ছাত্রসংসদে শিবিরের ধারাবাহিক জয়: জাতীয় রাজনীতিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত
- আপডেট সময় ১২:২১:২৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারী ২০২৬
- / ২৬ বার পড়া হয়েছে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়- দেশের পাঁচটি বড় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবির-সমর্থিত প্যানেলের ধারাবাহিক জয় বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতিতে শুধু নয়, মূলধারার রাজনীতিতেও একটি স্পষ্ট পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা দ্বিদলীয় বা ‘বাইনারি’ রাজনৈতিক কাঠামোর প্রতি ক্লান্তি যেন ক্যাম্পাস থেকেই প্রকাশ পাচ্ছে।
এই জয় কি কেবল সাংগঠনিক শক্তির ফল, নাকি শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক বোধ ও পছন্দে একটি মৌলিক রূপান্তরের প্রতিফলন- এই প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে।
নির্বাচনের ফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এসব জয় বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। প্রায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়েই শিবির-সমর্থিত প্রার্থীরা পরিষ্কার ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন। দীর্ঘ বিরতির পর অনুষ্ঠিত ছাত্র সংসদ নির্বাচনে শিক্ষার্থীদের ভোটের রায় স্পষ্ট করে দিয়েছে একটি ম্যান্ডেটের ভাষা। বিশ্লেষকদের মতে, এখানে কেবল ‘বিকল্পের অভাব’ নয়; বরং সচেতন রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রতিফলন ঘটেছে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বয়ান ও সংগঠনের ভূমিকা
এই সাফল্যের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের রাজনৈতিক বয়ান। আন্দোলনের সময় ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’সহ নানা ব্যানারে শিবিরের প্রত্যক্ষ নাম সামনে না থাকলেও সংগঠনের কৌশলগত ও সাংগঠনিক ভূমিকা ছিল দৃশ্যমান। মাঠপর্যায়ের সমন্বয়, পরিকল্পনা ও শৃঙ্খলার ক্ষেত্রে শিবির যে কার্যকর ভূমিকা রেখেছিল, তা এখন বিভিন্ন মহলে স্বীকৃত।
অনেক বিশ্লেষকের মতে, শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ইসলামিস্ট রাজনৈতিক শক্তিগুলোর ভূমিকার ধারণা তরুণ ভোটারদের মধ্যে সমর্থন তৈরি করেছে। পরিচয় আড়ালে রেখে সংগঠিত থাকার কৌশল শিবিরকে শিক্ষার্থীদের কাছে কার্যকর ও বাস্তববাদী শক্তি হিসেবে তুলে ধরেছে।
দীর্ঘ শূন্যতায় প্রস্তুত একমাত্র সংগঠন
গত প্রায় দুই দশকে ক্যাম্পাস রাজনীতির বাস্তবতায় আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ছাত্রলীগের একচ্ছত্র আধিপত্য, হামলা-মামলা ও ভয়ভীতির রাজনীতিতে ছাত্রদলসহ অধিকাংশ সংগঠন কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। এই দীর্ঘ শূন্যতায় একমাত্র ছাত্রশিবিরই আত্মগোপনে থেকেও সংগঠিত থেকেছে।
শিবিরের ‘ওয়েলফেয়ার নেটওয়ার্ক’- মেসে সিটের ব্যবস্থা, ভর্তি ও টিউশনে সহায়তা, চাকরির যোগাযোগ, পাঠচক্র- এইসব কার্যক্রম রাজনৈতিক পরিবর্তনের মুহূর্তে তাদেরকে সবচেয়ে প্রস্তুত সংগঠন হিসেবে সামনে নিয়ে আসে।
বিশ্লেষকদের দৃষ্টিভঙ্গি ও সতর্কবার্তা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন এক গণমাধ্যম বিশ্লেষণে বলেন, গত এক বছরে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের নেতৃত্বের যে ন্যারেটিভ দাঁড় করানো হয়েছে, তা ভোটারদের গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা, দাবি, স্লোগান ও আন্দোলনের কাঠামোর সাথে শিবিরের সম্পৃক্ততার দাবি শিক্ষার্থীদের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে।
ডাকসুর সাবেক জিএস মুশতাক হোসেন মনে করেন, স্বাধীনতার পর থেকে চলে আসা রাজনৈতিক ধারার প্রতি বর্তমান প্রজন্ম আগ্রহ হারিয়েছে। ধর্মভিত্তিক দলগুলোর বৈষম্যবিরোধী প্রতিশ্রুতি তরুণদের ভাবিয়েছে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, শিবির যদি ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের পথে এগোয়, তাহলে তাদের বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ গড়ে উঠতে সময় লাগবে না। ‘লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক’ রাজনীতির সাথে তাদের আদর্শ কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ- এই প্রশ্নও তিনি তোলেন।
ওয়েলফেয়ার রাজনীতি বনাম আধিপত্যের সংস্কৃতি
ছাত্র সংসদ নির্বাচনে শিবিরের পক্ষে বড় ভূমিকা রেখেছে তাদের ওয়েলফেয়ার রাজনীতি ও প্রতিশ্রুতির দ্রুত বাস্তবায়ন। দীর্ঘদিন ক্যাম্পাস রাজনীতি মানেই ছিল গেস্টরুম, গণরুম, চাঁদাবাজি ও দখলদারি। ক্যান্টিনে ‘ফাও খাওয়া’ ছিল পরিচিত চিত্র।
ডাকসুতে শিবির-সমর্থিত প্যানেলের জয়ের পর হলে খাবারের মান, বিশুদ্ধ পানি, ওয়াশরুম, ক্যান্টিন সংস্কার এবং প্রশাসনিক সেবায় দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে- যা আগের কোনো ডাকসুতে দেখা যায়নি বলে শিক্ষার্থীদের বক্তব্য।
পাঁচ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইশতেহার বিশ্লেষণে দেখা যায়, আবাসন সঙ্কট, স্বাস্থ্যসম্মত খাবার, নিরাপদ ও নারীবান্ধব ক্যাম্পাস, ডিজিটাল প্রশাসন, গবেষণা ও ক্যারিয়ার উন্নয়ন- এই বিষয়গুলোই অগ্রাধিকার পেয়েছে। ধর্মীয় পরিচয় সামনে না এনে সংস্কার ও সেবার ভাষায় ইশতেহার সাজানো হয়েছে।
সীমাবদ্ধতা ও ভবিষ্যৎ প্রভাব
তবে সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসনের সহযোগিতা না পাওয়া, ফান্ড ও কাঠামোগত ক্ষমতার অভাবে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে বাধার কথা বলছেন নির্বাচিত প্রতিনিধিরা।
তারপরও এই ছাত্র সংসদ নির্বাচনগুলো শুধু ক্যাম্পাস রাজনীতিতে নয়, দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ঢেউ তুলেছে। তরুণ প্রজন্ম এখন আর কেবল ঐতিহ্যগত দলীয় পরিচয়ে ভোট দিচ্ছে না; তারা আচরণ, সততা, দক্ষতা ও বাস্তব কাজের হিসাব মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এক অধ্যাপক বলেন, মূলধারার ছাত্রসংগঠনগুলোর আচরণ ও সৌজন্যবোধের ঘাটতি থেকেই নতুন এই স্রোত তৈরি হয়েছে। তার মতে, পাঁচ আগস্টের পর রাজনীতিতে গণতান্ত্রিক চর্চার যে সূচনা হয়েছে, তা আশাব্যঞ্জক।
সব মিলিয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠছে- বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতিতে একটি গুণগত পরিবর্তন ঘটেছে। এই পরিবর্তন ক্যাম্পাসের গণ্ডি পেরিয়ে জাতীয় রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। ভবিষ্যৎই বলে দেবে সেই প্রভাব কতটা গভীর হবে, তবে পরিবর্তনের ইঙ্গিত ইতোমধ্যেই সুস্পষ্ট।


















