মেঘনা অববাহিকায় খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতে জলবায়ু-সহিষ্ণু কৃষি নিয়ে নোবিপ্রবিতে সেমিনার
- আপডেট সময় ০৮:৫৩:৫৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬
- / ১৬ বার পড়া হয়েছে
মেঘনা অববাহিকায় ভবিষ্যৎ খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে জলবায়ু-সহিষ্ণু কৃষি, গবেষণা ও উদ্ভাবনের গুরুত্ব তুলে ধরতে নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (নোবিপ্রবি) এক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সোমবার (২৮ জুলাই) সকাল ১০টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের আইকিউএসি সেমিনার কক্ষে আয়োজিত এ সেমিনারের প্রতিপাদ্য ছিল ‘মেঘনা অববাহিকায় ভবিষ্যৎ খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে জলবায়ু-সহিষ্ণু কৃষি: গবেষণা ও উদ্ভাবন’।
সেমিনারে ‘মেঘনা অববাহিকায় লবণাক্ততার ক্রমবর্ধমান বিস্তার ও উৎপাদনের ওপর জলবায়ুর প্রভাব নিরূপণ এবং ভবিষ্যতের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে জলবায়ু-সহিষ্ণু শস্য নির্বাচন’ শীর্ষক প্রকল্প উপস্থাপন করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নোবিপ্রবির উপাচার্য অধ্যাপক ড. গোলাম রাব্বানী। বিশেষ অতিথি ছিলেন উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম এবং কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো. হাসান উদ্দিন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন প্রকল্প পরিচালক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মহিনুজ্জামান।
উদ্বোধনী বক্তব্যে বক্তারা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে মেঘনা অববাহিকার কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তা ক্রমেই ঝুঁকির মুখে পড়ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় গবেষণাভিত্তিক উদ্ভাবন, জলবায়ু-সহিষ্ণু ফসল নির্বাচন এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার সময়োপযোগী ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গবেষক, শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে টেকসই কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপরও তারা গুরুত্বারোপ করেন।
সেমিনারে উদ্বোধনী পর্বের পর দুটি কারিগরি সেশনে মেঘনা অববাহিকায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, কৃষি উৎপাদন এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে করণীয় বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
‘মেঘনা অববাহিকার নিম্নাঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের সার্বিক প্রভাব’ বিষয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ ড. মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক। আলোচনায় অংশ নেন পরিবেশ অধিদপ্তরের জলবায়ু পরিবর্তন ও আন্তর্জাতিক কনভেনশন বিভাগের পরিচালক মির্জা শওকত আলী। বক্তারা মেঘনা অববাহিকায় তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, বন্যা, নদীভাঙন, পলি জমার পরিবর্তন এবং জলবায়ু অভিযোজন কৌশল নিয়ে আলোকপাত করেন।
‘ফসলের বৃদ্ধি ও উৎপাদনের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব’ বিষয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ হারুন চৌধুরী। আলোচনায় অংশ নেন নোবিপ্রবির কৃষি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. গাজী মো. মহসিন এবং পরিবেশ অধিদপ্তর, নোয়াখালীর উপপরিচালক মোসাম্মৎ শওকত আরা কলি। তারা জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ধানসহ বিভিন্ন ফসলের উৎপাদন হ্রাস, মাটি ও পানির লবণাক্ততা বৃদ্ধি, কৃষিজমির উর্বরতা সংকট এবং জলবায়ু-সহিষ্ণু ফসল নির্বাচন ও আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন।
প্রকল্প পরিচালক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মহিনুজ্জামান বলেন, “দেশের মোট সয়াবিন উৎপাদনের প্রায় ৭০ শতাংশই মেঘনা অববাহিকা অঞ্চলে হয়ে থাকে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এ অঞ্চলের কৃষি ব্যবস্থা উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় জলবায়ু-সহিষ্ণু কৃষি প্রযুক্তি উদ্ভাবনের লক্ষ্যে আমরা একটি আধুনিক গ্রিনহাউস স্থাপন করেছি। গবেষণার মাধ্যমে যদি সয়াবিন ও বার্লির জলবায়ু-সহিষ্ণু জাত ও চাষাবাদ নিশ্চিত করা যায়, তবে এ অঞ্চলের কৃষি উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। এর ইতিবাচক প্রভাব জাতীয় অর্থনীতির পাশাপাশি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।”
কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো. হাসান উদ্দিন বলেন, “আমি আজই দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। এমন একটি সময়োপযোগী প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হতে পেরে আনন্দিত। ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য বার্লি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি শস্য। গবেষণার মাধ্যমে এর উৎপাদন বৃদ্ধি করা সম্ভব হলে তা জনস্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তা—উভয় ক্ষেত্রেই ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। আমি আশা করি, এই সেমিনার থেকে জলবায়ু-সহিষ্ণু কৃষির উন্নয়নে কার্যকর দিকনির্দেশনা পাওয়া যাবে।”
উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম বলেন, “পরিবর্তিত পরিবেশের সঙ্গে যেমন মানুষের শরীরকে খাপ খাইয়ে নিতে হয়, তেমনি উদ্ভিদকেও পরিবর্তিত জলবায়ুর সঙ্গে অভিযোজিত হতে হয়। ১৯৭১ সালের তুলনায় বর্তমানে দেশের চাষযোগ্য জমির পরিমাণ কমলেও কৃষি গবেষণা ও প্রযুক্তির কল্যাণে খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে। এ সাফল্যের পেছনে কৃষি গবেষকদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। আমি বিশ্বাস করি, এই প্রকল্প মেঘনা অববাহিকার কৃষকদের জন্য আশীর্বাদ হিসেবে কাজ করবে।”
প্রধান অতিথির বক্তব্যে উপাচার্য অধ্যাপক ড. গোলাম রাব্বানী বলেন, “সম্প্রতি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এক প্রদর্শনীতে এই প্রকল্প পরিদর্শন করে গবেষকদের উৎসাহিত করেছেন, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অত্যন্ত গর্বের বিষয়। আমাদের ক্যাম্পাসে একটি আধুনিক গ্রিনহাউস ল্যাবও স্থাপন করা হয়েছে। আমি আশা করি, এই প্রকল্প থেকে প্রাপ্ত গবেষণা ফলাফল জলবায়ু-সহিষ্ণু কৃষি উন্নয়ন এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।”
সেমিনারের শেষ পর্যায়ে মুক্ত আলোচনা পর্বে গবেষক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনরা প্রকল্পের সম্ভাবনা, গবেষণার ফলাফল এবং মেঘনা অববাহিকায় টেকসই কৃষি ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়নের বিভিন্ন দিক নিয়ে মতবিনিময় করেন।























