পিংক বাসে যাত্রী বেড়ে দ্বিগুণ, তবু দিনে ভর্তুকি ৬০ হাজার টাকা
- আপডেট সময় ০১:৫১:১৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ৫ অক্টোবর ২০২৬
- / ২১ বার পড়া হয়েছে
নারীদের যাতায়াতের জন্য চলতি বছরের আগস্টে পিংক বাস নামে বিশেষায়িত গণপরিবহন চালু করে সরকার। শুরুর দিকে এর যাত্রীসংখ্যা কম থাকলেও এক মাসের মাথায় তা বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। কর্মদিবসে চালানো এই বাসের সিংহভাগ যাত্রীই কর্মজীবী ও ছাত্রী। সাধারণ যাত্রীরা এতে বেশি উঠছেন না। অফিস টাইমের বাইরে বেশিরভাগ বাস থাকছে অনেকটাই ফাঁকা। ফলে সরকারকে দৈনিক বড় অঙ্কের টাকা ভর্তুকি দিতে হচ্ছে।
বিশেষায়িত এই নারী বাস সার্ভিস চালু হয় গত ১৮ আগস্ট। শুরুর দিকে এর দৈনিক যাত্রীর সংখ্যা ছিল প্রায় সাড়ে ৬০০, যা সেপ্টেম্বরের একই সময়ে বেড়ে ১,৩০০’র কাছাকাছি পৌঁছায়। প্রতিদিন যাত্রীদের কাছ থেকে ভাড়া বাবদ প্রায় ১৫ হাজার টাকা আয় হলেও সরকারকে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে ৫০-৬০ হাজার টাকা । ভর্তুকির এমন বোঝা নিয়ে পিংক বাস কতদূর এগোবো, তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছে বিভিন্ন যাত্রী সংগঠন। কর্তৃপক্ষ বলছে, আগামী বছরের শুরুতে আধুনিক সুবিধাসংবলিত নতুন ১০০ বাস বহরে যুক্ত হলে পরিস্থিতি বদলে যাবে।
বিআরটিসি সূত্র জানায়, প্রথম ধাপে রাজধানী, বগুড়া ও চট্টগ্রামের ১৩টি রুটে ১৪টি পিংক বাস নামানো হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকার ১০টি রুটে একটি একতলা ও ৯টি দ্বিতল বাস, বগুড়ার দুটি রুটে দুটি দ্বিতল বাস এবং চট্টগ্রামে একটি রুটে দুটি দ্বিতল বাস চলাচল করছে। বিশেষায়িত এই মহিলা বাস সার্ভিসের উদ্বোধন করা হয় গত ১৮ আগস্ট। পরদিন থেকে গত ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক মাসের মধ্যে ২০ দিন বাস সার্ভিস ছিল। এই সময়ে বাসগুলোর মোট ট্রিপ হয়েছে ২৭২টি।
সূত্রমতে, সার্ভিসের প্রথম দিন গত ১৯ আগস্ট থেকে ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বাসে ভ্রমণ করেছেন প্রায় ২১ হাজার যাত্রী। গড়ে প্রতিদিন ১,০৪০ জন। সার্ভিস চালুর প্রথম সপ্তাহে যাত্রী হাজারের নিচে থাকলেও সময়ের সঙ্গে তা বেড়েছে। সার্ভিস চালু থাকা ২০ দিনে প্রায় তিন লাখ টাকা আয় হয়েছে। গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১৫ হাজার টাকা। একই সময়ে সরকার ভর্তুকি দিয়েছে ১০-১২ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রতিদিন ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা।
বিআরটিসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সকাল ৭টা থেকে ৮টা ৪০ মিনিটে বাসগুলো ছাড়ছে। এরপর ঢাকায় বিকাল ৪টা থেকে সাড়ে ৪টা এবং বগুড়া ও চট্টগ্রামে দুপুর ১টা ও বেলা ৩টায় চলাচল করছে। যাত্রী না পাওয়ায় বাসগুলো দিনের বেশিরভাগ সময় অলস বসে থাকছে ডিপোতে।
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী আমার দেশকে বলেন, বিআরটিসির মহিলা বাস সার্ভিস চালু একটি অদূরদর্শী প্রকল্প। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে পরামর্শ করে কিংবা কোনো জরিপ ছাড়াই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ প্রকল্প মুখথুবড়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
মহিলাদের জন্য আলাদা বাস সার্ভিস কোনো কার্যকর সমাধান নয় উল্লেখ করে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান আমার দেশকে বলেন, এটি একটি অকার্যকর প্রকল্প। বাসের রঙ বদলে ও নতুন নাম দিয়ে চালালে সমাধান আসবে না। এটি নারীদের সঙ্গে উপহাস করার শামিল। তিনি বলেন, সব বাস নারী ও শিশুবান্ধব হতে হবে।
বিআরটিসির ডিজিএম (অপারেশন) শুকদেব ঢালী আমার দেশকে বলেন, মহিলা বাস সার্ভিসের ক্ষেত্রে সেবার দিকেই আমরা ফোকাস দিচ্ছি। মহিলা যাত্রীদের ব্যাপক আগ্রহ লক্ষ করা যাচ্ছে। মাত্র এক মাসেই যাত্রী বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। সামনে যাত্রীসংখ্যা আরো বাড়বে। এই মুহূর্তে লাভ-লসের হিসাবে না যাওয়াই ভালো।
পিংক বাস উদ্বোধনের সময় বিআরটিসি জানিয়েছিল, ঢাকা মহানগরীর ১০৬টি, চট্টগ্রামে ১২টি ও বগুড়ার ১৬টি স্পট থেকে যাত্রীদের ওঠানো-নামানো হবে। কিন্তু অনেক যাত্রী অভিযোগ করেছেন, অপেক্ষমাণ যাত্রী না দেখলে নির্ধারিত স্টপেজগুলোয়ও বাস দাঁড়াচ্ছে না। ফলে নিয়মিত যাত্রীর বাইরে অন্য যাত্রীরা উঠতে পারছেন না। চালকদের মধ্যে শুরুর স্টপেজ থেকে যাত্রী নিয়ে সোজা গন্তব্যে পৌঁছানোর মনোভাব আছে বলে অভিযোগ তাদের।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিআরটিসির এক কর্মকর্তা আমার দেশকে বলেন, পুরুষ চালক আর নারী চালকের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। নারী চালকরা পুরুষের মতো স্টপেজে স্টপেজে দাঁড়িয়ে যাত্রীর জন্য অপেক্ষা করায় অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারেননি এখনো। প্রতিটি স্টপেজে অন্য বাসগুলোকে পাশ কাটিয়ে বাসটিকে দাঁড় করাতে হয়। অভিজ্ঞতা কম থাকায় নারী চালকরা এই ঝামেলা আপাতত এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছেন। তবে তারাও ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে উঠবেন ।
যাত্রীরা বলছেন, অনেক যাত্রী বাস ছাড়ার এবং কোন স্টপেজে কখন পৌছাঁবে, তার নির্দিষ্ট ও নির্ভরযোগ্য সময়সূচি না জানায় পিংক বাসে উঠতে পারছেন না। তাছাড়া দুই বেলা বাস চলানো এবং নির্দিষ্ট স্টপেজে থামার কারণে অনেক নারী পিংক বাসে আগ্রহী হচ্ছেন না। নারীদের মাঝে বিশেষায়িত বাসে চলাচলের ব্যাপারে সচেতনতারও অভাব রয়েছে। আবার পিংক বাসের ভিডিও সামাজিকমাধ্যমে ছড়ানো হচ্ছে, তাতে নারীর ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বিঘ্নিত হওয়ার শঙ্কাও দেখছেন অনেকে। এসব কারণে পিংক বাসে যাত্রী বাড়ছে না।
পিংক বাসে করে ফার্মগেট থেকে মতিঝিলের কর্মস্থলের উদ্দেশে যাত্রা করা লায়লা ইয়ামিন (৪০) বলেন, আগে পাবলিক বাসে যাতায়াত করতাম। পিংক বাস চালু হওয়ার পর থেকে এই বাসেই প্রতিদিন কর্মস্থলে যাচ্ছি। প্রথম কয়েক দিন সময়সূচি নিয়ে সমস্যা হলেও এখন আর হয় না। মিরপুর-১২ থেকে আসা বাসটি সকাল সাড়ে ৮টা থেকে ৯টার মধ্যে ফার্মগেট দিয়ে যায়। ফলে আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়।
কারওয়ান বাজার দিয়ে যাওয়ার সময় এক নারীকে দৌড়ে পিংক বাসে ওঠার চেষ্টা করতে দেখা যায় গত বুধবার। কিন্তু স্টপেজ না থাকায় সাধারণ বাসেই ওঠেন ওই নারী। এ সময় বাসের যাত্রীরা জানান, রুটের প্রতিটি জায়গায় স্টপেজ থাকলে অনেকে যেতে পারতেন।
রেহানা পারভীন নামে এক যাত্রী জানালেন, নারী চালকরা একটু বেশি সতর্কতার সঙ্গে বাস চালানোর কারণে ধীরগতি লক্ষ করা যায়।
শনির আখড়া থেকে মতিঝিল রুটের বাসচালক সুপ্রিয়া কুণ্ডু আমার দেশকে বলেন, নারীরা বেশ আগ্রহ নিয়েই এই বাসে উঠছেন। আগামীতে যাত্রী আরো বাড়বে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
মতিঝিল ডিপোতে গিয়ে দেখা যায়, নতুন বাজার, তালতলা, মিরপুর, মিরপুর-১০, মিরপুর-১২, মোহাম্মদপুর এবং নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা বাসগুলো সকালের ট্রিপ শেষ করে ডিপোতে অলস বসে আছে। এখান থেকে বেরিয়ে বিকালে আবার নির্ধারিত স্থানে যাত্রী পরিবহনের জন্য যাবে। তারপর যাত্রীদের নিজ নিজ গন্তব্যে নামিয়ে আবার মতিঝিল ডিপোতে রাখা হবে বাসগুলো।
প্রশিক্ষণ শেষে দ্বিতীয় ধাপে আরো ১০ জন নারী চালক গত বৃহস্পতিবার যোগ দিয়েছেন। ফলে এখন নারী চালকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৬ জনে। তৃতীয় ধাপের নারী চালকের প্রশিক্ষণ প্রক্রিয়া চলতি মাসে শুরু হবে বলে জানিয়েছেন বিআরটিসি কর্মকর্তারা। এছাড়া আগামীতে ইলেকট্রনিক বাস চালানোর জন্য প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণও দেওয়া হবে।
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে, পিংক বাসের বহরে আরো ১০০টি অত্যাধুনিক বাস যোগ করা হবে। বাসগুলো তুলনামূলক ছোট থাকবে। এতে ওয়াই-ফাই, সিসি ক্যামেরা, এসিসহ অন্যান্য আধুনিক সুযোগ-সুবিধা থাকবে।



















