ঢাকা ০৮:৫৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ১০ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

বাসস্থান-ভোটাধিকার হারিয়ে অসহায় আসামের মুসলমানরা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  • আপডেট সময় ০৪:২০:৩৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
  • / ৩৫ বার পড়া হয়েছে

ভারতের আসাম রাজ্যের ধুবড়ি জেলার চিরাকুঠা গ্রামের যে স্থানে একসময় ছিল নিজের ঘর, সেখানেই এখন ত্রিপল টাঙিয়ে বসবাস করতে হচ্ছে বোদিয়াত জামালকে। গত সাত মাস ধরে এভাবেই জীবনযাপন করতে হচ্ছে তাকে। গত বছরের জুলাই মাসে একটি বিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজের জন্য আসামের ১৪০০ বাঙালি বংশোদ্ভূত মুসলিম পরিবারের ঘরবাড়ি ভেঙে দেয় আসাম সরকার।

সরকারের এমন পদক্ষেপের পর এই গ্রাম থেকে অনেকেই সরে গেলেও ৪২ বছর বয়সি রাজমিস্ত্রি ও তার পরিবার সেখানেই থেকে যায়।

শুধু তা-ই নয়, গত সপ্তাহে নির্বাচন কমিশন থেকে যে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা করা হয়, সেখানে জামাল ও তার পরিবারের নাম একটি বিশেষ সংশোধনীর পর তা বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। জামাল বলেন, গত ২৪ বছর ধরে এই রাজ্যের ভোটার তিনি। এখানেই ভোট দিচ্ছেন; কিন্তু এবার ভোটার তালিকা থেকেও নাম বাদ দেওয়া হয়েছে তার। তিনি আরো বলেন, ভোটার পরিচয়পত্র ছাড়া কোথাও কাজ করা বা ভ্রমণে যাওয়া যাবে না, যা তাকে গভীর উদ্বেগের মধ্যে ফেলেছে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম স্ক্রল ইনকে জামাল বলেন, তিনি কাজ করেন ডিব্রুগড় জেলায়। কিন্তু গত মাসে বাড়িতে ফিরে আসার পর জানতে পারেন এবারের ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন থেকে তার ও তার পরিবারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। বর্তমান সময়ে ভোটার কার্ড ছাড়া রাজ্যের বাইরে কাজ করা অন্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তাই ভোটার কার্ড না পাওয়া পর্যন্ত তিনি বাইরে কাজে যেতে পারবেন না। কারণ, গত কয়েক মাস ধরে আসামের অসমীয়া জাতিগোষ্ঠীর লোকজন বাঙালি বংশোদ্ভূত মুসলিম কর্মীদের তাদের দেশ ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়ার হুমকি দিয়ে আসছে। জামাল বলেন, এই সরকার একদিকে তাদের ঘরবাড়ি ভেঙে দিয়ে করেছে বাস্তুহারা, অন্যদিকে ভোটার আইডি কার্ডও কেড়ে নিয়ে করেছে পরিচয়হীন।

জামাল একা নন, তার মতো বহু বাঙালি মুসলমানের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে আসাম সরকার। শুধু চিরাকুঠা গ্রামেই চূড়ান্ত ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে ১২১ বাঙালি মুসলমানের নাম।

স্ক্রলের অনুসন্ধানে জানা গেছে, ধুবড়ি ও উরিয়াম ঘাটের ৫ হাজার ৭০০ মুসলমানকে ঘরবাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে; একই সঙ্গে তাদের ভোটার তালিকা থেকেও বাদ দেওয়া হয়েছে।

ধুবড়ি জেলায় গত বছরের জুলাই মাসে চারটি ভোটকেন্দ্র থেকে প্রায় ৭৫৬ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। এদিকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া প্রসঙ্গে বিলাসিপাড়া আসনের সেকেন্ড বুথ লেভেল অফিসার স্ক্রলকে জানিয়েছেন, উচ্ছেদের কারণে ৭০০ জনেরও বেশি ভোটারের স্থায়ী বাসস্থান পরিবর্তন হওয়ায় তাদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। উরিয়াম ঘাটে উচ্ছেদ হওয়া ১৯ গ্রামের পাঁচটি ভোটকেন্দ্র থেকে ৪ হাজার ৯৪৫ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।

আর নির্বাচনি এলাকার একজন সরকারি কর্মকর্তা, যিনি ফার্স্ট বুথ লেভেল অফিসার হিসেবে কর্মরত, তিনি জানিয়েছেন, তার ওয়ার্ডে উচ্ছেদের কারণে ২০০ জনেরও বেশি বাঙালি মুসলিমের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

এদিকে বাস্তুচ্যুত ভোটাররা জানিয়েছেন, নির্বাচনি কর্মকর্তারা তাদের ভোটার তালিকায় নাম ফিরিয়ে আনার কোনো চেষ্টাই করছেন না।

জামাল বলেন, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার বিষয়টি নিয়ে তিনি নির্বাচনি কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেও এর কোনো সদুত্তর পাননি। বরং চিরাকুঠা গ্রামের পরিবর্তনে বীরসিংহ জাড়ুয়া নির্বাচনি এলাকার ভোটার হিসেবে নিজেদের নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য আবেদন করতে বলেছিলেন তিনি। পরে জামাল আবেদন করলেও তা এখনো গৃহীত হয়নি।

চলতি বছরের ২৫ জানুয়ারি পাঁচটি বিরোধী দল আসামের মুখ্য নির্বাচনি কর্মকর্তার কাছে একটি স্মারকলিপি দিয়েছিলেন, যেখানে উল্লেখ করা হয়েছিল উচ্ছেদের ফলে বাস্তুচ্যুত প্রকৃত ভোটারদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে না।

এদিকে এক সংবাদ সম্মেলনে আসামের প্রধান নির্বাচন কর্মকর্তা অনুরাগ গোয়েল প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, ভোটার তালিকা থেকে ভোটারদের ‘স্বপ্রণোদিতভাবে’ বাদ দেওয়া হবে না। তিনি আরো বলেন, উচ্ছেদকৃতদের মধ্যে যারা তাদের নতুন ঠিকানায় নিজেদের নাম নথিভুক্ত করতে পারেননি, তাদের জন্য একটি পৃথক পদ্ধতি তৈরি করা হয়েছে। গোয়েল বলেন, উচ্ছেদের কারণে কিছু ভোটারকে ‘স্থায়ীভাবে স্থানান্তরিত’ করে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে এবং তাদের পূর্ববর্তী ভোটকেন্দ্র বা নির্বাচনি এলাকা থেকে তাদের নাম মুছে ফেলা হয়েছে। কিন্তু ধুবড়ি ও উরিয়াম ঘাটের বেশ কয়েকজন বাস্তুচ্যুত ব্যক্তির অভিযোগ, কোনো স্থানেই তাদের নাম ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে না।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

বাসস্থান-ভোটাধিকার হারিয়ে অসহায় আসামের মুসলমানরা

আপডেট সময় ০৪:২০:৩৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ২২ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

ভারতের আসাম রাজ্যের ধুবড়ি জেলার চিরাকুঠা গ্রামের যে স্থানে একসময় ছিল নিজের ঘর, সেখানেই এখন ত্রিপল টাঙিয়ে বসবাস করতে হচ্ছে বোদিয়াত জামালকে। গত সাত মাস ধরে এভাবেই জীবনযাপন করতে হচ্ছে তাকে। গত বছরের জুলাই মাসে একটি বিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজের জন্য আসামের ১৪০০ বাঙালি বংশোদ্ভূত মুসলিম পরিবারের ঘরবাড়ি ভেঙে দেয় আসাম সরকার।

সরকারের এমন পদক্ষেপের পর এই গ্রাম থেকে অনেকেই সরে গেলেও ৪২ বছর বয়সি রাজমিস্ত্রি ও তার পরিবার সেখানেই থেকে যায়।

শুধু তা-ই নয়, গত সপ্তাহে নির্বাচন কমিশন থেকে যে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা করা হয়, সেখানে জামাল ও তার পরিবারের নাম একটি বিশেষ সংশোধনীর পর তা বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। জামাল বলেন, গত ২৪ বছর ধরে এই রাজ্যের ভোটার তিনি। এখানেই ভোট দিচ্ছেন; কিন্তু এবার ভোটার তালিকা থেকেও নাম বাদ দেওয়া হয়েছে তার। তিনি আরো বলেন, ভোটার পরিচয়পত্র ছাড়া কোথাও কাজ করা বা ভ্রমণে যাওয়া যাবে না, যা তাকে গভীর উদ্বেগের মধ্যে ফেলেছে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম স্ক্রল ইনকে জামাল বলেন, তিনি কাজ করেন ডিব্রুগড় জেলায়। কিন্তু গত মাসে বাড়িতে ফিরে আসার পর জানতে পারেন এবারের ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন থেকে তার ও তার পরিবারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। বর্তমান সময়ে ভোটার কার্ড ছাড়া রাজ্যের বাইরে কাজ করা অন্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তাই ভোটার কার্ড না পাওয়া পর্যন্ত তিনি বাইরে কাজে যেতে পারবেন না। কারণ, গত কয়েক মাস ধরে আসামের অসমীয়া জাতিগোষ্ঠীর লোকজন বাঙালি বংশোদ্ভূত মুসলিম কর্মীদের তাদের দেশ ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়ার হুমকি দিয়ে আসছে। জামাল বলেন, এই সরকার একদিকে তাদের ঘরবাড়ি ভেঙে দিয়ে করেছে বাস্তুহারা, অন্যদিকে ভোটার আইডি কার্ডও কেড়ে নিয়ে করেছে পরিচয়হীন।

জামাল একা নন, তার মতো বহু বাঙালি মুসলমানের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে আসাম সরকার। শুধু চিরাকুঠা গ্রামেই চূড়ান্ত ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে ১২১ বাঙালি মুসলমানের নাম।

স্ক্রলের অনুসন্ধানে জানা গেছে, ধুবড়ি ও উরিয়াম ঘাটের ৫ হাজার ৭০০ মুসলমানকে ঘরবাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে; একই সঙ্গে তাদের ভোটার তালিকা থেকেও বাদ দেওয়া হয়েছে।

ধুবড়ি জেলায় গত বছরের জুলাই মাসে চারটি ভোটকেন্দ্র থেকে প্রায় ৭৫৬ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। এদিকে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া প্রসঙ্গে বিলাসিপাড়া আসনের সেকেন্ড বুথ লেভেল অফিসার স্ক্রলকে জানিয়েছেন, উচ্ছেদের কারণে ৭০০ জনেরও বেশি ভোটারের স্থায়ী বাসস্থান পরিবর্তন হওয়ায় তাদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। উরিয়াম ঘাটে উচ্ছেদ হওয়া ১৯ গ্রামের পাঁচটি ভোটকেন্দ্র থেকে ৪ হাজার ৯৪৫ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।

আর নির্বাচনি এলাকার একজন সরকারি কর্মকর্তা, যিনি ফার্স্ট বুথ লেভেল অফিসার হিসেবে কর্মরত, তিনি জানিয়েছেন, তার ওয়ার্ডে উচ্ছেদের কারণে ২০০ জনেরও বেশি বাঙালি মুসলিমের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।

এদিকে বাস্তুচ্যুত ভোটাররা জানিয়েছেন, নির্বাচনি কর্মকর্তারা তাদের ভোটার তালিকায় নাম ফিরিয়ে আনার কোনো চেষ্টাই করছেন না।

জামাল বলেন, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার বিষয়টি নিয়ে তিনি নির্বাচনি কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেও এর কোনো সদুত্তর পাননি। বরং চিরাকুঠা গ্রামের পরিবর্তনে বীরসিংহ জাড়ুয়া নির্বাচনি এলাকার ভোটার হিসেবে নিজেদের নাম অন্তর্ভুক্তির জন্য আবেদন করতে বলেছিলেন তিনি। পরে জামাল আবেদন করলেও তা এখনো গৃহীত হয়নি।

চলতি বছরের ২৫ জানুয়ারি পাঁচটি বিরোধী দল আসামের মুখ্য নির্বাচনি কর্মকর্তার কাছে একটি স্মারকলিপি দিয়েছিলেন, যেখানে উল্লেখ করা হয়েছিল উচ্ছেদের ফলে বাস্তুচ্যুত প্রকৃত ভোটারদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে না।

এদিকে এক সংবাদ সম্মেলনে আসামের প্রধান নির্বাচন কর্মকর্তা অনুরাগ গোয়েল প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, ভোটার তালিকা থেকে ভোটারদের ‘স্বপ্রণোদিতভাবে’ বাদ দেওয়া হবে না। তিনি আরো বলেন, উচ্ছেদকৃতদের মধ্যে যারা তাদের নতুন ঠিকানায় নিজেদের নাম নথিভুক্ত করতে পারেননি, তাদের জন্য একটি পৃথক পদ্ধতি তৈরি করা হয়েছে। গোয়েল বলেন, উচ্ছেদের কারণে কিছু ভোটারকে ‘স্থায়ীভাবে স্থানান্তরিত’ করে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে এবং তাদের পূর্ববর্তী ভোটকেন্দ্র বা নির্বাচনি এলাকা থেকে তাদের নাম মুছে ফেলা হয়েছে। কিন্তু ধুবড়ি ও উরিয়াম ঘাটের বেশ কয়েকজন বাস্তুচ্যুত ব্যক্তির অভিযোগ, কোনো স্থানেই তাদের নাম ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে না।