ঢাকা ১২:৩৯ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২২ মে ২০২৬, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বাড়ছে উৎসে কর, নিত্যপণ্যের দাম নিয়ে দুশ্চিন্তায় সাধারণ মানুষ

স্টাফ রিপোর্টার
  • আপডেট সময় ০৬:৫৫:২৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬
  • / ২২ বার পড়া হয়েছে

বাজেটে সুনির্দিষ্ট কী ধরনের শুল্ক-কর পরিবর্তনের প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় পড়ে, ওই খবর অনেকেই রাখেন না। তবে এটা ঠিক, বাজেট মানেই কিছু পণ্যের দামবৃদ্ধি- এমন আতঙ্ক অধিকাংশ মানুষের মধ্যেই রয়েছে। এ বছরও সরকারের একটি উদ্যোগ সাধারণ মানুষের ওই আতঙ্ক বা দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেটা হলো, আসন্ন বাজেটে নিত্যপণ্যের উৎসে কর দ্বিগুণ করার পরিকল্পনা।

মুন্নুজান বেগম, তিনি একটি বেসরকারি ব্যাংকে ছোট্ট পদে চাকরি করেন। তবে তিনি উৎসে করের বিষয়টি জানেন।তিনি বলেন, এবার বাজেটের পরে সবকিছুর দাম বাড়বে। এমনিতে যে মূল্যবৃদ্ধি, এরমধ্যে উৎসে কর বাড়ালে সংসার চালানো দায় হয়ে যাবে। এ সিদ্ধান্ত গরিব মানুষের জন্য ‍’যন্ত্রণার ওপর আরেক যন্ত্রণা’।

মুন্নুজানের মতো উৎসে করের প্রভাবে নিত্যপণ্যের দাম বাড়তে পারে এ শঙ্কার কথা জানা নেই পাশের হাজীপাড়া এলাকার অটোরিকশা চালক মাসুদ মিয়ার। তবে তিনি মনে করেন যে বাজেটের পরে তার জীবনযাত্রার খরচ বাড়বে। প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, অটোতে যাত্রীরা কথা বলে যে আবারও সবকিছুর দাম বাড়বে। এবার নাকি চাল আটা রুটির দামও বাড়বে। শুনি আর চিন্তায় পড়ি। বছর বছর এগুলো ভালো লাগেনা।

অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্র বলছে, স্থানীয় ঋণপত্রের কমিশনের ওপর উৎসে কর দশমিক ৫০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে এক শতাংশ করার প্রস্তাব রাখা হচ্ছে আসছে বাজেটে। এটি হলে এ বাড়তি করের আওতায় পড়বে প্রায় ২৮টি কৃষিপণ্য। অর্থাৎ বহুল ব্যবহৃত ধান, চাল, আটা, গম, ডাল, তেল, চিনি, লবণ, আলু, পেঁয়াজ, রসুনসহ প্রায় সব ধরনের কৃষিপণ্যের দাম বাড়তে পারে। সঙ্গে বেড়ে যাবে এসব পণ্য থেকে প্রক্রিয়াজাত কৃষি ও খাদ্যপণ্য।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উৎসে করের এ চাপ পরোক্ষভাবে ভোক্তার কাঁধে পড়বে। এমনিতেই উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে নিম্ন ও মধ্যআয়ের মানুষ চাপে রয়েছে। নতুন কর পরিস্থিতিকে আরও জটিল করতে পারে।

যদিও উৎসে কর বছর শেষে হিসাব করে কোম্পানির আয়-ব্যয়ের হিসাবে পড়ে সমন্বয়ের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এনবিআরের কাছে একবার করের টাকা গেলে ওই টাকা আর ফেরত পাওয়া যায় না বলে দাবি ব্যবসায়ীদের। এজন্য করকে খরচ হিসাব করে তা পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত করে কোম্পানিগুলো। যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপরই পড়বে।

উৎস করের ধারাবাহিকতা ও বাস্তবতা
এ বছর রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি ও কর ফাঁকি রোধের নানামুখী উদ্যোগের অংশ হিসেবে এ কর বসতে যাচ্ছে বলে জানা গেছে। যদিও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে কৃষিপণ্যের সরবরাহ পর্যায়ে উৎসে কর পুরোপুরি প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে আসছে। তাদের যুক্তি, কৃষক ও ক্ষুদ্র বিক্রেতাদের বড় অংশই কর ব্যবস্থার বাইরে। ফলে বাস্তবে এটি আদায় করা কঠিন।

এতে রাজস্ব আদায়ের সুফলের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি চাপ তৈরি করে পণ্যমূল্যে। যেখানে গত তিন বছর ধরে দেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী, যার অবস্থান ১০ শতাংশের আশপাশে।

চলতি অর্থবছরেও সরকার এই উৎসে কর এক শতাংশ থেকে কমিয়ে দশমিক ৫০ শতাংশে নামিয়েছিল। তার আগের অর্থবছরে কৃষিপণ্যের ওপর উৎসে কর দুই শতাংশ থেকে কমিয়ে এক শতাংশ করা হয়। কিন্তু এবার আবার তা দ্বিগুণ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

যা বলছেন ব্যবসায়ীরা
বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মহাসচিব ইমরান হাসান বলেন, আমরা খুচরা বাজার থেকে নগদে পণ্য কিনি। সেখানে আসলে উৎসে কর কর্তন সম্ভব নয়। কারণ বিক্রেতা বা কৃষকদের টিআইএন নেই। তারা আয়করের ব্যাপারে অজ্ঞ। এ কারণে কৃষিপণ্যের সরবরাহে এই করটা না থাকলেই ভালো। এটি ততটা কার্যকর নয়।

আসলে উৎসে কর কর্তন সম্ভব নয়। কারণ বিক্রেতা বা কৃষকদের টিআইএন নেই। তারা আয়করের ব্যাপারে অজ্ঞ। কৃষিপণ্য সরবরাহে কর না থাকলেই ভালো। এটি ততটা কার্যকর নয়।— বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মহাসচিব ইমরান হাসান

তার মতে, এ করের কারণে বাড়িতে যেমন মানুষের খাওয়ার খরচ বাড়বে তেমন রেস্তোরাঁরও। তিনি বলেন, হোটেল-রেস্তোরাঁ সরাসরি কৃষিপণ্যের বাজারের সঙ্গে যুক্ত। ফলে কাঁচামালের দাম বাড়লে খাবারের দামও বাড়বে।

এ করের প্রভাব পড়বে প্রক্রিয়াজাত কৃষি ও খাদ্যপণ্যের দামেও। বাংলাদেশ অ্যাগ্রো-প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক ছৈয়দ মুহাম্মদ শোয়াইব হাছান বলেন, বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বাজারেও অনিশ্চয়তা রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জাহাজ ভাড়া কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ার চাপ। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের পক্ষ থেকে সহায়তা বাড়ানোর পরিবর্তে করের চাপ বৃদ্ধি করা হলে কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত শিল্প খাত প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা হারাতে পারে। পণ্যমূল্যও বাড়বে।

বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এমন অবস্থায় সরকারের পক্ষ থেকে সহায়তা বাড়ানোর বদলে করের চাপ বাড়ানো হলে প্রক্রিয়াজাত শিল্পখাত প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা হারাতে পারে। এর প্রভাব বাড়তে পারে পণ্যের দাম।— বাপার সাধারণ সম্পাদক ছৈয়দ মুহাম্মদ শোয়াইব হাছান

বড় দুশ্চিন্তায় গরিব মানুষ
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) ‘ইকনোমিক ডায়নামিকস অ্যান্ড মুড অ্যাট হাউজহোল্ড লেবেল ইন মিড ২০২৫’ শীর্ষক গবেষণা দেখা গেছে, দেশে ২০২২ সালের চেয়ে শেষ বছর (২০২৫) এ অর্থাৎ গত তিন বছরের ব্যবধানে দারিদ্র্য কমেনি, উল্টো বেশ বেড়েছে। ২০২৫-এ দারিদ্র্যের হার ২৭ দশমিক ৯৩ বা প্রায় ২৮ শতাংশ ছিল, যেখানে ২০২২ সালে এই হার ছিল ১৮ দশমিক ৭।

পিপিআরসির গবেষণা বলছে, শহরের পরিবারের মাসিক আয় কমেছে, কিন্তু খরচ বেড়ে গেছে। শহরের একটি পরিবারের গড়ে মাসিক আয় ৪০ হাজার ৫৭৮ টাকা। খরচ হয় ৪৪ হাজার ৯৬১ টাকা। অন্যদিকে গ্রামের একটি পরিবারের গড় আয় ২৯ হাজার ২০৫ টাকা, খরচ ২৭ হাজার ১৬২ টাকা। আর একটি পরিবারের মাসের মোট খরচের প্রায় ৫৫ শতাংশ চলে যায় খাবার কেনায়।

এ অবস্থায় খাদ্যের দাম বাড়লে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েন নিম্নআয়ের মানুষ। রিকশা-ভ্যান-ইজিবাইক শ্রমিক ইউনিয়নের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলাম নাদিম বলেন, আমাদের চালকরা অল্প টাকায় কেক, রুটি কিনে খান। শরীরে শক্তি জোগাতে তাদের বারবার এসব খাবার খেতে হয়। এ খাবারের দাম বাড়লে নিম্ন আয়ের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

শাহানা হুদা রঞ্জনা একজন কলাম লেখক। জাগো নিউজে উৎসে কর বৃদ্ধি প্রসঙ্গে তার একটি কলামে তিনি লিখেছেন, কর বাড়ছে আর কমছে মানুষের বেঁচে থাকার সামর্থ্য। তার ভাষায়, মানুষের আয় বাড়ছে না, বরং কমছে। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়ায় বেকার বাড়ছে, বিশেষ করে শিক্ষিত ও তরুণ বেকার। অনেকেই কাজ হারিয়ে ইতোমধ্যে পথে বসেছেন। মধ্যবিত্তদের বড় একটা অংশ নিম্নবিত্তের তালিকায় নাম লিখিয়েছেন। এই বর্ণনাগুলো কোনোটাই বানানো নয়, সবটাই কঠিন বাস্তবতা।

ঠিক এরকম একটি অবস্থায় চাল, ডাল, তেল, ফলসহ ২৮টি নিত্যপণ্যের দাম প্রায় দ্বিগুণ করার পরিকল্পনা করছে এনবিআর। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন সবকিছু বাদ দিয়ে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষগুলোকে সরকারের কোপানলে ফেলতে ইচ্ছা হলো? আগেও বহুবার, বহুভাবে জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে। সাধারণ মানুষ ইতোমধ্যে মুখ থুবড়ে পড়েছে, এরপর হয়তো ডুবে যাবে।

তবে এ বিষয়ে এনবিআর ও অর্থমন্ত্রণালয় থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। শেষ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, সরকারের রাজস্ব আয়ের ওপর ব্যাপক চাপ রয়েছে। সে কারণেই উৎসে কর বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর বিকল্প ভালো কোনো প্রস্তাব আমাদের হাতে নেই।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

বাড়ছে উৎসে কর, নিত্যপণ্যের দাম নিয়ে দুশ্চিন্তায় সাধারণ মানুষ

আপডেট সময় ০৬:৫৫:২৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬

বাজেটে সুনির্দিষ্ট কী ধরনের শুল্ক-কর পরিবর্তনের প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় পড়ে, ওই খবর অনেকেই রাখেন না। তবে এটা ঠিক, বাজেট মানেই কিছু পণ্যের দামবৃদ্ধি- এমন আতঙ্ক অধিকাংশ মানুষের মধ্যেই রয়েছে। এ বছরও সরকারের একটি উদ্যোগ সাধারণ মানুষের ওই আতঙ্ক বা দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেটা হলো, আসন্ন বাজেটে নিত্যপণ্যের উৎসে কর দ্বিগুণ করার পরিকল্পনা।

মুন্নুজান বেগম, তিনি একটি বেসরকারি ব্যাংকে ছোট্ট পদে চাকরি করেন। তবে তিনি উৎসে করের বিষয়টি জানেন।তিনি বলেন, এবার বাজেটের পরে সবকিছুর দাম বাড়বে। এমনিতে যে মূল্যবৃদ্ধি, এরমধ্যে উৎসে কর বাড়ালে সংসার চালানো দায় হয়ে যাবে। এ সিদ্ধান্ত গরিব মানুষের জন্য ‍’যন্ত্রণার ওপর আরেক যন্ত্রণা’।

মুন্নুজানের মতো উৎসে করের প্রভাবে নিত্যপণ্যের দাম বাড়তে পারে এ শঙ্কার কথা জানা নেই পাশের হাজীপাড়া এলাকার অটোরিকশা চালক মাসুদ মিয়ার। তবে তিনি মনে করেন যে বাজেটের পরে তার জীবনযাত্রার খরচ বাড়বে। প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, অটোতে যাত্রীরা কথা বলে যে আবারও সবকিছুর দাম বাড়বে। এবার নাকি চাল আটা রুটির দামও বাড়বে। শুনি আর চিন্তায় পড়ি। বছর বছর এগুলো ভালো লাগেনা।

অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্র বলছে, স্থানীয় ঋণপত্রের কমিশনের ওপর উৎসে কর দশমিক ৫০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে এক শতাংশ করার প্রস্তাব রাখা হচ্ছে আসছে বাজেটে। এটি হলে এ বাড়তি করের আওতায় পড়বে প্রায় ২৮টি কৃষিপণ্য। অর্থাৎ বহুল ব্যবহৃত ধান, চাল, আটা, গম, ডাল, তেল, চিনি, লবণ, আলু, পেঁয়াজ, রসুনসহ প্রায় সব ধরনের কৃষিপণ্যের দাম বাড়তে পারে। সঙ্গে বেড়ে যাবে এসব পণ্য থেকে প্রক্রিয়াজাত কৃষি ও খাদ্যপণ্য।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উৎসে করের এ চাপ পরোক্ষভাবে ভোক্তার কাঁধে পড়বে। এমনিতেই উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে নিম্ন ও মধ্যআয়ের মানুষ চাপে রয়েছে। নতুন কর পরিস্থিতিকে আরও জটিল করতে পারে।

যদিও উৎসে কর বছর শেষে হিসাব করে কোম্পানির আয়-ব্যয়ের হিসাবে পড়ে সমন্বয়ের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এনবিআরের কাছে একবার করের টাকা গেলে ওই টাকা আর ফেরত পাওয়া যায় না বলে দাবি ব্যবসায়ীদের। এজন্য করকে খরচ হিসাব করে তা পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত করে কোম্পানিগুলো। যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তাদের ওপরই পড়বে।

উৎস করের ধারাবাহিকতা ও বাস্তবতা
এ বছর রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি ও কর ফাঁকি রোধের নানামুখী উদ্যোগের অংশ হিসেবে এ কর বসতে যাচ্ছে বলে জানা গেছে। যদিও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে কৃষিপণ্যের সরবরাহ পর্যায়ে উৎসে কর পুরোপুরি প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে আসছে। তাদের যুক্তি, কৃষক ও ক্ষুদ্র বিক্রেতাদের বড় অংশই কর ব্যবস্থার বাইরে। ফলে বাস্তবে এটি আদায় করা কঠিন।

এতে রাজস্ব আদায়ের সুফলের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি চাপ তৈরি করে পণ্যমূল্যে। যেখানে গত তিন বছর ধরে দেশে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী, যার অবস্থান ১০ শতাংশের আশপাশে।

চলতি অর্থবছরেও সরকার এই উৎসে কর এক শতাংশ থেকে কমিয়ে দশমিক ৫০ শতাংশে নামিয়েছিল। তার আগের অর্থবছরে কৃষিপণ্যের ওপর উৎসে কর দুই শতাংশ থেকে কমিয়ে এক শতাংশ করা হয়। কিন্তু এবার আবার তা দ্বিগুণ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

যা বলছেন ব্যবসায়ীরা
বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মহাসচিব ইমরান হাসান বলেন, আমরা খুচরা বাজার থেকে নগদে পণ্য কিনি। সেখানে আসলে উৎসে কর কর্তন সম্ভব নয়। কারণ বিক্রেতা বা কৃষকদের টিআইএন নেই। তারা আয়করের ব্যাপারে অজ্ঞ। এ কারণে কৃষিপণ্যের সরবরাহে এই করটা না থাকলেই ভালো। এটি ততটা কার্যকর নয়।

আসলে উৎসে কর কর্তন সম্ভব নয়। কারণ বিক্রেতা বা কৃষকদের টিআইএন নেই। তারা আয়করের ব্যাপারে অজ্ঞ। কৃষিপণ্য সরবরাহে কর না থাকলেই ভালো। এটি ততটা কার্যকর নয়।— বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মহাসচিব ইমরান হাসান

তার মতে, এ করের কারণে বাড়িতে যেমন মানুষের খাওয়ার খরচ বাড়বে তেমন রেস্তোরাঁরও। তিনি বলেন, হোটেল-রেস্তোরাঁ সরাসরি কৃষিপণ্যের বাজারের সঙ্গে যুক্ত। ফলে কাঁচামালের দাম বাড়লে খাবারের দামও বাড়বে।

এ করের প্রভাব পড়বে প্রক্রিয়াজাত কৃষি ও খাদ্যপণ্যের দামেও। বাংলাদেশ অ্যাগ্রো-প্রসেসরস অ্যাসোসিয়েশনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক ছৈয়দ মুহাম্মদ শোয়াইব হাছান বলেন, বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে কৃষিপণ্যের রপ্তানি কমেছে। মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বাজারেও অনিশ্চয়তা রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জাহাজ ভাড়া কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ার চাপ। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের পক্ষ থেকে সহায়তা বাড়ানোর পরিবর্তে করের চাপ বৃদ্ধি করা হলে কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত শিল্প খাত প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা হারাতে পারে। পণ্যমূল্যও বাড়বে।

বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এমন অবস্থায় সরকারের পক্ষ থেকে সহায়তা বাড়ানোর বদলে করের চাপ বাড়ানো হলে প্রক্রিয়াজাত শিল্পখাত প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা হারাতে পারে। এর প্রভাব বাড়তে পারে পণ্যের দাম।— বাপার সাধারণ সম্পাদক ছৈয়দ মুহাম্মদ শোয়াইব হাছান

বড় দুশ্চিন্তায় গরিব মানুষ
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) ‘ইকনোমিক ডায়নামিকস অ্যান্ড মুড অ্যাট হাউজহোল্ড লেবেল ইন মিড ২০২৫’ শীর্ষক গবেষণা দেখা গেছে, দেশে ২০২২ সালের চেয়ে শেষ বছর (২০২৫) এ অর্থাৎ গত তিন বছরের ব্যবধানে দারিদ্র্য কমেনি, উল্টো বেশ বেড়েছে। ২০২৫-এ দারিদ্র্যের হার ২৭ দশমিক ৯৩ বা প্রায় ২৮ শতাংশ ছিল, যেখানে ২০২২ সালে এই হার ছিল ১৮ দশমিক ৭।

পিপিআরসির গবেষণা বলছে, শহরের পরিবারের মাসিক আয় কমেছে, কিন্তু খরচ বেড়ে গেছে। শহরের একটি পরিবারের গড়ে মাসিক আয় ৪০ হাজার ৫৭৮ টাকা। খরচ হয় ৪৪ হাজার ৯৬১ টাকা। অন্যদিকে গ্রামের একটি পরিবারের গড় আয় ২৯ হাজার ২০৫ টাকা, খরচ ২৭ হাজার ১৬২ টাকা। আর একটি পরিবারের মাসের মোট খরচের প্রায় ৫৫ শতাংশ চলে যায় খাবার কেনায়।

এ অবস্থায় খাদ্যের দাম বাড়লে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েন নিম্নআয়ের মানুষ। রিকশা-ভ্যান-ইজিবাইক শ্রমিক ইউনিয়নের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলাম নাদিম বলেন, আমাদের চালকরা অল্প টাকায় কেক, রুটি কিনে খান। শরীরে শক্তি জোগাতে তাদের বারবার এসব খাবার খেতে হয়। এ খাবারের দাম বাড়লে নিম্ন আয়ের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

শাহানা হুদা রঞ্জনা একজন কলাম লেখক। জাগো নিউজে উৎসে কর বৃদ্ধি প্রসঙ্গে তার একটি কলামে তিনি লিখেছেন, কর বাড়ছে আর কমছে মানুষের বেঁচে থাকার সামর্থ্য। তার ভাষায়, মানুষের আয় বাড়ছে না, বরং কমছে। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়ায় বেকার বাড়ছে, বিশেষ করে শিক্ষিত ও তরুণ বেকার। অনেকেই কাজ হারিয়ে ইতোমধ্যে পথে বসেছেন। মধ্যবিত্তদের বড় একটা অংশ নিম্নবিত্তের তালিকায় নাম লিখিয়েছেন। এই বর্ণনাগুলো কোনোটাই বানানো নয়, সবটাই কঠিন বাস্তবতা।

ঠিক এরকম একটি অবস্থায় চাল, ডাল, তেল, ফলসহ ২৮টি নিত্যপণ্যের দাম প্রায় দ্বিগুণ করার পরিকল্পনা করছে এনবিআর। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন সবকিছু বাদ দিয়ে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষগুলোকে সরকারের কোপানলে ফেলতে ইচ্ছা হলো? আগেও বহুবার, বহুভাবে জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে। সাধারণ মানুষ ইতোমধ্যে মুখ থুবড়ে পড়েছে, এরপর হয়তো ডুবে যাবে।

তবে এ বিষয়ে এনবিআর ও অর্থমন্ত্রণালয় থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। শেষ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, সরকারের রাজস্ব আয়ের ওপর ব্যাপক চাপ রয়েছে। সে কারণেই উৎসে কর বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর বিকল্প ভালো কোনো প্রস্তাব আমাদের হাতে নেই।