ছিনতাই করতে গিয়ে ধরা পড়লো ঢাবি ছাত্রদল নেতা
- আপডেট সময় ১২:৪৮:০১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী ২০২৬
- / ২২ বার পড়া হয়েছে
ছুরি দেখিয়ে স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ -এর ৪ শিক্ষার্থীর থেকে ৩০ হাজার টাকা ছিনতাইয়ের অভিযোগ উঠেছে। এসময় এক শিক্ষার্থীকে ছুরি দিয়ে রক্তাক্ত ও অন্যদেরকে গাছের ডাল দিয়ে পেটানো হয়। এ ঘটনায় এক ছাত্রদল নেতার সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে এবং তিনি টাকা নেওয়ার অভিযোগ স্বীকারও করেছেন।
রোববার (২৫ জানুয়ারি) রাত ৮ টার দিকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের রমনা পার্ক সংলগ্ন এলাকায় এ ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী চার শিক্ষার্থী। অন্যদিকে ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত ছাত্রদল নেতা আরিফ ফয়সাল। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে কমিউনিকেশন ডিজঅর্ডার বিভাগের শিক্ষার্থী এবং তিনি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুর-৩ আসনের ছাত্রদলের নির্বাচন সমন্বয় কমিটির সমন্বয়ক।
ভুক্তভোগী চার শিক্ষার্থী হলেন- সৌরভ হাসান, মিফতাহুল শাহরিয়ার মিয়াজ, দিয়ান পারভেজ ও মাহি ইসলাম। তারা সবাই স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ -এর আইন বিভাগের শিক্ষার্থী।
ঘটনার বর্ণনা করতে গিয়ে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী মিফতাহুল শাহরিয়ার মিয়াজ বলেন, “আমরা ক্যাম্পাস থেকে উদ্যানের দিকে থেকে হাঁটতে হাঁটতে রমনার দিকে এসেছি। (উদ্যানের) পিছনের রমনা গেট দিয়ে আমরা হাসাহাসি করে যাচ্ছিলাম। এই মুহূর্তে আমাদেরকে ডাক দেয়।”
তিনি বলেন, “ওরা ডাক দিয়ে বলে ‘তোমরা কোন ইউনিভার্সিটিতে পড়ো?’। তখন আমরা বলি আমরা স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে আইন বিভাগে পড়াশোনা করি। এরই মাঝে ওরা বলে ‘বসো’। বসে বিভিন্ন ধরনের কথাবার্তা বলতে বলতে এসে আমাকে সেই হিট করা শুরু করে দেয়।”
আরেক ভূক্তভোগী শিক্ষার্থী সৌরভ হাসান জানান, ছিনতাইকারীরা তাদের মানিব্যাগ, ফোন, বিকাশ ও নগদ একাউন্ট – এমনকি ফোনের গ্যালারী পর্যন্ত চেক করে।
এসময় দিয়ান পারভেজ নামে ওপর এক শিক্ষার্থী বলেন, “এমনকি আমাদের (ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী) ব্ল্যাকমেইলও করেছে।” তিনি জানান, ছিনাতাইকারীরা তাদের নেশাদ্রব্য দিয়ে ফাঁসিয়ে ‘প্রলয় গ্যাং’ বলে পুলিশে হস্তান্তর করার হুমকি দেন এবং বাবাকে দিয়ে ছাড়িয়ে নিয়ে যেতে হবে বলে ভয়ভীতি দেখায়।
এসময় তারা বাকবিতন্ডায় জড়ালে ছিনতাইকারীরা মিফতাহুল শাহরিয়ার মিয়াজকে ছুরি দিয়ে আহত করে বলে জানান তিনি। এই আঘাতের ফলেই চোখ ও কপালের মাঝ বরাবর আঘাত পান তিনি এবং রক্তক্ষরণ হতে থাকে। এছাড়াও বাকি তিন জন শিক্ষার্থীকে গাছের ডাল ভেঙে পায়ে মারা হয়েছে বলে জানান তারা।
তারা জানান, ছিনতাইকারীরা প্রথমে দুইজন ছিলেন এবং পরবর্তীতে ৭ জন পর্যন্ত ছিলেন। এদের মধ্যে ৩ জন্ তাদেরকে নির্যাতন করেন।
তাদের কাছ থেকে কত টাকা ছিনতাই করা হয়েছে এমন প্রশ্নের উত্তরে মিফতাহুল শাহরিয়ার মিয়াজ বলেন, ১৫ হাজার টাকা ‘নগদ’ একাউন্ট থেকে এবং তাদের কাছে ক্যাশ ছিল ১৫ হাজার টাকা অর্থাৎ ৩০ হাজার টাকা ৪ জনের কাছ থেকে ছিনতাই করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
ভুক্তভোগীরা পরবর্তীতে তাদের ফোন থেকে নগদ একাউন্ট থেকে জোরপূর্বক ক্যাশ আউট করা এজেন্ট নম্বরে কল দিলে তারা জানতে পারেন নম্বরটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সূর্য সেন হলের শাকিলের দোকানের এজেন্ট নম্বর।
এ সূত্র ধরে ভুক্তভোগীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কবি জসিমউদদীন হল ছাত্রদলের সদস্য সালমান জিসান, জিয়া হল ছাত্রদলের সদস্য আব্দুর রহমান বাঁধন এবং ছাত্রদল কর্মী ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুর-৩ আসনের ছাত্রদলের নির্বাচন সমন্বয় কমিটির সমন্বয়ক মোঃ আস সামি সরকার নিশ্চয়কে সাথে নিয়ে সূর্য সেন হলের শাকিলের দোকানে আসেন। এর আগেই তারা দোকানর স্টাফ রবিউলকে ফোন দিয়ে গালাগালি ও হুমকিধামকি দেন।
রবিউল বলেন, “প্রথমে ২-৩ জন মোবাইলে গালাগালি করেছে। পরে ২ জন দোকানে এসে চিল্লাচিল্লি শুরু করে। এরপর তারা বলে, ‘দোকান বন্ধ করে দেবো’। হুমকির মুখে ভয় পেয়ে রবিউল বিকাশে ৫০০ টাকা ভুল নম্বরে সেন্ড করেন বলেও জানা গেছে।
পরবর্তীতে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের অভিযোগের ভিত্তিতে শাকিলের দোকানের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীদের নগদ একাউন্টে থেকে আসা ১৫ হাজার টাকা সংগ্রহ করেন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দিনাজপুর-৩ আসনের ছাত্রদলের নির্বাচন সমন্বয় কমিটির সমন্বয়ক ও ছাত্রদলের সক্রিয় কর্মী আরিফ ফয়সাল।
তিনি ২০২৫ সালের ডাকসু নির্বাচনের ছাত্রদলের প্যানেলের জিএস প্রার্থী ও কবি জসিমউদদীন হল ছাত্রদলের আহ্বায়ক শেখ তানাভীর বারী হামিম, সূর্য সেন হল ছাত্রদলের আহ্বায়ক মোনোয়ার হোসেন প্রান্ত এবং ঢাবি ছাত্রদলের ক্রীড়া সম্পাদক সাইফ উল্লাহসহ একাধিক নেতার সাথে ছাত্রদলের প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করতে দেখা গেছে।
দোকানদার শাকিলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী তার নগদ এজেন্ট একাউন্টে যে ১৫ হাজার টাকা যে নম্বরটি থেকে এসেছিল সেটি স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের শিক্ষার্থী মাহি ইসলামের নগদ একাউন্ট নম্বর বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।
দোকানের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায় রাত ৮ টা ৬ মিনিটে দোকানে আসেন অভিযুক্ত আরিফ ফয়সাল। এসে তিনি শুরুতেই জিজ্ঞাসা করেন নগদে ক্যাশআউট করা যাবে কিনা? পরবর্তীতে তিনি দোকানের স্টাফ রবিউলের থেকে নগদ একাউন্টে নম্বরটি সংগ্রহ করেন এবং মোবাইল ফোনে অন্যের কাছে তা প্রেরণ করেন। তারপর টাকা আসা সম্পন্ন হলে তিনি ১৫ হাজার টাকা সংগ্রহ করে রাত ৮ টা ৮ মিনিটে দোকান ত্যাগ করেন। এসময় তিনি ফোন কলে তার কথাবার্তা থেকে স্পষ্ট হয় যে তিনি তার পরিচিত ও সমবয়সী ব্যক্তিদের সাথে কথা বলছেন।
অভিযুক্ত আরিফ ফয়সালের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমাকে আমার এক বন্ধু ফোন দিয়েছিল। সে আমার কাছে একটা নম্বর চাইছে ক্যাশআউটের জন্য। পরবর্তী বিষয়টা আমার জানা ছিল না আসলে কী হয়েছে। ঘটনা আমি জানার পরে ভুক্তভোগী যে আছে তাদের সাথে আমি দেখা করেছি এবং বিষয়টা তার সাথে ক্লিয়ার করেছি। যার সাথে ঘটনা ঘটেছে সে কথা বলে বিষয়টা সল্ভ আউট করেছি।”
কারা টাকা ছিনতাই করেছিল এবং কতজন ছিল এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “নাম বলতে; ওরা ছিল কয়েকজন, বাকবিতন্ডায় হয়েছে। ওরাও (ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী) ইলিগ্যাল কাজ করছিল। এ অবস্থায় ওইটা নিয়ে তাদের মধ্যে বাকবিতন্ডা লাগছিল। এটা ছিল সিচুয়েশনে, আমি এটা বোঝার পর তাদেরকে বলেছি এবং তাদের কাছে পার্সোনালি স্যরি বলেছ এবং আমি আমার বন্ধু বান্ধবকেও বলেছি যেন এ ধরনের কাজ না হয়৷
তার বন্ধু কারা এটা আবারও জানতে চাইলে তিনি বলেন, “তারা কিছু ঢাকা ভার্সিটির আছে আর কিছু পরিচিত আরকি।”
ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা জানান, ছিনতাইকারীদের কারো পরিচয় তারা জানেন না। তবে দেখলে চিনতে পারবেন।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহস জানান, তিনি এ বিষয়ে অবগত নন। তিনি বলেন, “আরিফ ফয়সাল কে, সেটা দেখার বিষয় না। ছিনতাইকারী যে দলেরই হোক, তাদেরকে ধরে, বেঁধে পুলিশের ধরিয়ে দিতে হবে।”
ঢাবি প্রক্টর অধ্যাপক সাইফুদ্দিন আহমদ জানান, এ ঘটনায় কেউ প্রক্টর অফিসে অভিযোগ জানায়নি। অভিযোগ জানালে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আজ সন্ধ্যায় আবারও ছিনতাইয়ের ঘটনার সাথে কারা জড়িত জানতে আরিফ সোহেলের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জড়িতদের নাম না বলে কল কেটে দেয়।



















