ঢাকা ০৩:৪৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬, ২৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঐতিহাসিক জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস ও শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান

এ কে এম রেজাউল করিম
  • আপডেট সময় ০৩:২৫:২৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬
  • / ১৮ বার পড়া হয়েছে

৭ নভেম্বর ২০২৬। ঐতিহাসিক জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস। ১৯৭৫ সালের এই দিনে দেশের সিপাহি-জনতা ঐক্যবদ্ধভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে সকল চক্রান্ত রুখে দিয়েছিল। বাংলাদেশের ইতিহাসে ৭ নভেম্বর তাই এক বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এটি শুধু একটি দিনের নাম নয়; এটি জাতির শত্রু-মিত্র চিহ্নিত করার, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার এবং গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের একটি প্রতীক।

বাংলাদেশের জন্ম, মুক্তিযুদ্ধ ও পরবর্তী রাজনৈতিক উত্থান-পতন নিয়ে আলোচনা করতে গেলে একটি প্রবাদবাক্য প্রণিধানযোগ্য: “অতীত নিয়ে সবসময় পড়ে থাকলে এক চোখ অন্ধ, অতীতকে ভুলে গেলে দু’চোখই অন্ধ।” ইতিহাসকে অস্বীকার করা যায় না; আবার ইতিহাসের গণ্ডিতে আটকে থেকেও ভবিষ্যৎ নির্মাণ করা যায় না। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের পথ রচনা করাই একটি জাতির পরিপক্বতার পরিচয়। ৭ নভেম্বর আমাদের সেই শিক্ষাই দেয়—স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র রক্ষায় জাতীয় ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই।

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের পথ নির্ণয়ের একটি তারিখ। যারা বাংলাদেশকে তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করে রাখতে চেয়েছিল, যারা জনগণের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অধিকার হরণ করে দেশে একদলীয় স্বৈরাচারী শাসন কায়েম করতে চেয়েছিল, যারা দেশের শৌর্য, বীর্য, সাহস ও সম্মানের প্রতীক সেনাবাহিনীর গৌরবকে ভূলুণ্ঠিত করতে চেয়েছিল—১৯৭৫ সালের এই দিনে দেশপ্রেমিক সিপাহি-জনতার ঐতিহাসিক বিপ্লবের মাধ্যমে তাদের পরাজয় ঘটে। এই বিপ্লব প্রমাণ করে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে বিকিয়ে দেওয়ার বিষয় নয়; এটি লাখো শহীদের রক্ত ও কোটি মানুষের আকাঙ্ক্ষার ফসল।

১৯৭৫ সালের পটভূমি: চার দিনের অনিশ্চয়তা
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে চরম অস্থিরতা শুরু হয়। এরপর সেনা অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশ এক অনিশ্চিত পরিস্থিতির দিকে এগোতে থাকে। ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর একটি উচ্চাভিলাষী অংশ সামরিক অভ্যুত্থান ঘটায়। তারা তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে ক্যান্টনমেন্টের বাসভবনে বন্দি করে। এরপর বঙ্গভবনের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হয়, তৎকালীন প্রেসিডেন্ট খন্দকার মোশতাক আহমদকে গ্রেফতার করা হয়, মন্ত্রিসভা বিলুপ্ত ও জাতীয় সংসদ ভেঙে দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। প্রধান বিচারপতি আবু সা’দাত মোহাম্মদ সায়েমকে রাষ্ট্রপতির পদে বসানো হয়।

এই ঘটনায় সাধারণ জনগণ ও সিপাহীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীর সর্বমহলে, বিশেষত সাধারণ সিপাহীদের কাছে ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয়। ফলে তারা পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণ ও জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করার পরিকল্পনা করতে থাকে। ৩ থেকে ৬ নভেম্বর মধ্যরাত পর্যন্ত দেশ এক শ্বাসরুদ্ধকর, অনিশ্চিত ও ভীতিকর পরিস্থিতির মধ্যে থাকে। স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়ে। কিন্তু ৬ নভেম্বর গভীর রাতে সেনাবাহিনীর সাধারণ সিপাহীরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। সেই অভ্যুত্থানে স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন নিয়ে আপামর জনতা রাজপথে নেমে আসে। সিপাহি-জনতার মিলিত সেই বিপ্লবে বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান। পাল্টা অভ্যুত্থান ঠেকাতে গিয়ে প্রাণ হারান খালেদ মোশাররফ ও তার কতিপয় অনুসারী।

পরদিন ৭ নভেম্বর সর্বস্তরের সৈনিক ও জনতা সম্মিলিতভাবে ঢাকার রাস্তায় নেমে আসে; এই ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। অভূতপূর্ব এক সংহতির নজির সৃষ্টি হয়। ৬ নভেম্বর মধ্যরাতে ঘটে সিপাহি-জনতার ঐক্যবদ্ধ বিপ্লব, যা ইতিহাসে ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে স্থান লাভ করে। দেশবাসী সেদিন জিয়াউর রহমানের হাতেই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব তুলে দেয়।

তদানীন্তন দৈনিক বাংলার ৭ নভেম্বরের রিপোর্টে বলা হয়, “সিপাহি ও জনতার মিলিত বিপ্লবে চারদিনের দুঃস্বপ্ন শেষ হয়েছে। মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার রাত প্রায় ১টায় সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী, নৌবাহিনীর সিপাহি-জওয়ানরা বিপ্লবী অভ্যুত্থান ঘটিয়েছেন। ষড়যন্ত্রের নাগপাশ ছিন্ন করে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে উদ্ধার করেছেন বিপ্লবী সিপাহীরা।” ৭ নভেম্বর ভোরে রেডিওতে ভেসে আসে, “আমি মেজর জেনারেল জিয়া বলছি।” জেনারেল জিয়া জাতির উদ্দেশে ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে যথাস্থানে নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানান।

সেদিন রাজধানী ঢাকা ছিল মিছিলের নগরী। পথে পথে সিপাহি-জনতা একে অপরকে আলিঙ্গন করেছে। “নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবর”, “বাংলাদেশ জিন্দাবাদ” ধ্বনিতে আকাশ-বাতাস মুখরিত হয়ে ওঠে। আনন্দে উদ্বেলিত হাজার হাজার মানুষ রাজপথে নেমে আসে। সাধারণ মানুষ ট্যাঙ্কের নলে ফুলের মালা পরিয়ে দেয়। এই আনন্দের ঢেউ রাজধানী ছাড়িয়ে দেশের সব শহর-নগর-গ্রামে পৌঁছে যায়।

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস তার ‘বাংলাদেশ: এ লিগ্যাসি অব ব্লাড’ বইতে ৭ নভেম্বর সম্পর্কে লিখেছেন, ১৯৭৫ সালের ৫ ও ৬ নভেম্বর ক্যান্টনমেন্টসহ সারা শহরে হাজার হাজার প্রচারপত্র ছড়ানো হয়। একটি ব্যাপারে ডান ও বাম উভয় রাজনৈতিক দলই একমত ছিল—খালেদ মোশাররফ একজন বিশ্বাসঘাতক, ভারতের দালাল এবং সে ঘৃণিত বাকশাল ও মুজিববাদ ফিরিয়ে আনতে চাইছে। ৭ নভেম্বর ভোরের দিকে জওয়ানরা ব্যারাক থেকে বেরিয়ে পড়ে। সারা ঢাকা শহরে এই ‘সিপাহি বিপ্লব’ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। রাত ১টার মধ্যেই সিপাহীরা পুরো ক্যান্টনমেন্ট দখল করে নেয়। একদল জওয়ান যায় জেনারেল জিয়ার বাসভবনে। চার দিন বন্দি থাকার পর মুক্তি পান জেনারেল জিয়া। নৈশ পোশাক পরা অবস্থাতেই উল্লসিত জওয়ানরা তাকে কাঁধে করে নিয়ে যায় ২ ফিল্ড আর্টিলারির হেডকোয়ার্টারে। ঘটনার আকস্মিকতায় জিয়া তখন বিহ্বল। নাম না জানা অনেক জওয়ানের সঙ্গে আলিঙ্গন ও করমর্দন করেন তিনি।

মাসকারেনহাস আরও লিখেছেন, রেডিওতে ক্রমাগত সিপাহি-জনতার বিপ্লবের ঘোষণা এবং জেনারেল জিয়ার ক্ষমতা গ্রহণের খবর শুনে হাজার হাজার লোক স্রোতের মতো রাস্তায় নেমে আসে। তিন দিন ধরে তারা বিশ্বাস করছিল, ভারত খালেদ মোশাররফের মাধ্যমে তাদের কষ্টে অর্জিত স্বাধীনতাকে বিপন্ন করছে। এখন সেই দুঃস্বপ্ন কেটে গেছে। সর্বত্র জওয়ান ও সাধারণ মানুষ খুশিতে একে অপরের সঙ্গে কোলাকুলি করে, রাস্তায় নামে। সারারাত তারা স্লোগান দেয়—“আল্লাহু আকবর, বাংলাদেশ জিন্দাবাদ, সিপাহি বিপ্লব জিন্দাবাদ।” অবস্থা দেখে মনে হচ্ছিল, ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের মতো এদেশের মানুষ আবার জেগে উঠেছে। এটি ছিল একটি স্মরণীয় রাত।

৭ নভেম্বরের প্রকৃত তাৎপর্য
৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতা অভ্যুত্থানের প্রকৃত তাৎপর্য হলো—শাসক সমাজের ওপর বৈদেশিক মুরুব্বিয়ানার বাধ্যতা প্রত্যাখ্যান করে গণচেতনায় জাতিরাষ্ট্রের আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধার। দেশবাসীর মনে সার্বভৌমত্বের গর্ববোধ পুনঃপ্রতিষ্ঠা। পঁচিশ বছর মেয়াদি শান্তি ও মৈত্রী চুক্তির অসম সম্পর্কের মায়াজাল এদেশের অভিজাত সমাজে যে ভারতমুখাপেক্ষিতা ও হীনম্মন্যতার প্রসার ঘটিয়েছিল, তার বজ্রআঁটুনি ছিন্ন করেছিল দৃপ্ত সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান। রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে উৎখাত হয়েছিল দিল্লির প্রাসাদকামী পরগাছার জঞ্জাল।

এই দিন থেকে জাতিরাষ্ট্রের আত্মমর্যাদাবোধ যে স্বকীয়তা, স্বনির্ভরতা ও আত্মোন্নতির উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছিল, তা আজও জাতিকে প্রেরণা জোগায়। যদিও ভূরাজনৈতিক চক্রান্তে আবারও রাষ্ট্রক্ষমতা দিল্লির পদলেহী একটি পরিবারতন্ত্রের সংঘশক্তির করায়ত্ত হতে পারে; জাতিরাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান ও সংবিধানকে সাবোটাজ করে সেই শক্তি এদেশকে বিশ্বের চোখে স্বশাসনের অযোগ্য প্রমাণ করতে উঠে পড়ে লাগতে পারে; বাংলাদেশের ভারতভুক্তির একটি নীলনকশা অনুসরণ করতে পারে—তবু নভেম্বর বিপ্লবে জাগ্রত দেশবাসী পদে পদে নতজানু ভারতমুখাপেক্ষী উদ্যোগগুলোকে জনমতের প্রাচীর দিয়ে অবরুদ্ধ করেছে। জনস্বার্থ রক্ষায় রাষ্ট্রের বিকলাঙ্গ প্রতিষ্ঠানগুলোর খর্বশক্তি দিয়েও প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। চলমান বিশ্বব্যবস্থার সংঘাতসঙ্কুল আবর্তে, আঞ্চলিক আধিপত্যবাদের হুমকিতে কিংবা বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ার গোলকধাঁধায় দেশবাসী পথ হারায়নি। রাষ্ট্রঘাতী চক্রান্তের মোকাবেলায় রাজপথে নেমে এসেছে; প্রতিবাদে-প্রতিরোধে সোচ্চার হয়েছে। রাষ্ট্রঘাতী চক্রের কবল থেকে অচিরেই আবার রাষ্ট্রক্ষমতা ছিনিয়ে নেবে জাগ্রত জনতা—এই বিশ্বাসই ৭ নভেম্বরের চেতনা।

রেডিও বাংলাদেশে এক সংক্ষিপ্ত ভাষণে জেনারেল জিয়াউর রহমান ঘোষণা করেন, তিনি সাময়িকভাবে প্রধান আইন প্রশাসকের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন। সেনাবাহিনীর অনুরোধে এবং দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়েই তিনি এ দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তিনি বলেন, সাধ্য অনুযায়ী তিনি তার কর্তব্য পালন করবেন। দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য তিনি সবাইকে ঐক্যবদ্ধ ও কঠোর পরিশ্রম করার আহ্বান জানান। তিনি অবিলম্বে সবাইকে কাজে যোগ দেওয়ার নির্দেশ দেন।

৭ নভেম্বরের পরবর্তী রাজনীতি ও জিয়াউর রহমান
৭ নভেম্বর সংঘটিত হওয়ার পর প্রতিটি সরকার দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করেছে। কিন্তু ড. ফখরুদ্দীনের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার এ দিনের সরকারি ছুটি বাতিল করে এবং দিবসটি পালন করা থেকে বিরত থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় আঁতাতের মাধ্যমে ক্ষমতার মসনদে চেপে বসা আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারও তা পালন করছে না। এর আগে ১৯৯৬ সালের আওয়ামী লীগ সরকারও দিবসটি পালন করা থেকে বিরত ছিল এবং সরকারি ছুটি বাতিল করেছিল। অথচ ৭ নভেম্বর জাতীয় জীবনের এক ঐতিহাসিক দিন। ১৯৭৫ সালের এই দিনে সৈনিক-জনতা রাজপথে নেমে এসেছিল জাতীয় স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র রক্ষার দৃঢ় প্রত্যয় বুকে নিয়ে। তাই ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক বিপ্লব অত্যন্ত তাৎপর্যমণ্ডিত।

স্বাধীনতাত্তোর রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা, তৎকালীন ক্ষমতাসীন মহলের নিজেদের স্বার্থের অনুকূলে দেশের স্বাধীনতা বিকিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা এবং ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করার জন্য মানুষের বাক্, ব্যক্তি ও মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে গলাটিপে হত্যা করে একদলীয় বাকশাল কায়েম করা হয়। ফলে দেশে চরম অশান্তি ও হতাশা নেমে আসে। বাকশালী সরকার চরম অগণতান্ত্রিক ও ফ্যাসিবাদী পন্থায় মানুষের ন্যায়সংগত প্রতিবাদকে দমন করে। দেশমাতৃকার এই চরম সংকটকালে ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর আধিপত্যবাদের এদেশীয় এজেন্টদের কূটকৌশলে মহান স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমানকে সপরিবারে ক্যান্টনমেন্টে বন্দি করা হয়। এই অরাজক পরিস্থিতিতে স্বজাতির স্বাধীনতা রক্ষায় অকুতোভয় দেশপ্রেমিক সৈনিক এবং জনতার ঢল রাজপথে এক অনন্য সংহতির স্ফুরণে ৭ নভেম্বর জিয়া মুক্ত হন। এই পটপরিবর্তনে রাষ্ট্রপতি জিয়ার নেতৃত্বে দেশের স্বাধীনতা সুরক্ষিত হয় ও গণতন্ত্র অগ্রগতির পথে এগিয়ে যায়; বহুদলীয় গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়। মানুষের মনে স্বস্তি ফিরে আসে। আধিপত্যবাদী শক্তি ও তাদের এ দেশীয় অনুচররা উদ্দেশ্য সাধনের পথে কাঁটা মনে করে ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াকে হত্যা করে।

দেশপ্রেম ঈমানের অঙ্গ। একজন ঈমানদার মানুষের মধ্যে দেশপ্রেম থাকা অপরিহার্য। দেশপ্রেম ও সততা শব্দ দুটি একে অন্যের পরিপূরক। যে দেশপ্রেমিক সে অবশ্যই সৎ; আবার যে ব্যক্তি সৎ তার মধ্যে অবশ্যই দেশপ্রেম আছে। একজন প্রকৃত নেতার মধ্যে অনেক গুণাবলি থাকা আবশ্যক; তার মধ্যে দেশপ্রেম ও সততা অন্যতম। সততা ও দেশপ্রেমের কারণেই শহীদ জিয়া আমাদের প্রিয় নেতা ও জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব। আমাদের বিশ্বাস, জিয়াউর রহমানের যে কট্টর সমালোচক, সেও জিয়াউর রহমানের সততা ও দেশপ্রেম নিয়ে কটূক্তি করতে পারবে না। সততা ও দেশপ্রেমের প্রশ্নে আপসহীন এই মহান নেতা দেশের কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ের মণিকোঠায় অবস্থান করে নিয়েছেন।

জিয়াউর রহমানের জীবন ও মুক্তিযুদ্ধ
মুহাম্মদ মনসুর রহমান ও জাহানারা খাতুনের দ্বিতীয় পুত্র শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দের ১৯ জানুয়ারি বগুড়া জেলার বাগাবাড়ী গ্রামে তাঁর পিতামহের বসতবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শিশুকাল ও শৈশবের প্রথম অধ্যায় কেটেছে এই বাগাবাড়ী গ্রামেই। মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হলো শৈশব; কারণ এই সময়টাই নিজেকে আবিষ্কার করার এবং প্রকৃতির ভেতর নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার সময়। জিয়াউর রহমানও এর ব্যতিক্রম নন।

জিয়াউর রহমানের ডাকনাম ছিল ‘কমল’। কমল অর্থ পদ্ম। পিতা মুহাম্মদ মনসুর রহমান ও মাতা জাহানারা খাতুনের বড় আদরের সন্তান ছিলেন এই কমল। তাঁরা হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন, তাঁদের এই সন্তান পদ্মের মতো বিকশিত হয়ে উঠবে আপন গুণ, গরিমা ও প্রতিভায়। পিতা-মাতার নিবিড় পরিচর্যায় বড় হলেও তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে পিতামহ মৌলভী কামাল উদ্দিন মন্ডল এবং মাতামহী রহিমা খাতুনের প্রত্যক্ষ প্রভাব লক্ষ করা যায়। এছাড়া মাতামহ আবুল কাশেম আহম্মেদ, পিতামহী মিসির উন্নিসা বেগম এবং চাচা ডা. মমতাজুর রহমানের পরোক্ষ প্রভাবও তাঁর চরিত্রে দেখা যায়।

ধার্মিক ও ব্যক্তিত্ববান পিতামহ মৌলভী কামাল উদ্দিনের সাহচর্যে কাটে জিয়াউর রহমানের মধুর শিশুকাল। দ্বিতীয়ত, মাতামহী রহিমা খাতুনের প্রভাবও তাঁর ওপর প্রভাব বিস্তার করে। তিনি ছিলেন বহু বিরল গুণের অধিকারিণী, তেহস্বিনী মহিলা, সংগীতচর্চা করতেন। শিক্ষা ও সাহিত্যের প্রতি তাঁর বিশেষ আগ্রহ ও অনুরাগ ছিল। জিয়াউর রহমানের মাতা জাহানারা খাতুনের সংগীতগুরু ছিলেন জিয়ার মাতামহী। জিয়া গভীর আগ্রহ নিয়ে সারাদিন পরিশ্রম করে ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরলেও খাওয়া-দাওয়ার পর বিছানায় গিয়ে সংগীতের প্রতি অনুরক্ত হতে ভুলতেন না। ছোটবেলা থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই অভ্যাস তাঁর মধ্যে বিদ্যমান ছিল।

ছোটবেলায় জিয়া খুব খেলাধুলা করতেন। ফুটবল, হকি ও ক্রিকেট ছিল তাঁর প্রিয় খেলা। মাঝেমধ্যে গুলি, ডান্ডাও খেলতেন। আবার কখনো কখনো বৃষ্টিতে ভিজতেন, কাদা মেখে আনন্দ পেতেন। কখনো আকাশে ঘুড়ি উড়াতেন। খেলাধুলায় মেতে থাকলেও সন্ধ্যায় রাস্তায় বাতি জ্বলে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ি ফিরে যেতেন। এরপর লেখাপড়ায় মনোনিবেশ করতেন। খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে যাওয়া তাঁর ছোটবেলার অভ্যাস ছিল। স্বল্পভাষী হলেও ছেলেবেলায় তিনি ছিলেন প্রাণবন্ত। চকলেট তাঁর খুব প্রিয় ছিল। পছন্দ করতেন মিষ্টি ও মুরগির গোশত। বিশেষ করে মুরগির পাখনাকে শিশুকালে তিনি নাম দিয়েছিলেন ‘লাঙল’। আর প্রিয় খাবার ছিল ভাজা বাসি ভাত, বগুড়ার আঞ্চলিক ভাষায় যাকে বলা হয় ‘কড়কড়া’।

জিয়াউর রহমানের বয়স যখন ৪ বছর, তখন থেকে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে স্কুলে যাতায়াত শুরু করেন। সালটি ছিল ১৯৪০। কারণ তাঁর পিতামহ মৌলভী কামাল উদ্দিন মন্ডল ছিলেন বাগাবাড়ি মাইনর স্কুলের প্রধান শিক্ষক। জিয়ার হাতে খড়ি হয় তাঁরই পিতামহের হাতে। বাগাবাড়িতে তিনি ছিলেন ছোট কমলের প্রথম শিক্ষাগুরু। সেই সূত্রে জিয়াউর রহমানের সৌভাগ্য যে তিনি পিতামহের কাছ থেকে জীবনের বিভিন্ন বিষয় ও বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন করতে শিখেছিলেন। এরপর ১৯৪৩ সালে তাঁর পিতা মুহাম্মদ মনসুর রহমান পরিবারকে কলকাতায় নিয়ে যান। তখন জিয়ার বয়স ৬ বছর। তাঁকে ভর্তি করা হয় পার্ক সার্কাসের আমীন আলী এভিনিউতে অবস্থিত শিশু বিদ্যাপীঠে। এক বছর সেখানে পড়াশোনার পর পরিবার আবার বগুড়ার বাগাবাড়িতে ফিরে যায়। বাগাবাড়ি মাইনর স্কুলে এক বছর ভর্তি হন জিয়া। এরপর পরিবার আবার কলকাতায় ফিরে আসে। ১৯৪৪ সালে জিয়াকে কলকাতার কলেজ স্ট্রিটের হেয়ার স্কুলে তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি করা হয়। সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত তিনি হেয়ার স্কুলেই লেখাপড়া করেন।

১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর জিয়ার পিতা মো. মনসুর রহমান সরকারি চাকরিসূত্রে পরিবার নিয়ে পাকিস্তানের করাচিতে চলে আসেন। ১৯৪৮ সালের ১ জুলাই জিয়াকে করাচি একাডেমি স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে সেই স্কুলের নাম তাইয়েব আলী আলভী একাডেমি। ১৯৫২ সালে তিনি দ্বিতীয় বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করেন করাচি একাডেমি স্কুল থেকে। ম্যাট্রিক পাসের পর ভর্তি হন করাচির ডি. জে. কলেজে। ১৯৫৩ সালে পাকিস্তান সামরিক একাডেমিতে একজন অফিসার ক্যাডেট হিসেবে যোগ দেন। ১৯৫৫ সালে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে কমিশন পান। ১৯৫৭ সালে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে বদলি হয়ে আসেন। ১৯৫৯ থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগে কাজ করেন। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে খেমকারান সেক্টরে একটি কোম্পানির কমান্ডার ছিলেন; তাঁর কোম্পানি বীরত্বের জন্য পুরস্কৃত হয়। ১৯৬৬ সালে পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে প্রশিক্ষকের দায়িত্ব পান। সে বছরই কোয়েটা স্টাফ কলেজে কমান্ড কোর্সে যোগ দেন। ১৯৬৯ সালে জয়দেবপুরস্থ সেকেন্ড ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হিসেবে নিয়োগ পান। উচ্চ প্রশিক্ষণের জন্য পশ্চিম জার্মানিতে যান। ১৯৭০ সালে মেজর হিসেবে দেশে ফিরে আসেন এবং চট্টগ্রামে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হিসেবে নিয়োগ পান।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাত্রিতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যখন এদেশের নিরস্ত্র মানুষের ওপর বর্বর হামলা চালায়, তখন সব স্তরের জনগণ দিশেহারা হয়ে পড়ে। ২৬ মার্চ ঢাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বর আক্রমণের পর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করে ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে চট্টগ্রাম থেকে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন মেজর জিয়াউর রহমান। ২৭ মার্চ চট্টগ্রামস্থ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তিনি স্বাধীনতার ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন। ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠিত হলে তিনি সেক্টর কমান্ডার নিযুক্ত হন। পরে তিনটি সেক্টরের সমন্বয়ে জেড ফোর্সের অধিনায়ক হিসেবে যুদ্ধ পরিচালনা করেন। বৃহত্তর চট্টগ্রাম, নোয়াখালী ও কুমিল্লার কিয়দংশে মুক্তিপাগল মানুষকে সংগঠিত করেন। দীর্ঘ নয় মাস মরণপণ লড়াই করে অর্জিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশ। স্বাধীনতা যুদ্ধে সাহসী অবদানের জন্য তাঁকে ‘বীর উত্তম’ খেতাবে ভূষিত করা হয়।

স্বাধীনতার পর তিনি প্রথমে কুমিল্লা ব্রিগেড কমান্ডার এবং ১৯৭২ সালের জুন মাসে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ডেপুটি চিফ অব স্টাফ নিযুক্ত হন। ১৯৭২ সালে কর্নেল, ১৯৭৩-এর মাঝামাঝি ব্রিগেডিয়ার এবং শেষ দিকে মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি লাভ করেন।

রাষ্ট্রনায়ক জিয়া ও বহুদলীয় গণতন্ত্র
স্বাধীনতার ঘোষক, মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার ও জেড ফোর্সের প্রধান হিসেবে জিয়াউর রহমান এ দেশের মানুষের কাছে প্রথম পরিচিত হলেও পরে তিনি বাংলাদেশের একজন বরেণ্য রাষ্ট্রনায়কে পরিণত হন। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে রাজনৈতিক ঐকতানে নিয়ে আসা ও সুদৃঢ় অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর কারণে তাঁকে আধুনিক বাংলাদেশের স্থপতি হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়। তিনি বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের আদর্শের ভিত্তিতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপি গঠনের মধ্য দিয়ে দেশে উন্নয়ন ও উৎপাদনের রাজনীতির সূচনা করেন। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তিনি বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। অধ্যাপক একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী ছিলেন এর প্রথম মহাসচিব। জিয়ার এই দলে বাম, ডান ও মধ্যপন্থি সব ধরনের মানুষ ছিলেন। বিএনপির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল এর নিয়োগ পদ্ধতি; প্রায় ৪৫% সদস্য শুধু রাজনীতিতে নতুন ছিলেন না, তারা ছিলেন তরুণ।

১৯৭৮ সালের ৩ জুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জিয়াউর রহমান জয়লাভ করেন। এই নির্বাচনে মোট ১০ জন প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। এরপর মে মাসে ১৯ দফা কর্মসূচি ঘোষণা এবং আস্থা যাচাইয়ের জন্য ৩০ মে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়; হাঁ-সূচক ভোটে তিনি বিপুল জনসমর্থন লাভ করেন। ১৯৭৯ সালে দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ২৯৮টি আসনের মধ্যে ২০৭টিতে জয়লাভ করে। মালেক উকিলের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ৩৯টি ও মিজানুর রহমান চৌধুরির নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ২টি আসনে জয়লাভ করে। এছাড়া জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল ৮টি, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি ১টি ও মুসলিম ডেমোক্রেটিক লীগ ২০টি আসনে জয়লাভ করে।

জিয়াউর রহমান ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম জননির্বাচিত রাষ্ট্রপতি। যে রাষ্ট্রপতি জীবদ্দশায় গেছেন কৃষকের পর্ণকুটিরে, শ্রমিকের বস্তিতে; গ্রামে গ্রামে মাইলের পর মাইল পায়ে হেঁটে সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্টের কথা জেনে তা সমাধানের চেষ্টা করেছেন। তাঁর সৃষ্টিশীল নেতৃত্ব, দূরদর্শী রাজনৈতিক চিন্তা, জনসাধারণকে আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান করার পদক্ষেপ এবং নিজের প্রশ্নাতীত সততা তাঁকে সমসাময়িক কালের ঊর্ধ্বে প্রতিষ্ঠিত করে। ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’-এর ভিত্তিতে রাজনৈতিক দল গঠনের মাধ্যমে তিনি রাজনীতিতে সব মতের মানুষের সম্মিলন ঘটিয়েছিলেন। ‘দেশ’ ও ‘মানুষ’ই ছিল তাঁর রাজনীতির প্রধান প্রতিপাদ্য।

১৯৭৬ সালের ১৩ মার্চ রামপুরা টেলিভিশন ভবনে বেতার ও তথ্য বিভাগের পদস্থ অফিসারদের এক সমাবেশে জেনারেল জিয়াউর রহমান বলেছিলেন, “আমরা সকলে বাংলাদেশী। আমরা প্রথমে বাংলাদেশী এবং শেষেও বাংলাদেশী। এই মাটি আমাদের, এই মাটি থেকে আমাদের অনুপ্রেরণা আহরণ করতে হবে। জাতিকে শক্তিশালী করাই আমাদের লক্ষ্য। ঐক্য, শৃঙ্খলা, দেশপ্রেম, নিষ্ঠা ও কঠোর মেহনতের মাধ্যমেই তা সম্ভব।” (দৈনিক বাংলা, ১৪ মার্চ ১৯৭৬)

মিথ্যা প্রতিশ্রুতির অপরাজনীতি দ্বারা জনগণকে প্রতারিত করে স্বাধীনতাত্তোর ক্ষমতাসীন মহল যখন মানুষের বাক্-ব্যক্তি-স্বাধীনতাকে হরণ করে গণতন্ত্রের কবর রচনা করেছিল, দেশকে ঠেলে দিয়েছিল দুর্ভিক্ষের করাল গ্রাসে—এমনই জাতির এক চরম সংকটময় মুহূর্তে সৈনিক-জনতার ঐতিহাসিক বিপ্লবে শহীদ জিয়া ক্ষমতার হাল ধরেন। ক্ষমতায় এসেই মানুষের হারানো অধিকার ফিরিয়ে দিয়ে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন; নিশ্চিত করেন মানুষের বাক্ ও ব্যক্তি স্বাধীনতা। উৎপাদনের রাজনীতি প্রবর্তন করে তিনি দেশকে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধশালী করে গড়ে তুলতে সক্ষম হন। তাঁর তীব্র গণতান্ত্রিক চেতনা এবং দেশকে স্বনির্ভর করে গড়ে তোলার প্রচেষ্টা বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিকভাবে মর্যাদার আসনে সুপ্রতিষ্ঠিত করে। শহীদ জিয়া ছিলেন আধিপত্যবাদ ও সম্প্রসারণবাদের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এক আপসহীন দেশপ্রেমিক। তাই দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রকারীরা নিজেদের নীলনকশা বাস্তবায়নের কাঁটা ভেবে জিয়াকে নির্মমভাবে হত্যা করে। কিন্তু তাঁর এই আত্মত্যাগ জনগণের মধ্যে গড়ে উঠেছে দেশবিরোধী চক্রান্তকারীদের বিরুদ্ধে এক ইস্পাতকঠিন গণঐক্য।

১৯ দফা কর্মসূচি ও উন্নয়নের রাজনীতি
দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ১৯ দফা কর্মসূচি প্রণয়ন করেছিলেন:

১। সর্বোতভাবে দেশের স্বাধীনতা, অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা।

২। শাসনতন্ত্রের চারটি মূলনীতি—সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস ও আস্থা, গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের সমাজতন্ত্র—জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে প্রতিফলন করা।

৩। সর্ব উপায়ে নিজেদেরকে একটি আত্মনির্ভরশীল জাতি হিসেবে গড়ে তোলা।

৪। প্রশাসনের সর্বস্তরে, উন্নয়ন কার্যক্রম এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার ব্যাপারে জনসাধারণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।

৫। সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে কৃষি উন্নয়নের মাধ্যমে গ্রামীণ তথা জাতীয় অর্থনীতিকে জোরদার করা।

৬। দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা এবং কেউ যেন ভুখা না থাকে তার ব্যবস্থা করা।

৭। দেশে কাপড়ের উৎপাদন বাড়িয়ে সবার জন্য অন্তত মোটা কাপড় সরবরাহ নিশ্চিত করা।

৮। কোনো নাগরিক গৃহহীন না থাকে তার যথাসম্ভব ব্যবস্থা করা।

৯। দেশকে নিরক্ষরতার অভিশাপ থেকে মুক্ত করা।

১০। সকল দেশবাসীর জন্য ন্যূনতম চিকিৎসার বন্দোবস্ত করা।

১১। সমাজে নারীর যথাযোগ্য মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা এবং যুবসমাজকে সুসংগঠিত করে জাতি গঠনে উদ্বুদ্ধ করা।

১২। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বেসরকারি খাতে প্রয়োজনীয় উৎসাহ দান।

১৩। শ্রমিকদের অবস্থার উন্নতি সাধন এবং উৎপাদন বৃদ্ধির স্বার্থে সুস্থ শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক গড়ে তোলা।

১৪। সরকারি চাকরিজীবিদের মধ্যে জনসেবা ও দেশ গঠনের মনোবৃত্তিতে উৎসাহিত করা এবং তাদের আর্থিক অবস্থার উন্নয়ন করা।

১৫। জনসংখ্যা বিস্ফোরণ রোধ করা।

১৬। সকল বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে সমতার ভিত্তিতে বন্ধুত্ব গড়ে তোলা এবং মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা।

১৭। প্রশাসন ও উন্নয়ন ব্যবস্থা বিকেন্দ্রীকরণ এবং স্থানীয় সরকার শক্তিশালী করা।

১৮। দুর্নীতিমুক্ত ন্যায়নীতিভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা কায়েম করা।

১৯। ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে সকল নাগরিকের অধিকার পূর্ণ সংরক্ষণ করা এবং জাতীয় ঐক্য ও সংহতি সুদৃঢ় করা।

জিয়াউর রহমান ঘোষিত এই ১৯ দফা ছিল তাঁর উন্নয়নের মূলমন্ত্র। প্রেসিডেন্ট জিয়ার সময়ে দেশের প্রতিটি ক্ষেত্রে যে অভূতপূর্ব উন্নয়ন সাধিত হয়েছে, তার পেছনে গাইডলাইন হিসেবে কাজ করেছে ১৯ দফা। জেনারেল জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে ‘জাতীয় সেনাবাহিনী’ হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। প্রশিক্ষণ, কঠোর পরিশ্রম ও কর্তব্যনিষ্ঠার মাধ্যমে অফিসারদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি এবং তাদের মধ্যে দেশপ্রেম জাগাতে অসামান্য অবদান রাখেন তিনি। ধর্মীয় মূল্যবোধকে প্রাধান্য দিয়ে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তাদের আত্মবিশ্বাসী করে তোলেন।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দুর্বল-শক্তিশালী সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করেছেন। ভারত, চীন, পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরবসহ সবার সঙ্গে পারস্পরিক সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক স্থাপনে যথেষ্ট সফলতা দেখিয়েছেন। দীর্ঘমেয়াদি উদ্দেশ্য নিয়ে তিনি বৈদেশিক নীতি নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন করেন। জোটনিরপেক্ষ ও ইসলামী দেশগুলোর বিভিন্ন সম্মেলনে তাঁর ব্যক্তিগত ও সক্রিয় অংশগ্রহণে বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতিতে বিশেষ গতি সঞ্চারিত হয়। ব্যক্তিগত কূটনীতির মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক দুর্বলতা কাটিয়ে তুলতে সক্ষম হন।

রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের বৈদেশিক নীতির দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলকে তিন ভাগে আলোচনা করা যায়। প্রথমত, তিনি জাতিসংঘকে কেন্দ্র করে একটি বিশ্বব্যাপী শান্তির আবহ তৈরি করার লক্ষ্যে বাংলাদেশের কর্মকাণ্ড পরিচালিত করেন। জাতিসংঘের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনে অংশগ্রহণ করে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উন্নয়ন ঘটান। এর ফলেই বাংলাদেশ ১৯৮০ সালে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য নির্বাচিত হয়। তিনি উপমহাদেশের জন্য একটি স্থানীয় শান্তিকাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলো নিয়ে আসিয়ানের মতো সংস্থা গড়ার উদ্যোগ নেন, যা পরবর্তীকালে সার্ক নামে প্রতিষ্ঠা পায়।

রাষ্ট্রপতি জিয়ার পররাষ্ট্রনীতির আরেকটি লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যকে বহুমুখীকরণ এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ ও সাহায্যকে উৎসাহিত করা। তাঁর শাসনকালে বাংলাদেশকে অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর করে গড়ে তোলার নিরলস প্রচেষ্টার প্রশংসা করে বিশ্বের বিভিন্ন পত্রিকা। ইউনাইটেড প্রেস ইন্টারন্যাশনালের সুজান গ্রিন ঢাকা থেকে পাঠানো এক ডেসপাচে লিখেছিলেন, “সাম্যের প্রতীক ও সৎ লোকরূপে ব্যাপকভাবে গণ্য জিয়াউর রহমান স্বনির্ভর সংস্কার কর্মসূচি শুরু করে বাংলাদেশের ভিক্ষার ঝুড়ি ভাঙার প্রথম পদক্ষেপ নিয়েছেন।” মালয়েশিয় দৈনিক ‘বিজনেস টাইমস’-এ প্রকাশিত ওই ডেসপাচে বলা হয়, “অতীতে বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি হিসেবে পরিচিত করেছিল যে মহাপ্লাবী সমস্যাগুলো, প্রেসিডেন্ট জিয়া কার্যত সেগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন।” (দৈনিক ইত্তেফাক, ৪ নভেম্বর ১৯৭৯)

ওই সময় নিউইয়র্ক টাইমসের এক সংখ্যায় বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষা, স্বনির্ভরতা অর্জন এবং উৎপাদন দ্বিগুণ করার ব্যাপারে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অক্লান্ত প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করা হয়। কাজের জন্য জনগণকে সংগঠিত ও অনুপ্রাণিত করতে প্রেসিডেন্ট জিয়া প্রায়ই গ্রামে-গঞ্জে সফর করেন। ‘জনগণের সঙ্গে সংযোগ রক্ষায় বাংলাদেশী নেতা’ শিরোনামে মাইকেল টি. ক্যাফম্যানের এক রিপোর্টে গ্রামাঞ্চলে সপ্তাহে তিন-চারবার সফরের সময় জিয়াউর রহমানের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বিবরণ দেওয়া হয়।

নিরাপত্তার ক্ষেত্রে শহীদ জিয়ার আরেকটি অবদান হলো নাগরিক বাহিনী গঠনের চিন্তা বাস্তবায়ন করা। তিনি এক কোটি নারী ও পুরুষকে সাধারণ সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়ার লক্ষ্যে গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী গঠন করেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর—বিএনসিসি গঠনের মাধ্যমে দেশগঠন ও নিরাপত্তায় ছাত্রছাত্রীদের ভূমিকা রাখার সুযোগ করে দেন। জিয়াউর রহমানের গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী করার পদক্ষেপ বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো। কৃষকদের স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে গ্রামীণ উন্নয়ন প্রচেষ্টা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও বিশেষ প্রচার পায়। তিনি আমলানির্ভর প্রকল্প না করে স্থানীয় নেতাদের দ্বারা কৃষককে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। এতে কৃষকের মধ্যেও ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়।

সবচেয়ে বড় বিষয় হলো রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিপরীতে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’-এর প্রবর্তন করেন। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এক প্ল্যাটফর্মে থেকে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তিনি এদেশের মানুষের মধ্যে জাতীয়তাবোধ জাগানোর প্রয়াস চালান। অনেকটা সফলও হন তিনি। এ জাতীয়তাবাদী দর্শনই একটি জাতি ও দেশের রক্ষাকবচ।

জিয়া প্রবর্তিত উন্নয়নের রাজনীতির কতিপয় সাফল্য হলো: সকল দলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান; জাতীয় সংসদের ক্ষমতা বৃদ্ধি; বিচার বিভাগ ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেওয়া; দেশে কৃষি বিপ্লব, গণশিক্ষা বিপ্লব ও শিল্প উৎপাদনে বিপ্লব; সেচ ব্যবস্থা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে স্বেচ্ছাশ্রম ও সরকারি সহায়তার সমন্বয় ঘটিয়ে ১৪০০ খাল খনন ও পুনঃখনন; গণশিক্ষা কার্যক্রম প্রবর্তন করে অল্প সময়ে ৪০ লাখ মানুষকে অক্ষরজ্ঞান দান; গ্রামাঞ্চলে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় সহায়তা ও গ্রামোন্নয়ন কার্যক্রমে অংশগ্রহণের জন্য গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী—ভিডিপি গঠন; গ্রামাঞ্চলে চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি বন্ধ করা; হাজার হাজার মাইল রাস্তা-ঘাট নির্মাণ; ২৭,৫০০ পল্লী চিকিৎসক নিয়োগ করে গ্রামীণ জনগণের চিকিৎসার সুযোগ বৃদ্ধি; নতুন নতুন শিল্প-কলকারখানা স্থাপনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক বন্ধ্যাত্ব দূরীকরণ; কলকারখানায় তিন শিফট চালু করে শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি; কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও দেশকে খাদ্য রপ্তানির পর্যায়ে উন্নীতকরণ; যুব উন্নয়ন মন্ত্রণালয় ও মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয় সৃষ্টির মাধ্যমে দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে যুব ও নারী সমাজকে সম্পৃক্তকরণ; ধর্ম মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করে সকল মানুষের স্ব স্ব ধর্ম পালনের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি; বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সৃষ্টি করে প্রযুক্তির ক্ষেত্রে অগ্রগতি সাধন; তৃণমূল পর্যায়ে গ্রামের জনগণকে স্থানীয় প্রশাসন ব্যবস্থা ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা এবং সর্বনিম্ন পর্যায় থেকে দেশ গড়ার কাজে নেতৃত্ব সৃষ্টির লক্ষ্যে গ্রাম সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন; জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশের আসনলাভ; তিন সদস্যবিশিষ্ট আল-কুদস কমিটিতে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি; দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে ‘সার্ক’ প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগ গ্রহণ; বেসরকারি খাত ও উদ্যোগকে উৎসাহিতকরণ; জনশক্তি রপ্তানি, তৈরি পোশাক, হিমায়িত খাদ্য, হস্তশিল্পসহ সকল অপ্রচলিত পণ্যের রপ্তানির দ্বার উন্মোচন; শিল্পখাতে বেসরকারি বিনিয়োগের পরিমাণ বৃদ্ধি ও বিনিয়োগ ক্ষেত্রের সম্প্রসারণ। যে গার্মেন্টস ও টেক্সটাইলের ওপর আমাদের অর্থনীতি আজ দাঁড়িয়ে, তার গোড়াপত্তন করেন জিয়া।

জিয়ার রাষ্ট্রক্ষমতার সময় সংক্ষিপ্ত—পাঁচ বছরের একটু বেশি। এই স্বল্প সময়ে তিনি যুগান্তকারী সব কাজ করে গেছেন। তাঁর সঙ্গে ভারতবর্ষের ইতিহাসের পাঠান সম্রাট শেরশাহের অনেক মিল পাওয়া যায়। শেরশাহের শাসনভারও ছিল সংক্ষিপ্ত; কিন্তু জনকল্যাণে তাঁর কীর্তিগুলো ছিল অভিনব ও সুদূরপ্রসারী প্রভাবের। জিয়া জাতীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে একটি বড় রকমের ঝাঁকুনি দিয়ে গেছেন। রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি, ক্রীড়া, নারী, শিশু—সবকিছুতেই তিনি একটি বিপ্লব ঘটিয়েছেন। গোটা জাতিকে তিনি একাত্তরের মতো একতাবদ্ধ করতে পেরেছিলেন; একটি দৃঢ় জাতীয় সংহতি সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন। পরিচয়-সংকটে আক্রান্ত ও হীনম্মন্যতায় ভোগা জাতিকে তার সত্যিকারের পরিচয় এবং আপন স্বাধীন স্বকীয়তার পরিচিতি তিনি উন্মোচন করতে পেরেছিলেন। সে পরিচিতি বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের সংমিশ্রণে হাজার বছরের যে রসায়ন, তারই আবিষ্কার—নাম ছিল বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। এই জাতীয়তাবাদের ওপরই প্রতিষ্ঠিত তাঁর মন, মনন ও চেতনা—তাঁর রাজনৈতিক দর্শন। তাই তাঁর প্রিয় গান, যা তিনি আপন মনে গুনগুন করে গাইতেন—‘আমার জীবন বাংলাদেশ, আমার মরণ বাংলাদেশ।’

১৯৮১ সালের ৩০ মে: শহীদ জিয়াউর রহমান
১৯৮১ সালের ৩০ মে গভীর রাতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শহীদ হন। চট্টগ্রামে বিএনপির উপদলীয় কোন্দল নিরসনের লক্ষ্যে ২৯ মে সকালে পতেঙ্গা বিমানবন্দরে পৌঁছান রাষ্ট্রপতি জিয়া। সার্কিট হাউসে হালকা নাস্তা সেরে বারান্দায় বিএনপি নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনায় বসেন। জুম্মার নামাজ আদায় করেন চকবাজারের নন্দনপুরা মসজিদে। নামাজ শেষে মুসল্লীদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করে সার্কিট হাউসে ফিরে আসেন। দুপুরের খাবার সেরে ঘণ্টা দেড়েক বিশ্রাম নেন। বিকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, অধ্যাপক, আইনজীবী, সাংবাদিকসহ আগত অতিথীদের সঙ্গে আড়াই ঘণ্টা আলাপ করেন। এরপর স্থানীয় বিএনপির দুই উপদলের সঙ্গে রাত ৯টা থেকে ১১টা পর্যন্ত আলোচনা করেন। রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত চিকিৎসক লে. কর্নেল মাহতাবুল ইসলাম খাবার পরখ করে শেষ করলে রাত ১১টার একটু পর জিয়াকে রাতের খাবার দেওয়া হয়। ডিনার শেষে ঢাকায় স্ত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে টেলিফোনে মিনিট পনেরো কথা বলেন। জীবনের আলো নিভে যাওয়ার ৫ ঘণ্টা আগে ঘরের আলো নিভিয়ে ঘুমাতে যান তিনি।

রাত আড়াইটার দিকে কালুরঘাটস্থ রেডিও ট্রান্সমিটারের কাছে হাজির হয় ঘাতক দল। ঘাতকদলের নেতৃত্ব দেন লে. কর্নেল মতিউর রহমান। ঘাতকদল তিনটি দলে বিভক্ত হয়ে আক্রমণ পরিচালনার পরিকল্পনা নেয়। রাত সাড়ে তিনটার সামান্য পরে দল তিনটি প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যে গাড়ি চালিয়ে এগোতে থাকে। ঘাতকদল বিনাবাধায় সার্কিট হাউসে ঢুকে পড়ে। ভীতি সঞ্চারের জন্য রকেট ল্যান্সার থেকে ফায়ার ও গ্রেনেড চার্জ করা হয়; মেশিনগানের গুলি চালানো হয়। পাহারারত ৪৪ জন পুলিশের ১ জন নিহত, ১২ জন আহত হন; বাকিরা আত্মগোপন করেন। রাষ্ট্রপতির গার্ড রেজিমেন্টের সৈন্যরা তন্দ্রাচ্ছন্ন ছিল। রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তা কর্মকর্তা লে. কর্নেল আহসান ও ক্যাপ্টেন হাফিজ রাষ্ট্রপতিকে বাঁচাতে গিয়ে ঘাতকদের গুলিতে নিহত হন।

গোলাগুলি ও চিৎকার-চেঁচামেচিতে জিয়া চকিতে উঠে বসেন। কী ব্যাপার—ঘটনা প্রত্যক্ষ করতে দরজা খুলে বেরিয়ে আসেন; পরনে রাতের পোশাক। গভীর আত্মপ্রত্যয় ও অগাধ আস্থা নিয়ে বেরিয়ে এসে বলেন, “কি চাও তোমরা?” কাছে দাঁড়ানো লে. মোসলেহউদ্দিন রীতিমতো ঘাবড়ে যান। তিনি জিয়াকে আশ্বস্ত করেন, “স্যার, আপনি ঘাবরাবেন না। এখানে ভয়ের কিছু নেই।” কিন্তু মোসলেহউদ্দিনের মুখ থেকে আশ্বাসবাণী মিলিয়ে যাওয়ার আগেই লে. কর্নেল মতিউর রহমান তার এসএমজি থেকে অতি কাছ থেকে ব্রাশ ফায়ার করেন; জিয়ার শরীরের ডানদিক ঝাঝরা হয়ে যায়। দরজার কাছেই মুখ থুবড়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন জিয়া। এরপর মতিউর রহমান বন্দুকের নল দিয়ে জিয়ার প্রাণহীন দেহ উলটে নেন এবং মুখমন্ডল ও বুকে এসএমজির ট্রিগার টিপে ম্যাগাজিন খালি করে খুনের নেশা মেটান। আনুমানিক চার থেকে সাড়ে চারটায় জিয়ার মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে। জিয়াকে খুন করে ঘাতকদল দ্রুত সার্কিট হাউস ছেড়ে চলে যায়।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একাংশের হাতে কেন প্রেসিডেন্ট জিয়া নির্মমভাবে নিহত হয়েছিলেন—এ প্রশ্নের জবাব আজও জরুরি। ১৯৭৫ সালে সিপাহি-জনতার ষড়যন্ত্রবিনাশী অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় অভিষিক্ত হওয়ার পর জিয়াউর রহমানের মনোজগতে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। তাঁর চিন্তার জগতে শুধু সেনাবাহিনী বা চাকরি নয়—দেশের রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতিসহ সবকিছু অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। চিন্তার জগতের এই প্রসারতার প্রতিফলন ঘটে তাঁর বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে। জিয়াউর রহমান নিহত হয়েছিলেন তাঁরই প্রিয় সহকর্মী ও অনুগতদের হাতে। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। অতীতের ঘটনাবলির পর্যালোচনায় দুটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—প্রথমটি ষড়যন্ত্র, অপরটি সেনানায়ক থেকে তাঁর জননায়কে উত্তরণ। ষড়যন্ত্র তত্ত্বটি বহুল আলোচিত মনে হলেও এটি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাস্তবচিত্রের প্রতিফলন। এক্ষেত্রে কথাটিকে ষড়যন্ত্র না বলে একটি রাষ্ট্রের বিরাগভাজন হওয়াকেও উল্লেখ করা যেতে পারে। জিয়াউর রহমানের একটি বড় ‘অপরাধ’ ছিল—তিনি স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করতে চেয়েছিলেন। তিনি জানতেন, একটি রাষ্ট্র যদি তার ইচ্ছা অনুযায়ী পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে, তাহলে সে রাষ্ট্রটি সার্বভৌমত্বের মর্যাদা অর্জন করে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যেসব রাষ্ট্রনায়ক এই নীতি অনুসরণ করেছেন, তাদের অনেককেই নির্মম পরিণতি ভোগ করতে হয়েছে। জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতির স্বাধীন পথচলার কারণে বাংলাদেশ জগৎসভায় মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে তাঁর জননির্ভর রাজনীতি ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সামরিক শাসন দীর্ঘায়িত না করে তিনি গণরাজনীতিকে উদ্ধার করেন ১৯৭৫-পূর্ব সময়ের পঙ্কিল আবর্ত থেকে। একই সঙ্গে তিনি নিজেও বেরিয়ে আসেন সেনা প্রভাব থেকে এবং রাজনীতিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন ব্যক্তির কাছে। জিয়াউর রহমানের আগে ব্যক্তি আসত রাজনীতির কাছে; কিন্তু তিনি রাজনীতিকে নিয়ে যান ব্যক্তির কাছে। এটি রাজনীতিবিদ ও সেনা কর্মকর্তাসহ অনেকের মনোকষ্টের কারণ হয়। এ কারণেই তাঁর খণ্ডিত উদ্ধৃতি ব্যবহার করে তাঁকে ভিলেন বানানোর চেষ্টা করেন সেইসব ব্যক্তি, যারা বিভিন্ন কলাকৌশলে জনগণের ওপর তাদের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে চান। বাংলাদেশের সব রাজনীতিবিদের মধ্যে জিয়াউর রহমানই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি দেশের লাখো লাখো মানুষের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন, তাদের দুয়ারে গিয়েছেন, দিন ও রাতে তাদের সুখ-দুঃখের কাহিনি শুনেছেন এবং পরামর্শ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। জনরাজনীতির যে ধারার সূত্রপাত ঘটে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে, তাঁকে হত্যার মধ্য দিয়ে সেই ধারার অবসান ঘটে। জনগণের কাছে পৌঁছতে পেরে জিয়াউর রহমান অত্যুজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, যা স্বাধীন বাংলাদেশে এখনো আর কেউ স্থাপন করতে পারেননি। এই জনরাজনীতির উন্মেষই জিয়াউর রহমানের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, আমলা ও সেনাবাহিনীসহ সমাজের বিভিন্ন সুবিধাভোগী গোষ্ঠী, যারা রাষ্ট্রযন্ত্রকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, তাদের কাছে জনরাজনীতির বিকাশ হুমকির মতো মনে হয়।

জিয়াউর রহমানের আরেকটি বড় অবদান আধুনিক বাংলাদেশ নির্মাণের পথ চলার সূত্রপাত। তিনি তাঁর সব কর্মকাণ্ড দিয়ে বাংলাদেশকে একটি আধুনিক রাষ্ট্রে পরিণত করতে চেয়েছিলেন, যার অসংখ্য উদাহরণ এখনো টিকে আছে। এই আধুনিকীকরণের প্রয়াসও জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে খড়গহস্ত হতে অন্ধকারের শক্তিকে উৎসাহিত করেছিল। জিয়াউর রহমান বেঁচে আছেন তাঁর কর্মের মাধ্যমে। যদিও সেসব কর্মের বহু প্রতীক মুছে ফেলার চেষ্টা হচ্ছে; কিন্তু সে উদ্যোগ জনসমর্থন লাভ করেনি। ঘোষণা দিয়ে অথবা পরিপত্র জারি করে জনমন থেকে তাদের প্রিয় নেতার নাম মুছে ফেলা যায় না।

জিয়াউর রহমানকে রাজধানী ঢাকায় জাতীয় সংসদের উত্তর পাশে চন্দ্রিমা উদ্যানে দাফন করা হয়। ২০০২ সালের ডিসেম্বরে চন্দ্রিমা উদ্যানে শহীদ জিয়ার সমাধিস্থল ঘিরে মাজার কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হয়। প্রেসিডেন্ট জিয়ার জানাজায় বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ জনসমাগম ঘটে, যেখানে প্রায় ২০ লাখেরও বেশি মানুষ সমবেত হয়। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে অভূতপূর্ব শোকের ছায়া নেমে আসে। গণমানুষের এই শোক জিয়াউর রহমানের আদর্শ ও নীতির প্রতি দেশবাসীর ব্যাপক সমর্থনের বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নামে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোতে একটি অ্যাভিনিউয়ের নামকরণ করা হয়েছে।

২০২৬ সালের প্রাসঙ্গিকতা: জাতীয় ঐক্যের অঙ্গীকার
জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ক্ষণজন্মা রাষ্ট্রনায়ক। নানা কারণে তিনি বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ও গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ে স্থান করে নিয়েছেন। তাঁর সততা, নিষ্ঠা, গভীর দেশপ্রেম, পরিশ্রমপ্রিয়তা, নেতৃত্বের দৃঢ়তা প্রভৃতি গুণাবলি এ দেশের গণমানুষের হৃদয়কে স্পর্শ করেছিল। তিনি ছিলেন একজন পেশাদার সৈনিক; তা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের কাছে তাঁর যে গ্রহণযোগ্যতা ছিল, অন্য কোনো রাষ্ট্রনায়কের ভাগ্যে তা জোটেনি। মাত্র ছয় বছর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছিলেন জিয়াউর রহমান; কিন্তু সাধারণ মানুষ তাঁর ওপর ছিল প্রচণ্ড আস্থাশীল। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মানুষের এই আস্থায় কোনো চিড় ধরেনি।

১৯৭১ সালের যুদ্ধ ছিল স্বাধীনতা অর্জনের; ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর ছিল সেই স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার সংগ্রাম; ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান ছিল স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন; আর ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান ছিল ফ্যাসিবাদ ও জনবিরোধী শাসনের বিরুদ্ধে জনগণের জাগরণ। এসব আন্দোলনের মূল আকাঙ্ক্ষা একটাই—স্বাধীন বাংলাদেশে জনগণের সকল গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং একটি স্বনির্ভর, নিরাপদ ও কল্যাণমূলক রাষ্ট্র বিনির্মাণ। ৭ নভেম্বর আমাদের یاد করিয়ে দেয়, এই আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে জাতীয় ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই।

বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক-ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় জাতীয় ঐক্য সমুন্নত রাখতে হলে আমাদের ৭ নভেম্বরের মতো সিপাহি-জনতার বিপ্লবের চেতনা মনেপ্রাণে ধারণ করতে হবে। দলীয় বিভেদ, প্রতিহিংসা ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতি নয়; বরং দেশ ও জনগণের স্বার্থকে সর্বোচ্চ স্থানে রেখে ঐক্যবদ্ধ হওয়াই আজকের প্রধান দায়িত্ব। ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতা অভ্যুত্থান প্রমাণ করে, দেশ ও জাতির স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব যখন হুমকির মুখে পড়ে, তখন দেশপ্রেমিক সৈনিক ও সাধারণ মানুষ একসঙ্গে দাঁড়াতে জানে।

এই দিনে আমাদের অঙ্গীকার হোক: ভবিষ্যতে আর কেউ দেশ ও জনগণের অধিকার হরণ করতে পারবে না, বাংলাদেশকে তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করতে পারবে না। ৭ নভেম্বরের বৈপ্লবিক চেতনাই হোক বাংলাদেশের আগামী নির্মাণের প্রেরণা ও পাথেয়। দেশপ্রেমিক গণতন্ত্রকামী জনগণের দীপ্ত উচ্চারণ হোক: “দিল্লি নয়, পিণ্ডি নয়, নয় অন্য কোনো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ।”

৭ নভেম্বর আজ বেঁচে নেই কোনো আনুষ্ঠানিকতার মাঝে; ৭ নভেম্বর বেঁচে আছে কোটি মানুষের হৃদয়ে—স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রের চেতনা হিসেবে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান আজ বেঁচে নেই; কিন্তু আছে তাঁর রেখে যাওয়া ১৯ দফা কর্মসূচি, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের দর্শন, তাঁর সততা, দেশপ্রেম, জনগণের ভালোবাসা এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল বিএনপি। বাংলাদেশ বিশ্বের মানচিত্রে একটি আত্মনির্ভরশীল জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে—এই ছিল শহীদ জিয়ার স্বপ্ন। ৭ নভেম্বরের চেতনা আমাদের সেই স্বপ্ন পূরণের পথেই আহ্বান জানায়।

লেখক:
ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম রেজাউল করিম,
চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী গবেষণা কেন্দ্র

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

ঐতিহাসিক জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস ও শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান

আপডেট সময় ০৩:২৫:২৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬

৭ নভেম্বর ২০২৬। ঐতিহাসিক জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস। ১৯৭৫ সালের এই দিনে দেশের সিপাহি-জনতা ঐক্যবদ্ধভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে সকল চক্রান্ত রুখে দিয়েছিল। বাংলাদেশের ইতিহাসে ৭ নভেম্বর তাই এক বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এটি শুধু একটি দিনের নাম নয়; এটি জাতির শত্রু-মিত্র চিহ্নিত করার, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার এবং গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের একটি প্রতীক।

বাংলাদেশের জন্ম, মুক্তিযুদ্ধ ও পরবর্তী রাজনৈতিক উত্থান-পতন নিয়ে আলোচনা করতে গেলে একটি প্রবাদবাক্য প্রণিধানযোগ্য: “অতীত নিয়ে সবসময় পড়ে থাকলে এক চোখ অন্ধ, অতীতকে ভুলে গেলে দু’চোখই অন্ধ।” ইতিহাসকে অস্বীকার করা যায় না; আবার ইতিহাসের গণ্ডিতে আটকে থেকেও ভবিষ্যৎ নির্মাণ করা যায় না। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের পথ রচনা করাই একটি জাতির পরিপক্বতার পরিচয়। ৭ নভেম্বর আমাদের সেই শিক্ষাই দেয়—স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র রক্ষায় জাতীয় ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই।

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের পথ নির্ণয়ের একটি তারিখ। যারা বাংলাদেশকে তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করে রাখতে চেয়েছিল, যারা জনগণের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অধিকার হরণ করে দেশে একদলীয় স্বৈরাচারী শাসন কায়েম করতে চেয়েছিল, যারা দেশের শৌর্য, বীর্য, সাহস ও সম্মানের প্রতীক সেনাবাহিনীর গৌরবকে ভূলুণ্ঠিত করতে চেয়েছিল—১৯৭৫ সালের এই দিনে দেশপ্রেমিক সিপাহি-জনতার ঐতিহাসিক বিপ্লবের মাধ্যমে তাদের পরাজয় ঘটে। এই বিপ্লব প্রমাণ করে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর হাতে বিকিয়ে দেওয়ার বিষয় নয়; এটি লাখো শহীদের রক্ত ও কোটি মানুষের আকাঙ্ক্ষার ফসল।

১৯৭৫ সালের পটভূমি: চার দিনের অনিশ্চয়তা
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে চরম অস্থিরতা শুরু হয়। এরপর সেনা অভ্যুত্থান ও পাল্টা অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশ এক অনিশ্চিত পরিস্থিতির দিকে এগোতে থাকে। ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর একটি উচ্চাভিলাষী অংশ সামরিক অভ্যুত্থান ঘটায়। তারা তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে ক্যান্টনমেন্টের বাসভবনে বন্দি করে। এরপর বঙ্গভবনের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হয়, তৎকালীন প্রেসিডেন্ট খন্দকার মোশতাক আহমদকে গ্রেফতার করা হয়, মন্ত্রিসভা বিলুপ্ত ও জাতীয় সংসদ ভেঙে দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। প্রধান বিচারপতি আবু সা’দাত মোহাম্মদ সায়েমকে রাষ্ট্রপতির পদে বসানো হয়।

এই ঘটনায় সাধারণ জনগণ ও সিপাহীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীর সর্বমহলে, বিশেষত সাধারণ সিপাহীদের কাছে ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয়। ফলে তারা পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণ ও জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করার পরিকল্পনা করতে থাকে। ৩ থেকে ৬ নভেম্বর মধ্যরাত পর্যন্ত দেশ এক শ্বাসরুদ্ধকর, অনিশ্চিত ও ভীতিকর পরিস্থিতির মধ্যে থাকে। স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়ে। কিন্তু ৬ নভেম্বর গভীর রাতে সেনাবাহিনীর সাধারণ সিপাহীরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। সেই অভ্যুত্থানে স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন নিয়ে আপামর জনতা রাজপথে নেমে আসে। সিপাহি-জনতার মিলিত সেই বিপ্লবে বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান। পাল্টা অভ্যুত্থান ঠেকাতে গিয়ে প্রাণ হারান খালেদ মোশাররফ ও তার কতিপয় অনুসারী।

পরদিন ৭ নভেম্বর সর্বস্তরের সৈনিক ও জনতা সম্মিলিতভাবে ঢাকার রাস্তায় নেমে আসে; এই ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে। অভূতপূর্ব এক সংহতির নজির সৃষ্টি হয়। ৬ নভেম্বর মধ্যরাতে ঘটে সিপাহি-জনতার ঐক্যবদ্ধ বিপ্লব, যা ইতিহাসে ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে স্থান লাভ করে। দেশবাসী সেদিন জিয়াউর রহমানের হাতেই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব তুলে দেয়।

তদানীন্তন দৈনিক বাংলার ৭ নভেম্বরের রিপোর্টে বলা হয়, “সিপাহি ও জনতার মিলিত বিপ্লবে চারদিনের দুঃস্বপ্ন শেষ হয়েছে। মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার রাত প্রায় ১টায় সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী, নৌবাহিনীর সিপাহি-জওয়ানরা বিপ্লবী অভ্যুত্থান ঘটিয়েছেন। ষড়যন্ত্রের নাগপাশ ছিন্ন করে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে উদ্ধার করেছেন বিপ্লবী সিপাহীরা।” ৭ নভেম্বর ভোরে রেডিওতে ভেসে আসে, “আমি মেজর জেনারেল জিয়া বলছি।” জেনারেল জিয়া জাতির উদ্দেশে ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে যথাস্থানে নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানান।

সেদিন রাজধানী ঢাকা ছিল মিছিলের নগরী। পথে পথে সিপাহি-জনতা একে অপরকে আলিঙ্গন করেছে। “নারায়ে তাকবির, আল্লাহু আকবর”, “বাংলাদেশ জিন্দাবাদ” ধ্বনিতে আকাশ-বাতাস মুখরিত হয়ে ওঠে। আনন্দে উদ্বেলিত হাজার হাজার মানুষ রাজপথে নেমে আসে। সাধারণ মানুষ ট্যাঙ্কের নলে ফুলের মালা পরিয়ে দেয়। এই আনন্দের ঢেউ রাজধানী ছাড়িয়ে দেশের সব শহর-নগর-গ্রামে পৌঁছে যায়।

আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস তার ‘বাংলাদেশ: এ লিগ্যাসি অব ব্লাড’ বইতে ৭ নভেম্বর সম্পর্কে লিখেছেন, ১৯৭৫ সালের ৫ ও ৬ নভেম্বর ক্যান্টনমেন্টসহ সারা শহরে হাজার হাজার প্রচারপত্র ছড়ানো হয়। একটি ব্যাপারে ডান ও বাম উভয় রাজনৈতিক দলই একমত ছিল—খালেদ মোশাররফ একজন বিশ্বাসঘাতক, ভারতের দালাল এবং সে ঘৃণিত বাকশাল ও মুজিববাদ ফিরিয়ে আনতে চাইছে। ৭ নভেম্বর ভোরের দিকে জওয়ানরা ব্যারাক থেকে বেরিয়ে পড়ে। সারা ঢাকা শহরে এই ‘সিপাহি বিপ্লব’ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। রাত ১টার মধ্যেই সিপাহীরা পুরো ক্যান্টনমেন্ট দখল করে নেয়। একদল জওয়ান যায় জেনারেল জিয়ার বাসভবনে। চার দিন বন্দি থাকার পর মুক্তি পান জেনারেল জিয়া। নৈশ পোশাক পরা অবস্থাতেই উল্লসিত জওয়ানরা তাকে কাঁধে করে নিয়ে যায় ২ ফিল্ড আর্টিলারির হেডকোয়ার্টারে। ঘটনার আকস্মিকতায় জিয়া তখন বিহ্বল। নাম না জানা অনেক জওয়ানের সঙ্গে আলিঙ্গন ও করমর্দন করেন তিনি।

মাসকারেনহাস আরও লিখেছেন, রেডিওতে ক্রমাগত সিপাহি-জনতার বিপ্লবের ঘোষণা এবং জেনারেল জিয়ার ক্ষমতা গ্রহণের খবর শুনে হাজার হাজার লোক স্রোতের মতো রাস্তায় নেমে আসে। তিন দিন ধরে তারা বিশ্বাস করছিল, ভারত খালেদ মোশাররফের মাধ্যমে তাদের কষ্টে অর্জিত স্বাধীনতাকে বিপন্ন করছে। এখন সেই দুঃস্বপ্ন কেটে গেছে। সর্বত্র জওয়ান ও সাধারণ মানুষ খুশিতে একে অপরের সঙ্গে কোলাকুলি করে, রাস্তায় নামে। সারারাত তারা স্লোগান দেয়—“আল্লাহু আকবর, বাংলাদেশ জিন্দাবাদ, সিপাহি বিপ্লব জিন্দাবাদ।” অবস্থা দেখে মনে হচ্ছিল, ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের মতো এদেশের মানুষ আবার জেগে উঠেছে। এটি ছিল একটি স্মরণীয় রাত।

৭ নভেম্বরের প্রকৃত তাৎপর্য
৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতা অভ্যুত্থানের প্রকৃত তাৎপর্য হলো—শাসক সমাজের ওপর বৈদেশিক মুরুব্বিয়ানার বাধ্যতা প্রত্যাখ্যান করে গণচেতনায় জাতিরাষ্ট্রের আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধার। দেশবাসীর মনে সার্বভৌমত্বের গর্ববোধ পুনঃপ্রতিষ্ঠা। পঁচিশ বছর মেয়াদি শান্তি ও মৈত্রী চুক্তির অসম সম্পর্কের মায়াজাল এদেশের অভিজাত সমাজে যে ভারতমুখাপেক্ষিতা ও হীনম্মন্যতার প্রসার ঘটিয়েছিল, তার বজ্রআঁটুনি ছিন্ন করেছিল দৃপ্ত সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান। রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে উৎখাত হয়েছিল দিল্লির প্রাসাদকামী পরগাছার জঞ্জাল।

এই দিন থেকে জাতিরাষ্ট্রের আত্মমর্যাদাবোধ যে স্বকীয়তা, স্বনির্ভরতা ও আত্মোন্নতির উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছিল, তা আজও জাতিকে প্রেরণা জোগায়। যদিও ভূরাজনৈতিক চক্রান্তে আবারও রাষ্ট্রক্ষমতা দিল্লির পদলেহী একটি পরিবারতন্ত্রের সংঘশক্তির করায়ত্ত হতে পারে; জাতিরাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান ও সংবিধানকে সাবোটাজ করে সেই শক্তি এদেশকে বিশ্বের চোখে স্বশাসনের অযোগ্য প্রমাণ করতে উঠে পড়ে লাগতে পারে; বাংলাদেশের ভারতভুক্তির একটি নীলনকশা অনুসরণ করতে পারে—তবু নভেম্বর বিপ্লবে জাগ্রত দেশবাসী পদে পদে নতজানু ভারতমুখাপেক্ষী উদ্যোগগুলোকে জনমতের প্রাচীর দিয়ে অবরুদ্ধ করেছে। জনস্বার্থ রক্ষায় রাষ্ট্রের বিকলাঙ্গ প্রতিষ্ঠানগুলোর খর্বশক্তি দিয়েও প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। চলমান বিশ্বব্যবস্থার সংঘাতসঙ্কুল আবর্তে, আঞ্চলিক আধিপত্যবাদের হুমকিতে কিংবা বিশ্বায়ন প্রক্রিয়ার গোলকধাঁধায় দেশবাসী পথ হারায়নি। রাষ্ট্রঘাতী চক্রান্তের মোকাবেলায় রাজপথে নেমে এসেছে; প্রতিবাদে-প্রতিরোধে সোচ্চার হয়েছে। রাষ্ট্রঘাতী চক্রের কবল থেকে অচিরেই আবার রাষ্ট্রক্ষমতা ছিনিয়ে নেবে জাগ্রত জনতা—এই বিশ্বাসই ৭ নভেম্বরের চেতনা।

রেডিও বাংলাদেশে এক সংক্ষিপ্ত ভাষণে জেনারেল জিয়াউর রহমান ঘোষণা করেন, তিনি সাময়িকভাবে প্রধান আইন প্রশাসকের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছেন। সেনাবাহিনীর অনুরোধে এবং দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়েই তিনি এ দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তিনি বলেন, সাধ্য অনুযায়ী তিনি তার কর্তব্য পালন করবেন। দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য তিনি সবাইকে ঐক্যবদ্ধ ও কঠোর পরিশ্রম করার আহ্বান জানান। তিনি অবিলম্বে সবাইকে কাজে যোগ দেওয়ার নির্দেশ দেন।

৭ নভেম্বরের পরবর্তী রাজনীতি ও জিয়াউর রহমান
৭ নভেম্বর সংঘটিত হওয়ার পর প্রতিটি সরকার দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করেছে। কিন্তু ড. ফখরুদ্দীনের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার এ দিনের সরকারি ছুটি বাতিল করে এবং দিবসটি পালন করা থেকে বিরত থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় আঁতাতের মাধ্যমে ক্ষমতার মসনদে চেপে বসা আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারও তা পালন করছে না। এর আগে ১৯৯৬ সালের আওয়ামী লীগ সরকারও দিবসটি পালন করা থেকে বিরত ছিল এবং সরকারি ছুটি বাতিল করেছিল। অথচ ৭ নভেম্বর জাতীয় জীবনের এক ঐতিহাসিক দিন। ১৯৭৫ সালের এই দিনে সৈনিক-জনতা রাজপথে নেমে এসেছিল জাতীয় স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র রক্ষার দৃঢ় প্রত্যয় বুকে নিয়ে। তাই ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক বিপ্লব অত্যন্ত তাৎপর্যমণ্ডিত।

স্বাধীনতাত্তোর রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা, তৎকালীন ক্ষমতাসীন মহলের নিজেদের স্বার্থের অনুকূলে দেশের স্বাধীনতা বিকিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা এবং ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করার জন্য মানুষের বাক্, ব্যক্তি ও মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে গলাটিপে হত্যা করে একদলীয় বাকশাল কায়েম করা হয়। ফলে দেশে চরম অশান্তি ও হতাশা নেমে আসে। বাকশালী সরকার চরম অগণতান্ত্রিক ও ফ্যাসিবাদী পন্থায় মানুষের ন্যায়সংগত প্রতিবাদকে দমন করে। দেশমাতৃকার এই চরম সংকটকালে ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর আধিপত্যবাদের এদেশীয় এজেন্টদের কূটকৌশলে মহান স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমানকে সপরিবারে ক্যান্টনমেন্টে বন্দি করা হয়। এই অরাজক পরিস্থিতিতে স্বজাতির স্বাধীনতা রক্ষায় অকুতোভয় দেশপ্রেমিক সৈনিক এবং জনতার ঢল রাজপথে এক অনন্য সংহতির স্ফুরণে ৭ নভেম্বর জিয়া মুক্ত হন। এই পটপরিবর্তনে রাষ্ট্রপতি জিয়ার নেতৃত্বে দেশের স্বাধীনতা সুরক্ষিত হয় ও গণতন্ত্র অগ্রগতির পথে এগিয়ে যায়; বহুদলীয় গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়। মানুষের মনে স্বস্তি ফিরে আসে। আধিপত্যবাদী শক্তি ও তাদের এ দেশীয় অনুচররা উদ্দেশ্য সাধনের পথে কাঁটা মনে করে ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াকে হত্যা করে।

দেশপ্রেম ঈমানের অঙ্গ। একজন ঈমানদার মানুষের মধ্যে দেশপ্রেম থাকা অপরিহার্য। দেশপ্রেম ও সততা শব্দ দুটি একে অন্যের পরিপূরক। যে দেশপ্রেমিক সে অবশ্যই সৎ; আবার যে ব্যক্তি সৎ তার মধ্যে অবশ্যই দেশপ্রেম আছে। একজন প্রকৃত নেতার মধ্যে অনেক গুণাবলি থাকা আবশ্যক; তার মধ্যে দেশপ্রেম ও সততা অন্যতম। সততা ও দেশপ্রেমের কারণেই শহীদ জিয়া আমাদের প্রিয় নেতা ও জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব। আমাদের বিশ্বাস, জিয়াউর রহমানের যে কট্টর সমালোচক, সেও জিয়াউর রহমানের সততা ও দেশপ্রেম নিয়ে কটূক্তি করতে পারবে না। সততা ও দেশপ্রেমের প্রশ্নে আপসহীন এই মহান নেতা দেশের কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ের মণিকোঠায় অবস্থান করে নিয়েছেন।

জিয়াউর রহমানের জীবন ও মুক্তিযুদ্ধ
মুহাম্মদ মনসুর রহমান ও জাহানারা খাতুনের দ্বিতীয় পুত্র শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দের ১৯ জানুয়ারি বগুড়া জেলার বাগাবাড়ী গ্রামে তাঁর পিতামহের বসতবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শিশুকাল ও শৈশবের প্রথম অধ্যায় কেটেছে এই বাগাবাড়ী গ্রামেই। মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হলো শৈশব; কারণ এই সময়টাই নিজেকে আবিষ্কার করার এবং প্রকৃতির ভেতর নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার সময়। জিয়াউর রহমানও এর ব্যতিক্রম নন।

জিয়াউর রহমানের ডাকনাম ছিল ‘কমল’। কমল অর্থ পদ্ম। পিতা মুহাম্মদ মনসুর রহমান ও মাতা জাহানারা খাতুনের বড় আদরের সন্তান ছিলেন এই কমল। তাঁরা হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন, তাঁদের এই সন্তান পদ্মের মতো বিকশিত হয়ে উঠবে আপন গুণ, গরিমা ও প্রতিভায়। পিতা-মাতার নিবিড় পরিচর্যায় বড় হলেও তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে পিতামহ মৌলভী কামাল উদ্দিন মন্ডল এবং মাতামহী রহিমা খাতুনের প্রত্যক্ষ প্রভাব লক্ষ করা যায়। এছাড়া মাতামহ আবুল কাশেম আহম্মেদ, পিতামহী মিসির উন্নিসা বেগম এবং চাচা ডা. মমতাজুর রহমানের পরোক্ষ প্রভাবও তাঁর চরিত্রে দেখা যায়।

ধার্মিক ও ব্যক্তিত্ববান পিতামহ মৌলভী কামাল উদ্দিনের সাহচর্যে কাটে জিয়াউর রহমানের মধুর শিশুকাল। দ্বিতীয়ত, মাতামহী রহিমা খাতুনের প্রভাবও তাঁর ওপর প্রভাব বিস্তার করে। তিনি ছিলেন বহু বিরল গুণের অধিকারিণী, তেহস্বিনী মহিলা, সংগীতচর্চা করতেন। শিক্ষা ও সাহিত্যের প্রতি তাঁর বিশেষ আগ্রহ ও অনুরাগ ছিল। জিয়াউর রহমানের মাতা জাহানারা খাতুনের সংগীতগুরু ছিলেন জিয়ার মাতামহী। জিয়া গভীর আগ্রহ নিয়ে সারাদিন পরিশ্রম করে ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরলেও খাওয়া-দাওয়ার পর বিছানায় গিয়ে সংগীতের প্রতি অনুরক্ত হতে ভুলতেন না। ছোটবেলা থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই অভ্যাস তাঁর মধ্যে বিদ্যমান ছিল।

ছোটবেলায় জিয়া খুব খেলাধুলা করতেন। ফুটবল, হকি ও ক্রিকেট ছিল তাঁর প্রিয় খেলা। মাঝেমধ্যে গুলি, ডান্ডাও খেলতেন। আবার কখনো কখনো বৃষ্টিতে ভিজতেন, কাদা মেখে আনন্দ পেতেন। কখনো আকাশে ঘুড়ি উড়াতেন। খেলাধুলায় মেতে থাকলেও সন্ধ্যায় রাস্তায় বাতি জ্বলে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ি ফিরে যেতেন। এরপর লেখাপড়ায় মনোনিবেশ করতেন। খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে যাওয়া তাঁর ছোটবেলার অভ্যাস ছিল। স্বল্পভাষী হলেও ছেলেবেলায় তিনি ছিলেন প্রাণবন্ত। চকলেট তাঁর খুব প্রিয় ছিল। পছন্দ করতেন মিষ্টি ও মুরগির গোশত। বিশেষ করে মুরগির পাখনাকে শিশুকালে তিনি নাম দিয়েছিলেন ‘লাঙল’। আর প্রিয় খাবার ছিল ভাজা বাসি ভাত, বগুড়ার আঞ্চলিক ভাষায় যাকে বলা হয় ‘কড়কড়া’।

জিয়াউর রহমানের বয়স যখন ৪ বছর, তখন থেকে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে স্কুলে যাতায়াত শুরু করেন। সালটি ছিল ১৯৪০। কারণ তাঁর পিতামহ মৌলভী কামাল উদ্দিন মন্ডল ছিলেন বাগাবাড়ি মাইনর স্কুলের প্রধান শিক্ষক। জিয়ার হাতে খড়ি হয় তাঁরই পিতামহের হাতে। বাগাবাড়িতে তিনি ছিলেন ছোট কমলের প্রথম শিক্ষাগুরু। সেই সূত্রে জিয়াউর রহমানের সৌভাগ্য যে তিনি পিতামহের কাছ থেকে জীবনের বিভিন্ন বিষয় ও বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়ন করতে শিখেছিলেন। এরপর ১৯৪৩ সালে তাঁর পিতা মুহাম্মদ মনসুর রহমান পরিবারকে কলকাতায় নিয়ে যান। তখন জিয়ার বয়স ৬ বছর। তাঁকে ভর্তি করা হয় পার্ক সার্কাসের আমীন আলী এভিনিউতে অবস্থিত শিশু বিদ্যাপীঠে। এক বছর সেখানে পড়াশোনার পর পরিবার আবার বগুড়ার বাগাবাড়িতে ফিরে যায়। বাগাবাড়ি মাইনর স্কুলে এক বছর ভর্তি হন জিয়া। এরপর পরিবার আবার কলকাতায় ফিরে আসে। ১৯৪৪ সালে জিয়াকে কলকাতার কলেজ স্ট্রিটের হেয়ার স্কুলে তৃতীয় শ্রেণিতে ভর্তি করা হয়। সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত তিনি হেয়ার স্কুলেই লেখাপড়া করেন।

১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর জিয়ার পিতা মো. মনসুর রহমান সরকারি চাকরিসূত্রে পরিবার নিয়ে পাকিস্তানের করাচিতে চলে আসেন। ১৯৪৮ সালের ১ জুলাই জিয়াকে করাচি একাডেমি স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে সেই স্কুলের নাম তাইয়েব আলী আলভী একাডেমি। ১৯৫২ সালে তিনি দ্বিতীয় বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করেন করাচি একাডেমি স্কুল থেকে। ম্যাট্রিক পাসের পর ভর্তি হন করাচির ডি. জে. কলেজে। ১৯৫৩ সালে পাকিস্তান সামরিক একাডেমিতে একজন অফিসার ক্যাডেট হিসেবে যোগ দেন। ১৯৫৫ সালে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট হিসেবে কমিশন পান। ১৯৫৭ সালে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে বদলি হয়ে আসেন। ১৯৫৯ থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগে কাজ করেন। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে খেমকারান সেক্টরে একটি কোম্পানির কমান্ডার ছিলেন; তাঁর কোম্পানি বীরত্বের জন্য পুরস্কৃত হয়। ১৯৬৬ সালে পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমিতে প্রশিক্ষকের দায়িত্ব পান। সে বছরই কোয়েটা স্টাফ কলেজে কমান্ড কোর্সে যোগ দেন। ১৯৬৯ সালে জয়দেবপুরস্থ সেকেন্ড ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হিসেবে নিয়োগ পান। উচ্চ প্রশিক্ষণের জন্য পশ্চিম জার্মানিতে যান। ১৯৭০ সালে মেজর হিসেবে দেশে ফিরে আসেন এবং চট্টগ্রামে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হিসেবে নিয়োগ পান।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাত্রিতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যখন এদেশের নিরস্ত্র মানুষের ওপর বর্বর হামলা চালায়, তখন সব স্তরের জনগণ দিশেহারা হয়ে পড়ে। ২৬ মার্চ ঢাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বর আক্রমণের পর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করে ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে চট্টগ্রাম থেকে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন মেজর জিয়াউর রহমান। ২৭ মার্চ চট্টগ্রামস্থ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তিনি স্বাধীনতার ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন। ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠিত হলে তিনি সেক্টর কমান্ডার নিযুক্ত হন। পরে তিনটি সেক্টরের সমন্বয়ে জেড ফোর্সের অধিনায়ক হিসেবে যুদ্ধ পরিচালনা করেন। বৃহত্তর চট্টগ্রাম, নোয়াখালী ও কুমিল্লার কিয়দংশে মুক্তিপাগল মানুষকে সংগঠিত করেন। দীর্ঘ নয় মাস মরণপণ লড়াই করে অর্জিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশ। স্বাধীনতা যুদ্ধে সাহসী অবদানের জন্য তাঁকে ‘বীর উত্তম’ খেতাবে ভূষিত করা হয়।

স্বাধীনতার পর তিনি প্রথমে কুমিল্লা ব্রিগেড কমান্ডার এবং ১৯৭২ সালের জুন মাসে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ডেপুটি চিফ অব স্টাফ নিযুক্ত হন। ১৯৭২ সালে কর্নেল, ১৯৭৩-এর মাঝামাঝি ব্রিগেডিয়ার এবং শেষ দিকে মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি লাভ করেন।

রাষ্ট্রনায়ক জিয়া ও বহুদলীয় গণতন্ত্র
স্বাধীনতার ঘোষক, মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার ও জেড ফোর্সের প্রধান হিসেবে জিয়াউর রহমান এ দেশের মানুষের কাছে প্রথম পরিচিত হলেও পরে তিনি বাংলাদেশের একজন বরেণ্য রাষ্ট্রনায়কে পরিণত হন। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে রাজনৈতিক ঐকতানে নিয়ে আসা ও সুদৃঢ় অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর কারণে তাঁকে আধুনিক বাংলাদেশের স্থপতি হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়। তিনি বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের আদর্শের ভিত্তিতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপি গঠনের মধ্য দিয়ে দেশে উন্নয়ন ও উৎপাদনের রাজনীতির সূচনা করেন। ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর তিনি বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। অধ্যাপক একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী ছিলেন এর প্রথম মহাসচিব। জিয়ার এই দলে বাম, ডান ও মধ্যপন্থি সব ধরনের মানুষ ছিলেন। বিএনপির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল এর নিয়োগ পদ্ধতি; প্রায় ৪৫% সদস্য শুধু রাজনীতিতে নতুন ছিলেন না, তারা ছিলেন তরুণ।

১৯৭৮ সালের ৩ জুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জিয়াউর রহমান জয়লাভ করেন। এই নির্বাচনে মোট ১০ জন প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। এরপর মে মাসে ১৯ দফা কর্মসূচি ঘোষণা এবং আস্থা যাচাইয়ের জন্য ৩০ মে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়; হাঁ-সূচক ভোটে তিনি বিপুল জনসমর্থন লাভ করেন। ১৯৭৯ সালে দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ২৯৮টি আসনের মধ্যে ২০৭টিতে জয়লাভ করে। মালেক উকিলের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ৩৯টি ও মিজানুর রহমান চৌধুরির নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ২টি আসনে জয়লাভ করে। এছাড়া জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল ৮টি, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি ১টি ও মুসলিম ডেমোক্রেটিক লীগ ২০টি আসনে জয়লাভ করে।

জিয়াউর রহমান ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম জননির্বাচিত রাষ্ট্রপতি। যে রাষ্ট্রপতি জীবদ্দশায় গেছেন কৃষকের পর্ণকুটিরে, শ্রমিকের বস্তিতে; গ্রামে গ্রামে মাইলের পর মাইল পায়ে হেঁটে সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্টের কথা জেনে তা সমাধানের চেষ্টা করেছেন। তাঁর সৃষ্টিশীল নেতৃত্ব, দূরদর্শী রাজনৈতিক চিন্তা, জনসাধারণকে আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান করার পদক্ষেপ এবং নিজের প্রশ্নাতীত সততা তাঁকে সমসাময়িক কালের ঊর্ধ্বে প্রতিষ্ঠিত করে। ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’-এর ভিত্তিতে রাজনৈতিক দল গঠনের মাধ্যমে তিনি রাজনীতিতে সব মতের মানুষের সম্মিলন ঘটিয়েছিলেন। ‘দেশ’ ও ‘মানুষ’ই ছিল তাঁর রাজনীতির প্রধান প্রতিপাদ্য।

১৯৭৬ সালের ১৩ মার্চ রামপুরা টেলিভিশন ভবনে বেতার ও তথ্য বিভাগের পদস্থ অফিসারদের এক সমাবেশে জেনারেল জিয়াউর রহমান বলেছিলেন, “আমরা সকলে বাংলাদেশী। আমরা প্রথমে বাংলাদেশী এবং শেষেও বাংলাদেশী। এই মাটি আমাদের, এই মাটি থেকে আমাদের অনুপ্রেরণা আহরণ করতে হবে। জাতিকে শক্তিশালী করাই আমাদের লক্ষ্য। ঐক্য, শৃঙ্খলা, দেশপ্রেম, নিষ্ঠা ও কঠোর মেহনতের মাধ্যমেই তা সম্ভব।” (দৈনিক বাংলা, ১৪ মার্চ ১৯৭৬)

মিথ্যা প্রতিশ্রুতির অপরাজনীতি দ্বারা জনগণকে প্রতারিত করে স্বাধীনতাত্তোর ক্ষমতাসীন মহল যখন মানুষের বাক্-ব্যক্তি-স্বাধীনতাকে হরণ করে গণতন্ত্রের কবর রচনা করেছিল, দেশকে ঠেলে দিয়েছিল দুর্ভিক্ষের করাল গ্রাসে—এমনই জাতির এক চরম সংকটময় মুহূর্তে সৈনিক-জনতার ঐতিহাসিক বিপ্লবে শহীদ জিয়া ক্ষমতার হাল ধরেন। ক্ষমতায় এসেই মানুষের হারানো অধিকার ফিরিয়ে দিয়ে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন; নিশ্চিত করেন মানুষের বাক্ ও ব্যক্তি স্বাধীনতা। উৎপাদনের রাজনীতি প্রবর্তন করে তিনি দেশকে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধশালী করে গড়ে তুলতে সক্ষম হন। তাঁর তীব্র গণতান্ত্রিক চেতনা এবং দেশকে স্বনির্ভর করে গড়ে তোলার প্রচেষ্টা বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিকভাবে মর্যাদার আসনে সুপ্রতিষ্ঠিত করে। শহীদ জিয়া ছিলেন আধিপত্যবাদ ও সম্প্রসারণবাদের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে এক আপসহীন দেশপ্রেমিক। তাই দেশবিরোধী ষড়যন্ত্রকারীরা নিজেদের নীলনকশা বাস্তবায়নের কাঁটা ভেবে জিয়াকে নির্মমভাবে হত্যা করে। কিন্তু তাঁর এই আত্মত্যাগ জনগণের মধ্যে গড়ে উঠেছে দেশবিরোধী চক্রান্তকারীদের বিরুদ্ধে এক ইস্পাতকঠিন গণঐক্য।

১৯ দফা কর্মসূচি ও উন্নয়নের রাজনীতি
দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ১৯ দফা কর্মসূচি প্রণয়ন করেছিলেন:

১। সর্বোতভাবে দেশের স্বাধীনতা, অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা।

২। শাসনতন্ত্রের চারটি মূলনীতি—সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস ও আস্থা, গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের সমাজতন্ত্র—জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে প্রতিফলন করা।

৩। সর্ব উপায়ে নিজেদেরকে একটি আত্মনির্ভরশীল জাতি হিসেবে গড়ে তোলা।

৪। প্রশাসনের সর্বস্তরে, উন্নয়ন কার্যক্রম এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার ব্যাপারে জনসাধারণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।

৫। সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে কৃষি উন্নয়নের মাধ্যমে গ্রামীণ তথা জাতীয় অর্থনীতিকে জোরদার করা।

৬। দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা এবং কেউ যেন ভুখা না থাকে তার ব্যবস্থা করা।

৭। দেশে কাপড়ের উৎপাদন বাড়িয়ে সবার জন্য অন্তত মোটা কাপড় সরবরাহ নিশ্চিত করা।

৮। কোনো নাগরিক গৃহহীন না থাকে তার যথাসম্ভব ব্যবস্থা করা।

৯। দেশকে নিরক্ষরতার অভিশাপ থেকে মুক্ত করা।

১০। সকল দেশবাসীর জন্য ন্যূনতম চিকিৎসার বন্দোবস্ত করা।

১১। সমাজে নারীর যথাযোগ্য মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা এবং যুবসমাজকে সুসংগঠিত করে জাতি গঠনে উদ্বুদ্ধ করা।

১২। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বেসরকারি খাতে প্রয়োজনীয় উৎসাহ দান।

১৩। শ্রমিকদের অবস্থার উন্নতি সাধন এবং উৎপাদন বৃদ্ধির স্বার্থে সুস্থ শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক গড়ে তোলা।

১৪। সরকারি চাকরিজীবিদের মধ্যে জনসেবা ও দেশ গঠনের মনোবৃত্তিতে উৎসাহিত করা এবং তাদের আর্থিক অবস্থার উন্নয়ন করা।

১৫। জনসংখ্যা বিস্ফোরণ রোধ করা।

১৬। সকল বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে সমতার ভিত্তিতে বন্ধুত্ব গড়ে তোলা এবং মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা।

১৭। প্রশাসন ও উন্নয়ন ব্যবস্থা বিকেন্দ্রীকরণ এবং স্থানীয় সরকার শক্তিশালী করা।

১৮। দুর্নীতিমুক্ত ন্যায়নীতিভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা কায়েম করা।

১৯। ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে সকল নাগরিকের অধিকার পূর্ণ সংরক্ষণ করা এবং জাতীয় ঐক্য ও সংহতি সুদৃঢ় করা।

জিয়াউর রহমান ঘোষিত এই ১৯ দফা ছিল তাঁর উন্নয়নের মূলমন্ত্র। প্রেসিডেন্ট জিয়ার সময়ে দেশের প্রতিটি ক্ষেত্রে যে অভূতপূর্ব উন্নয়ন সাধিত হয়েছে, তার পেছনে গাইডলাইন হিসেবে কাজ করেছে ১৯ দফা। জেনারেল জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে ‘জাতীয় সেনাবাহিনী’ হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। প্রশিক্ষণ, কঠোর পরিশ্রম ও কর্তব্যনিষ্ঠার মাধ্যমে অফিসারদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি এবং তাদের মধ্যে দেশপ্রেম জাগাতে অসামান্য অবদান রাখেন তিনি। ধর্মীয় মূল্যবোধকে প্রাধান্য দিয়ে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তাদের আত্মবিশ্বাসী করে তোলেন।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দুর্বল-শক্তিশালী সব দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করেছেন। ভারত, চীন, পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরবসহ সবার সঙ্গে পারস্পরিক সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক স্থাপনে যথেষ্ট সফলতা দেখিয়েছেন। দীর্ঘমেয়াদি উদ্দেশ্য নিয়ে তিনি বৈদেশিক নীতি নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন করেন। জোটনিরপেক্ষ ও ইসলামী দেশগুলোর বিভিন্ন সম্মেলনে তাঁর ব্যক্তিগত ও সক্রিয় অংশগ্রহণে বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতিতে বিশেষ গতি সঞ্চারিত হয়। ব্যক্তিগত কূটনীতির মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক দুর্বলতা কাটিয়ে তুলতে সক্ষম হন।

রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের বৈদেশিক নীতির দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলকে তিন ভাগে আলোচনা করা যায়। প্রথমত, তিনি জাতিসংঘকে কেন্দ্র করে একটি বিশ্বব্যাপী শান্তির আবহ তৈরি করার লক্ষ্যে বাংলাদেশের কর্মকাণ্ড পরিচালিত করেন। জাতিসংঘের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনে অংশগ্রহণ করে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উন্নয়ন ঘটান। এর ফলেই বাংলাদেশ ১৯৮০ সালে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য নির্বাচিত হয়। তিনি উপমহাদেশের জন্য একটি স্থানীয় শান্তিকাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলো নিয়ে আসিয়ানের মতো সংস্থা গড়ার উদ্যোগ নেন, যা পরবর্তীকালে সার্ক নামে প্রতিষ্ঠা পায়।

রাষ্ট্রপতি জিয়ার পররাষ্ট্রনীতির আরেকটি লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যকে বহুমুখীকরণ এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ ও সাহায্যকে উৎসাহিত করা। তাঁর শাসনকালে বাংলাদেশকে অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর করে গড়ে তোলার নিরলস প্রচেষ্টার প্রশংসা করে বিশ্বের বিভিন্ন পত্রিকা। ইউনাইটেড প্রেস ইন্টারন্যাশনালের সুজান গ্রিন ঢাকা থেকে পাঠানো এক ডেসপাচে লিখেছিলেন, “সাম্যের প্রতীক ও সৎ লোকরূপে ব্যাপকভাবে গণ্য জিয়াউর রহমান স্বনির্ভর সংস্কার কর্মসূচি শুরু করে বাংলাদেশের ভিক্ষার ঝুড়ি ভাঙার প্রথম পদক্ষেপ নিয়েছেন।” মালয়েশিয় দৈনিক ‘বিজনেস টাইমস’-এ প্রকাশিত ওই ডেসপাচে বলা হয়, “অতীতে বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি হিসেবে পরিচিত করেছিল যে মহাপ্লাবী সমস্যাগুলো, প্রেসিডেন্ট জিয়া কার্যত সেগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন।” (দৈনিক ইত্তেফাক, ৪ নভেম্বর ১৯৭৯)

ওই সময় নিউইয়র্ক টাইমসের এক সংখ্যায় বাংলাদেশের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষা, স্বনির্ভরতা অর্জন এবং উৎপাদন দ্বিগুণ করার ব্যাপারে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অক্লান্ত প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করা হয়। কাজের জন্য জনগণকে সংগঠিত ও অনুপ্রাণিত করতে প্রেসিডেন্ট জিয়া প্রায়ই গ্রামে-গঞ্জে সফর করেন। ‘জনগণের সঙ্গে সংযোগ রক্ষায় বাংলাদেশী নেতা’ শিরোনামে মাইকেল টি. ক্যাফম্যানের এক রিপোর্টে গ্রামাঞ্চলে সপ্তাহে তিন-চারবার সফরের সময় জিয়াউর রহমানের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বিবরণ দেওয়া হয়।

নিরাপত্তার ক্ষেত্রে শহীদ জিয়ার আরেকটি অবদান হলো নাগরিক বাহিনী গঠনের চিন্তা বাস্তবায়ন করা। তিনি এক কোটি নারী ও পুরুষকে সাধারণ সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়ার লক্ষ্যে গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী গঠন করেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোর—বিএনসিসি গঠনের মাধ্যমে দেশগঠন ও নিরাপত্তায় ছাত্রছাত্রীদের ভূমিকা রাখার সুযোগ করে দেন। জিয়াউর রহমানের গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী করার পদক্ষেপ বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো। কৃষকদের স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে গ্রামীণ উন্নয়ন প্রচেষ্টা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও বিশেষ প্রচার পায়। তিনি আমলানির্ভর প্রকল্প না করে স্থানীয় নেতাদের দ্বারা কৃষককে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। এতে কৃষকের মধ্যেও ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়।

সবচেয়ে বড় বিষয় হলো রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিপরীতে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’-এর প্রবর্তন করেন। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এক প্ল্যাটফর্মে থেকে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় তিনি এদেশের মানুষের মধ্যে জাতীয়তাবোধ জাগানোর প্রয়াস চালান। অনেকটা সফলও হন তিনি। এ জাতীয়তাবাদী দর্শনই একটি জাতি ও দেশের রক্ষাকবচ।

জিয়া প্রবর্তিত উন্নয়নের রাজনীতির কতিপয় সাফল্য হলো: সকল দলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান; জাতীয় সংসদের ক্ষমতা বৃদ্ধি; বিচার বিভাগ ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ফিরিয়ে দেওয়া; দেশে কৃষি বিপ্লব, গণশিক্ষা বিপ্লব ও শিল্প উৎপাদনে বিপ্লব; সেচ ব্যবস্থা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে স্বেচ্ছাশ্রম ও সরকারি সহায়তার সমন্বয় ঘটিয়ে ১৪০০ খাল খনন ও পুনঃখনন; গণশিক্ষা কার্যক্রম প্রবর্তন করে অল্প সময়ে ৪০ লাখ মানুষকে অক্ষরজ্ঞান দান; গ্রামাঞ্চলে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় সহায়তা ও গ্রামোন্নয়ন কার্যক্রমে অংশগ্রহণের জন্য গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী—ভিডিপি গঠন; গ্রামাঞ্চলে চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি বন্ধ করা; হাজার হাজার মাইল রাস্তা-ঘাট নির্মাণ; ২৭,৫০০ পল্লী চিকিৎসক নিয়োগ করে গ্রামীণ জনগণের চিকিৎসার সুযোগ বৃদ্ধি; নতুন নতুন শিল্প-কলকারখানা স্থাপনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক বন্ধ্যাত্ব দূরীকরণ; কলকারখানায় তিন শিফট চালু করে শিল্প উৎপাদন বৃদ্ধি; কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি ও দেশকে খাদ্য রপ্তানির পর্যায়ে উন্নীতকরণ; যুব উন্নয়ন মন্ত্রণালয় ও মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয় সৃষ্টির মাধ্যমে দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে যুব ও নারী সমাজকে সম্পৃক্তকরণ; ধর্ম মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করে সকল মানুষের স্ব স্ব ধর্ম পালনের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি; বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সৃষ্টি করে প্রযুক্তির ক্ষেত্রে অগ্রগতি সাধন; তৃণমূল পর্যায়ে গ্রামের জনগণকে স্থানীয় প্রশাসন ব্যবস্থা ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা এবং সর্বনিম্ন পর্যায় থেকে দেশ গড়ার কাজে নেতৃত্ব সৃষ্টির লক্ষ্যে গ্রাম সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন; জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশের আসনলাভ; তিন সদস্যবিশিষ্ট আল-কুদস কমিটিতে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তি; দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলে ‘সার্ক’ প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগ গ্রহণ; বেসরকারি খাত ও উদ্যোগকে উৎসাহিতকরণ; জনশক্তি রপ্তানি, তৈরি পোশাক, হিমায়িত খাদ্য, হস্তশিল্পসহ সকল অপ্রচলিত পণ্যের রপ্তানির দ্বার উন্মোচন; শিল্পখাতে বেসরকারি বিনিয়োগের পরিমাণ বৃদ্ধি ও বিনিয়োগ ক্ষেত্রের সম্প্রসারণ। যে গার্মেন্টস ও টেক্সটাইলের ওপর আমাদের অর্থনীতি আজ দাঁড়িয়ে, তার গোড়াপত্তন করেন জিয়া।

জিয়ার রাষ্ট্রক্ষমতার সময় সংক্ষিপ্ত—পাঁচ বছরের একটু বেশি। এই স্বল্প সময়ে তিনি যুগান্তকারী সব কাজ করে গেছেন। তাঁর সঙ্গে ভারতবর্ষের ইতিহাসের পাঠান সম্রাট শেরশাহের অনেক মিল পাওয়া যায়। শেরশাহের শাসনভারও ছিল সংক্ষিপ্ত; কিন্তু জনকল্যাণে তাঁর কীর্তিগুলো ছিল অভিনব ও সুদূরপ্রসারী প্রভাবের। জিয়া জাতীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে একটি বড় রকমের ঝাঁকুনি দিয়ে গেছেন। রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি, ক্রীড়া, নারী, শিশু—সবকিছুতেই তিনি একটি বিপ্লব ঘটিয়েছেন। গোটা জাতিকে তিনি একাত্তরের মতো একতাবদ্ধ করতে পেরেছিলেন; একটি দৃঢ় জাতীয় সংহতি সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন। পরিচয়-সংকটে আক্রান্ত ও হীনম্মন্যতায় ভোগা জাতিকে তার সত্যিকারের পরিচয় এবং আপন স্বাধীন স্বকীয়তার পরিচিতি তিনি উন্মোচন করতে পেরেছিলেন। সে পরিচিতি বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের সংমিশ্রণে হাজার বছরের যে রসায়ন, তারই আবিষ্কার—নাম ছিল বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। এই জাতীয়তাবাদের ওপরই প্রতিষ্ঠিত তাঁর মন, মনন ও চেতনা—তাঁর রাজনৈতিক দর্শন। তাই তাঁর প্রিয় গান, যা তিনি আপন মনে গুনগুন করে গাইতেন—‘আমার জীবন বাংলাদেশ, আমার মরণ বাংলাদেশ।’

১৯৮১ সালের ৩০ মে: শহীদ জিয়াউর রহমান
১৯৮১ সালের ৩০ মে গভীর রাতে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শহীদ হন। চট্টগ্রামে বিএনপির উপদলীয় কোন্দল নিরসনের লক্ষ্যে ২৯ মে সকালে পতেঙ্গা বিমানবন্দরে পৌঁছান রাষ্ট্রপতি জিয়া। সার্কিট হাউসে হালকা নাস্তা সেরে বারান্দায় বিএনপি নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনায় বসেন। জুম্মার নামাজ আদায় করেন চকবাজারের নন্দনপুরা মসজিদে। নামাজ শেষে মুসল্লীদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করে সার্কিট হাউসে ফিরে আসেন। দুপুরের খাবার সেরে ঘণ্টা দেড়েক বিশ্রাম নেন। বিকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, অধ্যাপক, আইনজীবী, সাংবাদিকসহ আগত অতিথীদের সঙ্গে আড়াই ঘণ্টা আলাপ করেন। এরপর স্থানীয় বিএনপির দুই উপদলের সঙ্গে রাত ৯টা থেকে ১১টা পর্যন্ত আলোচনা করেন। রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত চিকিৎসক লে. কর্নেল মাহতাবুল ইসলাম খাবার পরখ করে শেষ করলে রাত ১১টার একটু পর জিয়াকে রাতের খাবার দেওয়া হয়। ডিনার শেষে ঢাকায় স্ত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে টেলিফোনে মিনিট পনেরো কথা বলেন। জীবনের আলো নিভে যাওয়ার ৫ ঘণ্টা আগে ঘরের আলো নিভিয়ে ঘুমাতে যান তিনি।

রাত আড়াইটার দিকে কালুরঘাটস্থ রেডিও ট্রান্সমিটারের কাছে হাজির হয় ঘাতক দল। ঘাতকদলের নেতৃত্ব দেন লে. কর্নেল মতিউর রহমান। ঘাতকদল তিনটি দলে বিভক্ত হয়ে আক্রমণ পরিচালনার পরিকল্পনা নেয়। রাত সাড়ে তিনটার সামান্য পরে দল তিনটি প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যে গাড়ি চালিয়ে এগোতে থাকে। ঘাতকদল বিনাবাধায় সার্কিট হাউসে ঢুকে পড়ে। ভীতি সঞ্চারের জন্য রকেট ল্যান্সার থেকে ফায়ার ও গ্রেনেড চার্জ করা হয়; মেশিনগানের গুলি চালানো হয়। পাহারারত ৪৪ জন পুলিশের ১ জন নিহত, ১২ জন আহত হন; বাকিরা আত্মগোপন করেন। রাষ্ট্রপতির গার্ড রেজিমেন্টের সৈন্যরা তন্দ্রাচ্ছন্ন ছিল। রাষ্ট্রপতির নিরাপত্তা কর্মকর্তা লে. কর্নেল আহসান ও ক্যাপ্টেন হাফিজ রাষ্ট্রপতিকে বাঁচাতে গিয়ে ঘাতকদের গুলিতে নিহত হন।

গোলাগুলি ও চিৎকার-চেঁচামেচিতে জিয়া চকিতে উঠে বসেন। কী ব্যাপার—ঘটনা প্রত্যক্ষ করতে দরজা খুলে বেরিয়ে আসেন; পরনে রাতের পোশাক। গভীর আত্মপ্রত্যয় ও অগাধ আস্থা নিয়ে বেরিয়ে এসে বলেন, “কি চাও তোমরা?” কাছে দাঁড়ানো লে. মোসলেহউদ্দিন রীতিমতো ঘাবড়ে যান। তিনি জিয়াকে আশ্বস্ত করেন, “স্যার, আপনি ঘাবরাবেন না। এখানে ভয়ের কিছু নেই।” কিন্তু মোসলেহউদ্দিনের মুখ থেকে আশ্বাসবাণী মিলিয়ে যাওয়ার আগেই লে. কর্নেল মতিউর রহমান তার এসএমজি থেকে অতি কাছ থেকে ব্রাশ ফায়ার করেন; জিয়ার শরীরের ডানদিক ঝাঝরা হয়ে যায়। দরজার কাছেই মুখ থুবড়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন জিয়া। এরপর মতিউর রহমান বন্দুকের নল দিয়ে জিয়ার প্রাণহীন দেহ উলটে নেন এবং মুখমন্ডল ও বুকে এসএমজির ট্রিগার টিপে ম্যাগাজিন খালি করে খুনের নেশা মেটান। আনুমানিক চার থেকে সাড়ে চারটায় জিয়ার মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে। জিয়াকে খুন করে ঘাতকদল দ্রুত সার্কিট হাউস ছেড়ে চলে যায়।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একাংশের হাতে কেন প্রেসিডেন্ট জিয়া নির্মমভাবে নিহত হয়েছিলেন—এ প্রশ্নের জবাব আজও জরুরি। ১৯৭৫ সালে সিপাহি-জনতার ষড়যন্ত্রবিনাশী অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় অভিষিক্ত হওয়ার পর জিয়াউর রহমানের মনোজগতে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। তাঁর চিন্তার জগতে শুধু সেনাবাহিনী বা চাকরি নয়—দেশের রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতিসহ সবকিছু অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। চিন্তার জগতের এই প্রসারতার প্রতিফলন ঘটে তাঁর বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে। জিয়াউর রহমান নিহত হয়েছিলেন তাঁরই প্রিয় সহকর্মী ও অনুগতদের হাতে। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। অতীতের ঘটনাবলির পর্যালোচনায় দুটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে—প্রথমটি ষড়যন্ত্র, অপরটি সেনানায়ক থেকে তাঁর জননায়কে উত্তরণ। ষড়যন্ত্র তত্ত্বটি বহুল আলোচিত মনে হলেও এটি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাস্তবচিত্রের প্রতিফলন। এক্ষেত্রে কথাটিকে ষড়যন্ত্র না বলে একটি রাষ্ট্রের বিরাগভাজন হওয়াকেও উল্লেখ করা যেতে পারে। জিয়াউর রহমানের একটি বড় ‘অপরাধ’ ছিল—তিনি স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করতে চেয়েছিলেন। তিনি জানতেন, একটি রাষ্ট্র যদি তার ইচ্ছা অনুযায়ী পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে, তাহলে সে রাষ্ট্রটি সার্বভৌমত্বের মর্যাদা অর্জন করে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যেসব রাষ্ট্রনায়ক এই নীতি অনুসরণ করেছেন, তাদের অনেককেই নির্মম পরিণতি ভোগ করতে হয়েছে। জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতির স্বাধীন পথচলার কারণে বাংলাদেশ জগৎসভায় মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে তাঁর জননির্ভর রাজনীতি ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সামরিক শাসন দীর্ঘায়িত না করে তিনি গণরাজনীতিকে উদ্ধার করেন ১৯৭৫-পূর্ব সময়ের পঙ্কিল আবর্ত থেকে। একই সঙ্গে তিনি নিজেও বেরিয়ে আসেন সেনা প্রভাব থেকে এবং রাজনীতিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন ব্যক্তির কাছে। জিয়াউর রহমানের আগে ব্যক্তি আসত রাজনীতির কাছে; কিন্তু তিনি রাজনীতিকে নিয়ে যান ব্যক্তির কাছে। এটি রাজনীতিবিদ ও সেনা কর্মকর্তাসহ অনেকের মনোকষ্টের কারণ হয়। এ কারণেই তাঁর খণ্ডিত উদ্ধৃতি ব্যবহার করে তাঁকে ভিলেন বানানোর চেষ্টা করেন সেইসব ব্যক্তি, যারা বিভিন্ন কলাকৌশলে জনগণের ওপর তাদের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতে চান। বাংলাদেশের সব রাজনীতিবিদের মধ্যে জিয়াউর রহমানই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি দেশের লাখো লাখো মানুষের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন, তাদের দুয়ারে গিয়েছেন, দিন ও রাতে তাদের সুখ-দুঃখের কাহিনি শুনেছেন এবং পরামর্শ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। জনরাজনীতির যে ধারার সূত্রপাত ঘটে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে, তাঁকে হত্যার মধ্য দিয়ে সেই ধারার অবসান ঘটে। জনগণের কাছে পৌঁছতে পেরে জিয়াউর রহমান অত্যুজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন, যা স্বাধীন বাংলাদেশে এখনো আর কেউ স্থাপন করতে পারেননি। এই জনরাজনীতির উন্মেষই জিয়াউর রহমানের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, আমলা ও সেনাবাহিনীসহ সমাজের বিভিন্ন সুবিধাভোগী গোষ্ঠী, যারা রাষ্ট্রযন্ত্রকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, তাদের কাছে জনরাজনীতির বিকাশ হুমকির মতো মনে হয়।

জিয়াউর রহমানের আরেকটি বড় অবদান আধুনিক বাংলাদেশ নির্মাণের পথ চলার সূত্রপাত। তিনি তাঁর সব কর্মকাণ্ড দিয়ে বাংলাদেশকে একটি আধুনিক রাষ্ট্রে পরিণত করতে চেয়েছিলেন, যার অসংখ্য উদাহরণ এখনো টিকে আছে। এই আধুনিকীকরণের প্রয়াসও জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে খড়গহস্ত হতে অন্ধকারের শক্তিকে উৎসাহিত করেছিল। জিয়াউর রহমান বেঁচে আছেন তাঁর কর্মের মাধ্যমে। যদিও সেসব কর্মের বহু প্রতীক মুছে ফেলার চেষ্টা হচ্ছে; কিন্তু সে উদ্যোগ জনসমর্থন লাভ করেনি। ঘোষণা দিয়ে অথবা পরিপত্র জারি করে জনমন থেকে তাদের প্রিয় নেতার নাম মুছে ফেলা যায় না।

জিয়াউর রহমানকে রাজধানী ঢাকায় জাতীয় সংসদের উত্তর পাশে চন্দ্রিমা উদ্যানে দাফন করা হয়। ২০০২ সালের ডিসেম্বরে চন্দ্রিমা উদ্যানে শহীদ জিয়ার সমাধিস্থল ঘিরে মাজার কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হয়। প্রেসিডেন্ট জিয়ার জানাজায় বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ জনসমাগম ঘটে, যেখানে প্রায় ২০ লাখেরও বেশি মানুষ সমবেত হয়। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে অভূতপূর্ব শোকের ছায়া নেমে আসে। গণমানুষের এই শোক জিয়াউর রহমানের আদর্শ ও নীতির প্রতি দেশবাসীর ব্যাপক সমর্থনের বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নামে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোতে একটি অ্যাভিনিউয়ের নামকরণ করা হয়েছে।

২০২৬ সালের প্রাসঙ্গিকতা: জাতীয় ঐক্যের অঙ্গীকার
জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ক্ষণজন্মা রাষ্ট্রনায়ক। নানা কারণে তিনি বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ও গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়ে স্থান করে নিয়েছেন। তাঁর সততা, নিষ্ঠা, গভীর দেশপ্রেম, পরিশ্রমপ্রিয়তা, নেতৃত্বের দৃঢ়তা প্রভৃতি গুণাবলি এ দেশের গণমানুষের হৃদয়কে স্পর্শ করেছিল। তিনি ছিলেন একজন পেশাদার সৈনিক; তা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের কাছে তাঁর যে গ্রহণযোগ্যতা ছিল, অন্য কোনো রাষ্ট্রনায়কের ভাগ্যে তা জোটেনি। মাত্র ছয় বছর রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছিলেন জিয়াউর রহমান; কিন্তু সাধারণ মানুষ তাঁর ওপর ছিল প্রচণ্ড আস্থাশীল। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মানুষের এই আস্থায় কোনো চিড় ধরেনি।

১৯৭১ সালের যুদ্ধ ছিল স্বাধীনতা অর্জনের; ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর ছিল সেই স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার সংগ্রাম; ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান ছিল স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন; আর ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান ছিল ফ্যাসিবাদ ও জনবিরোধী শাসনের বিরুদ্ধে জনগণের জাগরণ। এসব আন্দোলনের মূল আকাঙ্ক্ষা একটাই—স্বাধীন বাংলাদেশে জনগণের সকল গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং একটি স্বনির্ভর, নিরাপদ ও কল্যাণমূলক রাষ্ট্র বিনির্মাণ। ৭ নভেম্বর আমাদের یاد করিয়ে দেয়, এই আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে জাতীয় ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই।

বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক-ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় জাতীয় ঐক্য সমুন্নত রাখতে হলে আমাদের ৭ নভেম্বরের মতো সিপাহি-জনতার বিপ্লবের চেতনা মনেপ্রাণে ধারণ করতে হবে। দলীয় বিভেদ, প্রতিহিংসা ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতি নয়; বরং দেশ ও জনগণের স্বার্থকে সর্বোচ্চ স্থানে রেখে ঐক্যবদ্ধ হওয়াই আজকের প্রধান দায়িত্ব। ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতা অভ্যুত্থান প্রমাণ করে, দেশ ও জাতির স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব যখন হুমকির মুখে পড়ে, তখন দেশপ্রেমিক সৈনিক ও সাধারণ মানুষ একসঙ্গে দাঁড়াতে জানে।

এই দিনে আমাদের অঙ্গীকার হোক: ভবিষ্যতে আর কেউ দেশ ও জনগণের অধিকার হরণ করতে পারবে না, বাংলাদেশকে তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করতে পারবে না। ৭ নভেম্বরের বৈপ্লবিক চেতনাই হোক বাংলাদেশের আগামী নির্মাণের প্রেরণা ও পাথেয়। দেশপ্রেমিক গণতন্ত্রকামী জনগণের দীপ্ত উচ্চারণ হোক: “দিল্লি নয়, পিণ্ডি নয়, নয় অন্য কোনো দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ।”

৭ নভেম্বর আজ বেঁচে নেই কোনো আনুষ্ঠানিকতার মাঝে; ৭ নভেম্বর বেঁচে আছে কোটি মানুষের হৃদয়ে—স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রের চেতনা হিসেবে। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান আজ বেঁচে নেই; কিন্তু আছে তাঁর রেখে যাওয়া ১৯ দফা কর্মসূচি, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের দর্শন, তাঁর সততা, দেশপ্রেম, জনগণের ভালোবাসা এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল বিএনপি। বাংলাদেশ বিশ্বের মানচিত্রে একটি আত্মনির্ভরশীল জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে—এই ছিল শহীদ জিয়ার স্বপ্ন। ৭ নভেম্বরের চেতনা আমাদের সেই স্বপ্ন পূরণের পথেই আহ্বান জানায়।

লেখক:
ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম রেজাউল করিম,
চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী গবেষণা কেন্দ্র