সরকারের নেই কোনো মাথাব্যথা
দেশের নিরাপত্তার জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে ইউপিডিএফ
- আপডেট সময় ০৮:৫৮:১৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারী ২০২৬
- / ৩০ বার পড়া হয়েছে
দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য ক্রমেই চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)। পার্বত্য চট্টগ্রামে পূর্ণ আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার বা স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৯৮ সালের ২৬ ডিসেম্বর জন্ম নেয়া সংগঠনটি একের পর রাষ্ট্রবিরোধী কাজ করে চলেছে। বিগত কয়েক দশক ধরে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার ইন্ধনে সংগঠনটি নামে-বেনামে নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ড করে আসছে। এর মাধ্যমে দেশের নিরাপত্তার জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে তারা। তবে এ নিয়ে সরকারের কোনো মাথাব্যথা নেই বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। পার্বত্য চট্টগ্রামে সুদূরপ্রসারি লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে ইউপিডিএফ। তারা ধারাবাহিকভাবে পাহাড়িদের মগজধোলাইয়ের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে তাদের প্রভাব বিস্তার করছে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও সক্রিয় রয়েছে এর নেতারা। এমন উদ্বেগজনক তথ্যসংবলিত গোয়েন্দা সংস্থা ও নিরাপত্তা বাহিনীর একটি বিশেষ প্রতিবেদনে নয়া দিগন্তের হাতে এসেছে।
স্কুল-কলেজে জাতীয় পতাকার পরিবর্তে ইউপিডিএফের পতাকা: পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত কয়েকটি এলাকায় স্কুল-কলেজে এখন আর জাতীয় পতাকা দেখা যায় না। প্রতিদিন সকালে শিক্ষার্থীদের সামনে যে লাল-সবুজ পতাকা তোলা হওয়ার কথা, তার জায়গা দখল করে নিয়েছে ইউপিডিএফ (মূল) দলের পতাকা। দেয়ালজুড়ে দলটির গ্রাফিতি, পোস্টার আর স্লোগান দেখা যাচ্ছে। রাষ্ট্রীয় দিবসগুলোতে জাতীয় সঙ্গীত ও পতাকা উত্তোলনও আর হয় না।
কয়েক মাস আগে রাঙ্গামাটি জেলার কাউখালী উপজেলার পানছড়ি এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর বিশেষ অভিযানে এই চিত্র দেখা যায়। পানছড়ি মডেল উচ্চবিদ্যালয়ের আঙিনায় জাতীয় পতাকার দণ্ড থাকলেও পতাকা তোলা হয় না বছরের পর বছর। স্কুলের দেয়ালে আঁকা ইউপিডিএফের পতাকা, দেয়ালে ঝোলানো সংগঠনের ব্যানার-পোস্টার এবং ‘স্বায়ত্তশাসন’-কেন্দ্রিক বিভিন্ন স্লোগান স্কুলটির স্বাভাবিক পরিবেশকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
শুধু পানছড়িই নয়, রাঙ্গামাটির নানিয়ারচর, কাউখালী ও বাঘাইছড়ি এবং খাগড়াছড়ির লক্ষ্মীছড়ি ও সিন্দুকছড়ি এলাকার বেশ কয়েকটি স্কুল-কলেজেও একই দৃশ্য পাওয়া গেছে বলে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনায় ইউপিডিএফপন্থী শিক্ষক ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের সম্পৃক্ততার কথাও উঠে এসেছে।
গোয়েন্দা সংস্থার এই প্রতিবেদন হাতে আসার পর সরেজমিন যাচাই করেছে নয়া দিগন্ত। রাঙ্গামাটির কাউখালী উপজেলার পানছড়ি উচ্চবিদ্যালয়, রাঙ্গামাটির নানিয়ারচর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ অন্তত ৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ইউপিডিএফের পতাকা ও গ্রাফিতির চিহৃ দেখা গেছে।
গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য বলছে, প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই ইউপিডিএফ (মূল) দল পার্বত্যাঞ্চলে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে আন্দোলন করে আসছে। সেই লক্ষ্যে শিক্ষার্থীদের প্রভাবিত করতে তারা দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অবস্থান নিয়েছে। ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারিতে নানিয়ারচরে পিসিপির (পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ) উদ্যোগে আয়োজিত এক সমাবেশ থেকে মাতৃভাষা দিবস বর্জনের ডাক দেয়া হয়েছিল। ওই সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে পরদিন এলাকায় থাকা সব উপজাতি শিক্ষার্থী ক্লাস বর্জন করে। ২০১১ সালেও একইভাবে ২১ ফেব্রুয়ারিতে শহীদ মিনারে ফুল না দেয়ার ঘোষণা দেয় ইউপিডিএফ।
নিরাপত্তা বাহিনীর একজন কর্মকর্তা নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘রাষ্ট্রীয় দিবস বর্জনের বিষয়টি এখন পরিকল্পিতভাবে স্কুল-কলেজের ভেতর ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। এর মাধ্যমে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের জাতীয় পরিচয়বোধ থেকে দূরে সরিয়ে নেয়া হচ্ছে।’
গোয়েন্দা প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে, ইউপিডিএফ (মূল) দল তাদের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে শিক্ষা ব্যবস্থায় আধিপত্য কায়েম করছে। প্রাথমিক থেকে কলেজপর্যায়ের শিক্ষার্থীদের ‘জাতীয়তাবিরোধী’ চিন্তার দিকে ঠেলে দেয়ার চেষ্টা করছে দলটি। কোথাও কোথাও শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের দিয়ে রাষ্ট্রবিরোধী দেয়াললিখন, পোস্টার লাগানো, এমনকি প্রতিবাদ কর্মসূচিতেও অংশ নিতে বাধ্য করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
পানছড়ি বাজার এলাকার বাসিন্দা সুদীপন চাকমা বলেন, স্কুলের ভেতরে যে পরিবেশ তৈরি হয়েছে, সেটা আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যতের ওপর প্রভাব ফেলবে। রাজনৈতিক টানাপড়েন স্কুলে ঢুকে পড়াটা আমাদের কারও জন্যই ভালো নয়। জাতীয় দিবস পালন হোক-এটা আমরা চাই। শিশুরা তো দেশ সম্পর্কে জানুক।
বিদেশ থেকে অনলাইনে উসকানি : ইউপিডিএফ (মূল) দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতা প্রসীত বিকাশ খীসা, সচিব চাকমা, অর্কিড চাকমা, উজ্জ্বল কুমার চাকমা ও রবি শংকর চাকমাসহ শীর্ষ পর্যায়ের বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে পার্বত্যাঞ্চলে সশস্ত্র তৎপরতার পাশাপাশি নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। তারা রাজধানী ও দেশের বাইরে অবস্থান করলেও, বিদেশে থাকা অনলাইন অ্যাকটিভিস্টদের মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে উসকানিমূলক বক্তব্য, জাতিগত উত্তেজনা বাড়ানোর প্রচেষ্টা এবং অসত্য ঘটনাকে ইস্যু বানিয়ে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ।
সংস্থাগুলোর দাবি, পার্বত্য চট্টগ্রামে সংঘটিত যেকোনো সংবেদনশীল ঘটনার পর ইউপিডিএফ (মূল) দল তা ‘অপ্রমাণিত অভিযোগ’ হিসেবে সামনে এনে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা বাড়ানোর চেষ্টা করে। এতে প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হয় এবং এলাকার সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে।
দলটির নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় বাংলাদেশের কোনো জাতীয় দিবস পালন করা হয় না। ২০১০ ও ২০১১ সালের মাতৃভাষা দিবসকে কেন্দ্র করে দলটির নির্দেশে নানিয়ারচরের সব স্কুল ক্লাস বর্জন করে। ২০১১ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণ থেকেও বিরত থাকার নির্দেশ দেয় ইউপিডিএফ (মূল)।
ঐকমত্য কমিশনের সাথে বৈঠক করে ‘বৈধতা’ পাওয়ার চেষ্টা : ইউপিডিএফ বর্তমান সরকারের নীতিনির্ধারণী মহলের দৃষ্টি আকর্ষণে নেমেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। গত ১০ মে ঢাকায় জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সাথে ইউপিডিএফের (মূল) প্রতিনিধি দলের বৈঠক সেই আলোচনাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা বলছেন- এটি মূলত পাহাড়কে পরিকল্পিতভাবে অশান্ত করে ঢাকামুখী লবিংয়ের একটি ধাপ। যার মাধ্যমে দলটি রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারকদের সামনে নিজেদের দাবিকে বৈধতা দিতে চায়।
জানা গেছে, বৈঠকে ইউপিডিএফের এক মুখ্য সংগঠক পার্বত্য অঞ্চলে অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যক্রম নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন এবং তিনটি জেলার জন্য পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের দাবি তোলেন। ভূমি অধিকার, সেনা উপস্থিতি এবং প্রশাসনিক রদবদলের মতো সংবেদনশীল ইস্যু উপস্থাপনের ধরন থেকে স্পষ্ট-দলটি রাজধানীমুখী রাজনৈতিক পথে নিজেদের প্রভাব বাড়াতে চাইছে। যে সংগঠন পার্বত্য চুক্তির বিরোধিতাকে ভিত্তি করে আত্মপ্রকাশ করেছিল, এখন তারা জাতীয় পর্যায়ের আলোচনায় প্রবেশ করতে চাইছে- যা অনেকের কাছে ‘নতুন কৌশল’ বলে প্রতীয়মান।
নিরাপত্তা সংস্থার কর্মকর্তারা বলছেন, মাঠে দাঙ্গা, অবরোধ ও প্রচারণার মাধ্যমে উত্তেজনা বাড়ানোর পর হঠাৎ ঢাকায় গিয়ে কমিশনের সাথে বৈঠক করা ইউপিডিএফের দ্বৈত চরিত্রকেই সামনে আনে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি চাপ সৃষ্টি ও সমর্থন আদায়ের সমন্বিত প্রচেষ্টা। এক দিকে পার্বত্য অঞ্চলে উত্তেজনা সৃষ্টি করে সরকারকে বিব্রত করা হচ্ছে, অন্য দিকে রাজধানীতে এসে নিজেদের ‘জনপ্রতিনিধিত্ব’ দাবি করা হচ্ছে- এটি আসলে রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা পেতে একটি পরোক্ষ প্রচেষ্টা।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি আরো জটিল হওয়ার আগে ইউপিডিএফের (মূল) রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, সংগঠনের আর্থিক উৎস ও মাঠপর্যায়ের সহিংসতার চক্র নিয়ে গভীর তদন্ত প্রয়োজন। দলটি ক্রমেই দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠছে।



















