এএফপির এক্সপ্লেইনার
কীভাবে উত্থান হলো ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের?
- আপডেট সময় ০৩:৩৯:৪৬ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / ১৭ বার পড়া হয়েছে
মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হয়ে কৌশলগত বাব আল-মানদেব প্রণালি দখল করেছে। এর মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান–সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে হুতিদের শক্ত অবস্থান আরও পাকাপোক্ত হলো।
একসময় হুতিদের তুলনামূলক বিচ্ছিন্ন একটি ধর্মীয় ও সামরিক সংগঠন হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু তারা এখন ইয়েমেনের পুরো লোহিত সাগর উপকূল নিয়ন্ত্রণ করছে। পাশাপাশি দেশটির উত্তরাঞ্চলের বড় একটি অংশও হুতিদের নিয়ন্ত্রণে। এর মধ্যে রাজধানী সানাও রয়েছে।
হুতিরা জায়দি সম্প্রদায়ভুক্ত। জায়দিরা শিয়াদের একটি শাখা। ইয়েমেনের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ সুন্নি। আর দেশটিতে জায়দিরা সংখ্যালঘু।
গত শতকের নব্বই দশকে জায়দিদের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক বৈষম্যের অভিযোগ তুলে হুতিরা প্রতিরোধে নামে। জায়দিদের বেশির ভাগই ইয়েমেনের দারিদ্র্যপীড়িত উত্তরাঞ্চলে বসবাস করে।
হুতিরা ‘আনসার আল্লাহ’ নামেও পরিচিত। এর অর্থ ‘আল্লাহর সমর্থক’। প্রয়াত ধর্মীয় নেতা বদরেদ্দিন আল-হুতির নামানুসারে এই সংগঠনের নামকরণ হয়। তাঁর ছেলে হুসেইনও এই আন্দোলনের নেতা ছিলেন। তিনি ২০০৪ সালে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর হাতে নিহত হন।
বদরেদ্দিনের আরেক ছেলে আবদুলমালিক পরে সংগঠনের নেতৃত্বের দায়িত্ব নেন। জ্বালাময়ী বক্তৃতার মাধ্যমে তিনি পরিচিতি পান। দেশটির উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বিচ্ছিন্ন একটি গোষ্ঠী তাঁর নেতৃত্বে রাজধানী সানার নিয়ন্ত্রণকারী শক্তিতে পরিণত হয়। একই সঙ্গে আঞ্চলিক শক্তি হিসেবেও তারা নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে।
এখন হুতিদের হাজার হাজার যোদ্ধা রয়েছে। ইয়েমেনের দুর্গম ও পাহাড়ি এলাকায় লড়াইয়ের জন্য তারা প্রশিক্ষিত। দীর্ঘদিনের যুদ্ধেও তারা অভিজ্ঞ হয়ে উঠেছে।
ইয়েমেনের জনসংখ্যার বড় অংশ যে এলাকাগুলোতে বসবাস করে, হুতিরা সেসব এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। তবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার এখনো দেশটির বেশি এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে।
হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ইয়েমেনের তেলসমৃদ্ধ উপসাগরীয় প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে। ইসরায়েলের জন্যও তারা হুমকি। ফিলিস্তিনের গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর হুতিরা বারবার ইসরায়েলে হামলা চালিয়েছে।

কয়েক দশক ধরে উত্থান
২০০৪ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত হুতিরা ইয়েমেনের তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে ছয়টি যুদ্ধে লড়েছে। আর ২০০৯ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত সৌদি আরবের সঙ্গেও তারা লড়াই করে। সে সময় তারা সীমান্ত পেরিয়ে সৌদি আরবে ঢুকে পড়েছিল।
আরব বসন্তের বিক্ষোভের ধারাবাহিকতায় ২০১২ সালে ইয়েমেনের তৎকালীন শাসক আলী আবদুল্লাহ সালেহকে ক্ষমতাচ্যুত করতে যে আন্দোলন হয়েছিল, তাতে হুতিরা অংশ নেয়। পরে অবশ্য তারা সালেহর সঙ্গে জোট গড়ে। তবে আবার তাদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। ২০১৭ সালে হুতিরা সালেহকে হত্যা করে।
হুতিদের বড় ধরনের উত্থান ঘটে ২০১৪ সালে। সে বছর তারা রাজধানী সানা দখল করে। এর জেরে ২০১৫ সালের মার্চে সৌদি আরবের নেতৃত্বে হুতিবিরোধী সামরিক অভিযান শুরু হয়। এরপর ইয়েমেনে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। এতে কয়েক লাখ মানুষ নিহত হয়। ইয়েমেনে বড় ধরনের মানবিক সংকট তৈরি হয়।
২০২২ সালে সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের সঙ্গে হুতিদের একটি যুদ্ধবিরতি হয়। তবে দেশটির উত্তরাঞ্চলের বড় একটি অংশ তখনো হুতিদের নিয়ন্ত্রণে ছিল।
গত জুলাইয়ে আবার সংঘাত শুরু হয়। সৌদি আরবের নিয়ন্ত্রণাধীন ইয়েমেনের আকাশসীমা অমান্য করে হুতিরা একটি ইরানি উড়োজাহাজকে অবতরণের অনুমতি দেয়। এর জবাবে বিমানবন্দরে হামলা হয়। এই হামলার জন্য সৌদি আরবকে দায়ী করে হুতিরা।
‘প্রতিরোধ অক্ষ’-এর সঙ্গে সম্পর্ক
হুতিরা তেহরানের নেতৃত্বাধীন ‘প্রতিরোধ অক্ষ’-এর অংশ। এই অক্ষে লেবাননের হিজবুল্লাহ, ফিলিস্তিনের হামাস, ইরাকের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী রয়েছে।
সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে হুতিদের ইরানের ‘হাতিয়ার’ হিসেবে দেখে আসছে। তাদের অভিযোগ, তেহরান হুতিদের অস্ত্র সরবরাহ করে। ইরান অবশ্য এই অভিযোগ অতীতে অস্বীকার করেছে।
হিজবুল্লাহর মতো হুতিরা ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে ‘চূড়ান্ত কর্তৃপক্ষ’ হিসেবে মানে না। তবে বছরের পর বছর ধরে ইরানের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে।
২০২৪ সালে হুতিরা লোহিত সাগরে জাহাজে হামলা শুরু করে। তাদের দাবি ছিল, এসব জাহাজের সঙ্গে ইসরায়েলের সম্পর্ক রয়েছে। গাজা যুদ্ধে ফিলিস্তিনিদের সমর্থনে তারা এসব হামলা চালানোর কথা জানায়।
এই হামলার কারণে অনেক জাহাজকে গন্তব্যে যেতে দক্ষিণ আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্ত ঘুরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়েছে।
গত মার্চে ইরানের সমর্থনে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে হুতিরাও যোগ দেয়। তারা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নতুন করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবি করে। তবে এসব হামলায় ইসরায়েলের বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।
ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকলেও হুতিরা তাদের সমর্থনদাতা দেশটির কাছ থেকে কিছুটা স্বাধীনতা বজায় রাখতে পেরেছে। সামরিক সহায়তার জন্যই তারা মূলত ইরানের ওপর নির্ভর করে।

বাব আল-মানদেব দখলের লড়াই
লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রবেশপথ বাব আল-মানদেব প্রণালিতে হামলা চালিয়ে হুতিরা দীর্ঘদিন ধরে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ব্যাহত করতে সক্ষম হয়েছে।
সুয়েজ খালের মাধ্যমে ইউরোপ ও এশিয়াকে যুক্ত করেছে লোহিত সাগর। সৌদি আরবের জন্যও এই জলপথ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ইরান হরমুজ প্রণালি অবরোধ করে পারস্য উপসাগর থেকে তেল পরিবহন অনেকটাই বন্ধ করে দেয়। এরপর তেল রপ্তানি চালু রাখতে সৌদি আরব এই জলপথের ওপর নির্ভর করছে।
গত জুলাইয়ে হুতিরা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে সমুদ্রপথ অবরোধের ঘোষণা দেয়। এর পর থেকে তারা লোহিত সাগরে সৌদি আরবের জাহাজে বারবার হামলা চালিয়েছে।
ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর সঙ্গে আবার সংঘাত শুরুর কিছুদিন পর ৩ সেপ্টেম্বর হুতিরা বাব আল-মানদেব দখলের লক্ষ্যে বড় ধরনের হামলা শুরু করে।
এক সপ্তাহের মধ্যেই হুতিরা পুরো লোহিত সাগর উপকূল এবং প্রণালিটির ভেতর ও আশপাশের কৌশলগত দ্বীপগুলো দখল করে নেয়। এতে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণসহ সৌদির তেলবাহী জাহাজে হুতিদের হামলা চালানোর সক্ষমতা আরও বেড়েছে।



















