ঢাকা ০৭:১৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৮ জানুয়ারী ২০২৬, ২৫ পৌষ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

কাঁটাতারে ফেলানির লাশ: বিচারহীনতার পনেরো বছর

স্টাফ রিপোর্টার
  • আপডেট সময় ০২:৫৫:০২ অপরাহ্ন, বুধবার, ৭ জানুয়ারী ২০২৬
  • / ৪০ বার পড়া হয়েছে

২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি ভোরে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার অনন্তপুর সীমান্তে বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষের গুলিতে নির্মমভাবে প্রাণ হারিয়েছিল কিশোরী ফেলানী। কাঁটাতারে সাড়ে চার ঘণ্টা ঝুলে থাকা ফেলানীর নিথর দেহ আজও বিশ্ববিবেকের কাছে এক বিচারহীনতার ক্ষত হয়ে আছে।

‘জীবন তো শেষ। আর কতদিন বেঁচে থাকব? মরার আগে মেয়ের হত্যার বিচারটা দেইখা যাইতে চাই।’ মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি ২০২৬)-অশ্রুসিক্ত চোখে কথাগুলো বলছিলেন ফেলানীর বাবা নূরুল ইসলাম নুরু। ১৫ বছর পেরিয়ে গেলেও শোকের ছায়া কাটেনি পরিবারটিতে।

কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার রামখানা ইউনিয়নের কলোনীটারী গ্রামের দরিদ্র নূরুল ইসলাম পেটের তাগিদে আর দশজনের মতো পারি জমান ভারতে। পরিবার নিয়ে থাকতেন ভারতের বঙ্গাইগাঁও এলাকায়। নূরুল ইসলামের বড় মেয়ে ফেলানীর বিয়ে ঠিক হয় বাংলাদেশে। বিয়ের উদ্দেশে ভারতের কাঁটাতার টপকে নিজ দেশে আসতে হবে তাদের। ২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি শুক্রবার। ভোর ৬টা ফুলবাড়ির অনন্তপুর সীমান্তে মই বেয়ে কাঁটাতার টপকায় ফেলানীর বাবা। পরে কাঁটাতার টপকানোর চেষ্টা করে ফেলানী। এ সময় ভারতীয় বিএসএফের গুলিতে বিদ্ধ হয় সে।

কাঁটাতারে ঝুলে থাকে ফেলানীর নিথর দেহ। গণমাধ্যমসহ বিশ্বের মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে ভারত। বিশ্বব্যাপী তোলপাড়ের পর ২০১৩ সালের ১৩ আগস্ট ভারতের কোচবিহারে জেনারেল সিকিউরিটি ফোর্সেস কোর্টে ফেলানী হত্যা মামলার বিচার শুরু হয়। বিএসএফের কোর্টে সাক্ষী দেন ফেলানীর বাবা নূর ইসলাম ও মামা হানিফ। ওই বছরের ৬ সেপ্টেম্বর আসামি অমিয় ঘোষকে খালাস দেয় বিএসএফের বিশেষ কোর্ট। পরে রায় প্রত্যাখ্যান করে পুনর্বিচারের দাবি জানায় ফেলানীর বাবা।

২০১৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর পুনর্বিচার শুরু হলে ১৭ নভেম্বর আবারও আদালতে সাক্ষ্য দেন ফেলানীর বাবা। ২০১৫ সালের ২ জুলাই এ আদালত পুনরায় আত্মস্বীকৃত আসামি অমিয় ঘোষকে খালাস দেয়। রায়ের পরে একই বছর ১৪ জুলাই ভারতের মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ (মাসুম) ফেলানীর বাবার পক্ষে দেশটির সুপ্রিম কোর্টে রিট পিটিশন করে। ওই বছর ৬ অক্টোবর রিট শুনানি শুরু হয়। ২০১৬, ২০১৭ এবং ২০১৮ সালে কয়েক দফা শুনানি পিছিয়ে যায়। পরে ২০২০ সালের ১৮ মার্চ করোনা শুরুর আগে শুনানির দিন ধার্য হলেও শুনানি হয়নি এখনও। পরে বিএসএফের বিশেষ কোর্টে দুই দফায় বিচারিক রায়ে খালাস দেয়া হয় অভিযুক্ত বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষকে। হত্যাকাণ্ডের ১৫ বছরেও সুষ্ঠু বিচার পায়নি ফেলানীর পরিবার। আশা করছেন পরবর্তী সরকারের নিকট আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে সঠিক বিচার পাবে বলেও প্রত্যাশা করেন তারা।

ফেলানীর বাবা নূরুল ইসলাম বলেন, ফেলানী হত্যার ১৫ বছর হয়ে গেল এখন পর্যন্ত বিচার পাই নাই। ভারতীয় সুপ্রিমকোর্টে বিচারটা নিয়া গেলাম, কয়েকবার শুনানির তারিখ দিলেও তা পিছিয়ে গেছে। আমি আমার মেয়ে ফেলানী হত্যাকারীর বিচার মরার আগে দেখে যেতে চাই। সামনে যেহেতু ভোট, যে সরকারই আসুক, ফেলানী হত্যার বিচার যেনও করে।

তিনি আরও বলেন, জীবনতো শেষের দিকে। আর কত বেঁচে থাকব। মেয়ের বিচারটা দেখে যেতে চাই। তাহলে শান্তি পাবো। এখন আমার মামলার কোনও আইনজীবী নাই। সরকারের কাছে একজন আইনজীবী চাই। তিনি আমার মামলা দেখবেন।

ফেলানীর মা জাহানারা বেগম বলেন, অনেকবার মেয়ে হত্যার বিচার দাবি জানিয়েছি। কিন্তু কোনও ফল পাইনি। ভোটে যেই সরকার আসুক। আমার মেয়ে হত্যার বিচারটা যেন করে। আমার মেয়ের বিচার হলে কাঁটাতারে আর কেউ ঝুলবে না। আমার মতো কোনও মায়ের বুক খলি হবে না।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

কাঁটাতারে ফেলানির লাশ: বিচারহীনতার পনেরো বছর

আপডেট সময় ০২:৫৫:০২ অপরাহ্ন, বুধবার, ৭ জানুয়ারী ২০২৬

২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি ভোরে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার অনন্তপুর সীমান্তে বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষের গুলিতে নির্মমভাবে প্রাণ হারিয়েছিল কিশোরী ফেলানী। কাঁটাতারে সাড়ে চার ঘণ্টা ঝুলে থাকা ফেলানীর নিথর দেহ আজও বিশ্ববিবেকের কাছে এক বিচারহীনতার ক্ষত হয়ে আছে।

‘জীবন তো শেষ। আর কতদিন বেঁচে থাকব? মরার আগে মেয়ের হত্যার বিচারটা দেইখা যাইতে চাই।’ মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি ২০২৬)-অশ্রুসিক্ত চোখে কথাগুলো বলছিলেন ফেলানীর বাবা নূরুল ইসলাম নুরু। ১৫ বছর পেরিয়ে গেলেও শোকের ছায়া কাটেনি পরিবারটিতে।

কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার রামখানা ইউনিয়নের কলোনীটারী গ্রামের দরিদ্র নূরুল ইসলাম পেটের তাগিদে আর দশজনের মতো পারি জমান ভারতে। পরিবার নিয়ে থাকতেন ভারতের বঙ্গাইগাঁও এলাকায়। নূরুল ইসলামের বড় মেয়ে ফেলানীর বিয়ে ঠিক হয় বাংলাদেশে। বিয়ের উদ্দেশে ভারতের কাঁটাতার টপকে নিজ দেশে আসতে হবে তাদের। ২০১১ সালের ৭ জানুয়ারি শুক্রবার। ভোর ৬টা ফুলবাড়ির অনন্তপুর সীমান্তে মই বেয়ে কাঁটাতার টপকায় ফেলানীর বাবা। পরে কাঁটাতার টপকানোর চেষ্টা করে ফেলানী। এ সময় ভারতীয় বিএসএফের গুলিতে বিদ্ধ হয় সে।

কাঁটাতারে ঝুলে থাকে ফেলানীর নিথর দেহ। গণমাধ্যমসহ বিশ্বের মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে ভারত। বিশ্বব্যাপী তোলপাড়ের পর ২০১৩ সালের ১৩ আগস্ট ভারতের কোচবিহারে জেনারেল সিকিউরিটি ফোর্সেস কোর্টে ফেলানী হত্যা মামলার বিচার শুরু হয়। বিএসএফের কোর্টে সাক্ষী দেন ফেলানীর বাবা নূর ইসলাম ও মামা হানিফ। ওই বছরের ৬ সেপ্টেম্বর আসামি অমিয় ঘোষকে খালাস দেয় বিএসএফের বিশেষ কোর্ট। পরে রায় প্রত্যাখ্যান করে পুনর্বিচারের দাবি জানায় ফেলানীর বাবা।

২০১৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর পুনর্বিচার শুরু হলে ১৭ নভেম্বর আবারও আদালতে সাক্ষ্য দেন ফেলানীর বাবা। ২০১৫ সালের ২ জুলাই এ আদালত পুনরায় আত্মস্বীকৃত আসামি অমিয় ঘোষকে খালাস দেয়। রায়ের পরে একই বছর ১৪ জুলাই ভারতের মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ (মাসুম) ফেলানীর বাবার পক্ষে দেশটির সুপ্রিম কোর্টে রিট পিটিশন করে। ওই বছর ৬ অক্টোবর রিট শুনানি শুরু হয়। ২০১৬, ২০১৭ এবং ২০১৮ সালে কয়েক দফা শুনানি পিছিয়ে যায়। পরে ২০২০ সালের ১৮ মার্চ করোনা শুরুর আগে শুনানির দিন ধার্য হলেও শুনানি হয়নি এখনও। পরে বিএসএফের বিশেষ কোর্টে দুই দফায় বিচারিক রায়ে খালাস দেয়া হয় অভিযুক্ত বিএসএফ সদস্য অমিয় ঘোষকে। হত্যাকাণ্ডের ১৫ বছরেও সুষ্ঠু বিচার পায়নি ফেলানীর পরিবার। আশা করছেন পরবর্তী সরকারের নিকট আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে সঠিক বিচার পাবে বলেও প্রত্যাশা করেন তারা।

ফেলানীর বাবা নূরুল ইসলাম বলেন, ফেলানী হত্যার ১৫ বছর হয়ে গেল এখন পর্যন্ত বিচার পাই নাই। ভারতীয় সুপ্রিমকোর্টে বিচারটা নিয়া গেলাম, কয়েকবার শুনানির তারিখ দিলেও তা পিছিয়ে গেছে। আমি আমার মেয়ে ফেলানী হত্যাকারীর বিচার মরার আগে দেখে যেতে চাই। সামনে যেহেতু ভোট, যে সরকারই আসুক, ফেলানী হত্যার বিচার যেনও করে।

তিনি আরও বলেন, জীবনতো শেষের দিকে। আর কত বেঁচে থাকব। মেয়ের বিচারটা দেখে যেতে চাই। তাহলে শান্তি পাবো। এখন আমার মামলার কোনও আইনজীবী নাই। সরকারের কাছে একজন আইনজীবী চাই। তিনি আমার মামলা দেখবেন।

ফেলানীর মা জাহানারা বেগম বলেন, অনেকবার মেয়ে হত্যার বিচার দাবি জানিয়েছি। কিন্তু কোনও ফল পাইনি। ভোটে যেই সরকার আসুক। আমার মেয়ে হত্যার বিচারটা যেন করে। আমার মেয়ের বিচার হলে কাঁটাতারে আর কেউ ঝুলবে না। আমার মতো কোনও মায়ের বুক খলি হবে না।