ঢাকা ০৬:৫২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬, ৩১ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

‘এলাকার ছেলে’ পরিচয় দিয়ে চাঁদাবাজির আসামিদের ছাড়িয়ে নিলেন বিএনপি নেতা

নিজস্ব সংবাদ :
  • আপডেট সময় ০৪:৩৫:৪৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬
  • / ২৫ বার পড়া হয়েছে

ফরিদপুরের ভাঙ্গায় চাঁদাবাজির অভিযোগে দুই তরুণকে পুলিশ আটক করার পর তাঁদের ‘এলাকার ছেলে’ পরিচয় দিয়ে থানা থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে গেছেন উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব মোল্লা। গত মঙ্গলবার রাতে ভাঙ্গা থানায় এ ঘটনা ঘটে।

পুলিশ চাঁদাবাজির অভিযোগে যে দুই ব্যক্তিকে আটক করেছিলেন তাঁরা হলেন ভাঙ্গা পৌরসভার হোগলাডাঙ্গী সদরদী মহল্লার বাসিন্দা ৮ নং ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর লিয়াকত মোল্লার ছেলে শোয়েব মোল্লা (২৯) ও ভাঙ্গা পৌরসভার কাফুরিয়া সদরদী মহল্লার বাসিন্দা শাহী মুন্সির ছেলে সোহান মুন্সি (২৮)। তাঁরা ভাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড ও টেম্পোস্ট্যান্ড এলাকায় চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ আছে।

এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। ‘বিএনপি করলে চাঁদাবাজি করেও মুক্তি মেলে’ শিরোনামে ১ মিনিট ৩৪ সেকেন্ডের ওই ভিডিওটি বুধবার সন্ধ্যায় পোস্ট করা হয় ‘শেখ আরাফাত’ নামে একটি ফেসবুক আইডি থেকে। ভিডিওতে দেখা যায়, ভাঙ্গা থানার সুসজ্জিত একটি কক্ষে ছয়জন ব্যক্তি পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছেন। ছয়জনের মধ্যে থাকা বাঁ থেকে দ্বিতীয় ব্যক্তিটি ভাঙ্গা উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক।

ভিডিওতে ওসি মিজানুর রহমানকে বলতে শোনা যায়, ‘আপনাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ যে আপনারা এই এলাকায় বিভিন্ন খারাপ কাজের সঙ্গে জড়িত, চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত, বিভিন্ন অপকর্মের সঙ্গে জড়িত। এই তথ্য আর কি আমরা শুনব? এই সোহান (সোহান মুন্সি) বলেন।’

এরপর ওসি সোহানের বাবা শাহী মুন্সিকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘বাবা হিসেবে আপনি বলেন, আপনি ছেলেকে নিতে আসছেন আপনি বলেন, তারা যদি কিছু করে এই দায়দায়িত্ব আপনি নেবেন?’ জবাবে শাহী মুন্সিকে অস্পষ্ট করে কিছু একটা বলতে শোনা যায়।

এরপর ওসি উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব মোল্লাকে বলেন, ‘আইয়ুব ভাই, আপনি বলেন ওদের সম্বন্ধে। আপনি কেন আসছেন, কী করতে চাচ্ছেন?’

উত্তরে আইয়ুব মোল্লা বলেন, ‘আমি আসছি, ওরা আমাদের এলাকার ছেলে। শুনলাম ওদেরকে থানায় ডেকে আনা হয়েছে, এখন ওরা যদি ত্রুটিবিচ্যুতি কিছু করে থাকে, সেটা আমরা সংশোধন করার চেষ্টা করব এবং ভবিষ্যতে যদি করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যে ব্যবস্থা নেবে আমরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহযোগিতা করব।’

তখন ওসি বলেন, ‘আমার স্পষ্ট কথা ভাই, যেহেতু আমার সিনিয়র অফিসারদের নির্দেশ কোনো রকম আইনশৃঙ্খলার অবনতি হবে, চাঁদাবাজি হবে, গরিবের অত্যাচার করবে এসব কাজ ভাই হবে না। যদি হয় দায়দায়িত্ব যেহেতু আপনি (আইয়ুব মোল্লা) আসছেন, আপনি বাবা (সোহানের বাবা) হিসেবে আসছেন, বিএনপির সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব আপনাকে নিতে হবে। কথা ক্লিয়ার?’

থানায় গিয়ে আটক দুজনকে ছাড়িয়ে আনতে ওসির সঙ্গে কথা বলার বিষয়টি বিএনপি নেতা আইয়ুব মোল্লা নিশ্চিত করেছেন। তিনি দাবি করেন, চাঁদাবাজির যে অভিযোগ ওই দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনা হয়েছিল, তা কথিত অভিযোগ। আইয়ুব মোল্লা বলেন, ‘ভাঙ্গা বাস ও টেম্পোস্ট্যান্ডে কাউন্টার “খাওয়াদাওয়া” নিয়ে গ্যাঞ্জাম আছে। অন্য গ্রুপ এদের ধরিয়ে নিয়েছিল। আমরা পলিটিক্স করি। এঁরা আমাদের এলাকার ছেলে। একটি দলে একটি পরিবারে ভালো–মন্দ সব ধরনের লোক থাকে। এ জন্য আমি ওসি সাহেবকে বলেছি, আমরা ওদের সংশোধনের উদ্যোগ নেব, না পারলে আপনার হাতে তুলে দেব।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি মিজানুর রহমান কোনো মন্তব্য করতে চাননি। তবে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে ফরিদপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ভাঙ্গা সার্কেল) মো. রেজওয়ান দীপু  বলেন, ভাঙ্গা গোলচত্বর এলাকা থেকে ওই দুই ব্যক্তি বিভিন্ন যানবাহন থেকে ৩০ থেকে ৫০ টাকা করে চাঁদা তোলেন, এমন অভিযোগে তাঁদের আটক করা হয়। এমনি তাঁদের নামে কোনো বড় ক্রাইমের অভিযোগ নেই। এ জন্য বিএনপি নেতা ও তাঁদের বাবার মুচলেকায় ওই দুজনকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এ সংক্রান্ত ভিডিওটি কীভাবে বাইরে গেল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

‘এলাকার ছেলে’ পরিচয় দিয়ে চাঁদাবাজির আসামিদের ছাড়িয়ে নিলেন বিএনপি নেতা

আপডেট সময় ০৪:৩৫:৪৯ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬

ফরিদপুরের ভাঙ্গায় চাঁদাবাজির অভিযোগে দুই তরুণকে পুলিশ আটক করার পর তাঁদের ‘এলাকার ছেলে’ পরিচয় দিয়ে থানা থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে গেছেন উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব মোল্লা। গত মঙ্গলবার রাতে ভাঙ্গা থানায় এ ঘটনা ঘটে।

পুলিশ চাঁদাবাজির অভিযোগে যে দুই ব্যক্তিকে আটক করেছিলেন তাঁরা হলেন ভাঙ্গা পৌরসভার হোগলাডাঙ্গী সদরদী মহল্লার বাসিন্দা ৮ নং ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর লিয়াকত মোল্লার ছেলে শোয়েব মোল্লা (২৯) ও ভাঙ্গা পৌরসভার কাফুরিয়া সদরদী মহল্লার বাসিন্দা শাহী মুন্সির ছেলে সোহান মুন্সি (২৮)। তাঁরা ভাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড ও টেম্পোস্ট্যান্ড এলাকায় চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ আছে।

এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। ‘বিএনপি করলে চাঁদাবাজি করেও মুক্তি মেলে’ শিরোনামে ১ মিনিট ৩৪ সেকেন্ডের ওই ভিডিওটি বুধবার সন্ধ্যায় পোস্ট করা হয় ‘শেখ আরাফাত’ নামে একটি ফেসবুক আইডি থেকে। ভিডিওতে দেখা যায়, ভাঙ্গা থানার সুসজ্জিত একটি কক্ষে ছয়জন ব্যক্তি পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছেন। ছয়জনের মধ্যে থাকা বাঁ থেকে দ্বিতীয় ব্যক্তিটি ভাঙ্গা উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক।

ভিডিওতে ওসি মিজানুর রহমানকে বলতে শোনা যায়, ‘আপনাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ যে আপনারা এই এলাকায় বিভিন্ন খারাপ কাজের সঙ্গে জড়িত, চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত, বিভিন্ন অপকর্মের সঙ্গে জড়িত। এই তথ্য আর কি আমরা শুনব? এই সোহান (সোহান মুন্সি) বলেন।’

এরপর ওসি সোহানের বাবা শাহী মুন্সিকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘বাবা হিসেবে আপনি বলেন, আপনি ছেলেকে নিতে আসছেন আপনি বলেন, তারা যদি কিছু করে এই দায়দায়িত্ব আপনি নেবেন?’ জবাবে শাহী মুন্সিকে অস্পষ্ট করে কিছু একটা বলতে শোনা যায়।

এরপর ওসি উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব মোল্লাকে বলেন, ‘আইয়ুব ভাই, আপনি বলেন ওদের সম্বন্ধে। আপনি কেন আসছেন, কী করতে চাচ্ছেন?’

উত্তরে আইয়ুব মোল্লা বলেন, ‘আমি আসছি, ওরা আমাদের এলাকার ছেলে। শুনলাম ওদেরকে থানায় ডেকে আনা হয়েছে, এখন ওরা যদি ত্রুটিবিচ্যুতি কিছু করে থাকে, সেটা আমরা সংশোধন করার চেষ্টা করব এবং ভবিষ্যতে যদি করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যে ব্যবস্থা নেবে আমরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহযোগিতা করব।’

তখন ওসি বলেন, ‘আমার স্পষ্ট কথা ভাই, যেহেতু আমার সিনিয়র অফিসারদের নির্দেশ কোনো রকম আইনশৃঙ্খলার অবনতি হবে, চাঁদাবাজি হবে, গরিবের অত্যাচার করবে এসব কাজ ভাই হবে না। যদি হয় দায়দায়িত্ব যেহেতু আপনি (আইয়ুব মোল্লা) আসছেন, আপনি বাবা (সোহানের বাবা) হিসেবে আসছেন, বিএনপির সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব আপনাকে নিতে হবে। কথা ক্লিয়ার?’

থানায় গিয়ে আটক দুজনকে ছাড়িয়ে আনতে ওসির সঙ্গে কথা বলার বিষয়টি বিএনপি নেতা আইয়ুব মোল্লা নিশ্চিত করেছেন। তিনি দাবি করেন, চাঁদাবাজির যে অভিযোগ ওই দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনা হয়েছিল, তা কথিত অভিযোগ। আইয়ুব মোল্লা বলেন, ‘ভাঙ্গা বাস ও টেম্পোস্ট্যান্ডে কাউন্টার “খাওয়াদাওয়া” নিয়ে গ্যাঞ্জাম আছে। অন্য গ্রুপ এদের ধরিয়ে নিয়েছিল। আমরা পলিটিক্স করি। এঁরা আমাদের এলাকার ছেলে। একটি দলে একটি পরিবারে ভালো–মন্দ সব ধরনের লোক থাকে। এ জন্য আমি ওসি সাহেবকে বলেছি, আমরা ওদের সংশোধনের উদ্যোগ নেব, না পারলে আপনার হাতে তুলে দেব।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ওসি মিজানুর রহমান কোনো মন্তব্য করতে চাননি। তবে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে ফরিদপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ভাঙ্গা সার্কেল) মো. রেজওয়ান দীপু  বলেন, ভাঙ্গা গোলচত্বর এলাকা থেকে ওই দুই ব্যক্তি বিভিন্ন যানবাহন থেকে ৩০ থেকে ৫০ টাকা করে চাঁদা তোলেন, এমন অভিযোগে তাঁদের আটক করা হয়। এমনি তাঁদের নামে কোনো বড় ক্রাইমের অভিযোগ নেই। এ জন্য বিএনপি নেতা ও তাঁদের বাবার মুচলেকায় ওই দুজনকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। এ সংক্রান্ত ভিডিওটি কীভাবে বাইরে গেল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।