবে ক্ষেত্রবিশেষে লক্ষণ প্রকাশ ছাড়াও ভাইরাসটি ৪৫ দিন পর্যন্ত সুপ্ত অবস্থায় থাকতে পারে। সংক্রমণের প্রাথমিক পর্যায়ে রোগীর তীব্র জ্বর, মাথাব্যথা, পেশিতে ব্যথা, বমি ভাব, গলা ব্যথা কিংবা ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো উপসর্গ দেখা দেয়।
তবে রোগটি দ্রুত জটিল আকার ধারণ করতে পারে। এক্ষেত্রে রোগীর মাথা ঘোরা, অস্বাভাবিক তৃষ্ণা বোধ করা, জ্ঞান হারিয়ে ফেলা এমনকি অসংলগ্ন আচরণের মতো স্নায়ুবিক লক্ষণ দেখা দিতে পারে। এছাড়া মস্তিষ্কের তীব্র সংক্রমণ এবং শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত মারাত্মক সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে বেশিভাগ রোগী মৃত্যুমুখে পতিত হন। এমনকি যারা সুস্থ হয়ে ওঠেন, তাদের মধ্যেও কেউ কেউ পরবর্তী সময়ে মস্তিষ্কের সংক্রমণে ভুগতে পারেন।
এমনকি কোনো সুস্থ মানুষ নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হলে একেবারে উপসর্গবিহীন থেকে তার মারাত্মক মস্তিষ্কের প্রদাহজনিত সমস্যা দেখা দিতে পারে।
মৃত্যুর হার ও পরিসংখ্যান
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, নিপাহ ভাইরাসে মৃত্যুর হার ৪০ থেকে ৭৫ শতাংশ।
নিপাহ ভাইরাসের ইতিহাস তুলে ধরে তিনি বলেন, ১৯৯৮-৯৯ সালে মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে শূকরচাষিদের মধ্যে প্রথম নিপাহ ভাইরাস শনাক্ত হয়। ওই সময় ২৮৩ জন আক্রান্তের মধ্যে ১০৯ জনই মারা যান।
বাংলাদেশে ২০০১ সালে মেহেরপুরে প্রথম নিপাহ ভাইরাসের রোগী শনাক্ত হয় এবং ২০০৪ সালে নমুনা পরীক্ষার মাধ্যমে তা নিশ্চিত করা হয়। এরপর থেকে প্রায় প্রতি বছরই দেশে নিপাহ ভাইরাসের রোগী পাওয়া যাচ্ছে।
এ পর্যন্ত (২০০১-২০২৫) বাংলাদেশের ৩২টি জেলায় নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত মোট ৩৪৩ জন রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ২৪৫ জন মারা গেছেন। অর্থাৎ বাংলাদেশে এই রোগে মৃত্যুর গড় হার ৭১ শতাংশ। মেহেরপুর, ফরিদপুর, রাজশাহী, নওগাঁ, রংপুর, পাবনা ও নাটোরে আক্রান্তের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। সবচেয়ে বেশি রোগী পাওয়া গেছে ফরিদপুর জেলায়, দ্বিতীয় অবস্থানে রাজবাড়ী।
প্রতিবেশী দেশ ভারতের পরিস্থিতি সম্পর্কে ডা. আরিফা আকরাম জানান, সেখানে এখন পর্যন্ত বড় ধরনের তিনটি প্রাদুর্ভাব (আউটব্রেক) দেখা দিয়েছে; যার মধ্যে রয়েছে ২০০১ সালে শিলিগুড়ি, ২০০৭ সালে নদীয়া এবং ২০১৮ সালে কেরালা। এসব ঘটনায় দেখা গেছে, ৬৬ জন আক্রান্তের মধ্যে ৪৫ জনই মারা গেছেন, যা মোট আক্রান্তের প্রায় ৭৫ শতাংশ। বিশেষ করে শিলিগুড়ির ঘটনায় দেখা গিয়েছিল, এই ভাইরাস একজনের শরীর থেকে অন্যজনের শরীরে খুব দ্রুত ছড়াতে পারে। সেখানে আক্রান্তদের বড় একটি অংশ অর্থাৎ প্রায় ৭৫ শতাংশই ছিলেন হাসপাতালের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী, চিকিৎসাধীন অন্য রোগী এবং তাদের সাথে আসা স্বজনরা।
উদ্বেগের বিষয় হলো, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে ভারতে যারা এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছিলেন, তাদের সবারই মৃত্যু হয়েছে।
পরীক্ষা ও শনাক্তকরণ
ডা. আরিফা বলেন, নিপাহ ভাইরাস শনাক্ত করতে আক্রান্ত ব্যক্তির প্রস্রাব, রক্ত, সেরেব্রো স্পাইনাল ফ্লুইড (RCR, ELISA, Culture) পরীক্ষা করা হয়। এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ জীবাণু হওয়ায় সাধারণত বায়োসেফটি লেভেল-৪ ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করা হয়। তবে সংগ্রহের সময় নমুনাগুলো যদি নিষ্ক্রিয় করা হয়, সেক্ষেত্রে এটি বায়োসেফটি লেভেল-২ পরীক্ষাগারে সাবধানতার সাথে পরীক্ষা করা যেতে পারে।
প্রতিরোধে করণীয়
এখন পর্যন্ত নিপাহ ভাইরাসের কোনো প্রতিষেধক বা ভ্যাকসিন আবিষ্কৃত হয়নি। তাই সচেতনতাই একমাত্র পথ। ডা. আরিফা আকরাম বেশ কিছু জরুরি পরামর্শ দিয়েছেন:
- কাঁচা রস বর্জন : খেজুরের কাঁচা বা অপরিষ্কার রস কোনোভাবেই খাওয়া যাবে না। কারণ এ রসের মাধ্যমে বাদুড়ের লালা বা মল থেকে ভাইরাস ছড়াতে পারে। তবে রস থেকে তৈরি গুড় নিরাপদ।
- আধা-খাওয়া ফল : গাছ থেকে পড়া বা বাদুড়ের মুখ দেওয়া কোনো ফল (যেমন: বরই, পেয়ারা) খাওয়া যাবে না।
- বুকের দুধ খাওয়ানো : কোনো মা নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হলে তার শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানো বন্ধ রাখতে হবে।
- সরকারি পদক্ষেপ : প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন স্থানে উৎসব করে খেজুরের রস খাওয়ার আয়োজন করা হয়। এটা সরকারিভাবে নিষেধ করতে হবে এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন।
নিপাহ ভাইরাস প্রতিরোধে সরকার ও সাধারণ মানুষের দায়িত্বের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, গণমাধ্যম, পোস্টার ও লিফলেটের মাধ্যমে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে।
ডা. আরিফা আকরাম বলেন, হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে নিপাহ শনাক্তকরণ ও চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকতে হবে। স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিয়মিত স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ চালাতে হবে। রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে দ্রুত আইসোলেশন ও কন্টাক্ট ট্রেসিং নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি আরো বলেন, অসুস্থ ব্যক্তি বা প্রাণীর সংস্পর্শ এড়িয়ে চলতে হবে। সন্দেহজনক লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। সেবা বা জরুরি প্রয়োজনে আক্রান্ত রোগীর কাছে যেতে হলে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে, মাস্ক ব্যবহার করতে হবে। একই সাথে নিয়মিত হাত ধোয়া, মাস্ক ব্যবহার ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। সন্দেহভাজন রোগীর সংস্পর্শে এলে নিজেকে আইসোলেশনে রাখার পরামর্শও দেন তিনি।
ডা. আরিফা আকরাম জানান, এখন পর্যন্ত নিপাহ ভাইরাসের কোনো কার্যকর প্রতিষেধক আবিষ্কৃত না হওয়ায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সচেতনতা বৃদ্ধিমূলক কর্মসূচি জোরদার করাই এই ভাইরাস প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিলে নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ অনেকাংশেই কমানো সম্ভব।
ডা. আরিফা আকরাম জোর দিয়ে বলেন, নিপাহ ভাইরাস অত্যন্ত প্রাণঘাতী হলেও সঠিক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা ও জনসচেতনতা তৈরির মাধ্যমে এর সংক্রমণ ও মৃত্যু অনেকাংশেই কমিয়ে আনা সম্ভব।
সূত্র : বাসস

























