ঢাকা ০৮:০৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

“আসসালামু আলাইকুম”, “ইনশাআল্লাহ” ও “জাজাকাল্লাহ” বলায় পশ্চিমবঙ্গের আইপিএস কর্মকর্তা বুশরা বানোকে বদলি

ডেস্ক রিপোর্ট
  • আপডেট সময় ০৬:৩৭:০৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / ২৪ বার পড়া হয়েছে

ভিডিওতে উর্দু ও আরবি সম্ভাষণ ব্যবহার করার কারণে একটি হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের তোপের মুখে পড়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গ ক্যাডারের আইপিএস কর্মকর্তা বুশরা বানো। এই ঘটনার জের ধরে অভিযোগ দায়েরের মাত্র কয়েকদিনের মাথায় সোমবার তাকে পদ থেকে বদলি করা হয়েছে।

২০২১ ব্যাচের এই নারী কর্মকর্তা মেদিনীপুরের খড়গপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এএসপি) হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন। সেখান থেকে সরিয়ে তাকে রাজ্য সশস্ত্র পুলিশের ডেপুটি কমান্ড্যান্ট পদে বদলি করা হয়েছে।

গত ১৩ সেপ্টেম্বর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বুশরা বানোর একটি ভিডিও প্রকাশিত হয়, যেখানে তিনি নিজের সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার প্রস্তুতি ও সফলতার গল্প শুনিয়ে হবু প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের উৎসাহিত করেছিলেন।

ভিডিওতে বুশরা বানোর ব্যবহৃত “আসসালামু আলাইকুম”, “ইনশাআল্লাহ” ও “জাজাকাল্লাহ” শব্দগুলোর প্রতি তীব্র আপত্তি জানিয়ে ‘হিন্দু লিগ্যাল ফান্ড’ নামে একটি ইসলাম-বিদ্বেষী সংগঠন পশ্চিমবঙ্গের স্বরাষ্ট্র সচিবের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করে।

সংগঠনটির দাবি, রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্বকারী একজন দায়িত্বশীল সরকারি কর্মকর্তার যেকোনো জনসমক্ষে বা সামাজিক মাধ্যমের বক্তব্যে ধর্মীয় নিরপেক্ষতা বজায় রাখা উচিত। তাদের মতে, কোনো ধর্মীয় সম্ভাষণের বদলে “জয় হিন্দ” বা “বন্দে মাতরম”-এর মতো জাতীয় বাক্য ব্যবহার করা উচিত ছিল।

অভিযোগকারী সংগঠনটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) লেখে, “তিনি ভিডিওটি শুরু করেছেন আসসালামু আলাইকুম দিয়ে, মাঝে ব্যবহার করেছেন ইনশাআল্লাহ এবং শেষ করেছেন জাজাকাল্লাহ বলে। তবে তিনি কোথাও ‘বন্দে মাতরম’ বা ‘জয় হিন্দ’ ব্যবহার করেননি।” এই বিষয়ে তদন্তের দাবিও তোলে তারা। এই ঘটনার পর থেকে সিভিল সার্ভিস কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত বা জনসমক্ষে কথা বলার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো জাতীয় বা ধর্মীয় শব্দ ব্যবহারে বাধ্যবাধকতা থাকা উচিত কি না—তা নিয়ে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।

আইপিএস বুশরা বানোর সফলতার পথচলা
ভিডিওটিতে বুশরা বানো মূলত তাঁর সংগ্রাম ও একাডেমিক যাত্রার কথা তুলে ধরেছিলেন। উত্তরপ্রদেশের কনৌজ জেলায় জন্ম নেওয়া বুশরা আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় (এএমইউ) থেকে ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন এবং জুনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপের (জেআরএফ) জন্য এনইটি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পরবর্তীতে তিনি সৌদি আরবের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এরপর ভারতে ফিরে এসে ইউপিএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন।

নিজের সাফল্যের পেছনে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘রেসিডেন্সিয়াল কোচিং একাডেমি’র অবদানের কথা কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করেন তিনি, যারা তাকে স্টাডি মেটেরিয়াল, লাইব্রেরি সুবিধা ও টেস্ট সিরিজের ব্যবস্থা করে দিয়েছিল।

২০১৮ সালে ইউপিএসসি পরীক্ষায় ২৭৭তম র্যাঙ্ক অর্জন করে ‘ইন্ডিয়ান রেলওয়ে ট্রাফিক সার্ভিস’-এ সুযোগ পান বুশরা। কিন্তু সে সময় দ্বিতীয় সন্তানের জন্মদাত্রী হওয়ায় তিনি সেই চাকরিতে যোগ দিতে পারেননি। পরের বছর (২০১৯ সালে) তিনি পুনরায় পরীক্ষায় অংশ নেন এবং ২৩৪তম র্যাঙ্ক নিয়ে স্বপ্নের ‘ইন্ডিয়ান পুলিশ সার্ভিস’ (আইপিএস)-এ মনোনীত হন।
পুলিশ প্রশাসনে আরও কিছু রদবদল

২০২১ ব্যাচের আইপিএস কর্মকর্তা হিসেবে বুশরা বানোকে পশ্চিমবঙ্গ ক্যাডারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। হুগলি গ্রামীণ অঞ্চলের সহকারী পুলিশ সুপার হিসেবে নিজের কর্মজীবন শুরু করেছিলেন তিনি এবং চলতি বছরের জুনে তিনি অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদে পদোন্নতি পান।

রাজ্য সরকারের নতুন এক ঘোষণায় বুশরা বানোর পাশাপাশি খড়গপুরের নতুন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে পার্থ ঘোষকে এবং চন্দননগর পুলিশ কমিশনারেটের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার পদে শুভেন্দু মণ্ডলকে বদলি করা হয়েছে।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

“আসসালামু আলাইকুম”, “ইনশাআল্লাহ” ও “জাজাকাল্লাহ” বলায় পশ্চিমবঙ্গের আইপিএস কর্মকর্তা বুশরা বানোকে বদলি

আপডেট সময় ০৬:৩৭:০৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ভিডিওতে উর্দু ও আরবি সম্ভাষণ ব্যবহার করার কারণে একটি হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের তোপের মুখে পড়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গ ক্যাডারের আইপিএস কর্মকর্তা বুশরা বানো। এই ঘটনার জের ধরে অভিযোগ দায়েরের মাত্র কয়েকদিনের মাথায় সোমবার তাকে পদ থেকে বদলি করা হয়েছে।

২০২১ ব্যাচের এই নারী কর্মকর্তা মেদিনীপুরের খড়গপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (এএসপি) হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন। সেখান থেকে সরিয়ে তাকে রাজ্য সশস্ত্র পুলিশের ডেপুটি কমান্ড্যান্ট পদে বদলি করা হয়েছে।

গত ১৩ সেপ্টেম্বর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বুশরা বানোর একটি ভিডিও প্রকাশিত হয়, যেখানে তিনি নিজের সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার প্রস্তুতি ও সফলতার গল্প শুনিয়ে হবু প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের উৎসাহিত করেছিলেন।

ভিডিওতে বুশরা বানোর ব্যবহৃত “আসসালামু আলাইকুম”, “ইনশাআল্লাহ” ও “জাজাকাল্লাহ” শব্দগুলোর প্রতি তীব্র আপত্তি জানিয়ে ‘হিন্দু লিগ্যাল ফান্ড’ নামে একটি ইসলাম-বিদ্বেষী সংগঠন পশ্চিমবঙ্গের স্বরাষ্ট্র সচিবের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করে।

সংগঠনটির দাবি, রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্বকারী একজন দায়িত্বশীল সরকারি কর্মকর্তার যেকোনো জনসমক্ষে বা সামাজিক মাধ্যমের বক্তব্যে ধর্মীয় নিরপেক্ষতা বজায় রাখা উচিত। তাদের মতে, কোনো ধর্মীয় সম্ভাষণের বদলে “জয় হিন্দ” বা “বন্দে মাতরম”-এর মতো জাতীয় বাক্য ব্যবহার করা উচিত ছিল।

অভিযোগকারী সংগঠনটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) লেখে, “তিনি ভিডিওটি শুরু করেছেন আসসালামু আলাইকুম দিয়ে, মাঝে ব্যবহার করেছেন ইনশাআল্লাহ এবং শেষ করেছেন জাজাকাল্লাহ বলে। তবে তিনি কোথাও ‘বন্দে মাতরম’ বা ‘জয় হিন্দ’ ব্যবহার করেননি।” এই বিষয়ে তদন্তের দাবিও তোলে তারা। এই ঘটনার পর থেকে সিভিল সার্ভিস কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত বা জনসমক্ষে কথা বলার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো জাতীয় বা ধর্মীয় শব্দ ব্যবহারে বাধ্যবাধকতা থাকা উচিত কি না—তা নিয়ে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।

আইপিএস বুশরা বানোর সফলতার পথচলা
ভিডিওটিতে বুশরা বানো মূলত তাঁর সংগ্রাম ও একাডেমিক যাত্রার কথা তুলে ধরেছিলেন। উত্তরপ্রদেশের কনৌজ জেলায় জন্ম নেওয়া বুশরা আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় (এএমইউ) থেকে ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন এবং জুনিয়র রিসার্চ ফেলোশিপের (জেআরএফ) জন্য এনইটি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পরবর্তীতে তিনি সৌদি আরবের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এরপর ভারতে ফিরে এসে ইউপিএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন।

নিজের সাফল্যের পেছনে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘রেসিডেন্সিয়াল কোচিং একাডেমি’র অবদানের কথা কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করেন তিনি, যারা তাকে স্টাডি মেটেরিয়াল, লাইব্রেরি সুবিধা ও টেস্ট সিরিজের ব্যবস্থা করে দিয়েছিল।

২০১৮ সালে ইউপিএসসি পরীক্ষায় ২৭৭তম র্যাঙ্ক অর্জন করে ‘ইন্ডিয়ান রেলওয়ে ট্রাফিক সার্ভিস’-এ সুযোগ পান বুশরা। কিন্তু সে সময় দ্বিতীয় সন্তানের জন্মদাত্রী হওয়ায় তিনি সেই চাকরিতে যোগ দিতে পারেননি। পরের বছর (২০১৯ সালে) তিনি পুনরায় পরীক্ষায় অংশ নেন এবং ২৩৪তম র্যাঙ্ক নিয়ে স্বপ্নের ‘ইন্ডিয়ান পুলিশ সার্ভিস’ (আইপিএস)-এ মনোনীত হন।
পুলিশ প্রশাসনে আরও কিছু রদবদল

২০২১ ব্যাচের আইপিএস কর্মকর্তা হিসেবে বুশরা বানোকে পশ্চিমবঙ্গ ক্যাডারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। হুগলি গ্রামীণ অঞ্চলের সহকারী পুলিশ সুপার হিসেবে নিজের কর্মজীবন শুরু করেছিলেন তিনি এবং চলতি বছরের জুনে তিনি অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদে পদোন্নতি পান।

রাজ্য সরকারের নতুন এক ঘোষণায় বুশরা বানোর পাশাপাশি খড়গপুরের নতুন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে পার্থ ঘোষকে এবং চন্দননগর পুলিশ কমিশনারেটের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার পদে শুভেন্দু মণ্ডলকে বদলি করা হয়েছে।