ঢাকা ০৫:৫৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬, ২৯ চৈত্র ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
নগ্ন ছবি তুলে চলতো ব্ল্যাকমেইল

সিলেটে তানহা’র হানিট্র্যাপ সাম্রাজ্য

স্টাফ রিপোর্টার
  • আপডেট সময় ১২:৫২:২২ অপরাহ্ন, রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬
  • / ৪৩ বার পড়া হয়েছে

সিলেটের ২৭ বছরের যুবতী তানজিলা আক্তার তানহা। রাবেয়া বেগম তানহা নামেও পরিচিত তিনি। তার নেতৃত্বেই নগরের  সুবহানীঘাটে গড়ে তোলা হয়েছিল ‘হানিট্র্যাপ ফাঁদ’ ও ব্ল্যাকমেইলিং ব্যবসা। এ চক্রের ফাঁদে পড়ে লক্ষ লক্ষ টাকা খুইয়েছে একাধিক তরুণ।

টাকা দিয়ে তাদের কাছে ছাড় পাওয়ার পরে লজ্জায়, ভয়ে অনেকেই পুলিশের কাছে যাননি। তবে গোলাপগঞ্জের দুই যুবক ওই গ্রুপের কাছে বন্দি থাকা অবস্থাই পরিবারের লোকজনের অভিযোগের প্রেক্ষিতে পুলিশ অ্যাকশনে যায়। ঘটনাস্থলেই গিয়েই সন্ধান পায় গ্রুপের। নগরের যতরপুরের নবপুষ্প বাসার ৫ তলার বাসাটি কয়েক মাস আগে ভাড়া নেয় তানহা। সঙ্গে রাখে তরুণী জেসমিন আক্তারকে। ঘটনা বৃহস্পতিবার রাতের। গোলাপগঞ্জের রনকেলী গ্রামের তরুণ মাহমুদুল হাসান রিফাত ও তার প্রবাসী বন্ধু মাহফুজ আলীর সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা হয় হানিট্র্যাপ গ্রুপের প্রধান তানহার সঙ্গে। এরপর তানহার আমন্ত্রণে তারা দেখা করতে সিলেট নগরে আসেন।

তানহার চক্রে রয়েছে পুরুষ সদস্যরা ও। নগরের মেন্দিবাগ পয়েন্টে তানহার গ্রুপের সদস্য আব্দুল জলিল ও জাহেদ আহমদ তাদের সঙ্গে দেখা করে। বাসার যাওয়ার জন্য তারা একটি সিএনজি অটোরিকশাতে তুলে। সেখান থেকে রিফাত ও মাহফুজকে নিয়ে আসা হয় নগরের যতরপুরের নবপুষ্প বাসার ৫ তলায়। ওই বাসায় আগে থেকেই অবস্থান করছিল জেসমিন আক্তার। সেখানে যাওয়ার পর তাদের বসিয়ে রাখা হয়। এসময় চক্রের প্রধান তানহা তার গ্রুপের কয়েকজন সদস্য নিয়ে বাসায় ঢুকে। প্রথমেই তারা রিফাত ও মাহফুজকে মারধর করে। একপর্যায়ে তাদের উলঙ্গ হওয়ার কথা বলে। এতে রাজি না হওয়ায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাদেরকে ভয় দেখানো হয়। তাদের দেয়া হয় ইলেকট্রিক শকও। রিফাত ও মাহফুজ জানিয়েছে, ক্রমাগত নির্যাতন করে উলঙ্গ করা হয়। বিবস্ত্র অবস্থায় ছবি তোলা হয়। তার আগে তাদের কাছে থাকা আইফোন, টাকাসহ সব জিনিসপত্র ছিনিয়ে নেয়।

তারা জানায়, একপর্যায়ে তাদের ব্ল্যাকমেইল শুরু করে তানহা ও তার সহযোগী। হুমকি দিয়ে বলে, ১০ লাখ টাকা না দিলে তাদের নুড ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছেড়ে দেবে। এসময় তারা পরিবারের লোকজনের সঙ্গে তাদের মোবাইল ফোন দিয়ে যোগাযোগ করায়। আক্রান্ত দু’যুবক জানায়, ছিনিয়ে নেয়া মোবাইল ফোন থেকে পরিবারের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে। একপর্যায়ে তাদের সঙ্গেও কথা বলায়। যোগাযোগের পর পরিবারের সদস্যরা পর্যায়ক্রমে হানিট্র্যাপ গ্রুপের কাছে বিকাশের মাধ্যমে ৯০ হাজার টাকা পাঠায়। তবে টাকা পাঠানোর সময় সন্দেহ হয় পরিবারের লোকজনের। তারা বিষয়টি মধ্যরাতেই অবগত করেন কোতোয়ালি থানা পুলিশকে। ঘটনার খবর পেয়ে সক্রিয় হয় কোতোয়ালি পুলিশ।

অনুসন্ধান শুরু করে পুলিশ। প্রযুক্তিগত অনুসন্ধানও চালানো হয়। অনুসন্ধানের একপর্যায়ে দুই যুবক যতরপুরের ওই বাসায় অবস্থান করছে বলে জানতে পারে। ভোরে ওই বাসায় চালানো হয় অভিযান। অভিযান পরিচালনায় থাকা কোতোয়ালি থানার সাব-ইন্সপেক্টর আনোয়ারুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানিয়েছেন- ওই বাসায় ৫ তলায় ওই রিফাত ও মাহফুজকে রাখা হয়েছিল। এসময় বাসায় তানহা, জেসমিন, জলিল ও জাহেদ ছিল। পুলিশ হানিট্র্যাপের ফাঁদে পড়া দু’জনকে উদ্ধার করে। একইসঙ্গে আটক করা হয় ওই গ্যাংয়ের সদস্য তানহা, জেসমিন, জলিল ও জাহেদকে। পরে তাদের থানায় নিয়ে আসা হয়। কোতোয়ালি থানার ওসি খান মুহাম্মদ মাইনুল জাকির জানিয়েছেন, গ্যাংয়ের প্রধান তাহনার নেতৃত্বে নবপুষ্পের ওই বাসায় হানিট্র্যাপের ফাঁদ পাতা হয়। ওখানে শুধু ওই দুই যুবককেই নয়, আরও একাধিক যুবককে এ ধরনের ট্র্যাপে ফেলে টাকা লুটে নেয়া হয়েছে।

আটকের পর তানহার মোবাইলে এ ধরনের কয়েকজন তরুণের ছবি পাওয়া গেছে। তাদের ধরে এনে নির্যাতন করা হয়। তিনি বলেন, গত রমজান মাস থেকে তারা যতরপুরের ওই বাসা ভাড়া নিয়ে অপকর্ম করে। এর আগে তারা কয়েকটি এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে এ ধরনের ঘটিয়েছে বলে প্রাথমিক তদন্তে মিলেছে। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে গ্যাং সদস্যরা এসব কথা বলেছে। হানিট্র্যাপে পড়ে সর্বস্বান্ত হওয়া কয়েকজন যুবক পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। মামলা করার জন্য তাদের পরামর্শ দেয়া হয়েছে বলে জানান ওসি মাইনুল। এদিকে ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে সবার বাড়ি সিলেটে। গ্যাং প্রধান তানহা বিবাহিত। তার দুই সন্তান রয়েছে। সে কানাইঘাটের সুরইঘাট বাউরভাগ এলাকার জুবায়ের আহমদ রাজুর স্ত্রী ও তার সহযোগী জেসমিনের বাড়ি নগরের আগপাড়ায়। গ্রেপ্তার হওয়া আব্দুল জলিলের বাড়ি জাফলংয়ের মোহাম্মদপুরে ও জায়েদ আহমদের বাড়ি নগরের দক্ষিণ অংশের গঙ্গানগরে। এ ঘটনায় মামলা দায়ের করে আসামিদের আদালতে পাঠানো হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, হানিট্র্যাপ গ্রুপের কাছ থেকে আরও তথ্য জানতে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। আদালতে তাদের রিমান্ডের আবেদন করা হয়েছে।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

নগ্ন ছবি তুলে চলতো ব্ল্যাকমেইল

সিলেটে তানহা’র হানিট্র্যাপ সাম্রাজ্য

আপডেট সময় ১২:৫২:২২ অপরাহ্ন, রবিবার, ১২ এপ্রিল ২০২৬

সিলেটের ২৭ বছরের যুবতী তানজিলা আক্তার তানহা। রাবেয়া বেগম তানহা নামেও পরিচিত তিনি। তার নেতৃত্বেই নগরের  সুবহানীঘাটে গড়ে তোলা হয়েছিল ‘হানিট্র্যাপ ফাঁদ’ ও ব্ল্যাকমেইলিং ব্যবসা। এ চক্রের ফাঁদে পড়ে লক্ষ লক্ষ টাকা খুইয়েছে একাধিক তরুণ।

টাকা দিয়ে তাদের কাছে ছাড় পাওয়ার পরে লজ্জায়, ভয়ে অনেকেই পুলিশের কাছে যাননি। তবে গোলাপগঞ্জের দুই যুবক ওই গ্রুপের কাছে বন্দি থাকা অবস্থাই পরিবারের লোকজনের অভিযোগের প্রেক্ষিতে পুলিশ অ্যাকশনে যায়। ঘটনাস্থলেই গিয়েই সন্ধান পায় গ্রুপের। নগরের যতরপুরের নবপুষ্প বাসার ৫ তলার বাসাটি কয়েক মাস আগে ভাড়া নেয় তানহা। সঙ্গে রাখে তরুণী জেসমিন আক্তারকে। ঘটনা বৃহস্পতিবার রাতের। গোলাপগঞ্জের রনকেলী গ্রামের তরুণ মাহমুদুল হাসান রিফাত ও তার প্রবাসী বন্ধু মাহফুজ আলীর সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা হয় হানিট্র্যাপ গ্রুপের প্রধান তানহার সঙ্গে। এরপর তানহার আমন্ত্রণে তারা দেখা করতে সিলেট নগরে আসেন।

তানহার চক্রে রয়েছে পুরুষ সদস্যরা ও। নগরের মেন্দিবাগ পয়েন্টে তানহার গ্রুপের সদস্য আব্দুল জলিল ও জাহেদ আহমদ তাদের সঙ্গে দেখা করে। বাসার যাওয়ার জন্য তারা একটি সিএনজি অটোরিকশাতে তুলে। সেখান থেকে রিফাত ও মাহফুজকে নিয়ে আসা হয় নগরের যতরপুরের নবপুষ্প বাসার ৫ তলায়। ওই বাসায় আগে থেকেই অবস্থান করছিল জেসমিন আক্তার। সেখানে যাওয়ার পর তাদের বসিয়ে রাখা হয়। এসময় চক্রের প্রধান তানহা তার গ্রুপের কয়েকজন সদস্য নিয়ে বাসায় ঢুকে। প্রথমেই তারা রিফাত ও মাহফুজকে মারধর করে। একপর্যায়ে তাদের উলঙ্গ হওয়ার কথা বলে। এতে রাজি না হওয়ায় ধারালো অস্ত্র দিয়ে তাদেরকে ভয় দেখানো হয়। তাদের দেয়া হয় ইলেকট্রিক শকও। রিফাত ও মাহফুজ জানিয়েছে, ক্রমাগত নির্যাতন করে উলঙ্গ করা হয়। বিবস্ত্র অবস্থায় ছবি তোলা হয়। তার আগে তাদের কাছে থাকা আইফোন, টাকাসহ সব জিনিসপত্র ছিনিয়ে নেয়।

তারা জানায়, একপর্যায়ে তাদের ব্ল্যাকমেইল শুরু করে তানহা ও তার সহযোগী। হুমকি দিয়ে বলে, ১০ লাখ টাকা না দিলে তাদের নুড ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছেড়ে দেবে। এসময় তারা পরিবারের লোকজনের সঙ্গে তাদের মোবাইল ফোন দিয়ে যোগাযোগ করায়। আক্রান্ত দু’যুবক জানায়, ছিনিয়ে নেয়া মোবাইল ফোন থেকে পরিবারের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে। একপর্যায়ে তাদের সঙ্গেও কথা বলায়। যোগাযোগের পর পরিবারের সদস্যরা পর্যায়ক্রমে হানিট্র্যাপ গ্রুপের কাছে বিকাশের মাধ্যমে ৯০ হাজার টাকা পাঠায়। তবে টাকা পাঠানোর সময় সন্দেহ হয় পরিবারের লোকজনের। তারা বিষয়টি মধ্যরাতেই অবগত করেন কোতোয়ালি থানা পুলিশকে। ঘটনার খবর পেয়ে সক্রিয় হয় কোতোয়ালি পুলিশ।

অনুসন্ধান শুরু করে পুলিশ। প্রযুক্তিগত অনুসন্ধানও চালানো হয়। অনুসন্ধানের একপর্যায়ে দুই যুবক যতরপুরের ওই বাসায় অবস্থান করছে বলে জানতে পারে। ভোরে ওই বাসায় চালানো হয় অভিযান। অভিযান পরিচালনায় থাকা কোতোয়ালি থানার সাব-ইন্সপেক্টর আনোয়ারুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানিয়েছেন- ওই বাসায় ৫ তলায় ওই রিফাত ও মাহফুজকে রাখা হয়েছিল। এসময় বাসায় তানহা, জেসমিন, জলিল ও জাহেদ ছিল। পুলিশ হানিট্র্যাপের ফাঁদে পড়া দু’জনকে উদ্ধার করে। একইসঙ্গে আটক করা হয় ওই গ্যাংয়ের সদস্য তানহা, জেসমিন, জলিল ও জাহেদকে। পরে তাদের থানায় নিয়ে আসা হয়। কোতোয়ালি থানার ওসি খান মুহাম্মদ মাইনুল জাকির জানিয়েছেন, গ্যাংয়ের প্রধান তাহনার নেতৃত্বে নবপুষ্পের ওই বাসায় হানিট্র্যাপের ফাঁদ পাতা হয়। ওখানে শুধু ওই দুই যুবককেই নয়, আরও একাধিক যুবককে এ ধরনের ট্র্যাপে ফেলে টাকা লুটে নেয়া হয়েছে।

আটকের পর তানহার মোবাইলে এ ধরনের কয়েকজন তরুণের ছবি পাওয়া গেছে। তাদের ধরে এনে নির্যাতন করা হয়। তিনি বলেন, গত রমজান মাস থেকে তারা যতরপুরের ওই বাসা ভাড়া নিয়ে অপকর্ম করে। এর আগে তারা কয়েকটি এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে এ ধরনের ঘটিয়েছে বলে প্রাথমিক তদন্তে মিলেছে। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে গ্যাং সদস্যরা এসব কথা বলেছে। হানিট্র্যাপে পড়ে সর্বস্বান্ত হওয়া কয়েকজন যুবক পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। মামলা করার জন্য তাদের পরামর্শ দেয়া হয়েছে বলে জানান ওসি মাইনুল। এদিকে ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে সবার বাড়ি সিলেটে। গ্যাং প্রধান তানহা বিবাহিত। তার দুই সন্তান রয়েছে। সে কানাইঘাটের সুরইঘাট বাউরভাগ এলাকার জুবায়ের আহমদ রাজুর স্ত্রী ও তার সহযোগী জেসমিনের বাড়ি নগরের আগপাড়ায়। গ্রেপ্তার হওয়া আব্দুল জলিলের বাড়ি জাফলংয়ের মোহাম্মদপুরে ও জায়েদ আহমদের বাড়ি নগরের দক্ষিণ অংশের গঙ্গানগরে। এ ঘটনায় মামলা দায়ের করে আসামিদের আদালতে পাঠানো হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, হানিট্র্যাপ গ্রুপের কাছ থেকে আরও তথ্য জানতে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। আদালতে তাদের রিমান্ডের আবেদন করা হয়েছে।