বিমানের জেট ফুয়েলে ভেজাল, দুর্ঘটনার আশঙ্কা
স্টাফ রিপোর্টার
- আপডেট সময় ০৯:১১:২৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬
- / ১৬ বার পড়া হয়েছে
বাংলাদেশে বিমান ও হেলিকপ্টারে ব্যবহৃত এভিয়েশন জেট ফুয়েলে ভেজালের প্রমাণ মিলেছে ল্যাব পরীক্ষায়। বাংলাদেশে এভিয়েশন টারবাইন ফুয়েল (জেট-এ১) সরবরাহ করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) অধীন প্রতিষ্ঠান পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড।
সম্প্রতি আর্মি এভিয়েশনে ব্যবহৃত জেট ফুয়েলের ১৭টি নমুনা পরীক্ষা করে প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (এমআইএসটি)। পরীক্ষায় নমুনাগুলোতে পানি ও এসিডের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
এমআইএসটির ল্যাবে আর্মি এভিয়েশনে ব্যবহৃত ১৩টি এবং বিজিবির হেলিকপ্টারে ব্যবহৃত চারটি জেট ফুয়েলের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষায় সব নমুনায় গ্রহণযোগ্য মাত্রার বাইরে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পানি ও এসিডের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের জ্বালানি ব্যবহার নিরাপদ নয় এবং উড্ডয়নের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
এ বিষয়ে এমআইএসটির অধ্যাপক ড. মো. আমিরুল ইসলাম স্টার নিউজকে বলেন, ‘জেট-এ১’ জ্বালানিতে সাধারণত পানির উপস্থিতি থাকার কথা নয়। এর গ্রহণযোগ্য মাত্রা শূন্য হলেও পরীক্ষায় প্রতি মিলিয়ন অংশে (পিপিএম) ৫০ পিপিএম পানি পাওয়া গেছে।
তিনি আরও জানান, ‘জেট-এ১’ জ্বালানিতে এসিডের উপস্থিতিও শূন্য থাকার কথা। তবে পরীক্ষায় প্রতি কেজি জ্বালানিতে ০.৫ মাইক্রোগ্রাম কেএইচ (KOH) ইউনিট এসিড শনাক্ত হয়েছে, যা গ্রহণযোগ্য নয়।
ড. মো. আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘জেট-এ১’ জ্বালানিতে পানি ও এসিডের উপস্থিতি ইঞ্জিনের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এতে ইঞ্জিনের আরপিএম কমে যাওয়ার পাশাপাশি উড্ডয়নের সময় দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বেড়ে যায়।
তার মতে, দেশে বিভিন্ন সময়ে ঘটে যাওয়া প্রশিক্ষণ বিমান দুর্ঘটনার পেছনেও এ ধরনের জ্বালানিগত ত্রুটি ভূমিকা রেখে থাকতে পারে।
এ বিষয়ে এমআইএসটির অধ্যাপক ড. মো. আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘একটি উড়োজাহাজের ইঞ্জিন প্রায় ৩০ হাজার আরপিএম গতিতে ঘুরতে পারে। এ ধরনের উচ্চগতির ইঞ্জিনে পর্যাপ্ত লুব্রিকেশন না থাকলে দ্রুত যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে ইঞ্জিনের অভ্যন্তরীণ অংশে ক্ষয় শুরু হতে পারে এবং ইঞ্জিন বিকলের ঝুঁকিও তৈরি হয়।’
তিনি আরও জানান, জেট ফুয়েলে থাকা পানি ও এসিড দহনের সময় ইঞ্জিনের লুব্রিকেটিং অয়েলের সঙ্গে মিশে যেতে পারে। এতে ইঞ্জিন অয়েল দূষিত (কন্টামিনেটেড) হয়ে কার্যক্ষমতা কমে যায়। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে ইঞ্জিনে গুরুতর যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেওয়ার ঝুঁকিও বেড়ে যায়।
তিনি বলেন, জেট ফুয়েলে থাকা পানি ও এসিড ইঞ্জিনের ভেতরে দহনের সময় লুব্রিকেটিং অয়েলের সঙ্গে মিশে যেতে পারে। এতে ইঞ্জিন অয়েল দূষিত বা কন্টামিনেটেড হয়ে যায়। ফলে ইঞ্জিনের কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের যান্ত্রিক সমস্যার আশঙ্কা তৈরি হয়।
বিমানের জ্বালানিতে ভেজাল থাকলে এর দায় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের বলে জানিয়েছেন বিমান বাহিনীর সাবেক উইং কমান্ডার এটিএম নজরুল ইসলাম।
তিনি বলেন, তেলবাহী গাড়ি যখন এয়ারক্রাফটে জ্বালানি সরবরাহ করতে যায় বা অন্য কোনো স্থানে পরিবহন করে, তখন এর মান ও নিরাপত্তা তদারকির দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট পরিবহনকারী প্রতিষ্ঠানের। এয়ারলাইনস বা অন্য কোনো ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠান জ্বালানি গ্রহণের সময় সাধারণত তেলবাহী গাড়ির সঙ্গে থাকা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র বা সার্টিফিকেট যাচাই করে। সেই সনদপত্রের ভিত্তিতেই তারা জ্বালানি গ্রহণ করে থাকে।
বিষয়টি নিয়ে ক্যামেরার সামনে কথা বলতে রাজি হয়নি পদ্মা অয়েল কর্তৃপক্ষ। তবে মুঠোফোনে অভিযোগ অস্বীকার করেন পদ্মা অয়েল পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মফিজুর রহমান।
তিনি বলেন, ‘আমি কেবল জেট ফুয়েল সরবরাহ করি। এরপর এর ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণের দায়িত্ব ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে চলে যায়। নির্ধারিত মান অনুযায়ী পরীক্ষা করে সম্পূর্ণ ঠিক থাকার পরই আমরা জ্বালানি সরবরাহ করি।’
তিনি আরও বলেন, ‘এয়ারফোর্স তাদের নিজস্ব পরিবহনের মাধ্যমে আমাদের কাছ থেকে জেট ফুয়েল নিয়ে যায়। পরবর্তী পর্যায়ে জ্বালানি ব্যবহারের আগে বা সংরক্ষণের সময় কোনো পরিবর্তন বা সমস্যা হলে সেটি ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানের তত্ত্বাবধানের বিষয়। প্রয়োজন হলে তারা নমুনা নিয়ে আসতে পারে, পাশাপাশি আমাদের সংরক্ষিত নমুনাও পরীক্ষার জন্য পাঠানো যেতে পারে।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেকোনো ধরনের জ্বালানি তেলের মান নিশ্চিত করতে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।




















