ঢাকা ০২:২৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ মে ২০২৪, ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

১৪ বছর পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঘুম ভেঙেছে

নিউজ ডেস্ক:-
  • আপডেট সময় ০২:৫৫:০০ অপরাহ্ন, শনিবার, ২ মার্চ ২০২৪
  • / ২২৪ বার পড়া হয়েছে

কুয়েতে কর্মরত অবস্থায় মৃত্যু হয় বাংলাদেশি মো. আব্দুল আলীর। তাঁর পরিবার দীর্ঘদিন ধরে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে ঘুরেও মৃত্যুর কারণ ও রহস্য উদ্ঘাটন করতে সরকারকে রাজি করাতে পারেনি। তবে এবার নড়েচড়ে বসেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

নিহতের ছেলে সেলিমের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কুয়েতে বাংলাদেশ দূতাবাসকে গত ৬ ফেব্রুয়ারি চিঠি দিয়ে মৃত্যুর যথাযথ তদন্ত করে ক্ষতিপূরণ আদায় করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে মন্ত্রণালয় সরব হলেও দূতাবাস এ বিষয়ে কতটা গুরুত্ব দেবে– এখন সে প্রশ্ন উঠেছে।

২০১০ সালের ২৭ নভেম্বর কুয়েতের গিলিব আল সুয়েখ অঞ্চলে মৃত্যু হয় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার পশ্চিম দেওভোগের বাসিন্দা ৫২ বছর বয়সী আব্দুল আলীর। ২০১১ সালের ১৪ জানুয়ারি তাঁর লাশ দেশে আসে। ১৯৮৫ সাল থেকে দেশটিতে গাড়িচালক হিসেবে কাজ করেছিলেন তিনি। দুই বা তিন বছর পরপর দেশে আসতেন এই প্রবাসী। মারা যাওয়ার মাত্র দুই মাস আগে নতুন মালিকের অধীনে কাজ নিয়েছিলেন। আব্দুল আলীর ছোট ভাই আব্দুল মান্নানও কুয়েতে থাকছেন দীর্ঘদিন ধরে। ভাই মারা যাওয়ার পর দেশে লাশ আনাসহ বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

আব্দুল আলীর মৃত্যু যে স্বাভাবিকভাবে হয়নি, তা নিয়ে ২০১০ সালের ১৬ ডিসেম্বর কুয়েতের জাতীয় দৈনিক আল শাহিদ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাতে বলা হয়, আবদুল আলী মারা যাওয়ার আগে যে দুই মাস কাজ করেছিলেন, সেই দুই মাসের বেতনও পাননি। কফিলের (নিয়োগকর্তা) স্ত্রীর সঙ্গে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে মারধরের শিকার হন তিনি। তাতেই মারা যান এ চালক।

বাবার মৃত্যুর কারণ ও এর ক্ষতিপূরণ নিয়ে আবারও দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন সেলিম। পররাষ্ট্র এবং প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী থেকে শুরু করে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের চিঠি দিয়েছেন। তাঁর চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে আব্দুল আলীর মৃত্যু রহস্য ও ক্ষতিপূরণে সরব হয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

পিতার মৃত্যুর বিষয়ে সেলিম বলেন, বাবার লাশ যখন দেশে আনা হয় তখন শরীরের বিভিন্ন স্থানে ও মাথায় আঘাতের চিহ্ন ছিল। তাঁর অনেক দাঁত ছিল ভাঙা। দাড়িতে ছিল রক্তের দাগ। এসব দেখে তা কোনোভাবেই স্বাভাবিক মৃত্যু বলে মনে হয়নি। বরং কোনো কারণে বাবাকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছিল।

তিনি বলেন, চাচার কাছ থেকে শুনেছিলাম, বাবার মৃত্যুর পর লাশ নিয়ে তড়িঘড়ি করছিলেন সংশ্লিষ্টরা। সেখানেই তাঁকে দাফনের কথা বলা হয়েছিল। পূর্ণাঙ্গ কোনো ময়নাতদন্তও করা হয়নি। কেউ মারা গেলে তো মৃত্যুর কারণ তাঁর মৃত্যু সনদে উল্লেখ করতে হয়; কিন্তু বাবার মৃত্যুর সনদে কোনো কারণ উল্লেখ নেই। বাংলাদেশ দূতাবাসে তখন যারা কর্মরত ছিলেন, তাদের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ। আর বাবাকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। ফলে কোনো ময়নাতদন্ত ছাড়া কি এভাবে লাশ হাসপাতাল থেকে বের করা যায়?

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যেসব নথি জমা দেওয়া হয়েছে তা থেকে জানা গেছে, ২০১১ সালের ৭ আগস্ট কুয়েতের বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রথম সচিব (শ্রম) কে এম আলী রেজা জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর মহাপরিচালককে এক চিঠিতে উল্লেখ করেন, দূতাবাসের পক্ষ থেকে আব্দুল আলীর মৃত্যুর কারণে ক্ষতিপূরণ/আর্থিক সুবিধা পাওয়া যায় কিনা, সে বিষয়ে তাঁর কফিলের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হয়েছে। কফিল ক্ষতিপূরণের বিষয়ে কোনো ধরনের সহযোগিতা করতে পারবেন না বলে দূতাবাসকে জানিয়েছেন। আব্দুল আলী কুয়েতে বৈধভাবে কর্মরত ছিলেন, এ বিষয়টিও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে সেলিম আরও বলেন, কফিলের নম্বর বলে চিঠিতে যে নম্বরটির কথা বলা হচ্ছে, তা হচ্ছে কুয়েতে থাকা তাঁর চাচা আব্দুল মান্নানের নম্বর। ফলে দূতাবাস কফিলের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে– এর সত্যতা নিয়েই প্রশ্ন থাকছে।

১৪ বছর ধরে বিভিন্ন সময় আব্দুল আলীর মৃত্যুর কারণ উদ্ঘাটন ও ক্ষতিপূরণ চেয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে একাধিকবার চিঠি দিয়ে এসেছে তাঁর পরিবার। কিন্তু মৃত্যুর কারণ কেউ জানাতে পারেনি। তবে তাঁর মৃত্যুর কারণ হিসেবে পরিবারের কাছে কুয়েতের হাসপাতালের একটি সনদ রয়েছে, যেখানে মৃত্যুর কারণ হিসেবে লেখা– ‘অবস্থা বিবেচনাধীন’।

এক সময় নিহত আব্দুল আলীর স্ত্রী কাওসারী বেগম ও ছেলে সেলিম সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে দৌড়েছেন। এখন ছেলে একাই সরকারের দপ্তরগুলোতে দৌড়ে বেড়াচ্ছেন।

১৪ বছর ধরে সরকারের দপ্তরগুলোতে ঘুরে ক্ষোভ নিয়ে সেলিম বলেন, বাবার মৃত্যুর কারণটা জানতে না পারলে সারা জীবনের একটা আক্ষেপ থেকে যাবে। তাই সুষ্ঠু তদন্তের দাবি করেই যাচ্ছি। কিছু দিন আগে সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাস পুরোনো ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন করে একজনের ক্ষতিপূরণ আদায় করে দিয়েছে। তাহলে কুয়েতে থাকা বাংলাদেশ দূতাবাস কেন পারবে না– প্রশ্ন তাঁর।

নিউজটি শেয়ার করুন

১৪ বছর পর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঘুম ভেঙেছে

আপডেট সময় ০২:৫৫:০০ অপরাহ্ন, শনিবার, ২ মার্চ ২০২৪

কুয়েতে কর্মরত অবস্থায় মৃত্যু হয় বাংলাদেশি মো. আব্দুল আলীর। তাঁর পরিবার দীর্ঘদিন ধরে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে ঘুরেও মৃত্যুর কারণ ও রহস্য উদ্ঘাটন করতে সরকারকে রাজি করাতে পারেনি। তবে এবার নড়েচড়ে বসেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

নিহতের ছেলে সেলিমের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কুয়েতে বাংলাদেশ দূতাবাসকে গত ৬ ফেব্রুয়ারি চিঠি দিয়ে মৃত্যুর যথাযথ তদন্ত করে ক্ষতিপূরণ আদায় করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে মন্ত্রণালয় সরব হলেও দূতাবাস এ বিষয়ে কতটা গুরুত্ব দেবে– এখন সে প্রশ্ন উঠেছে।

২০১০ সালের ২৭ নভেম্বর কুয়েতের গিলিব আল সুয়েখ অঞ্চলে মৃত্যু হয় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার পশ্চিম দেওভোগের বাসিন্দা ৫২ বছর বয়সী আব্দুল আলীর। ২০১১ সালের ১৪ জানুয়ারি তাঁর লাশ দেশে আসে। ১৯৮৫ সাল থেকে দেশটিতে গাড়িচালক হিসেবে কাজ করেছিলেন তিনি। দুই বা তিন বছর পরপর দেশে আসতেন এই প্রবাসী। মারা যাওয়ার মাত্র দুই মাস আগে নতুন মালিকের অধীনে কাজ নিয়েছিলেন। আব্দুল আলীর ছোট ভাই আব্দুল মান্নানও কুয়েতে থাকছেন দীর্ঘদিন ধরে। ভাই মারা যাওয়ার পর দেশে লাশ আনাসহ বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

আব্দুল আলীর মৃত্যু যে স্বাভাবিকভাবে হয়নি, তা নিয়ে ২০১০ সালের ১৬ ডিসেম্বর কুয়েতের জাতীয় দৈনিক আল শাহিদ একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাতে বলা হয়, আবদুল আলী মারা যাওয়ার আগে যে দুই মাস কাজ করেছিলেন, সেই দুই মাসের বেতনও পাননি। কফিলের (নিয়োগকর্তা) স্ত্রীর সঙ্গে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে মারধরের শিকার হন তিনি। তাতেই মারা যান এ চালক।

বাবার মৃত্যুর কারণ ও এর ক্ষতিপূরণ নিয়ে আবারও দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন সেলিম। পররাষ্ট্র এবং প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী থেকে শুরু করে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের চিঠি দিয়েছেন। তাঁর চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে আব্দুল আলীর মৃত্যু রহস্য ও ক্ষতিপূরণে সরব হয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

পিতার মৃত্যুর বিষয়ে সেলিম বলেন, বাবার লাশ যখন দেশে আনা হয় তখন শরীরের বিভিন্ন স্থানে ও মাথায় আঘাতের চিহ্ন ছিল। তাঁর অনেক দাঁত ছিল ভাঙা। দাড়িতে ছিল রক্তের দাগ। এসব দেখে তা কোনোভাবেই স্বাভাবিক মৃত্যু বলে মনে হয়নি। বরং কোনো কারণে বাবাকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছিল।

তিনি বলেন, চাচার কাছ থেকে শুনেছিলাম, বাবার মৃত্যুর পর লাশ নিয়ে তড়িঘড়ি করছিলেন সংশ্লিষ্টরা। সেখানেই তাঁকে দাফনের কথা বলা হয়েছিল। পূর্ণাঙ্গ কোনো ময়নাতদন্তও করা হয়নি। কেউ মারা গেলে তো মৃত্যুর কারণ তাঁর মৃত্যু সনদে উল্লেখ করতে হয়; কিন্তু বাবার মৃত্যুর সনদে কোনো কারণ উল্লেখ নেই। বাংলাদেশ দূতাবাসে তখন যারা কর্মরত ছিলেন, তাদের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ। আর বাবাকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। ফলে কোনো ময়নাতদন্ত ছাড়া কি এভাবে লাশ হাসপাতাল থেকে বের করা যায়?

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যেসব নথি জমা দেওয়া হয়েছে তা থেকে জানা গেছে, ২০১১ সালের ৭ আগস্ট কুয়েতের বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রথম সচিব (শ্রম) কে এম আলী রেজা জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর মহাপরিচালককে এক চিঠিতে উল্লেখ করেন, দূতাবাসের পক্ষ থেকে আব্দুল আলীর মৃত্যুর কারণে ক্ষতিপূরণ/আর্থিক সুবিধা পাওয়া যায় কিনা, সে বিষয়ে তাঁর কফিলের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হয়েছে। কফিল ক্ষতিপূরণের বিষয়ে কোনো ধরনের সহযোগিতা করতে পারবেন না বলে দূতাবাসকে জানিয়েছেন। আব্দুল আলী কুয়েতে বৈধভাবে কর্মরত ছিলেন, এ বিষয়টিও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে সেলিম আরও বলেন, কফিলের নম্বর বলে চিঠিতে যে নম্বরটির কথা বলা হচ্ছে, তা হচ্ছে কুয়েতে থাকা তাঁর চাচা আব্দুল মান্নানের নম্বর। ফলে দূতাবাস কফিলের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে– এর সত্যতা নিয়েই প্রশ্ন থাকছে।

১৪ বছর ধরে বিভিন্ন সময় আব্দুল আলীর মৃত্যুর কারণ উদ্ঘাটন ও ক্ষতিপূরণ চেয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে একাধিকবার চিঠি দিয়ে এসেছে তাঁর পরিবার। কিন্তু মৃত্যুর কারণ কেউ জানাতে পারেনি। তবে তাঁর মৃত্যুর কারণ হিসেবে পরিবারের কাছে কুয়েতের হাসপাতালের একটি সনদ রয়েছে, যেখানে মৃত্যুর কারণ হিসেবে লেখা– ‘অবস্থা বিবেচনাধীন’।

এক সময় নিহত আব্দুল আলীর স্ত্রী কাওসারী বেগম ও ছেলে সেলিম সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে দৌড়েছেন। এখন ছেলে একাই সরকারের দপ্তরগুলোতে দৌড়ে বেড়াচ্ছেন।

১৪ বছর ধরে সরকারের দপ্তরগুলোতে ঘুরে ক্ষোভ নিয়ে সেলিম বলেন, বাবার মৃত্যুর কারণটা জানতে না পারলে সারা জীবনের একটা আক্ষেপ থেকে যাবে। তাই সুষ্ঠু তদন্তের দাবি করেই যাচ্ছি। কিছু দিন আগে সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাস পুরোনো ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন করে একজনের ক্ষতিপূরণ আদায় করে দিয়েছে। তাহলে কুয়েতে থাকা বাংলাদেশ দূতাবাস কেন পারবে না– প্রশ্ন তাঁর।