ইছামতি নদী উদ্ধার প্রকল্প: মেগা প্রজেক্ট যখন ‘বড় নালা’ তৈরির আয়োজন
- আপডেট সময় ০২:১৮:০০ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬
- / ২৪ বার পড়া হয়েছে
পাবনার ঐতিহ্যবাহী ইছামতি নদী পুনরুজ্জীবিত করতে দেড় হাজার কোটি টাকার মেগা প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছিল বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে। কিন্তু আলোর মুখ দেখতে থাকা এই বিশাল আয়োজন এখন যেন দায়সারা এক কর্মযজ্ঞ। বুয়েট বিশেষজ্ঞদের মতামতকে তোয়াক্কা না করে প্রকল্পের নকশা থেকে হঠাৎ বাদ দেওয়া হয়েছে নদী প্রবাহে বাধা সৃষ্টিকারী ১৩ সেতু পুনর্নির্মাণ ও নৌপথ তৈরির পরিকল্পনা। তড়িঘড়ি করে নেওয়া এ সিদ্ধান্তের পেছনে রাজনৈতিক চাপ ও প্রশাসনিক উদাসীনতাকে দায়ী করছেন স্থানীয়রা। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, যথাযথ সংস্কার ছাড়া এই মেগা প্রকল্প শেষ পর্যন্ত নদী নয়, স্রেফ একটি বড় নালা তৈরিতেই সীমাবদ্ধ থাকবে।
পাবনা পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা যায়, এক সময় ইছামতি নদী দিয়েই কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বজরা (নৌকা) চলত। কিন্তু গত কয়েক দশকে দখল আর দূষণের কবলে পড়ে নদীটি আজ মৃতপ্রায়। চলাচলের সুবিধার কথা বলে নদীর ওপর অসংখ্য নিচু ব্রিজ ও কালভার্ট নির্মাণ করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ, এলজিইডি এবং সড়ক ও জনপথ বিভাগসহ বিভিন্ন দপ্তর ।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) বিশেষজ্ঞ দল সমীক্ষা চালিয়ে জানিয়েছে, এসব অপরিকল্পিত স্থাপনাই নদীর স্বাভাবিক পানি প্রবাহে প্রধান বাধা। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বিশেষজ্ঞদের এমন মতামতের ভিত্তিতে এবং দীর্ঘদিনের জনদাবির মুখে ২০২৩ সালে ‘ইছামতি উদ্ধারে’ এক হাজার ৫৫৪ কোটি টাকার মেগা প্রকল্পটি হাতে নেয় তৎকালীন সরকার।
২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদি এ প্রকল্পে বলা হয়েছিল, পানি প্রবাহে বাধা সৃষ্টিকারী সব কালভার্ট ভেঙে সেখানে আধুনিক ও সুউচ্চ সেতু নির্মাণ করা হবে। একইসঙ্গে নদীকে দখলমুক্ত করে সৌন্দর্যবর্ধনের মাধ্যমে একটি নান্দনিক রূপ দেওয়া হবে। পানি উন্নয়ন বোর্ড ও সেনাবাহিনীর যৌথ তত্ত্বাবধানে নদীটির শহরের অংশের বাইরের কাজ দ্রুত চললেও পাঁচ কিলোমিটার শহর অংশের কাজ মামলা জটিলতায় বারবার থমকে যাচ্ছে।
জানা যায়, প্রকল্পের মূল পরিকল্পনার বড় একটি অংশ ছিল শহরের ব্যস্ততম আব্দুল হামিদ রোডের যানজট কমাতে নদীতে বিকল্প নৌপথ তৈরি করা। কিন্তু নতুন নৌপথের কাজও বাদ দেওয়া হয়েছে সংশোধিত ডিপিপিতে।
তবে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি আসে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের মাত্র সাতদিন আগে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে। তড়িঘড়ি করে প্রকল্পের নকশা সংশোধন (আরডিপিপি) করা হয়। রহস্যজনকভাবে নতুন এ নকশা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে প্রবাহে বাধা সৃষ্টিকারী ১৩টি সেতু পুনর্নির্মাণের পরিকল্পনা। এ কারণে রূপকথা সড়ক, পৈলানপুর ও নতুন ব্রিজসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো আগের মতোই রয়ে যাচ্ছে, যা নদী উদ্ধারের মূল লক্ষ্যকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পানি উন্নয়ন বোর্ডের একজন কর্মকর্তার ভাষ্য, প্রকল্পের মূল পরিকল্পনার বড় একটি অংশ ছিল শহরের ব্যস্ততম আব্দুল হামিদ রোডের যানজট কমাতে নদীতে বিকল্প নৌপথ তৈরি করা। কিন্তু নতুন সংশোধনীতে নৌপথের কাজও বাদ দেওয়া হয়েছে সংশোধিত ডিপিপিতে।
তিনি বলেন, একনেকে পাস হওয়া একটি জনগুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প কোনো আলাপ-আলোচনা ছাড়াই এমন কাটছাঁট নজিরবিহীন। এতে প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য অর্জন হবে না, যা ব্যর্থ প্রকল্পে পরিণত হবে।
এ বিষয়ে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের ডিন অধ্যাপক ড. নাজমুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, প্রতিবন্ধক সেতুগুলো রেখে নদী খনন করা মানে হলো একটি ড্রেন বা নালা তৈরি করা, নদী উদ্ধার নয়। প্রবাহ রুদ্ধ থাকলে নদী কখনোই তার যৌবন ফিরে পাবে না। হাজার কোটি টাকার এ প্রকল্প কেবল অপচয়েই পর্যবসিত হবে।
এদিকে তড়িঘড়ি করে করা এই পরিবর্তনকে ‘জনস্বার্থবিরোধী’ উল্লেখ করে অবিলম্বে প্রকল্পটির সংশোধিত ডিপিপি বাতিল ও পূর্বের নকশা অনুযায়ী ব্রিজ নির্মাণ এবং সৌন্দর্যবর্ধনের দাবি জানিয়ে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছেন পাবনা সদর আসনের সংসদ সদস্য শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস।
পাবনা জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও জেলা বিএনপির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট মাসুদ খন্দকার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এ প্রকল্পটি কাটছাঁট করা হয়েছে। বুয়েট বিশেষজ্ঞদের মতামতকেও উপেক্ষা করা হয়েছে। আমি এর নিন্দা জানাই। প্রকল্পটি পরিবর্তন না করে প্রথম অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী বাস্তবায়নের দাবি জানাচ্ছি।
তবে পাবনা পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ও প্রকল্প পরিচালক সুধাংশু কুমার সরকার এ বিষয়ে বলেন, নকশা পরিবর্তনে প্রকল্পের খুব বেশি ক্ষতি হবে না। এরই মধ্যে ২৬ কিলোমিটার পর্যন্ত খননকাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। শহর অংশে সাড়ে তিন কিলোমিটার এলাকায় আমরা আংশিক খননকাজ করেছি। তবে শহর অংশে মামলা জটিলতার কারণে প্রকল্পের কাজ কিছুটা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আমরা এটি সমাধানের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।



















