‘জনগণের অধিকার প্রশ্নে কাউকে ছাড় নয়’- ডা শফিকুর রহমান
- আপডেট সময় ১২:৫৮:২৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ২৭ বার পড়া হয়েছে
জনগণের অধিকার প্রশ্নে কাউকে ছাড় না দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান।
তিনি বলেছেন, “আমরা আজ কোনো দল, ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর জন্য রাস্তায় নামিনি; নেমেছি ১৮ কোটি মানুষের পক্ষে। আমাদের কর্মসূচির ওষুধ ইতোমধ্যে কাজ করতে শুরু করেছে, বিভিন্ন জায়গায় তার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে।
“আপনারা বলতেছেন এই করলে, সেই করলে ছাড় দিয়ে কথা বলা হবে না। আমরা পরিষ্কার বলে দিচ্ছি, জনগণের অধিকার নিয়ে ছিনিমিনি করলে জনগণও কাউকে ছাড় দিয়ে কথা বলবে না।”
ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে ‘লং মার্চ’ কর্মসূচি শুরুর প্রাক্কালে শনিবার সকালে ঢাকার শাপলা চত্বরে সমাবেশে বক্তব্য দিচ্ছিলেন শফিকুর রহমান।
জনদুর্ভোগের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “গ্যাস নাই, পানি নাই, ইলেকট্রিসিটি নাই। কিন্তু গ্যাসের বিলও যথারীতি আছে। কারেন্টের ভূতুড়ে বিল আছে।”
গণভোটের রায় বাস্তবায়ন; জুলাই গণহত্যার বিচার; বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সার সংকট নিরসন; নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি রোধে চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি বন্ধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ও দলীয়করণ বন্ধের দাবিতে এদিন ‘লং মার্চ’ করছে জামায়াত জোট।
চাঁদাবাজ ও দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে জামায়াত আমির বলেন, “কোনো চাঁদাবাজ এবং দুর্নীতিবাজের অস্তিত্ব বাংলাদেশে আমরা বরদাশত করব না। চাঁদাবাজদের জ্বালায় মানুষ অতিষ্ঠ, দুর্নীতিবাজদের হাতে জনগণের অধিকার লুণ্ঠিত।”
সকাল ৭টায় কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে মতিঝিলে সমাবেশ শুরু হয়। সমাবেশের পর সোয়া ৮টার পর বিশাল গাড়িবহর চট্টগ্রামের পথ ধরে।
আয়োজকরা জানিয়েছেন, ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাওয়ার পথে পূর্বনির্ধারিত বিভিন্ন পয়েন্টে পথসভা অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর ব্রিজের কাছে ট্রাক স্ট্যান্ডে, কুমিল্লার পদুয়ার বাজার বিশ্বরোড, ফেনীর মহীপাল এবং মীরসরাইয়ে পথসভা হবে। সবশেষ চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানে জনসভার মধ্য দিয়ে এ কর্মসূচি শেষ হবে।
এর আগে গত ৬ অগাস্ট ঢাকার মুক্তাঙ্গনে জোটের এক অবস্থান কর্মসূচি থেকে সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ঢাকা থেকে চারটি বিভাগীয় শহরে ‘লং মার্চ’ ও মহাসমাবেশ কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছিলেন জোটের শীর্ষ নেতা শফিকুর রহমান।
ঘোষিত ওই কর্মসূচি অনুযায়ী, শনিবারের পর আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে রংপুর, ১০ অক্টোবর ঢাকা থেকে খুলনা এবং ২৪ অক্টোবর ঢাকা থেকে সিলেটে (রেলপথে) লং মার্চ অনুষ্ঠিত হবে। এরপর ১৪ নভেম্বর ঢাকায় মহাসমাবেশের মাধ্যমে কর্মসূচি শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।
‘বাধা দিলে ছয় দফা এক দফায় পরিণত হবে’
সমাবেশে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, “আজকে যত বাধা-বিপত্তি আসুক না কেন, আমাদের এই লংমার্চ চট্টগ্রাম পৌঁছাবেই। আমরা লংমার্চ শান্তিপূর্ণভাবে পালন করব।
“যদি সরকার বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে, তাহলে এই লং মার্চের ছয় দফা এক দফাতে পরিণত হবে।”
নতুন করে যারা স্বৈরাচার হতে যাচ্ছে, তাদের পথ বন্ধ করতেই এ লং মার্চ মন্তব্য করে তিনি বলেন, “এই লং মার্চ চাঁদাবাজ, সন্ত্রাস, মাদকের বিরুদ্ধে। যারা সিন্ডিকেট করে দাম বৃদ্ধির পাঁয়তারা করছে এবং যারা ৭০ শতাংশ জনগণের গণরায়ের সঙ্গে প্রতারণা করেছে, তাদের বিরুদ্ধে।”
‘জুলাই সনদ বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে সরকার’
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, জনগণের দুর্ভোগ-ভোগান্তি দূর করতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। সরকারের ভেতরের নীতিনির্ধারকরা তাল হারিয়ে ফেলেছেন এবং তাদের বক্তব্যে ‘অসংগতি ও এলোমেলো’ ভাব দেখা যাচ্ছে।
তিনি বলেন, “আপনারা জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ৩০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদ ডাকার কথা ছিল, ডাকেননি। আমরা সেই ট্রেন মিস করেছি।
“কথা ছিল ছয় মাসের মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন করবেন, সেপ্টেম্বরে সেই সময় শেষ হচ্ছে। আপনারা জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণের সমস্ত প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছেন।”
ক্ষমতাসীনদের সমালোচনা করে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, “নির্বাচনের সময় আপনারা গণভোটের পক্ষে হ্যাঁ ভোট দিয়েছিলেন বলে বিশ্বাস করি। অথচ এখন বলছেন গণভোট মানেন না। তাহলে স্বীকার করুন আপনারা না ভোট দিয়েছিলেন।
“সংসদে ভুল স্বীকার করে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য আপনাদের সংবিধান সংস্কারের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এই যাত্রা থামবে না।”
‘মানুষ বলছে আর কখনও বিএনপিকে ভোট দেব না’
লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) প্রেসিডেন্ট অলি আহমদ সমাবেশে বলেন, “আমার ৮৮ বছর বয়সে আমি কখনো শুনিনি, একটা সরকার গঠন হওয়ার পর লোকে বলে এই সরকার টিকবে না।
“সারাক্ষণ দেখছি নারীরা, পুরুষেরা নিজের জুতা নিজের কপালে মারছে; বলছে, ‘আর কখনও বিএনপিকে ভোট দেব না’।”
রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচন করে হেরে যাওয়া অলি আহমদ নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধানের উদ্দেশেও কথা বলেন।
“ফখরুল সাহেব এই বিল্ডিংয়ের পিছনে রয়েছেন। তিনি বলেছিলেন, ‘গ্যাস দে, বিদ্যুৎ দে, নইলে গদি ছাড়’। এখন ফখরুল সাহেব কী বলবেন?”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ কোরআন-সুন্নাহর বাইরে কাজ না করার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সে প্রসঙ্গ টেনে অলি আহমদ বলেন, “তিনি একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন, ‘সুন্নত এবং কোরআনের বাইরে আমি কোনো কাজ করব না’।
“এখন আমি উনাকে জিজ্ঞাসা করি, আপনি কি আগের জায়গায় আছেন? থাকলে আমাদের সঙ্গে সমস্যাটা কোথায়?”
দেশ চালানোর জন্য ‘ঈমানদার’ মানুষ বেছে নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে এলডিপি প্রেসিডেন্ট বলেন, “বেঈমান, মুনাফেক আর বিদেশি দালালদের দিয়ে দেশ চলবে না। আমরা আমাদের প্রথম রাউন্ড শেষ করেছি, দ্বিতীয় রাউন্ড শুরু।
“এখনো বসে আছেন, সঠিক পথে চলেন। না হলে অন্যান্যরা যেভাবে দেশ ছেড়ে পলায়ন করেছে, তাদের পথ আপনাকে অনুসরণ করতে হবে।”
লং মার্চ শান্তিপূর্ণ হবে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “আমরা মেজবান খাইতে আসিনি। জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আসছি।
“পথে যদি কেউ বাধা সৃষ্টি করে, সেটা অধিকতর শক্তি দিয়ে মোকাবিলা করা হবে।”
‘শুরুর ছয় মিনিটেই বিশ্বাসঘাতকতা করেছে সরকার’
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক বলেন, “আমাদের প্রশ্ন করা হয়, ছয় মাস যেতে পারেনি, এখনই কেন সরকারের বিরুদ্ধে কঠোরতা? আমরা বলতে চাই, সরকার তার যাত্রার শুরুর ছয় মিনিট অতিক্রান্ত হওয়ার আগেই জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে।”
তিনি বলেন, “ক্ষমতার মসনদে বসে জাতিকে ভুল পথে পরিচালিত করতে চাইলে, হাতে-পায়ে ধরে বলব সঠিক পথে আসতে। এর পরেও সঠিক পথে না এলে ঘাড় ধরতে একচুল পরিমাণ আমাদের হাত কেঁপে উঠবে না।
“সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করুন, আর না হয় আপনাদের জন্যও সেই পরিণাম অপেক্ষা করছে—যেই পরিণাম জাতিকে অপমান করা প্রতিটি স্বৈরশাসকের জন্য অপেক্ষা করেছিল।”
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদের সভাপতিত্বে সমাবেশে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) সদস্য সচিব মজিবুর রহমান মঞ্জু, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইসলাম চান, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব ফখরুল ইসলাম, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সহসভাপতি রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির আমির আব্দুল কাইয়ুম সোবহানী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির সদস্য সচিব আখতার হোসেন।
সমাবেশ সঞ্চালনা করেন জামায়াতের ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি শফিকুল ইসলাম মাসুদ ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের সেক্রেটারি রেজাউল করিম।


















