এনসিপির বাজেট আলোচনায় বক্তারা
শিক্ষাখাতে সরকারের প্রতিশ্রুতির বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই
- আপডেট সময় ০৯:২৬:১৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬
- / ২৮ বার পড়া হয়েছে
সরকার এক শিক্ষক-এক ট্যাব, ফ্রি ইউনিফর্ম এবং আরও ডিজিটাল ল্যাব স্থাপনের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। বর্তমানে আমাদের শিক্ষিত বেকার একটি বড় সমস্যা। এই তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিতে হবে।
বৃহস্পতিবার (২১ মে) বিকেলে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তায় বাংলাদেশের বাজেট: কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও সংস্কারে অগ্রাধিকার এবং জনপ্রত্যাশার বৈষম্যহীন সমৃদ্ধ বাংলাদেশ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠানের প্রথম সেশনে বক্তারা এসব কথা বলেন। ‘শিক্ষা, চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও কর্মসংস্থান’ শিরোনামে সেশনটি আয়েজিত হয়।
আলাউদ্দিন মোহাম্মদের সঞ্চালনায় এই সেশনে সভাপতিত্ব করেন আবদুল্লাহ আল আমিন, এমপি এবং সহ-সভাপতি হিসেবে ছিলেন নুসরাত তাবাসসুম, এমপি। সেশনে বিডিজবস ডট কমের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এ.কে.এম ফাহিম মাশরুর, বন্ডস্টেরিন ও সিঙ্গুলারিটি লিমিটের সহপ্রতিষ্ঠাতা মীর শাহরুখ ইসলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. এম নিয়াজ আসাদুল্লাহ এবং বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা মালিক সমিতির সভাপতি আলী জামান। যুগ্ম সদস্য সচিব আকরাম হুসাইন।
ফাহিম মাশরুর বলেন, বাংলাদেশে সামগ্রিকভাবে বেকারত্ব ৫ শতাংশের কম; যা এক দৃষ্টিকোণ থেকে খারাপ নয়। কিন্তু মূল পার্থক্য হল, আমাদের শিক্ষিত যুবকদের মধ্যে বেকারত্ব। আমাদের প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রায়জুয়েট পড়াশোনা শেষ করে ৩-৪ বছরের মধ্যে কোনো চাকরি পায় না। আমাদের বেকারত্বের প্রকৃতি কী? শিক্ষিত এবং তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব বেশি। বাংলাদেশের প্রতিবছর চাকরির বাজারে ২০ লাখ লোক প্রবেশ করে; সেখানে ৭ লাখ লোক গ্র্যাজুয়েট। এটা আগে ২ লাখ ছিল, কিন্তু হাসিনা জেলা-উপজেলা পর্যায় কলেজ করে এটি বাড়িয়েছে, মার্কেটে যার চাহিদা নেই।
তিনি বলেন, আমাদের যারা গ্র্যাজুয়েট, তারা তো শ্রমিকের কাজ করতে চায় না। তাদের সুযোগ দিতে হবে। ঢাকা শহরের ১৫ লাখ বাংলা টেসলা; এদের অনেকেই শিক্ষিত। যারা রাইড শেয়ার করে এদের প্রায় ৮০/৯০ ভাগ শিক্ষিত। তেল সংকটের সময় একজন মন্ত্রী বললেন, আমাদের তরুণরা তেল মজুত করে। তার ধারণাই নেই যে, আমাদের ৫ থেকে ৬ লাখ তরুণ এই রাইড শেয়ার করে নিজেদের ঘর চালায়। সরকার এখন ১২০ সিসি-র উপরের গাড়িতে ২ হাজার টাকা অগ্রিম কর দিতে চাচ্ছে। আমাদের পলিসিমেকারদের এখানে কাজ করা উচিত। কারা বেকার, কাদের উপর করও বসানো উচিত না, তা জানা দরকার।
আলী জামান বলেন, আমাদের ট্যাক্স-জিডিপির রেশিও ৬.৬ শতাংশ। আমার মনে হয়, এটা বাংলাদেশের জন্য যথেষ্ট ভালো। মানুষ কেন কর দেবে? খুব সাধারণ একটা কথা প্রচলিত আছে যে, সরকারের আয় মানে জনগণের ব্যয়। অর্থাৎ আমি সরকারকে যে কর দিচ্ছি, তা সে আমাকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও বাসস্থানের মাধ্যমে ফিরিয়ে দেবে। কিন্তু কোন সরকার এটা বাস্তবায়ন করতে পেরেছে। এখন বাজেটে কর আয় করাই মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ বাজেট একটা ভিশনারি জিনিস।
তিনি বলেন, সারাবছর তারা এসআরও তৈরি করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের উপর নতুন নতুন ট্যাক্স বসায়। এনবিআর যে স্লোগান দেয়, তা কতটা বায়বীয় খেয়াল করুন। পরোক্ষ ট্যাক্স-ভ্যাটের পরিমাণ এখন কমে গেছে। সবাই এটি দিচ্ছে। এখানেই দ্বন্দ্ব বা দ্বিচারিতা সৃষ্টি হচ্ছে। যেকারণে মানুষ মনে করে ট্যাক্সের খাতায় নাম লেখানো মানেই গিলোটিনে মাথা দেওয়া। যে ট্যাক্স দিচ্ছে, তার উপর নতুন ট্যাক্স আরোপ করা হচ্ছে। নতুন করদাতা সৃষ্টি হচ্ছে না।
শেয়ার বাজারের বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, আগে যেসব কোম্পানি যেমন ইউনিলিভার বা এরপর যারা বাংলাদেশে এসেছে, আপনি যদি তাদের লিস্টিং প্রবণতা দেখেন, তারা যখন কোম্পানি খেয়ে ছোগলা করে ফেলেছে, তখন সেটা জনগণের কাছে বিক্রির জন্য শেয়ার বাজারে এনলিস্টেড করেছে। শেয়ার মার্কেট তিন মাসের মধ্যে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
সংসদ সদস্য নজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, কর্মসংস্থানের বিষয়টি শিক্ষার সাথে জড়িত। বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, এক বছর শিক্ষার পেছনে ব্যয় করলে ব্যক্তির আয় ৮-৯ ভাগ বাড়ে। কিন্তু বাংলাদেশে যুবকদের মধ্যে যোগ্যতা অনুযায়ী ৮৫ ভাগ লোক চাকরি পায় না। আমাদের বাজেটে শিক্ষাখাতে জিডিপির মাত্র ১.৬৯ ভাগ ব্যয় করা হয়েছে। যেখানে জাতিসংঘ ৬ ভাগ ব্যয় করতে বলে।
তিনি বলেন, আজকে পঞ্চম শিল্প বিপ্লব শুরু হয়েছে। আমাদের গত বছরের বাজেটে সুদ পে করেছি ১৫ শতাংশের বেশি। সুদ তো আমরা দিচ্ছি, কারণ আমরা ঋণ নিচ্ছি। আমরা যদি ঋণ না নেই, তাহলে আমরা উন্নয়ন কার্যক্রম ব্যয় করতে পারব না। এখানে আমরা কী আউটসাইড দ্যা বক্স চিন্তা করতে পারি না? জাকাত নিয়ে রিয়েলিস্টিক কাজ ১৯৯১ সালের পর হয়েছে কী না, আমি জানি না। বাংলাদেশে তৎকালীন সাহাবুদ্দিনের সময় একটি অনুসন্ধান করা হয়েছে দারিদ্র বিমোচনে বাংলাদেশে কত টাকা লাগতে পারে। তারা দেখেছেন, ৬ হাজার কোটি টাকা দরকার। তখন ব্যাংকিং খাত থেকে হিসেব করা হয়েছিল যে, জাকাত থেকে ১৮ হাজার কোটি টাকা আয় করা সম্ভব।
এম নিয়াজ আসাদুল্লাহ বলেন, কোনো নির্বাচিত সরকার শিক্ষা নিয়ে এত উদ্দীপনা আগে দেখায়নি। ডিজিপির ৫ ভাগ বাজেট করতে হবে। যেটা ডলারে ২৫ বিলিয়নে দাড়ায়। আমাদের এখনকার বাজেট ৮ বিলিয়ন ডলার। ধরুন আমাদের হাতে টাকাটা এসেছে। এখন এই টাকা আমরা কীভাবে ব্যয় করব? সরকার ইতোমধ্যে তাদের নির্বাচনী ইশতিহারে পরিষ্কার করে দিয়েছেন যে, এক শিক্ষক-এক ট্যাব, ফ্রি ইউনিফর্ম দেওয়া, ডিজিটাল ল্যাব স্থাপন। কিন্তু আমাদের শিক্ষাখাতের যে চ্যালেঞ্জ উনাদের পলিসি এজেন্ডা সাজানো হয়নি।
তিনি বলেন, এখানে আমরা খরচ করার ক্ষেত্রে বিরাজতিকীকরণ করতে হবে। আমাদের যে ধরনের প্রমিস করা হয়েছে যে, এক শিক্ষক-এক ট্যাব, ফ্রি ইউনিফর্ম, আরও ডিজিটাল ল্যাব স্থাপন-এগুলোর কিন্তু কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নাই। আমাদের পঞ্চবার্ষিক মহাপরিকল্পনায় এবছরকে বলা হয়েছে, স্ট্যাবিলাইজেশন অ্যান্ড রিকভারি। তো প্রশ্নটা হল শিক্ষাতে কীভাবে স্ট্যাবিলাইজেশন রিকভারি আমাদের দরকার? কারণ এ বছরের বাজেটটা হবে ২০৩৪ এর ট্রিলিয়ন ডলার ইকোনমির ফাউন্ডেশন। ট্রিলিয়ন ডলার ইকোনমির জন্য যেই মানব সম্পদ দরকার, তা এখান থেকে তৈরি হবে। আমাদের প্রায়োরিটি হওয়া উচিত প্রাথমিক ও আর্লি স্টেজের শিক্ষায় তাহলেই আমরা পরের ধাপে যেতে পারব।
তিনি আরও বলেন, চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির লক্ষ্য অর্জনে প্রথম পদক্ষেপ হওয়া উচিত ‘রেমিডিয়াল এডুকেশন’ বা শিখন ঘাটতি পুনরুদ্ধার এবং প্রাক-প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার ভিত্তি শক্ত করা। বৃত্তিমূলক ও মাদ্রাসা শিক্ষাকে কেবল সামাজিক নিরাপত্তার অংশ হিসেবে না দেখে মূলধারার সমান মর্যাদা দেওয়া প্রয়োজন। বর্ধিত বাজেটের সঠিক ব্যবহার ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে একটি স্বাধীন ‘পারফরম্যান্স মনিটরিং ইউনিট’ গঠন করা যেতে পারে, যা অপচয় ও অপব্যবহার রোধে ভূমিকা রাখবে। এছাড়া করপোরেট খাতের সহায়তায় একটি ‘শিক্ষা সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিল’ গঠন করা যেতে পারে। একইসাথে, ১৯ শতকের মানের শিক্ষা ব্যবস্থা দিয়ে ২১ শতকের প্রযুক্তিনির্ভর বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। যেকোনো সংকটেও শিক্ষা বাজেটকে স্পর্শ না করার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষায় বিনিয়োগকে রাজনৈতিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে রেখে তথ্য ও উপাত্তের ভিত্তিতে পরিচালনা করাই এখন সময়ের দাবি।
ড. এম নিয়াজ আসাদুল্লাহ আরও বলেন, চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির লক্ষ্য অর্জনে প্রথম পদক্ষেপ হওয়া উচিত ‘রেমিডিয়াল এডুকেশন’ বা শিখন ঘাটতি পুনরুদ্ধার এবং প্রাক-প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার ভিত্তি শক্ত করা। বৃত্তিমূলক ও মাদ্রাসা শিক্ষাকে কেবল সামাজিক নিরাপত্তার অংশ হিসেবে না দেখে মূলধারার সমান মর্যাদা দেওয়া প্রয়োজন। বর্ধিত বাজেটের সঠিক ব্যবহার ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে একটি স্বাধীন ‘পারফরম্যান্স মনিটরিং ইউনিট’ গঠন করা যেতে পারে, যা অপচয় ও অপব্যবহার রোধে ভূমিকা রাখবে। এছাড়া করপোরেট খাতের সহায়তায় একটি ‘শিক্ষা সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিল’ গঠন করা যেতে পারে। একইসাথে, ১৯ শতকের মানের শিক্ষা ব্যবস্থা দিয়ে ২১ শতকের প্রযুক্তিনির্ভর বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। যেকোনো সংকটেও শিক্ষা বাজেটকে স্পর্শ না করার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষায় বিনিয়োগকে রাজনৈতিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে রেখে তথ্য ও উপাত্তের ভিত্তিতে পরিচালনা করাই এখন সময়ের দাবি।
সভাপতির বক্তব্যে আব্দুল্লাহ আল আমিন বলেন, আমাদের দেশে সাংবিধানিকভাবে ধূমপান নিরুসাহিত করা হয়েছে। কিন্তু সংসদে একটি আইন ২ ঘণ্টা আগে দিয়ে বলল সংশোধন আছে। সেখানে আইনে ইলেক্ট্রনিক সিগেরট বৈধ করে দেওয়া হচ্ছে। যেটি বিস্তারিত আলোচনার দাবি রাখে, যার সাথে স্বাস্থ্য জড়িত। সেটা আমরা পাশ করে ফেলছি গাঁয়ের জোরে। এরকম বাস্তবতায় তখন মনে হয়, এর থেকে আমি আমার একটি ইউনিয়নের নাম বললে তারা খুশি হয়।
তিনি বলেন, আমাদের পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থা দেখলে মনে হয়, রাষ্ট্র জনগণকে বিশ্বাস করে না। তার কিছু অলিগার্কদের অলিগার্কদের বিশ্বাস করে। তারা যতই ঋণখেলাপি হবে, তাদেরকে নির্বাচনের সুযোগ দেবে। কিন্তু যারা তরুণ উদ্যোক্তা, তাদের জন্য ঋণের বেলায় নানা ধরনের অবস্টাকল। এই বাজেটে পরিকল্পনা আসছে ১২০ সিসির বাইকের উপর ২ হাজার টাকা কর দিতে হবে। কিন্তু তারা জানে না যে, বাইক এখন আর কোনো বিলাসী দ্রব্য নয়। বাইক শেয়ার করে যারা জীবিকা নির্বাহ করে, তাদের অধিকাংশই শিক্ষিত ও তরুণ। তাদেরকে করের ফাঁদে ফেলা হচ্ছে। এটা থেকে আমরা কীভাবে বের হতে পারি, সেই চেষ্টা আমরা করছি।



















