ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতির অনুসারীদের নেতৃত্বে ঢামেকে হামলা, সিসিটিভি ফুটেজে শনাক্ত
- আপডেট সময় ০৮:০১:৩৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল ২০২৬
- / ২৬ বার পড়া হয়েছে
ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসকদের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষের ঘটনার দুটি সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ করেছেন ইন্টার্ন চিকিৎসকরা। ভিডিওতে দেখা গেছে, ঢাবি শিক্ষার্থীদের একটি অংশ প্রথমে চিকৎসকদের গায়ে হাত তোলেন। এতে নেতৃত্ব দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অমর একুশে হল শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ও গত ডাকসু নির্বাচনের হল সংসদের এজিএস প্রার্থী নূরুল আমিন তায়েব।
তবে সংঘর্ষে জড়ানো ছাত্রদল নেতারা বলছেন, ইন্টার্ন চিকিৎসকরা তাদের সুবিধামত সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ করেছেন। ঢাবি শিক্ষার্থীদের ওপর তারা দু’দফায় চড়াও হলেও, এমনকি রক্তাক্ত করা হলেও সেগুলো প্রকাশ করা হয়নি। এ ঘটনায় অভিযুক্তরা সবাই কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিবের অনুসারী বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
প্রকাশিত সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বিকাল ৫টা ৪ মিনিটে দল বেঁধে জরুরি বিভাগে প্রবেশ করেন ঢাবি শিক্ষার্থীরা। এতে নেতৃত্ব দেন অমর একুশে হল ছাত্রদল নেতা তায়েব, হল ছাত্রদলের সদস্য মোবিন মিয়া ও মাহাদী হাসান সানিম। এর মধ্যে মোবিন মিয়া (মোমিন মিয়া) ও মাহাদী হাসান সানিম হল সংসদে ছাত্রদলের প্যানেলে সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। ছাত্রদল নেতা সানিমের অসুস্থতা ও ইনজেকশন প্রেসক্রাইব করা নিয়ে এই ঘটনার সূত্রপাত।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই তিন ছাত্রদল নেতাই সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিবের অনুসারী এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র সহ-সভাপতি মাসুম বিল্লাহ ও শহীদুল্লাহ হল ছাত্রদলের সভাপতি শাহিনের ছোটভাই হিসেবে পরিচিত। তারা সবাই ছাত্রদলের বৃহত্তর ময়মনসিংহ গ্রুপ মেইন্টেন করেন। এর মধ্যে তায়েবের বাড়ি ময়মনসিংহ, আর মাহাদী হাসান সামিনের গ্রামের বাড়ি শেরপুরে। এছাড়া মোবিন মিয়ার বাড়িও ময়মনসিংহ এলাকায় বলে হল ছাত্রদলের একাধিক সূত্র দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে নিশ্চিত করেছে।
বিকেল ৫টা ৪ মিনিটের জরুরি বিভাগের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, দলবল নিয়ে আসার পর সেখানে কর্তব্যরত ট্রেইনি চিকিৎসক ডা. মহসিনের ওপর প্রায় অতর্কিত আক্রমণ করেন তারা। ডা. মহসিন নিউরোসার্জারি বিভাগের ট্রেইনি চিকিৎসক, তবে ঘটনার সময় তিনি জরুরি বিভাগের সার্জারি ইউনিটে কর্তব্যরত ছিলেন। এ সময় তায়েব, মোবিন ও সানিমের নেতৃত্বে বেশ কয়েকজন মিলে তাকে এলোপাতাড়ি কিল-ঘুষি মারতে থাকেন। প্রায় দেড় মিনিট পর আনসার সদস্যরা এসে ঢাবি শিক্ষার্থীদের সরিয়ে নেন। তবে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় চলতে থাকে। ৪ মিনিট ১ সেকেন্ডের ফুটেজটির পুরো অংশ জুড়েই ঢাবি শিক্ষার্থীদের জরুরি বিভাগে অবস্থান করতে দেখা গেছে।
অপর এক সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ৫টা ১৭ মিনিটের দিকে একদল ঢাবি শিক্ষার্থী জরুরি বিভাগের কেঁচি গেট দিয়ে প্রবেশ করে চিকিৎসক-নার্সসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের পেটাতে শুরু করেন। কিছুক্ষণ পর আনসার সদস্যরা ওই শিক্ষার্থীদের বের করে দিতে সক্ষম হন। এরপর দু’পক্ষ কেঁচি গেটের দুই পাশে অবস্থান নেন। তবে এর আগে ইন্টার্ন চিকিৎসক ডা. সাইফুর রহমান খানকে মারধর করে তার ওটি ড্রেস ছিঁড়ে ফেলা হয়।

ঘটনার বর্ণনা দিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ইন্টার্ন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশনের (আইডিএ) সাধারণ সম্পাদক ডা. নাবিল বিন কাশেম দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, সানিমের সঙ্গে ভুক্তভোগী ট্রেইনি চিকিৎসকের বাগবিতণ্ডার পর তারা দলবল নিয়ে এসে অতর্কিত আক্রমণ করেন। ওই সময়ে একজন নারী ইন্টার্ন চিকিৎসকও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। ঢাবির স্টুডেন্টরা এসে ডা. মহসিনকে এলোপাতাড়ি কিল-ঘুষি মারতে থাকে। পরে আনসার সদস্যদের সহায়তায় তাদের বের করে দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, খবর পেয়ে আমি, ইন্টার্ন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ফয়সাল ভাই এবং গাইনি বিভাগের অপারেশন থিয়েটারে কর্তব্যরত ডা. ফয়সাল ছুটে আসি। এ সময় কেঁচি গেটের কাছে পৌঁছালে তারা আবার আমাদের ওপর চড়াও হয়। তারা ডা. ফয়সালকে ঘিরে ধরে মারতে থাকে। এমনভাবে ফয়সালকে টেনে নেয় যে আনসাররাও তাকে ছাড়াতে পারছিল না।
আইডিএ সাধারণ সম্পাদক বলেন, আমরা ইতোমধ্যে চার দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেছি। তদন্ত কমিটি আমাদের কাছে শনিবার সকাল পর্যন্ত সময় চেয়েছে। কিন্তু তদন্ত কার্যক্রম দৃশ্যমান না হলে আমরা কর্মবিরতিতে যাব। প্রয়োজনে সারাদেশের ইন্টার্ন চিকিৎসকদের নিয়ে কর্মবিরতি শুরু হবে।
এ বিষয়ে জানতে মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও মাহাদী হাসান সানিমকে পাওয়া যায়নি। অমর একুশে হল ছাত্রদলের সদস্য মোবিন মিয়া দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ডাক্তাররা শুধু তাদের ফায়দা হয় এমন সিসিটিভি ফুটেজ পাবলিশ করেছে। কিন্তু এর আগে সানিমকে মারতে উদ্যত হওয়া আর পরে এক্সরে রুমে আমাদের কয়েকজনকে মারধর করার ফুটেজ পাবলিশ করা হয়নি।
একই বক্তব্য চাইলে অমর একুশে হল ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক নূরুল আমিন তায়েবের। জানতে চাইলে তিনি দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, সিসিটিভি ফুটেজে দেখানো সময়ের আগে ওই ডাক্তার সানিমের গায়ে হাত তোলার চেষ্টা করেন। খবর পেয়ে আমরা লিখিত অভিযোগ দেওয়ার জন্য ঘটনাস্থলে যাই এবং ওই ডাক্তারকে আটকানোর চেষ্টা করি, যেন তিনি পালিয়ে যেতে না পারেন। সে সময় কিছু পরিস্থিতি তৈরি হয়।
তায়েব আরও বলেন, পরে আমরা সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে চাইলেও আমাদের কয়েকজনকে এক্সরে রুমে আটকে মারধর করা হয়। সম্ভবত কোনো ধারালো কিছু তারা ব্যবহার করেছে। এতে আমাদের কয়েকজন রক্তাক্ত হয়েছে। আমিও আহত হয়েছি, এজন্য আমার আজকের পরীক্ষা দিতে যেতে পারিনি।
এই ছাত্রদল নেতার অভিযোগ, গতকাল বুধবার সানিমের পরীক্ষা ছিল। এরপর একিউট প্যানক্রিয়াটাইটিস (তীব্র অগ্ন্যাশয় প্রদাহ) নিয়ে ঢাকা মেডিকেলের জরুরি হাসপাতালে যান তিনি। তাকে যে তিনটি ওষুধ দেওয়া হয়, তার দুটি ঢাকা মেডিকেলের আশেপাশের সবগুলো ফার্মেসি ঘুরেও পাওয়া যায়নি। এতে প্রচণ্ড ব্যাথা নিয়ে চিকিৎসা নিতে যাওয়া সানিম কিছুটা বিরক্ত হয়ে ডাক্তারদের বলেনরেই যে— ‘কী ওষুধ দিয়েছেন, কোথাও পাই না’। নূর আহমেদ তায়েব বলেন, হতে পারে প্রচণ্ড ব্যাথার নিয়ে পুরো এলাকা ঘুরে ওষুধ না পাওয়ায় সানিম একটু রুড বিহেভ করেছে, কিন্তু ডাক্তাররা যেভাবে বলছে যে সানিম তুই-তুকারি করেছে, বিষয়টা তেমন নয়। এটার জন্য ওই ডাক্তার স্কেল নিয়ে সানিমকে মারতে আসে। এজন্য এত বড় ঘটনার সূত্রপাত।
এ বিষয়ে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিবকে মুঠোফোনে একাধিকবার কল দেওয়ার পর ক্ষুদেবার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।
উল্লেখ্য, গতকাল বুধবার বিকেলের সংঘর্ষের ঘটনায় ঢাবি ও ঢামেকের প্রতিনিধিদের নিয়ে ৬ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটির প্রধান হিসেবে রয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের ডিন ও ঢামেকের সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক ডা. নাদিম আহমেদ। আগামী শনিবার (১১ এপ্রিল) সকালের মধ্যে কমিটিকে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।





















