ঢাকা ১২:৪৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬, ৯ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ধানের দাম অর্ধেকও পাচ্ছেন না হাওরাঞ্চলের কৃষকরা

স্টাফ রিপোর্টার
  • আপডেট সময় ০৭:৫৪:২১ অপরাহ্ন, বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬
  • / ৪৬ বার পড়া হয়েছে

সরকার ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে প্রতি মণ ধানের দাম ১ হাজার ৪৪০ টাকা নির্ধারণ করলেও হাওরাঞ্চলের কৃষকরা সেই দামের অর্ধেকও পাচ্ছেন না। মধ্যনগরসহ সুনামগঞ্জের বিভিন্ন হাওরে বর্তমানে কাঁচা ধান বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকা মণ দরে। এতে উৎপাদন খরচই উঠছে না বলে জানিয়েছেন কৃষকরা।

স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে অতিবৃষ্টির কারণে হাওরের প্রায় ৩০ শতাংশ জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। যেসব জমিতে ধান রয়েছে, সেগুলো নিয়েও চরম বেকায়দায় আছেন কৃষকরা। অনেক হাওরে ধান আনার রাস্তা পানিতে ডুবে যাওয়ায় বা অনুপযোগী হয়ে পড়ায় ঘরে তুলতে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। পাশাপাশি, অনেক জমিতে হারভেস্টার মেশিন ব্যবহার করা যাচ্ছে না। তেলের দাম বৃদ্ধি ও সংকটের কারণে যান্ত্রিকভাবে ধান কাটার খরচও বেড়েছে। অন্যদিকে শ্রমিক সংকটের ফলে মজুরি বৃদ্ধি পাওয়ায় ধান কাটা, মাড়াই ও পরিবহন খরচ প্রায় ধানের মূল্যের সমান হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে কম দামে ধান বিক্রি করে চরম আর্থিক চাপে পড়েছেন কৃষকরা। অনেকেই ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করলেও তা পরিশোধ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

মধ্যনগর হাওরাঞ্চলের অন্যতম বড় ধানের আড়ৎ হিসেবে পরিচিত। তবে সরেজমিনে দেখা গেছে, আড়ৎগুলোতে ধান বেচাকেনার তেমন চাঞ্চল্য নেই। সংশ্লিষ্ট আড়ৎদাররা জানান, অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার বাজার অনেকটাই স্থবির। ধান ক্রয়ে আগ্রহী ধানের ব্যাপারীও অন্যান্য বছরের তুলনায় অনেক কম আসছে বলে জানান তারা।

আড়ৎ কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক বরুণ সরকার বলেন, এবার ধানের বেচাকেনা উল্লেখযোগ্যভাবে কম। অতিবৃষ্টিতে অনেক কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। রোদ না থাকায় ধান শুকানোও সম্ভব হচ্ছে না। ভালো মানের ধান পাওয়া গেলে আমরা সর্বোচ্চ ১ হাজার টাকা মণ দরে কিনছি।

বোয়ালা হাওরের কৃষক বিল্লাল হোসেন জানান, সরকারি ক্রয় কার্যক্রম কার্যকর না থাকায় তারা নির্ধারিত দামে ধান বিক্রি করতে পারছেন না। ফলে মৌসুমের শুরুতেই কম দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। এ সুযোগে মধ্যস্বত্বভোগীরা কম দামে ধান কিনে বেশি দামে বিক্রি করছেন।

টগার হাওরের কৃষক খায়রুল ইসলাম বলেন, সরকার যে দাম নির্ধারণ করেছে, আমরা তার কাছাকাছিও পাই না। সময়মতো রোদ না থাকায় ধান শুকাতে পারছি না। অনেক ধান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। গুদামে ধান দিতে গেলেও নানা ধরনের হয়রানির শিকার হতে হয়।

স্থানীয় কৃষক মুখলেছ জানান, সরকার এখনো পুরোদমে ধান সংগ্রহ শুরু না করায় কৃষকরা বঞ্চিত হচ্ছেন। দ্রুত ক্রয় কার্যক্রম শুরু হলে তারা কিছুটা উপকৃত হবেন বলে আশা প্রকাশ করেন।

কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে সরকারি ধান সংগ্রহের সীমাবদ্ধতাই এ পরিস্থিতির মূল কারণ। হাওরাঞ্চলে পর্যাপ্ত ক্রয়কেন্দ্র না থাকায় কৃষকরা সহজে সরকারি গুদামে ধান সরবরাহ করতে পারছেন না। কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন তারা।

একটিভিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মো. নিজাম উদ্দিন বলেন, কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হলে সরাসরি সরকারি ধান ক্রয় কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে পর্যাপ্ত ক্রয়কেন্দ্র স্থাপন এবং আধুনিক গুদাম সুবিধা বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি বাজারে নজরদারি বাড়িয়ে সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে এবং কৃষকদের স্বল্প সুদে ঋণ ও প্রণোদনা দিতে হবে।

গত ২১ এপ্রিল জাতীয় সংসদে ধানের ন্যায্য দাম না পাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল। তিনি বলেন, হাওরাঞ্চলে প্রতি মণ ধান উৎপাদনে প্রায় ১ হাজার টাকা খরচ হলেও কৃষকদের ৮০০ টাকা দরে বিক্রি করতে হচ্ছে। এ অবস্থায় কৃষকের স্বার্থে ধানের দাম বাড়িয়ে ১ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব দেন তিনি।

ধর্মপাশা ও মধ্যনগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আসয়াদ বিন খলিল রাহাত জানান, প্রকৃত কৃষকদের কাছ থেকে ন্যায্যমূল্যে ধান সংগ্রহের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। আগ্রহী কৃষকরা চাইলে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে ধান বিক্রি করতে পারবেন।এছাড়া সরকারিভাবে ধান সংগ্রহ কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

ধানের দাম অর্ধেকও পাচ্ছেন না হাওরাঞ্চলের কৃষকরা

আপডেট সময় ০৭:৫৪:২১ অপরাহ্ন, বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬

সরকার ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে প্রতি মণ ধানের দাম ১ হাজার ৪৪০ টাকা নির্ধারণ করলেও হাওরাঞ্চলের কৃষকরা সেই দামের অর্ধেকও পাচ্ছেন না। মধ্যনগরসহ সুনামগঞ্জের বিভিন্ন হাওরে বর্তমানে কাঁচা ধান বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকা মণ দরে। এতে উৎপাদন খরচই উঠছে না বলে জানিয়েছেন কৃষকরা।

স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে অতিবৃষ্টির কারণে হাওরের প্রায় ৩০ শতাংশ জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। যেসব জমিতে ধান রয়েছে, সেগুলো নিয়েও চরম বেকায়দায় আছেন কৃষকরা। অনেক হাওরে ধান আনার রাস্তা পানিতে ডুবে যাওয়ায় বা অনুপযোগী হয়ে পড়ায় ঘরে তুলতে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। পাশাপাশি, অনেক জমিতে হারভেস্টার মেশিন ব্যবহার করা যাচ্ছে না। তেলের দাম বৃদ্ধি ও সংকটের কারণে যান্ত্রিকভাবে ধান কাটার খরচও বেড়েছে। অন্যদিকে শ্রমিক সংকটের ফলে মজুরি বৃদ্ধি পাওয়ায় ধান কাটা, মাড়াই ও পরিবহন খরচ প্রায় ধানের মূল্যের সমান হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে কম দামে ধান বিক্রি করে চরম আর্থিক চাপে পড়েছেন কৃষকরা। অনেকেই ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করলেও তা পরিশোধ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

মধ্যনগর হাওরাঞ্চলের অন্যতম বড় ধানের আড়ৎ হিসেবে পরিচিত। তবে সরেজমিনে দেখা গেছে, আড়ৎগুলোতে ধান বেচাকেনার তেমন চাঞ্চল্য নেই। সংশ্লিষ্ট আড়ৎদাররা জানান, অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার বাজার অনেকটাই স্থবির। ধান ক্রয়ে আগ্রহী ধানের ব্যাপারীও অন্যান্য বছরের তুলনায় অনেক কম আসছে বলে জানান তারা।

আড়ৎ কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক বরুণ সরকার বলেন, এবার ধানের বেচাকেনা উল্লেখযোগ্যভাবে কম। অতিবৃষ্টিতে অনেক কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। রোদ না থাকায় ধান শুকানোও সম্ভব হচ্ছে না। ভালো মানের ধান পাওয়া গেলে আমরা সর্বোচ্চ ১ হাজার টাকা মণ দরে কিনছি।

বোয়ালা হাওরের কৃষক বিল্লাল হোসেন জানান, সরকারি ক্রয় কার্যক্রম কার্যকর না থাকায় তারা নির্ধারিত দামে ধান বিক্রি করতে পারছেন না। ফলে মৌসুমের শুরুতেই কম দামে ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। এ সুযোগে মধ্যস্বত্বভোগীরা কম দামে ধান কিনে বেশি দামে বিক্রি করছেন।

টগার হাওরের কৃষক খায়রুল ইসলাম বলেন, সরকার যে দাম নির্ধারণ করেছে, আমরা তার কাছাকাছিও পাই না। সময়মতো রোদ না থাকায় ধান শুকাতে পারছি না। অনেক ধান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। গুদামে ধান দিতে গেলেও নানা ধরনের হয়রানির শিকার হতে হয়।

স্থানীয় কৃষক মুখলেছ জানান, সরকার এখনো পুরোদমে ধান সংগ্রহ শুরু না করায় কৃষকরা বঞ্চিত হচ্ছেন। দ্রুত ক্রয় কার্যক্রম শুরু হলে তারা কিছুটা উপকৃত হবেন বলে আশা প্রকাশ করেন।

কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে সরকারি ধান সংগ্রহের সীমাবদ্ধতাই এ পরিস্থিতির মূল কারণ। হাওরাঞ্চলে পর্যাপ্ত ক্রয়কেন্দ্র না থাকায় কৃষকরা সহজে সরকারি গুদামে ধান সরবরাহ করতে পারছেন না। কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন তারা।

একটিভিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মো. নিজাম উদ্দিন বলেন, কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হলে সরাসরি সরকারি ধান ক্রয় কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে পর্যাপ্ত ক্রয়কেন্দ্র স্থাপন এবং আধুনিক গুদাম সুবিধা বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি বাজারে নজরদারি বাড়িয়ে সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে এবং কৃষকদের স্বল্প সুদে ঋণ ও প্রণোদনা দিতে হবে।

গত ২১ এপ্রিল জাতীয় সংসদে ধানের ন্যায্য দাম না পাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল। তিনি বলেন, হাওরাঞ্চলে প্রতি মণ ধান উৎপাদনে প্রায় ১ হাজার টাকা খরচ হলেও কৃষকদের ৮০০ টাকা দরে বিক্রি করতে হচ্ছে। এ অবস্থায় কৃষকের স্বার্থে ধানের দাম বাড়িয়ে ১ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব দেন তিনি।

ধর্মপাশা ও মধ্যনগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আসয়াদ বিন খলিল রাহাত জানান, প্রকৃত কৃষকদের কাছ থেকে ন্যায্যমূল্যে ধান সংগ্রহের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। আগ্রহী কৃষকরা চাইলে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে ধান বিক্রি করতে পারবেন।এছাড়া সরকারিভাবে ধান সংগ্রহ কার্যক্রম চলমান রয়েছে।