আরাকান আর্মির হাতে আটক ‘৪২০ জেলে’, তাঁদের উদ্ধারের আকুতি
- আপডেট সময় ০১:২৯:০২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারী ২০২৬
- / ৪ বার পড়া হয়েছে
সাগরে মাছ ধরার সময় মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির হাতে আটক জেলেদের উদ্ধারে সরকারকে তৎপর হতে অনুরোধ করেছে নিখোঁজদের পরিবার। তারা বলছে, গত পাঁচ মাসে টেকনাফ ও সেন্ট মার্টিনের কমপক্ষে ৪২০ জন জেলেকে বাংলাদেশের জলসীমা থেকে তুলে নিয়ে গেছে আরাকান আর্মি। তাঁদের ছাড়িয়ে আনতে সরকার কোনো ধরনের তৎপরতা চালাচ্ছে না।
বৃহস্পতিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমেদ চৌধুরী মিলনায়তনে ‘দ্বীপের নারীরা: সেন্ট মার্টিন দ্বীপের জন্য একটি পরিবেশগত নারীবাদের দৃষ্টিভঙ্গি’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে সরকারকে এ অনুরোধ জানান তারা। এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে সেন্টার ফর ক্রিটিক্যাল ডিসকোর্স নামের একটি সংগঠন।
অনুষ্ঠানে অংশ নিতে সেন্ট মার্টিন থেকে ঢাকায় আসেন হুমায়রা বেগম ও রাবেয়া বেগম। গত সেপ্টেম্বরে তাঁদের স্বামীদের মাছ ধরার সময় অপহরণ করে নিয়ে যায় আরাকান আর্মি। প্রায় পাঁচ মাস ধরে তাঁদের কোনো খবর পাননি তাঁরা।
স্বামীর অনুপস্থিতিতে সংসারে অভাবের বর্ণনা দিতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন হুমায়রা বেগম। তিনি বলেন, ‘স্বামীকে অপহরণের পর গত পাঁচ মাসে সে কি বেঁচে আছে না মারা গেছে, সেটা জানি না। এদিকে দুই সন্তান নিয়ে আধপেটা খেয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে।’
সাগরে মাছ ধরতে যাওয়ার আগে দাদন করে যেতে হয় জানিয়ে হুমায়রা বলেন, ‘এ রকম অভাবের মধ্যে দাদনের ঋণ শোধের চাপও আছে। আমার স্বামীকে উদ্ধারে জোর তৎপরতা চালাতে সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি।’
রাবেয়া বেগমও স্বামী নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে সংসার চালাতে কষ্টের কথা জানান। তিনি বলেন, ‘নিজের দেশের সীমানার মধ্যে মাছ ধরাও এখন নিরাপদ না। আরাকান আর্মি ধরে নিয়ে যায়। সরকার নিরাপত্তা দিতে পারে না। অবিলম্বে আমার স্বামীকে উদ্ধারে সরকারকে ব্যবস্থা নিতে হবে।’
এ সময় নিখোঁজ দুই জেলের মা এবং রাবেয়া ও হুমায়রা বেগমের শাশুড়ি মদিনা বেগম বলেন, কৈশোরে স্বামীকে হারিয়ে ছেলে দুটোকে অনেক কষ্টে বড় করেছেন। আজকে তারা আরাকান আর্মির হাতে বন্দী। তিনি বলেন, ‘আমাদের দুঃখ কোনো কালে ঘুচল না। সরকারের কাছে আকুল আবেদন জানাই, মরার আগে যেন দুই সন্তানের চেহারা দেখে যেতে পারি, সে ব্যবস্থা করেন।’
সেন্ট মার্টিনের বাসিন্দা মো. যোবায়ের বলেন, ‘নামে মাত্র দুই মাস পর্যটন হলেও আমাদের বাপ–দাদাদের মূল পেশা মৎস্য শিকার। আমাদের মূল পেশার ওপর আঘাত আসছে। মাছ ধরতে গেলে আরাকান আর্মি আমাদের জলসীমা থেকে আমাদের জেলেদের অপহরণ করে নিয়ে যাচ্ছে। সরকার নিরাপত্তা দিতে পারছে না।’
আরাকান আর্মির হাতে চার শতাধিক জেলে অপহরণের পর কারও কোনো সক্রিয়তা না থাকার সমালোচনা করেছেন ছাত্র ইউনিয়নের একাংশের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি মেঘমল্লার বসু। তিনি বলেন, ‘আমরা ফেলানী হত্যা হোক বা সীমান্তে প্রত্যেকটা হত্যাকাণ্ড নিয়ে সব সময় অবস্থান নিয়েছি। বিএসএফের সীমান্ত হত্যাকে খর্ব করার জন্য বলছি না, কিন্তু একবার চিন্তা করে দেখেন তো এ মুহূর্তে বিএসএফের হাতে যদি বাংলাদেশের সাড়ে ৪০০ জেলে থাকত, ডাকসুর যারা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি রয়েছেন, তাঁরা এটা নিয়ে ‘গোলামি না আজাদি’ স্লোগানে শত শত মিছিল করে ফেলতেন।’
আরাকান আর্মির হাতে জেলেদের আক্রান্ত হওয়াকে গোলামি আখ্যায়িত করে মেঘমল্লার বলেন, ‘আমার কাছে মনে হচ্ছে, একটা প্যারামিলিটারি বাহিনী, যেটা কি না আমাদের সরকারের সঙ্গে নানা ধরনের নেগোসিয়শনের কারণে এমপাওয়ার্ড, সে যখন আমাদের ৪৫০ জন মানুষকে আটক করে রাখে এবং সরকার সেটার কোনো সুরাহা করতে পারে না, তার মানে সে সরকার সম্পূর্ণরূপে গোলাম।’ এটা নিয়ে জনসচেতনতা গড়ে তোলার আহ্বান জানান মেঘমল্লার বসু।
অনুষ্ঠানে আলোচনায় অংশ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক সাজ্জাদ সিদ্দিকী বলেন, যুদ্ধের অনুপস্থিতি মানে শান্তি নয়। কাঠামোগত যে বৈষম্য সেটা সম্ভাব্য সংঘর্ষের প্রেক্ষাপট তৈরি করে। সমুদ্র বিজয় হলেও সমুদ্রে বাংলাদেশের জেলেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়নি।
সমতল, পাহাড় ও দ্বীপে—সবখানে একই পরিস্থিতি বিদ্যমান উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে আমাদের সামষ্টিকভাবে প্রশ্ন তুলতে হবে।
শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিপার্টমেন্ট অব একোয়াকালচারের সহকারী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, সেন্ট মার্টিনের বাসিন্দাদের দুঃখ–দুর্দশা শুনলে হৃদয় ভারী হয়ে আসে। নিখোঁজের পরিবার শুধু জানতে চাচ্ছে, তাদের স্বজনেরা বেঁচে আছে কি না। রাষ্ট্র সেটাও পূরণ করতে পারছে না।
বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের গবেষক সামিরা আহমদ বলেন, পর্যটকের দৃষ্টিভঙ্গিতে সেন্ট মার্টিনকে দেখলে এখানকার বাসিন্দারা গৌণ হয়ে পড়েন। সেন্ট মার্টিনকে বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে ভূরাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে হবে।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সেন্টার ফর ক্রিটিক্যাল স্টাডিজের প্রদায়ক শৈলি আখন্দ।


















