গাজার শাসনভার স্বাধীন ফিলিস্তিনি সংস্থার হাতে দিতে সম্মত হামাস
- আপডেট সময় ০৮:১৫:৩৩ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারী ২০২৬
- / ৩০ বার পড়া হয়েছে
ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হরকাতুল মুকাওয়ামিতিল ইসলামিয়া বা হামাস জানিয়েছে, গাজা উপত্যকার সব সরকারি দফতর ও প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীন ফিলিস্তিনি প্রযুক্তিবিদদের সমন্বয়ে গঠিত একটি সংস্থার কাছে শাসনভার হস্তান্তরের প্রস্তুতি নিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে মিডল ইস্ট মনিটর।
রোববার এক টেলিভিশন বিবৃতিতে হামাসের মুখপাত্র হাজেম কাসেম বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গাজায় শান্তি পরিষদ গঠনের ঘোষণা দেয়ার পর এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণ ছাড়ার সিদ্ধান্ত ‘স্পষ্ট ও চূড়ান্ত’। তিনি আরো জানান, নতুন কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম সফল করতে মসৃণ হস্তান্তর নিশ্চিত করার জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এ পদক্ষেপকে তিনি ফিলিস্তিনিদের বৃহত্তর স্বার্থের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন। কাসেম বলেন, এটি সেই পরিকল্পনার অংশ, যার মাধ্যমে গাজায় যুদ্ধ বন্ধের চুক্তি শারম আল-শেখে স্বাক্ষরিত হয়েছিল। কাসেম জানান, এর আগে ফিলিস্তিনি দলগুলো গাজা উপত্যকার প্রশাসন স্বাধীনব্যক্তিত্ব ও স্থানীয় বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গঠিত একটি অস্থায়ী ফিলিস্তিনি কমিটির হাতে তুলে দেয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছিল। গত ২৪ অক্টোবর কায়রোতে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এ সিদ্ধান্ত হয়। দলগুলো আরো আহ্বান জানিয়েছে, ফিলিস্তিনি মুক্তি সংগঠনকে পুনরুজ্জীবিত করে একক বৈধ প্রতিনিধি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে এবং আগামী পর্যায়ে এর নেতৃত্ব নিশ্চিত করতে একটি ঐক্যবদ্ধ জাতীয় কৌশল প্রণয়ন করা প্রয়োজন।
গাজায় শীতের তীব্রতায় প্রাণ গেল ২১ বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনির, অধিকাংশই শিশু
গাজা উপত্যকার বাস্তুচ্যুত শিবিরে তীব্র শীতের কারণে অন্তত ২১ ফিলিস্তিনি মারা গেছেন। নিহতদের মধ্যে অধিকাংশই শিশু। ইসরাইলের যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ মৃত্যু ঘটেছে বলে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। গাজার সরকারি গণমাধ্যম কার্যালয় জানায়, অস্থায়ী আশ্রয়ে থাকা পরিবারগুলো শীতের তীব্রতায় সুরক্ষা পাচ্ছে না। এতে মানবিক বিপর্যয় আরো গভীর হচ্ছে। খবর মিডল ইস্ট মনিটরের।
মৃতদের মধ্যে ১৮ জন শিশু। কার্যালয় বলেছে, বিশেষ করে নবজাতক ও অল্প বয়সী শিশুদের জন্য তাঁবুতে থাকা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ সেখানে নেই গরম রাখার ব্যবস্থা, নেই পর্যাপ্ত শীতবস্ত্র বা প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম। গত শনিবার মাত্র এক সপ্তাহ বয়সী শিশু মাহমুদ আল-আকরা শীতজনিত হাইপোথার্মিয়ায় মারা যায়। তার বাবা আদনান আল-আকরা জানান, শিশুটি প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় কাঁপতে কাঁপতে শেষ পর্যন্ত আল-আকসা শহীদ হাসপাতালেই মারা যায়। গাজার গণমাধ্যম কার্যালয় বলেছে, এসব মৃত্যু সরাসরি ঘটছে ঘরবাড়ি ও অবকাঠামো ধ্বংস, ইসরাইলি অবরোধ এবং ১৫ লাখেরও বেশি মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়ার কারণে। তারা সতর্ক করেছে, চলমান শৈত্যপ্রবাহে আরো মৃত্যু হতে পারে, বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ ও দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্তদের মধ্যে।
ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া এ শীত মৌসুমে এখন পর্যন্ত ঠাণ্ডাজনিত কারণে আরো চারজন মারা গেছেন। শীতবস্ত্র, কম্বল, গরম রাখার সরঞ্জাম ও নিরাপদ আশ্রয়ের মারাত্মক সঙ্কট রয়েছে। ফিলিস্তিনি আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, শুক্রবার থেকে নতুন নিম্নচাপ গাজায় প্রভাব ফেলছে। এতে প্রবল বৃষ্টি, ঝোড়ো হাওয়া ও তাপমাত্রা হ্রাস পেয়েছে। কিছু এলাকায় বাতাসের গতি ঘণ্টায় ৬০ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছেছে। গাজার সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে, ঝড়ের কারণে হাজারো বাস্তুচ্যুতদের তাঁবু ক্ষতিগ্রস্ত বা উড়ে গেছে। এ ছাড়া ইসরাইলি হামলায় দুর্বল হয়ে পড়া বহু ভবন ভেঙে পড়েছে, এতে আরো হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। গাজার গণমাধ্যম কার্যালয় ইসরাইলকে এসব মৃত্যুর জন্য দায়ী করেছে। তারা বলছে, যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হওয়ার পরও ইসরাইল পর্যাপ্ত আশ্রয়সামগ্রী, গরম রাখার সরঞ্জাম ও পুনর্গঠন সামগ্রী প্রবেশ করতে দিচ্ছে না।
সরকারি তথ্যানুযায়ী, যুদ্ধবিরতির পরও ইসরাইল বারবার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে। তাঁবু, অস্থায়ী ঘরবাড়ি ও পানি, পয়ঃনিষ্কাশন ও বিদ্যুৎ নেটওয়ার্ক মেরামতের জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী প্রবেশে বাধা দিয়েছে। গাজার গণমাধ্যম কার্যালয় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, জাতিসঙ্ঘ ও মানবিক সংস্থাগুলোকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে আহ্বান জানিয়েছে, যাতে নিরাপদ আশ্রয়, গরম রাখার সরঞ্জাম ও মানবিক সহায়তা পৌঁছে দিয়ে আরো প্রাণহানি ঠেকানো যায়। অক্টোবর ২০২৩ থেকে ইসরাইলি সেনাদের হামলায় এখন পর্যন্ত ৭১ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশই নারী ও শিশু। আহত হয়েছেন এক লাখ ৭১ হাজারেরও বেশি। ভয়াবহ এ হামলায় গাজা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। গত ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি শুরু হলেও ইসরাইলি সেনারা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এতে এখন পর্যন্ত ৪৪২ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন এক হাজার ২৩৬ জন।
ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের হামলা বেড়েছে ২৫ শতাংশ
অবৈধ ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা ২০২৫ সালে পশ্চিমতীরে ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়েছে বলে জানিয়েছে আনাদোলু এজেন্সি। হারেৎজ পত্রিকা সেনাবাহিনীর তথ্য উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর থেকে পশ্চিমতীরে বসতি স্থাপনকারীদের হামলা ধারাবাহিকভাবে ও দ্রুত বেড়েছে।
তথ্যানুযায়ী যুদ্ধ শুরুর পর থেকে বসতি স্থাপনকারীরা ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে এক হাজার ৭২০টি সহিংস হামলা চালিয়েছে। ২০২৫ সালে একাই বসতি স্থাপনকারীরা ৮৪৫টি হামলা চালিয়েছে, যেগুলো জাতীয়তাবাদী উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল। এতে চারজন নিহত হয়েছেন এবং প্রায় ২০০ জন আহত হয়েছেন। ২০২৪ সালে এ ধরনের হামলার সংখ্যা ছিল ৬৭৫, যেখানে ছয়জন নিহত ও ১৪৯ জন আহত হয়েছিলেন; অর্থাৎ ২০২৫ সালে হামলা বেড়েছে প্রায় ২৫ শতাংশ। বর্তমানে পশ্চিমতীরে শত শত অবৈধ বসতিতে প্রায় সাত লাখ ৫০ হাজার ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারী বাস করছে। এর মধ্যে প্রায় দুই লাখ ৫০ হাজার পূর্ব জেরুসালেমে। ফিলিস্তিনিরা বলছে, বসতি স্থাপনকারীরা প্রায় প্রতিদিনই বাসিন্দা ও তাদের সম্পত্তির ওপর হামলা চালায়, যাতে জোরপূর্বক তাদের স্থানচ্যুত করা যায়। ফিলিস্তিনি তথ্যানুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরাইলি সেনা ও বসতি স্থাপনকারীরা পশ্চিমতীরে, যার মধ্যে পূর্ব জেরুসালেমও রয়েছে, অন্তত এক হাজার ১০৪ জনকে হত্যা করেছে, প্রায় ১১ হাজারকে আহত করেছে এবং প্রায় ২১ হাজারকে বন্দী করেছে। গত জুলাইয়ে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) এক ঐতিহাসিক মতামতে জানিয়েছিল, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইলের দখল অবৈধ এবং পশ্চিমতীর ও পূর্ব জেরুসালেমের সব বসতি খালি করার আহ্বান জানিয়েছিল।
গাজায় শান্তি পরিষদ গঠনের ঘোষণা ট্রাম্পের
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, গাজায় প্রস্তাবিত ‘বোর্ড অব পিস’ গঠনের কাজ চলছে। এতে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর নেতারা অন্তর্ভুক্ত থাকবেন। রোববার এয়ারফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘বোর্ড অব পিস গঠিত হচ্ছে। মূলত বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর নেতারাই এতে থাকবেন।’ খবর মিডল ইস্ট মনিটরের।
ট্রাম্প আরো বলেন, এ উদ্যোগে অংশ নিতে আন্তর্জাতিক আগ্রহ প্রবল। তার ভাষায়, ‘সবাই এতে থাকতে চায়’। প্রত্যাশা করা হচ্ছে, ট্রাম্পের নেতৃত্বে প্রায় ১৫ জন বিশ্বনেতা এই বোর্ডে থাকবেন। তারা একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি প্রযুক্তিবিদ সরকার গঠনের তদারকি করবেন এবং গাজার পুনর্গঠন কার্যক্রম পরিচালনা করবেন। বোর্ডে যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি, সৌদি আরব, কাতার, মিসর ও তুরস্ক যোগ দিতে পারে।
এ ছাড়া জাতিসঙ্ঘের সাবেক মধ্যপ্রাচ্য দূত নিকোলাই ম্লাদেনভ মাঠপর্যায়ে বোর্ডের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করতে পারেন। যদিও এ সপ্তাহে বোর্ড প্রকাশের পরিকল্পনার কথা শোনা গেছে, ট্রাম্প কোনো সময়সীমা দেননি। তার প্রশাসন ইতোমধ্যে একাধিকবার ঘোষণা পিছিয়েছে। গত মাসে বোর্ড অব পিস প্রকাশের প্রাথমিক পরিকল্পনা থাকলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি।



















