পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি মন্ত্রীর হুমকি
মাদরাসা বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হবে: পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি মন্ত্রী
- আপডেট সময় ০২:১৫:৩২ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৮ মে ২০২৬
- / ২১ বার পড়া হয়েছে
পশ্চিমবঙ্গে সরকার পরিবর্তনের পর থেকেই চরম অস্থিরতা ও আতঙ্কের পরিবেশ বিরাজ করছে। রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় এসেই বিভিন্ন প্রান্তে উচ্ছেদ ও ভাঙচুর অভিযান শুরু করেছে বলে অভিযোগ।
রাজনৈতিক মহলের একাংশের দাবি, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নির্দেশেই বেছে বেছে মুসলিম সম্প্রদায়ের বাড়িঘর বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। শেয়ালদহ স্টেশন চত্বরে চলছে হকার উচ্ছেদ। এবার চরম আঘাত আসছে সংখ্যালঘুদের শিক্ষার অন্যতম প্রধান পীঠস্থান মাদরাসা ব্যবস্থার ওপর।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ঐতিহ্যবাহী মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থাও চরম হুমকির মুখে। পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান সংখ্যালঘু উন্নয়ন বিষয়ক ও মাদরাসা শিক্ষা এবং অনগ্রসর শ্রেণি কল্যাণ দপ্তরের মন্ত্রী ক্ষুদিরাম টুডু স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, রাজ্যে বেআইনিভাবে চলা কোনো মাদরাসা বরদাস্ত করা হবে না।
সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে তিনি রীতিমতো হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, মাদরাসা কর্তৃপক্ষ যদি সরকারি নির্দেশ অমান্য করে, তবে প্রয়োজনে বুলডোজার দিয়ে সেসব মাদরাসা ভেঙে ফেলা হবে। যদিও পরবর্তীতে তিনি নিজের বক্তব্যের সাফাই গেয়ে দাবি করেন, তার কথার ভুল ব্যাখ্যা করা হচ্ছে এবং তিনি ঢালাও মাদরাসা ভাঙার কথা বলেননি, বরং কিছু ‘বেআইনি’ মাদরাসার বিরুদ্ধে তদন্তের কথা বলেছেন। কিন্তু তার এই বুলডোজার তত্ত্বের অবতারণা রাজ্যজুড়ে তীব্র আতঙ্ক ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
বিজেপি শাসিত উত্তরপ্রদেশ এবং আসামে ইতঃপূর্বে বেআইনি তকমা দিয়ে একাধিক মাদরাসা বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। বিজেপি একই রূপরেখা বাংলায় কার্যকর করার নীলনকশা তৈরি করছে বলে আশঙ্কা করছেন ওয়াকিবহাল মহল।
মাদরাসাগুলোকে মূল টার্গেট বানিয়ে মন্ত্রী ক্ষুদিরাম টুডু জানান, সরকার অনুমোদিত, স্বীকৃত আন-এডেড এবং ইংরেজি মাধ্যম মাদরাসার যাবতীয় তথ্য সরেজমিনে যাচাই করা হবে এবং কোনো গরমিল বা বেআইনি কাজের প্রমাণ মিললে তা সরাসরি বন্ধ করে দেওয়া হবে। একই সঙ্গে মাদরাসা পরিচালন সমিতি বা কর্তৃপক্ষের কোনো অনৈতিক কাজ বা সরকারি জায়গা দখলের অভিযোগ উঠলে কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
ইতোমধ্যেই পশ্চিমবঙ্গের এই নয়া সরকার সংখ্যালঘু উন্নয়ন ও মাদরাসা শিক্ষা দপ্তরের সব পুরোনো বোর্ড ও বডি ভেঙে দিয়েছে, যা এই শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর সরকারি নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে কায়েম করার একটি পরিকল্পিত পদক্ষেপ বলে মনে করা হচ্ছে।
মন্ত্রীর এ ধরনের বিতর্কিত ও পরোক্ষ ঘৃণামূলক বার্তার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মুসলিম আলেম, ধর্মীয় গুরু এবং সমাজের বিশিষ্টজনরা। তাদের স্পষ্ট বক্তব্য, ভারতের সংবিধান সংখ্যালঘুদের নিজস্ব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্বাধীনভাবে পরিচালনা করার মৌলিক অধিকার দিয়েছে। বিভিন্ন মসজিদ বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নিজস্ব উদ্যোগে যে সব খারেজি মাদরাসা তৈরি করে শিশু থেকে শুরু করে ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষা দান করছে, তা ভারতীয় আইন মোতাবেক বিন্দুমাত্র বেআইনি নয়। আসামের মতো রাজ্যেও বহু খারেজি মাদরাসা এখনো বহাল তবিয়তে চলছে, যারা সরকারের কাছ থেকে কোনো আর্থিক সাহায্য না নিয়ে সম্পূর্ণভাবে সম্প্রদায়ের অর্থবলে পরিচালিত হয়। নয়া প্রশাসন যেভাবে মাদরাসার স্বাধিকারে হস্তক্ষেপ করছে এবং বুলডোজার চালানোর প্রচ্ছন্ন হুমকি দিচ্ছে, তা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক।
অবশ্য বিতর্কের ড্যামেজ কন্ট্রোল করতে মন্ত্রী ক্ষুদিরাম টুডু মাদরাসার ঘাটতি মেটানো এবং উন্নয়নের কিছু আশ্বাসও দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, স্কুলগুলোর মতো মাদরাসাতেও দ্রুত নতুন ম্যানেজিং কমিটি গঠন করা হবে এবং পড়ুয়াদের স্বার্থে শিক্ষা ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা হবে। বর্তমানে ইংরেজি মাধ্যম ও সরকার অনুমোদিত মাদরাসাগুলোতে যে তীব্র স্থায়ী শিক্ষক ঘাটতি রয়েছে, তা মেটাতে স্কুল সার্ভিস কমিশন বা এসএসসির মাধ্যমে স্কুলে নিয়োগের সময়েই মাদরাসাতেও শিক্ষক নিয়োগ করা হবে।
তিনি আরো বলেন, স্কুল ও মাদরাসার সুযোগ-সুবিধা এবং পঠনপাঠনের মান যাতে একই স্তরে থাকে, সেই বিষয়েও দপ্তর নজর রাখবে। পাশাপাশি মাদরাসার হোস্টেলগুলোকে পড়ুয়াদের কল্যাণে সঠিকভাবে ব্যবহার করার উদ্যোগ নেওয়া হবে এবং স্কুলের মতোই মাদরাসাগুলোও পৃথক দপ্তরের মাধ্যমে পরিচালিত হবে।
বিশিষ্টজনরা বলছেন, উন্নয়নের এ সমস্ত চটকদার আশ্বাসের আড়ালে মাদরাসা ধ্বংসের এবং সংখ্যালঘু প্রতিষ্ঠানগুলোকে টার্গেট করার যে আগ্রাসী মানসিকতা নয়া সরকারের মন্ত্রীর বুলডোজার মন্তব্যে প্রকাশ পেয়েছে, তা বাংলার ধর্মনিরপেক্ষ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে এক গভীর সংকটের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
কলকাতায় বিক্ষোভে পুলিশের অ্যাকশন
বুলডোজারের অভিযান এবং ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত বন্ধের দাবিতে বিক্ষোভ দেখাল পার্ক সার্কসের বাসিন্দারা। গতকাল রোববার দুপুর দুটো নাগাদ সেভেন পয়েন্টে জমায়েত হন এলাকার প্রায় ৫০০ নারী-পুরুষ। তবে এদিনের জমায়েতে মহিলাদের অংশগ্রহণ ছিল বেশি। বিক্ষোভ চলাকালে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় বিশাল পুলিশ বাহিনী এবং সিআরপিএফের জওয়ানেরা। আসে কলকাতা পুলিশের র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্সও। পুলিশ প্রথমে বিক্ষোভ তুলে নেওয়ার অনুরোধ জানায়। বিক্ষুব্ধ জনতা উত্তেজিত হয়ে অবরোধের চেষ্টা করে। এরপরই পুলিশ লাঠিচার্জ শুরু করে। ঘটনাস্থলে বহু নারীকে রাস্তা ও ফুটপাতে ফেলে বেধড়ক মারধর করে পুলিশ। এরপর তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে।























