ঢাকা ০৮:০৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ইরানের হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের ৩০ রিপার ড্রোনসহ ক্ষতিগ্রস্ত-ধ্বংস কয়েক ডজন বিমান

ডেস্ক রিপোর্ট
  • আপডেট সময় ০৭:১৭:৪৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / ২০ বার পড়া হয়েছে

ইরানের হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক ডজন বিমান ও ড্রোন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। হামলার স্বীকার হয়েছে বহু ভবন ও স্থাপনাও। ক্ষতিগ্রস্ত অস্ত্রের মধ্যে অন্তত ৩০টি এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন রয়েছে। পেন্টাগনের এক পর্যবেক্ষণ সংস্থার বরাত দিয়ে মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) এ তথ্য জানিয়েছে কাতার-ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা।

প্রকাশিত মার্কিন প্রতিরক্ষা ইন্সপেক্টর জেনারেলের প্রতিবেদনে ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত চলা যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষয়ক্ষতির প্রথম সরকারি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও স্বীকার করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের গোলাবারুদের মজুত কমে আসছে এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় জট তৈরি হয়েছে।

এর সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বারবার দেয়া বক্তব্যের অসঙ্গতি দেখা যাচ্ছে। সোমবার ট্রাম্প বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র আমাদের ইতিহাসের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি উন্নত ও অভিজাত অস্ত্র তৈরি করছে।’ এর আগে মার্কিন গণমাধ্যমে গোলাবারুদের ঘাটতির খবর প্রকাশের পর তিনি দাবি করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কার্যত সীমাহীন গোলাবারুদ রয়েছে।

ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী হামলা শুরুর পর পুরো যুদ্ধজুড়েই তেহরান উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা মার্কিন ঘাঁটি ও স্থাপনায় নিয়মিত হামলা চালায়। এসব হামলার বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ওয়াশিংটন জানিয়েছিল, প্রতিহত করা হয়েছে হামলাগুলো। তবে পেন্টাগনের প্রতিবেদনে ওই অঞ্চলে মার্কিন বাহিনী ও স্থাপনাগুলোর উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতির চিত্র উঠে এসেছে, যার আর্থিক মূল্যও অনেক বেশি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ জানিয়েছে, যুদ্ধে অন্তত ১১ জন মার্কিন সামরিক সদস্য নিহত হয়েছেন। যুদ্ধের বাইরে মারা গেছেন আরও সাতজন। ইরানের হামলায় ১ মার্চ কুয়েতের শুয়াইবা বন্দরে অন্তত ছয়জন এবং একই দিন সৌদি আরবে একজন নিহত হন। ১৭ জুলাই জর্ডানের মুওয়াফফাক আল-সালতি বিমানঘাঁটি বা আল-আজরাক ঘাঁটিতে তিনজন এবং ১৯ জুলাই ইরাকের এরবিল বিমানঘাঁটিতে একজন নিহত হন।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ১২ মার্চ ইরাকে একটি কেসি-১৩৫ বিধ্বস্ত হয়ে ছয়জন নিহত হন। এ ছাড়া ১ জুলাই আরব সাগরে এমএইচ-৬০এস হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হলে নিহত হন আরও একজন। এছাড়া ৩০ জুন পর্যন্ত ইরানের হামলায় অন্তত ৪১৭ জন মার্কিন সামরিক সদস্য আহত হয়েছেন বলেও উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

কতটি বিমান হারিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র?
মার্কিন ক্ষয়ক্ষতির মধ্যে সামনের সারির যুদ্ধবিমান ও আক্রমণাত্মক বিমান থেকে শুরু করে আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান, আকাশপথে কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল বিমান, উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার এবং চালকবিহীন নজরদারি বিমান রয়েছে।

এফ-১৫ই: প্রায় ৩ কোটি ডলার মূল্যের অন্তত চারটি দুই আসনের এ ধরনের যুদ্ধবিমান ধ্বংস হয়েছে। এর মধ্যে তিনটি ১ মার্চ কুয়েতের আকাশে নিজেদের বাহিনীর ভুল হামলায় ভূপাতিত হয়। চতুর্থটি এপ্রিলে ইরানের আকাশে যুদ্ধে ভূপাতিত হয়। তবে উদ্ধার করা হয় সব বিমানকর্মীকে।

এফ-৩৫এ: ভারী নিরাপত্তাবেষ্টিত আকাশসীমায় প্রবেশের জন্য তৈরি যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত একটি অত্যাধুনিক বহুমুখী যুদ্ধবিমান মার্চে ইরানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে জানা গেছে।

এ-১০: স্থলবাহিনীকে বিমান সহায়তা দেয়ার জন্য তৈরি অন্তত একটি ভারী সুরক্ষিত আক্রমণাত্মক বিমান ইরানের হামলায় ভূপাতিত হয়।

কেসি-১৩৫: দূরপাল্লার মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলোর পরিসর ও উড্ডয়নক্ষমতা বাড়াতে ব্যবহৃত অন্তত সাতটি বড় আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। এর একটি ১২ মার্চ ইরাকে জ্বালানি সরবরাহের মিশনের সময় বিধ্বস্ত হলে ছয়জন নিহত হন। আরও পাঁচটি সৌদি আরবে মাটিতে থাকা অবস্থায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সপ্তম বিমানটিও ইরাকে হামলার শিকার হয়।

ই-৩ সেন্ট্রি: সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে মাটিতে থাকা অন্তত একটি আগাম সতর্কতা ও নিয়ন্ত্রণ বিমান ইরানি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এইচএইচ-৬০ডব্লিউ হেলিকপ্টার: চার ব্লেড ও দুই ইঞ্জিনবিশিষ্ট অন্তত একটি মাঝারি আকারের সামরিক হেলিকপ্টার যুদ্ধকালীন অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানের সময় ইরানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এমকিউ-৪সি ট্রাইটন: সমুদ্রভিত্তিক গোয়েন্দা ও নজরদারির কাজে ব্যবহৃত প্রায় ২৪ কোটি ডলার মূল্যের উচ্চ উচ্চতায় দীর্ঘ সময় উড়তে সক্ষম অন্তত একটি চালকবিহীন নজরদারি বিমান এপ্রিলে বিধ্বস্ত হয়।

এএইচ-৬ হেলিকপ্টার: ইরানে যুদ্ধকালীন অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানের সময় উদ্ধার করা সম্ভব নয় বলে বিবেচিত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র চারটি ছোট ও অত্যন্ত দ্রুতগামী হেলিকপ্টার ধ্বংস করে।

এএইচ-৬৪ অ্যাপাচি: দুই ইঞ্জিন ও চার ব্লেডের অন্তত একটি অ্যাটাক হেলিকপ্টার ৮ জুন হরমুজ প্রণালির কাছে ভূপাতিত হয়।

এমএইচ-৬০এস: যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর অন্তত একটি বহুমুখী হেলিকপ্টার ১ জুলাই আরব সাগরে বিধ্বস্ত হয়। চার ক্রুর মধ্যে তিনজন আহত অবস্থায় উদ্ধার হন, আর নিখোঁজ হন চতুর্থজন।

এমকিউ-৯ রিপার: নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও নির্ভুল হামলায় ব্যবহৃত দীর্ঘসময় উড়তে সক্ষম সশস্ত্র চালকবিহীন এই বিমান ৩০টি হারিয়েছে ওয়াশিংটন।

এদিকে এর বাইরে ইরানি সামরিক বাহিনী আরও মার্কিন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত করার দাবি করেছে। তারা হরমুজ প্রণালির কাছে একাধিকবার নজরদারি ও আক্রমণাত্মক ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে। তেহরান চলতি মাসের শুরুতে একটি মার্কিন ডুবোযান ‘ডাইভ-এলডি’ও আটক করে।

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটির ক্ষয়ক্ষতি
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের বক্তব্য অনুযায়ী, যুদ্ধের সময় কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, ইরাক, ওমান ও জর্ডানে মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোর শত শত ভবন ও স্থাপনা ইরানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।

তবে এসব ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে প্রতিবেদনে অতিরিক্ত কোনো বিস্তারিত তথ্য দেয়া হয়নি। এর আগে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানা যায়, ইরানের হামলার কারণে বেশ কয়েকটি মার্কিন স্থাপনা সাময়িকভাবে বন্ধ বা অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হয়েছিল।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক অভিযান শুরুর আগে ও চলাকালে পর্যাপ্ত নৌঘাঁটি ও সহায়তা বন্দর স্থাপন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছিল। এর কারণ হিসেবে বহরের জন্য সরবরাহ পুনরায় পূরণে বন্দর ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্বাগতিক দেশের অনুমতির জটিলতা ও অনিশ্চয়তার কথা বলা হয়েছে।

সেন্ট্রাল কমান্ডের বক্তব্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়, সামরিক সরবরাহ ও অবকাঠামো দিয়েগো গার্সিয়ায় স্থানান্তরের ক্ষেত্রে বড় সমস্যা ছিল দূরত্ব। দীর্ঘ সমুদ্রপথে পরিবহনের কারণে সরবরাহ চক্রে ১৪ থেকে ১৮ দিন সময় লাগত।

উপসাগরে মার্কিন কূটনৈতিক স্থাপনায় ক্ষয়ক্ষতি
পেন্টাগনের পর্যবেক্ষণ সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরাক, কুয়েত, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে থাকা মার্কিন কূটনৈতিক স্থাপনাগুলো ইরানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব ক্ষয়ক্ষতির আনুমানিক মোট ব্যয় ১৮ কোটি ৪০ লাখ ডলার।

এ ছাড়া বাগদাদ, জেরুজালেম, তেল আবিব, কায়রো, আম্মান, কুয়েত সিটি ও মাসকাটে কর্মী প্রত্যাহার ও ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার কারণে নির্মাণ প্রকল্প বিলম্বে প্রতি মাসে খরচ হয়েছে আনুমানিক ২ কোটি ৪৫ লাখ ডলার।

ইরাক: মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের তথ্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুনের শেষ পর্যন্ত ইরাকে মার্কিন মিশনের ওপর ৬০০টির বেশি হামলা হয়েছে, যাতে প্রায় ১৫ কোটি ৭০ লাখ ডলার পর্যন্ত ক্ষতি হয়েছে।

এরবিলে মার্কিন কনস্যুলেট জেনারেলের নতুন কনস্যুলেট ভবনের একাধিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাগদাদের মার্কিন দূতাবাসও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তবে তুলনামূলকভাবে কম। অন্যদিকে, বাগদাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে অবস্থিত বাগদাদ কূটনৈতিক সহায়তা কেন্দ্র ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে।

কুয়েত: আঞ্চলিক উত্তেজনা, হামলা ও দূতাবাসের স্থাপনায় ক্ষয়ক্ষতির কারণে ৫ মার্চ কুয়েত সিটিতে মার্কিন দূতাবাস কার্যক্রম স্থগিত করে। এতে প্রায় ১ কোটি ৪৭ লাখ ৫০ হাজার ডলার ব্যয় হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সৌদি আরব: ৩ মার্চ দুটি ইরানি ড্রোন রিয়াদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসে আঘাত হানে। এতে বস্তুগত ক্ষয়ক্ষতি হয়, যার ব্যয় প্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ ডলার।

সংযুক্ত আরব আমিরাত: দুবাইয়ে মার্কিন কনস্যুলেট জেনারেলের একটি ইউটিলিটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার ডলার ক্ষতি হয়েছে বলে জানায় মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

ইরানের হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের ৩০ রিপার ড্রোনসহ ক্ষতিগ্রস্ত-ধ্বংস কয়েক ডজন বিমান

আপডেট সময় ০৭:১৭:৪৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ইরানের হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক ডজন বিমান ও ড্রোন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। হামলার স্বীকার হয়েছে বহু ভবন ও স্থাপনাও। ক্ষতিগ্রস্ত অস্ত্রের মধ্যে অন্তত ৩০টি এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন রয়েছে। পেন্টাগনের এক পর্যবেক্ষণ সংস্থার বরাত দিয়ে মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) এ তথ্য জানিয়েছে কাতার-ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা।

প্রকাশিত মার্কিন প্রতিরক্ষা ইন্সপেক্টর জেনারেলের প্রতিবেদনে ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত চলা যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষয়ক্ষতির প্রথম সরকারি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও স্বীকার করা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের গোলাবারুদের মজুত কমে আসছে এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় জট তৈরি হয়েছে।

এর সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বারবার দেয়া বক্তব্যের অসঙ্গতি দেখা যাচ্ছে। সোমবার ট্রাম্প বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র আমাদের ইতিহাসের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি উন্নত ও অভিজাত অস্ত্র তৈরি করছে।’ এর আগে মার্কিন গণমাধ্যমে গোলাবারুদের ঘাটতির খবর প্রকাশের পর তিনি দাবি করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কার্যত সীমাহীন গোলাবারুদ রয়েছে।

ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী হামলা শুরুর পর পুরো যুদ্ধজুড়েই তেহরান উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা মার্কিন ঘাঁটি ও স্থাপনায় নিয়মিত হামলা চালায়। এসব হামলার বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ওয়াশিংটন জানিয়েছিল, প্রতিহত করা হয়েছে হামলাগুলো। তবে পেন্টাগনের প্রতিবেদনে ওই অঞ্চলে মার্কিন বাহিনী ও স্থাপনাগুলোর উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতির চিত্র উঠে এসেছে, যার আর্থিক মূল্যও অনেক বেশি।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ জানিয়েছে, যুদ্ধে অন্তত ১১ জন মার্কিন সামরিক সদস্য নিহত হয়েছেন। যুদ্ধের বাইরে মারা গেছেন আরও সাতজন। ইরানের হামলায় ১ মার্চ কুয়েতের শুয়াইবা বন্দরে অন্তত ছয়জন এবং একই দিন সৌদি আরবে একজন নিহত হন। ১৭ জুলাই জর্ডানের মুওয়াফফাক আল-সালতি বিমানঘাঁটি বা আল-আজরাক ঘাঁটিতে তিনজন এবং ১৯ জুলাই ইরাকের এরবিল বিমানঘাঁটিতে একজন নিহত হন।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ১২ মার্চ ইরাকে একটি কেসি-১৩৫ বিধ্বস্ত হয়ে ছয়জন নিহত হন। এ ছাড়া ১ জুলাই আরব সাগরে এমএইচ-৬০এস হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হলে নিহত হন আরও একজন। এছাড়া ৩০ জুন পর্যন্ত ইরানের হামলায় অন্তত ৪১৭ জন মার্কিন সামরিক সদস্য আহত হয়েছেন বলেও উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

কতটি বিমান হারিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র?
মার্কিন ক্ষয়ক্ষতির মধ্যে সামনের সারির যুদ্ধবিমান ও আক্রমণাত্মক বিমান থেকে শুরু করে আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান, আকাশপথে কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল বিমান, উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার এবং চালকবিহীন নজরদারি বিমান রয়েছে।

এফ-১৫ই: প্রায় ৩ কোটি ডলার মূল্যের অন্তত চারটি দুই আসনের এ ধরনের যুদ্ধবিমান ধ্বংস হয়েছে। এর মধ্যে তিনটি ১ মার্চ কুয়েতের আকাশে নিজেদের বাহিনীর ভুল হামলায় ভূপাতিত হয়। চতুর্থটি এপ্রিলে ইরানের আকাশে যুদ্ধে ভূপাতিত হয়। তবে উদ্ধার করা হয় সব বিমানকর্মীকে।

এফ-৩৫এ: ভারী নিরাপত্তাবেষ্টিত আকাশসীমায় প্রবেশের জন্য তৈরি যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত একটি অত্যাধুনিক বহুমুখী যুদ্ধবিমান মার্চে ইরানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে জানা গেছে।

এ-১০: স্থলবাহিনীকে বিমান সহায়তা দেয়ার জন্য তৈরি অন্তত একটি ভারী সুরক্ষিত আক্রমণাত্মক বিমান ইরানের হামলায় ভূপাতিত হয়।

কেসি-১৩৫: দূরপাল্লার মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলোর পরিসর ও উড্ডয়নক্ষমতা বাড়াতে ব্যবহৃত অন্তত সাতটি বড় আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। এর একটি ১২ মার্চ ইরাকে জ্বালানি সরবরাহের মিশনের সময় বিধ্বস্ত হলে ছয়জন নিহত হন। আরও পাঁচটি সৌদি আরবে মাটিতে থাকা অবস্থায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সপ্তম বিমানটিও ইরাকে হামলার শিকার হয়।

ই-৩ সেন্ট্রি: সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে মাটিতে থাকা অন্তত একটি আগাম সতর্কতা ও নিয়ন্ত্রণ বিমান ইরানি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এইচএইচ-৬০ডব্লিউ হেলিকপ্টার: চার ব্লেড ও দুই ইঞ্জিনবিশিষ্ট অন্তত একটি মাঝারি আকারের সামরিক হেলিকপ্টার যুদ্ধকালীন অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানের সময় ইরানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এমকিউ-৪সি ট্রাইটন: সমুদ্রভিত্তিক গোয়েন্দা ও নজরদারির কাজে ব্যবহৃত প্রায় ২৪ কোটি ডলার মূল্যের উচ্চ উচ্চতায় দীর্ঘ সময় উড়তে সক্ষম অন্তত একটি চালকবিহীন নজরদারি বিমান এপ্রিলে বিধ্বস্ত হয়।

এএইচ-৬ হেলিকপ্টার: ইরানে যুদ্ধকালীন অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানের সময় উদ্ধার করা সম্ভব নয় বলে বিবেচিত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র চারটি ছোট ও অত্যন্ত দ্রুতগামী হেলিকপ্টার ধ্বংস করে।

এএইচ-৬৪ অ্যাপাচি: দুই ইঞ্জিন ও চার ব্লেডের অন্তত একটি অ্যাটাক হেলিকপ্টার ৮ জুন হরমুজ প্রণালির কাছে ভূপাতিত হয়।

এমএইচ-৬০এস: যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর অন্তত একটি বহুমুখী হেলিকপ্টার ১ জুলাই আরব সাগরে বিধ্বস্ত হয়। চার ক্রুর মধ্যে তিনজন আহত অবস্থায় উদ্ধার হন, আর নিখোঁজ হন চতুর্থজন।

এমকিউ-৯ রিপার: নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও নির্ভুল হামলায় ব্যবহৃত দীর্ঘসময় উড়তে সক্ষম সশস্ত্র চালকবিহীন এই বিমান ৩০টি হারিয়েছে ওয়াশিংটন।

এদিকে এর বাইরে ইরানি সামরিক বাহিনী আরও মার্কিন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত করার দাবি করেছে। তারা হরমুজ প্রণালির কাছে একাধিকবার নজরদারি ও আক্রমণাত্মক ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে। তেহরান চলতি মাসের শুরুতে একটি মার্কিন ডুবোযান ‘ডাইভ-এলডি’ও আটক করে।

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটির ক্ষয়ক্ষতি
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের বক্তব্য অনুযায়ী, যুদ্ধের সময় কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, ইরাক, ওমান ও জর্ডানে মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোর শত শত ভবন ও স্থাপনা ইরানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।

তবে এসব ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে প্রতিবেদনে অতিরিক্ত কোনো বিস্তারিত তথ্য দেয়া হয়নি। এর আগে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানা যায়, ইরানের হামলার কারণে বেশ কয়েকটি মার্কিন স্থাপনা সাময়িকভাবে বন্ধ বা অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হয়েছিল।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক অভিযান শুরুর আগে ও চলাকালে পর্যাপ্ত নৌঘাঁটি ও সহায়তা বন্দর স্থাপন বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছিল। এর কারণ হিসেবে বহরের জন্য সরবরাহ পুনরায় পূরণে বন্দর ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্বাগতিক দেশের অনুমতির জটিলতা ও অনিশ্চয়তার কথা বলা হয়েছে।

সেন্ট্রাল কমান্ডের বক্তব্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়, সামরিক সরবরাহ ও অবকাঠামো দিয়েগো গার্সিয়ায় স্থানান্তরের ক্ষেত্রে বড় সমস্যা ছিল দূরত্ব। দীর্ঘ সমুদ্রপথে পরিবহনের কারণে সরবরাহ চক্রে ১৪ থেকে ১৮ দিন সময় লাগত।

উপসাগরে মার্কিন কূটনৈতিক স্থাপনায় ক্ষয়ক্ষতি
পেন্টাগনের পর্যবেক্ষণ সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরাক, কুয়েত, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে থাকা মার্কিন কূটনৈতিক স্থাপনাগুলো ইরানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব ক্ষয়ক্ষতির আনুমানিক মোট ব্যয় ১৮ কোটি ৪০ লাখ ডলার।

এ ছাড়া বাগদাদ, জেরুজালেম, তেল আবিব, কায়রো, আম্মান, কুয়েত সিটি ও মাসকাটে কর্মী প্রত্যাহার ও ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার কারণে নির্মাণ প্রকল্প বিলম্বে প্রতি মাসে খরচ হয়েছে আনুমানিক ২ কোটি ৪৫ লাখ ডলার।

ইরাক: মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের তথ্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুনের শেষ পর্যন্ত ইরাকে মার্কিন মিশনের ওপর ৬০০টির বেশি হামলা হয়েছে, যাতে প্রায় ১৫ কোটি ৭০ লাখ ডলার পর্যন্ত ক্ষতি হয়েছে।

এরবিলে মার্কিন কনস্যুলেট জেনারেলের নতুন কনস্যুলেট ভবনের একাধিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাগদাদের মার্কিন দূতাবাসও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তবে তুলনামূলকভাবে কম। অন্যদিকে, বাগদাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে অবস্থিত বাগদাদ কূটনৈতিক সহায়তা কেন্দ্র ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে।

কুয়েত: আঞ্চলিক উত্তেজনা, হামলা ও দূতাবাসের স্থাপনায় ক্ষয়ক্ষতির কারণে ৫ মার্চ কুয়েত সিটিতে মার্কিন দূতাবাস কার্যক্রম স্থগিত করে। এতে প্রায় ১ কোটি ৪৭ লাখ ৫০ হাজার ডলার ব্যয় হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সৌদি আরব: ৩ মার্চ দুটি ইরানি ড্রোন রিয়াদে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসে আঘাত হানে। এতে বস্তুগত ক্ষয়ক্ষতি হয়, যার ব্যয় প্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ ডলার।

সংযুক্ত আরব আমিরাত: দুবাইয়ে মার্কিন কনস্যুলেট জেনারেলের একটি ইউটিলিটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার ডলার ক্ষতি হয়েছে বলে জানায় মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর।