নোবিপ্রবিতে কোটি টাকার প্রকল্পে ছাত্রদল নেতাদের হস্তক্ষেপের অভিযোগ
- আপডেট সময় ০২:৫০:২৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
- / ২৫ বার পড়া হয়েছে
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (নোবিপ্রবি) রাস্তা সংস্কার ও পরিবহন শেডের প্রায় ৩ কোটি ৬৫ লাখ টাকার প্রকল্পে নিয়োজিত নির্বাহী প্রকৌশলীকে হুমকি, হেনস্তা ও মানসিক চাপে রেখে বিল আটকানোর চেষ্টা এবং ম্যানেজারকে জিম্মি করে চাঁদা দাবির অভিযোগ উঠেছে।
অভিযুক্তরা হলেন- শাখা ছাত্রদলের সভাপতি মো. জাহিদ হাসান, সেক্রেটারি হাসিবুল হাসান ও সহ-সভাপতি আমিনুল ইসলাম।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি নোবিপ্রবিতে ২ কোটি ২৩ লাখ ৬৮ হাজার টাকা ব্যয়ে আরসিসি রাস্তার ঢালাই এবং ১ কোটি ৪১ লাখ ৬১ হাজার ২ টাকা ব্যয়ে পরিবহন শেড নির্মাণ প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হয়। রাস্তার কাজটি করে কেএমসি ব্রিকস্ এবং পরিবহন শেড নির্মাণ করে মেসার্স মোজাম্মেল হক নামে দুই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। উভয় প্রকল্পের ম্যানেজার ছিলেন স্থানীয় ঠিকাদার মো. ইমদাদুল করিম রুমেল। প্রকল্প দুটির দায়িত্বে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা, উন্নয়ন ও ওয়ার্কস দপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী (সিভিল) মো. সৈয়দ আহমদ।
নির্মাণ কাজ শেষে বিল উত্থাপনকে কেন্দ্র করে নোবিপ্রবি ছাত্রদলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী মো. সৈয়দ আহমদের ওপর চাপ ও হুমকি দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
ভুক্তভোগী প্রকৌশলী জানান, গত ৮ থেকে ১০ দিন আগে ছাত্রদলের জাহিদ ও হাসিব অফিসে এসে তাকে বিল ফাইনাল না করার নির্দেশ দেন। পরে বিষয়টি ট্রেজারারকে জানালে নিয়ম অনুযায়ী তিনি কাজ চালিয়ে যেতে বলেন।
তিনি জানান, এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৮ জানুয়ারি বুধবার সকাল ১১টার দিকে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক হাসিব ফোন করে বিল উত্থাপন নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং বিষয়টি ‘দেখে নেওয়ার’ হুমকি দেন। কিছুক্ষণ পর ছাত্রদলের সভাপতি জাহিদ ও সাধারণ সম্পাদক হাসিব একটি গ্রুপ কলে যুক্ত করে। সেখানে অকথ্য ভাষায় গালাগালি, তুই-তোকারি এবং অশালীন আচরণের শিকার হতে হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। এ সময় জাহিদ তাকে ১২ তারিখের পর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করতে না দেওয়া এবং ঢুকলে ঠেং ভেঙ্গে দেওয়ার হুমকি দেন বলে জানান।
এ বিষয়ে তিনি বলেন, “বিষয়টি আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ, পরিকল্পনা, উন্নয়ন ও ওয়ার্কস দপ্তরের প্রধান, জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ও কর্মকর্তা নেতৃবৃন্দ এবং প্রশাসনকে অবহিত করেছি।”
এদিকে এর আগেও উক্ত দুই প্রকল্পের ম্যানেজার মো. ইমদাদুল করিম রুমেলকে জিম্মি করে চাঁদা দাবির অভিযোগ রয়েছে। রোমেলের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৫ ডিসেম্বর প্রশাসনিক ভবন থেকে বিল সংক্রান্ত কাজ শেষ করে বের হলে ছাত্রদলের একজন তাকে ডেকে সংস্কারকাজ চলমান ক্যাফেটেরিয়ার ভেতরে নিয়ে যায় এবং তার রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তোলে। একপর্যায়ে একজন তার কলার চেপে ধরে হুমকি দেন এবং পাঁচ লাখ টাকা দাবি করেন। পরে সেখানে ছাত্রদল নেতা আমিনুল এসে টাকা দিলে মীমাংসা করার প্রস্তাব দেন।
ভুক্তভোগী জানান, পরবর্তীতে তাকে প্রশান্তি পার্কের চা দোকানে নিয়ে গিয়ে দুই লাখ টাকা না দিলে প্রক্টর অফিসে এবং পুলিশে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। সেখানেও টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে কয়েকজন ছাত্রদল কর্মী দিয়ে তাকে প্রক্টর অফিসে সোপর্দ করা হয়।
প্রক্টর তার পরিচয় যাচাই করে নিশ্চিত হন বিশ্ববিদ্যালয়ে তার কোটি টাকার প্রকল্প আছে। পরিচয় যাচাই শেষে প্রক্টর তাকে বসিয়ে রেখে অন্য কাজে বের হন। এ সময় আমিনুল আবার এসে সভাপতির সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছে জানিয়ে এক লাখ টাকা দাবি করেন। কিন্তু তখনও টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানান ভুক্তভোগী ঠিকাদার। শেষে প্রক্টর অফিস আসলে তার কাছে মুচলেকা দিয়ে ছাড়া পান তিনি। এর মধ্যে একজন নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে তার ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ায় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এ বিষয়ে রুমেল বলেন, “জামানাতসহ আমার প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ টাকা এখনো বিল বাকি আছে। আমি তাদের চাওয়া মত টাকা না দেওয়ায় এখন শুনতেছি এই বিল আটকানোর জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের লোকদেরও তারা হুমকি দিয়ে যাচ্ছে।”
এ বিষয়ে অভিযুক্ত ছাত্রদলের সহ-সভাপতি আমিনুল ইসলাম বলেন, আমি রুমেলের থেকে কোনো প্রকার চাঁদা দাবি করিনি। ছাত্রলীগের দোসর হওয়ার কারণে তাকে প্রক্টর অফিসে নিয়ে গিয়েছিলাম। কেননা তার বিরুদ্ধে ছাত্রলীগের আমলে অনেক শিক্ষার্থীকে হেনস্তা করার অভিযোগ রয়েছে। কত শিক্ষার্থী তার কারণে ঝামেলায় পড়েছে তার শেষ নেই। আমি ভিডিও স্টেটমেন্টে সব বলব। কিন্তু চাঁদার অভিযোগটি সম্পূর্ণ মিথ্যা।
অভিযোগ অস্বীকার করে ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক হাসিবুল হাসান বলেন, আমি এবং নোবিপ্রবি ছাত্রদল এই রকম কোন কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত নয়। আমার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট। সিভিল ইঞ্জিনিয়ার যার কথা বলা হচ্ছে তাকে আমি চিনিও না সেই জায়গায় এসব কাজ করার কোন প্রশ্নই উঠে না। এছাড়া গ্রুপ কলে হুমকি দেয়ার কথাটাও মিথ্যা। নোবিপ্রবি ছাত্রদলের মূল কাজ হচ্ছে শিক্ষার্থীদের সমস্যা নিয়ে কাজ করা।
নোবিপ্রবি ছাত্রদলের সভাপতি মো. জাহিদ হাসান বলেন, যে অভিযোগগুলো করা হয়েছে সেটা সম্পূর্ণ মিথ্যা। রাস্তার নির্মাণ কাজ এবং পরিবহন শেডের নির্মাণ এবং বিল উত্থাপনের কাজ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের, নোবিপ্রবি ছাত্রদলের না। এছাড়া যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কথা বলা হচ্ছে সেটার কাউকেই আমি চিনি না সেখানে চাঁদা দাবি করার কোন কথা আসবে কেন। নোবিপ্রবি ছাত্রদলের কোন সদস্য এর সঙ্গে জড়িত নয়।
স্থানীয় ঠিকাদারকে প্রক্টর অফিসে সোপর্দের বিষয়ে প্রক্টর এ এফ এম আরিফুর রহমান বলেন, রুমেল নামে এক ঠিকাদারকে কয়েকজন মিলে আমার অফিসে নিয়ে আসে। ছাত্রলীগের সঙ্গে তার সম্পর্ক আছে বলে অভিযোগ করে। পরে ঠিকাদারের সাথে কথা বলে নিরাপত্তার স্বার্থে বিশ্ববিদ্যালয়ে তার যাতায়াত সীমিত করে দিতে বলি এবং তার থেকে একটা মুচলেকা নেওয়া হয়।
এ বিষয়ে নোবিপ্রবি কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হানিফ (মুরাদ) বলেন, ইঞ্জিনিয়ারের সঙ্গে খারাপ আচরণ কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য না। ইঞ্জিনিয়ার বিষয়টি জানালে আমি তাকে নিয়ম অনুযায়ী কাজ করতে বলেছি। পরে গত ২৮ তারিখে সে আমাকে ঘটনা সম্পর্কে মৌখিকভাবে অবহিত করে। তাকে আমি বিষয়টি ভিসি স্যারকে জানাতে বলেছি। প্রয়োজনে তার সঙ্গে কারা এটি করেছে সেটা লিখিত আকারে দিতে বলেছি।
তিনি বলেন, আমাকে ছাত্রদলের সভাপতি জাহিদ ফোন দিয়ে বলেছে যে ঠিকাদার আওয়ামী লীগের দোসর ছিলো, তার বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের নির্যাতনের অভিযোগ আছে। আমি বলেছি, যদি অভিযোগ থাকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে লিখিতভাবে জানালে তখন সেটা ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কাজের সাথে এটার কোন সম্পর্ক নাই। কাজ যদি শেষ হয় তার বকেয়া বিল বা জামানত সে আইন অনুযায়ী পেয়ে যাবে।
এ বিষয়ে নোবিপ্রবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইসমাইল বলেন, আমরা কারো বিল আটকে রাখি না। নিয়ম অনুযায়ী কাজ সম্পন্ন হলে ঠিকাদার তার বিল পেয়ে যাবে। এটা কেউ চাইলেও আটকিয়ে রাখতে পারবে না। প্রকৌশলীকে হুমকির বিষয়ে উপাচার্য বলেন, এ বিষয়ে আমি এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে অবশ্যই তদন্ত সাপেক্ষে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে৷









