ঢাকা ০২:৪৭ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ০৮ মার্চ ২০২৬, ২৩ ফাল্গুন ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
ইতিহাসের কালো অধ্যায়

৭ই মার্চ এবং বাংলাদেশে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর সূচনা

নিজস্ব সংবাদ :
  • আপডেট সময় ০৯:৫৯:৩২ অপরাহ্ন, শনিবার, ৭ মার্চ ২০২৬
  • / ৩৭ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ৭ই মার্চ একটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করলেও, ১৯৭৩ সালের ৭ই মার্চ দিনটি একইসাথে দেশে নির্বাচনী কারচুপি এবং গণতন্ত্রের স্বপ্নভঙ্গের  এক নেতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবেও চিহ্নিত হয়ে আছে। আজকের বাংলাদেশের যে রাজনৈতিক সংকট এবং নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থাহীনতা, তার বীজ বপন করা হয়েছিল মূলত সেই ৭৩-এর প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমেই। যে দলটির হাত ধরে স্বাধীনতা এসেছিল, সেই দলটির হাতেই স্বাধীন দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা প্রথম কলঙ্কিত হয়েছিল। যার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন খোদ শেখ মুজিবুর রহমান।

স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত জাতীয় সংসদের ১৩টি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে হাতে গোনা কয়েকটি নির্বাচন বাদে বেশিরভাগ নির্বাচন নিয়েই ছিল নানা প্রশ্ন, যা থেকে বাদ যায়নি বাংলাদেশের প্রথম সংসদ নির্বাচনও। স্বাধীনতার পর প্রথম নির্বাচনে ব্যপক অনিয়মের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসে। সেসময় প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন শেখ মুজিবর রহমান। ৭৩ সালের নির্বাচনে আওয়ামিলীগের পরাজিত হবার সম্ভাবনা ছিলনা কিন্তু তারপরও ব্যপক অনিয়ম মাধ্যমে সিংহভাগ সিট দখল করে দলটি। অনিয়মের সেই নির্বাচনে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নকে ধুলিস্যাৎ করে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার বীজ বপন করে। আজকের রাজনৈতিক সংকটের বীজও তার মধ্য নিহিত ছিল।

ঐতিহাসিক তথ্য ও দলিলাদি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আওয়ামী লীগের সেই নির্বাচনে কারচুপির কোনো যৌক্তিক প্রয়োজন ছিল না। শেখ মুজিবুর রহমানের বিশাল ব্যক্তিত্ব ও আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার জোয়ারে নৌকা প্রতীক এমনিতেই দুই-তৃতীয়াংশ আসন পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নিরঙ্কুশ ক্ষমতার মোহ এবং বিরোধী দলগুলোকে সহ্য না করার মানসিকতা আওয়ামী লীগকে এক নজিরবিহীন জালিয়াতির পথে পরিচালিত করে।

গবেষক মহিউদ্দিন আহমদের ভাষায়, সেই নির্বাচনে পরাজয়ের ভয় নয়, বরং ‘বিরোধীদের অস্তিত্ব মুছে ফেলার’ এক সর্বগ্রাসী বাসনা শাসকদলের মধ্যে কাজ করেছিল। কনফিডেন্সহীনতার জন্য আওয়ামিলীগ নির্বাচনে অনিয়ম নীতিতে পরিণত করেছিল। বিরোধীদের নির্বাচন নিয়ে অতিরিক্ত উচ্ছসিত এবং আওয়ামিলীগের অতি আস্থাহীনতাই আওয়ামীলীগকে ম্যানেজড নির্বাচনের দিকে নিয়ে যায়।

সেই নির্বাচনে ভোট কারচুপির কৌশলগুলো ছিল আঁতকে ওঠার মতো। প্রথমত, প্রশাসনিক ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে মনোনয়নপত্র দাখিলে বাধা দেওয়া এবং অপহরণের মতো ঘটনা ঘটেছিল। ভোলার জনপ্রিয় নেতা ডা. আজহারউদ্দিনকে অপহরণ করে তোফায়েল আহমেদের আসনটি ‘পরিষ্কার’ করা কিংবা রাজশাহীর এইচএম কামরুজ্জামান ও ময়মনসিংহের রফিকউদ্দিন ভূঞাদের মাধ্যমে বিরোধী প্রার্থীদের মনোনয়ন প্রত্যাহারে বাধ্য করা ছিল সেই ইঞ্জিনিয়ারিংয়েরই অংশ।

হালিম দাদ খান তার “বাংলাদেশের রাজনীতি” বইয়ের ৪৭ নং পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেন ‘রাজশাহীর এইচএম কামরুজ্জামান, ময়মনসিংয়ের রফিকউদ্দিন ভূঞা, কিশোরগঞ্জের সৈয়দ নজরুল ইসলাম, জিল্লুর রহমান ও মনোরঞ্জন ধর বিরোধীপ্রার্থীদের মনোনয়ন প্রত্যাহারে বাধ্য করেন। মাগুরার সোহরাব হোসেন, ফরিদপুরের কেএম ওবায়দুর রহমান, মোতাহার উদ্দিন আহমেদ বিরোধীপ্রার্থীদের মনোনয়ন জমা দিতে দেননি। বিরোধী প্রার্থীকে মনোনয়ন জমা দিতে দেননি ভোলার তোফায়েল আহমেদ।

বইয়ের ৪৩ নং পৃষ্ঠায় বলা হয়, “টাঙ্গাইলের মন্ত্রী আবদুল মান্নান ভাসানী ন্যাপের ড.আলীম আল রাজীর কাছে,বরিশালের হরনাথ বাইন ও আবদুল মান্নান জাসদের মেজর জলিলের কাছে (দুটি আসনে),ক্যাপ্টেন সুজাত আলী অধ্যাপক মোজাফর আহমেদের কাছে পরাজিত হয়েও জয়ী হয়েছেন বলে দেশবাসী মনে করে।।শেখ মুজিব পাশের আসন থেকে কম ভোটে জয়ী হলে সেটা মুজিবের জন্য সম্মানহানি হবে মনে করে প্রাপ্ত ভোট ১লাখ ৫হাজার থেকে বাড়িয়ে ১লাখ ১৪ হাজার ঘোষণা করা হয়।“

মনোনয়ন প্রত্যাহারে বাধ্য করে এমন দুজন সৈয়দ নজরুল ইসলাম প্রবাসী সরকারের উপ রাষ্ট্রপতি ও কামরুজ্জামান স্বরাষ্ট্র, কৃষি,ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু এ ব্যক্তিরাই যাদেরকে জাতীয় চার নেতা হিসেবে ধরা হয় তারাই প্রার্থীদের ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে মনোনয়ন প্রত্যাহারে বাধ্য করেন। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন “১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত যারা মুক্তিযোদ্ধা ছিল-দেশ স্বাধীন করতে প্রাণ দেয়ার জন্য সদা প্রস্তুত থাকতো তারাই ১৬ডিসেম্বরে লুটপাটকারীতে পরিণত হয়”। খান আতাউর তাঁর ‘আবার তোরা মানুষ হ’ ছবিতে সে বিষয়টিই দেখিয়েছেন। এ কারণে ছবিটি ব্যান করা হয়।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক আব্দুল লতিফ মাসুম বিবিসি বাংলার সাক্ষাৎকারে বলেন, পেশায় চিকিৎসক আজহার উদ্দিন বিনা পয়সায় মানুষকে চিকিৎসা সেবা দিতেন। তিনি পাকিস্তান জাতীয় পরিষদেরও সদস্য ছিলেন। ওই এলাকায় জাসদ এতটাই জনপ্রিয় ছিল যে তাকে হারানোর মতো কোনো প্রার্থী ওই অঞ্চলে ছিল না। তখন আজহার সাহেবকে হারানোর জন্য তিনটি আসনের বাইরে বাকেরগঞ্জ ৪ আসনেও প্রার্থী হয়েছিলেন শেখ মুজিব। কিন্তু আজহার সাহেব যাতে শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে না পারেন সে কারণে মনোনয়ন দাখিলের দিন হাইজ্যাক করা হয়েছিল আজহার সাহেবকে।

“জাসদের উত্থান পতনঃ অস্থির সময়ের রাজনীতি” বইয়ের ৪৭ নং পৃষ্ঠায় বলা হয়, “
তোফায়েল আহমেদ ৪৫ বছর পর এবারও ভোলার তাঁর আসনের সবগুলো কেন্দ্র দখল করে নেন। ভোলায় আরেকটি আসনে মনোনয়ন জমা দেয়ার কথা ছিল ডাঃ আজহার উদ্দিনের। তিনি ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। মনোনয়ন জমা দেয়ার আগে তাঁকে অপহরণ করায় তাঁর মনোনয়ন জমা পড়েনি। ফলে ঐ আসনে আওয়ামিলীগের প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় লাভ করে।“

অলি আহাদ তাঁর “জাতীয় রাজনীতি “বইয়ের ৪৬৪ পৃষ্ঠায় লেখেন “১৯৭৩ এর মার্চের এই সাধারণ নির্বাচনে প্রশাসনিক ক্ষমতার মারাত্মক অব্যবহার, চরম দূর্ণীতির আশ্রয় গ্রহণ, মিডিয়া ক্যু, দলীয় বাহিনীর যথেচ্ছ আগ্রেয়াস্ত্র ব্যবহার ও ঢালাও হুমকির সহায়তায় প্রধানমন্ত্রী ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৯২ টি দখল করেন। এছাড়া বেসরকারিভাবে বিজয়ী ঘোষণা করা চট্টগ্রামে (২৯৪ নং আসন) ন্যাপের প্রার্থী মোশতাক আহমদ চৌধুরীরিকেও ১০মার্চ বেতারে পরাজিত ঘোষণা করা হয়।

দ্বিতীয়ত, ব্যালট বাক্স ছিনতাই এবং ‘মিডিয়া ক্যু’র মাধ্যমে মাঠের ফলাফল বদলে দেওয়ার এক জঘন্য সংস্কৃতি সেদিন থেকেই শুরু হয়। কুমিল্লার দাউদকান্দিতে ন্যাপ প্রার্থী রশিদ ইঞ্জিনিয়ারের কাছে খন্দকার মোশতাক আহমেদের শোচনীয় পরাজয় নিশ্চিত জেনে হেলিকপ্টারে করে ব্যালট বাক্স ঢাকায় উড়িয়ে নিয়ে আসা বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসের সবচেয়ে বড় কালো অধ্যায়। শুধু মোশতাকই নন, অলি আহাদ থেকে শুরু করে ড. আলীম আল রাজী কিংবা মেজর জলিল—অনেকেই স্থানীয়ভাবে জয়ী হয়েও রেডিও-টেলিভিশনের ‘ফরমায়েসি’ ঘোষণায় পরাজিত হয়েছেন।

এই যে রাষ্ট্রীয় প্রচারযন্ত্র ব্যবহার করে জয়ী প্রার্থীকে পরাজিত করার কৌশল তা আধুনিক বাংলাদেশের বিতর্কিত নির্বাচনগুলোর ‘মডেল’ হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে। নির্বাচনের পর খোদ প্রধানমন্ত্রীর মুখে “বাংলাদেশে কোনো বিরোধী দল নেই” এমন ঘোষণা মূলত একটি একদলীয় শাসনের পদধ্বনিই ছিল। সেদিন যদি জাতীয় সংসদে অন্তত ৩০-৪০ জন বিরোধী সদস্যকে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হতো, তবে হয়তো বাংলাদেশের সংসদীয় ব্যবস্থা আজ এতটা পঙ্গু হতো না, বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

নির্বাচন পরবর্তী অনিয়ম তুলে ধরে সংবাদ সম্মেলন করে প্রতিবাদ করে বিভিন্ন দল।
“নির্বাচনে স্বচ্ছতা নিয়ে অভিযোগ ছিল কমবেশী সব দলেরই। ৯মার্চ সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচন পরবর্তী প্রতিক্রিয়া জানায় জাসদ। আসম আবদুর রব একটা লিখিত বিবৃতিতে বলেন, বিরোধী দলের প্রার্থীদের পরাজিত হতে বাধ্য করা হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে মেজর জলিল বলেন, তাঁর দলকে পোলিং এজেন্ট দিতে দেওয়া হয়নি। জাল ভোট দেয়া হয়েছে, সন্ত্রাস সৃষ্টি করা হয়েছে এবং নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণায় কারচুপি করা হয়েছে” (গণকণ্ঠ, ১০মার্চ ১৯৭৩;জাসদের উত্থান পতনঃঅস্থির সময়ের রাজনীতি, পৃঃ৯৯)

১০মার্চ কমিউনিস্ট পার্টি বিবৃতিতে বলেন ” কতগুলো আসনে যেখানে আওয়ামীলীগ প্রার্থীরা শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্মুখীন হয়, সেই সকল স্থানে আওয়ামী প্রার্থীদের তরফ হইতে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের পরিপন্থী অগণতান্ত্রিক কার্যকলাপ অনুষ্ঠিত হইয়াছে বলিয়া বহু অভিযোগ রহিয়াছে।”(সংবাদ, ১১মার্চ ১৯৭৩;জাসদের উত্থান পতনঃঅস্থির সময়ের রাজনীতি, পৃঃ ৯৯-১০০)

ন্যাপের সভাপতি অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ ও সম্পাদক পঙ্কজ ভট্টাচার্য ৯মার্চ একটি যৌথ বিবৃতিতে বলেন “কমপক্ষে ৭০টি নির্বাচনী আসনে যেখানে ন্যাপ ও অন্যান্য বিরোধী রাজনৈতিক দলের সুনিশ্চিত বিজয়ের সম্ভাবনা ছিল, সেই আসন সমূহে শাসক দল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার, অস্ত্রের ঝনঝনানি,ভয়ভীতি, সন্ত্রাস প্রয়োগ, গুন্ডাবাহিনী ব্যবহার, ভুয়া ভোট, পোলিং বুথ দখল, পোলিং এজেন্ট অপহরণ, বিদেশী সাহায্য সংস্থা, জাতিসংঘ,সরকারি গাড়ি এবং রেডক্রসের গাড়ির অপব্যবহার প্রভৃতি চরম অগণতান্ত্রিক কার্যকলাপের মাধ্যমে উক্ত নির্বাচনী কেন্দ্রসমূহে নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করিয়াছে এবং বিরোধী দলের প্রার্থীদের জোরপূর্বক পরাজিত করিয়াছে” (সংবাদ, ১০ মার্চ ১৯৭৩; জাসদের উত্থান পতনঃ অস্থির সময়ের রাজনীতি, পৃঃ ৯৯)

গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ বিবিসি বাংলায় দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “স্বাধীনতার পর প্রথম নির্বাচনটি এমনভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হবে তা কেউ ভাবেনি। যে কারণে দেশের নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থাহীনতা সেই শুরু থেকেই জন্ম নিয়েছে”। অথচ তখনকার বাস্তবতা এমন ছিল যে আওয়ামী লীগের অনায়াসে দুইশো আসনে জয়লাভ করে সরকার গঠনের বিষয়টি একেবারেই নিশ্চিত ছিল।

এই লেখকের ভাষ্য, ভোটের দিন এটা যখন স্পষ্ট হতে শুরু করে যে খন্দকার মোশতাক আহমেদ জিতবেন না, তখন ব্যালট পেপার সেখানে গুনতেই দেওয়া হয়নি। সব ব্যালট নিয়ে আসা হয় ঢাকায়। ভোটের পর নির্বাচন কমিশনের আনুষ্ঠানিক ফলাফলে দেখা যায়, খন্দকার মোশতাক আহমেদ ৫২ হাজার ৪১৯ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। আর তার বিপরীতে মি. রশিদের ভোট ছিল ৩৬ হাজার ৬৩০। কুমিল্লার এই আসনের নির্বাচনটি যে কারণে বাংলাদেশের নির্বাচনের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আলোচিত ও সমালোচিত ঘটনা ছিল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তারিক আবেদীন বলেন, ১৯৭৩ সালের সেই জালিয়াতি কেবল সংসদে নয়, সমাজ ও ছাত্রদের মধ্যেও দুর্বৃত্তায়নের বীজ ঢুকিয়ে দিয়েছিল। ডাকসু নির্বাচনে ব্যালট বাক্স ছিনতাই ছিল সেই জাতীয় জালিয়াতিরই একটি ক্ষুদ্র সংস্করণ। ২০১৪/২০১৮/২০১৯/ ২০২৪ এ এসেও তারা ঠিক সেই কাজটি করে যা করেছিল তাদের পূর্ববর্তীরা। এভাবেই যুগ যুগ ধরে তাদের ঐতিহ্য বহন করে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী এ দলটি।

তিনি আরো বলেন, ১৯৭৩ সালের সেই প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনই বাংলাদেশের নির্বাচনী কাঠামোর ওপর মানুষের আস্থাকে প্রথম ধূলিসাৎ করে দেয়। আজকের যে রাজনৈতিক সংকট, মিডিয়া ক্যু আর ভোট চুরির অভিযোগ—তার শেকড় মূলত ৫৩ বছর আগের সেই ৭ই মার্চের মধ্যেই নিহিত। ইতিহাসের এই দায় কোনোভাবেই এড়ানো সম্ভব নয়। গণতন্ত্রকে পুনরুদ্ধার করতে হলে আগে এই আদিপাপ স্বীকার করে সেখান থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি।

নিউজটি শেয়ার করুন

ইতিহাসের কালো অধ্যায়

৭ই মার্চ এবং বাংলাদেশে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর সূচনা

আপডেট সময় ০৯:৫৯:৩২ অপরাহ্ন, শনিবার, ৭ মার্চ ২০২৬

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ৭ই মার্চ একটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করলেও, ১৯৭৩ সালের ৭ই মার্চ দিনটি একইসাথে দেশে নির্বাচনী কারচুপি এবং গণতন্ত্রের স্বপ্নভঙ্গের  এক নেতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবেও চিহ্নিত হয়ে আছে। আজকের বাংলাদেশের যে রাজনৈতিক সংকট এবং নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থাহীনতা, তার বীজ বপন করা হয়েছিল মূলত সেই ৭৩-এর প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমেই। যে দলটির হাত ধরে স্বাধীনতা এসেছিল, সেই দলটির হাতেই স্বাধীন দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা প্রথম কলঙ্কিত হয়েছিল। যার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন খোদ শেখ মুজিবুর রহমান।

স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত জাতীয় সংসদের ১৩টি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে হাতে গোনা কয়েকটি নির্বাচন বাদে বেশিরভাগ নির্বাচন নিয়েই ছিল নানা প্রশ্ন, যা থেকে বাদ যায়নি বাংলাদেশের প্রথম সংসদ নির্বাচনও। স্বাধীনতার পর প্রথম নির্বাচনে ব্যপক অনিয়মের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসে। সেসময় প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন শেখ মুজিবর রহমান। ৭৩ সালের নির্বাচনে আওয়ামিলীগের পরাজিত হবার সম্ভাবনা ছিলনা কিন্তু তারপরও ব্যপক অনিয়ম মাধ্যমে সিংহভাগ সিট দখল করে দলটি। অনিয়মের সেই নির্বাচনে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নকে ধুলিস্যাৎ করে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার বীজ বপন করে। আজকের রাজনৈতিক সংকটের বীজও তার মধ্য নিহিত ছিল।

ঐতিহাসিক তথ্য ও দলিলাদি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আওয়ামী লীগের সেই নির্বাচনে কারচুপির কোনো যৌক্তিক প্রয়োজন ছিল না। শেখ মুজিবুর রহমানের বিশাল ব্যক্তিত্ব ও আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার জোয়ারে নৌকা প্রতীক এমনিতেই দুই-তৃতীয়াংশ আসন পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু নিরঙ্কুশ ক্ষমতার মোহ এবং বিরোধী দলগুলোকে সহ্য না করার মানসিকতা আওয়ামী লীগকে এক নজিরবিহীন জালিয়াতির পথে পরিচালিত করে।

গবেষক মহিউদ্দিন আহমদের ভাষায়, সেই নির্বাচনে পরাজয়ের ভয় নয়, বরং ‘বিরোধীদের অস্তিত্ব মুছে ফেলার’ এক সর্বগ্রাসী বাসনা শাসকদলের মধ্যে কাজ করেছিল। কনফিডেন্সহীনতার জন্য আওয়ামিলীগ নির্বাচনে অনিয়ম নীতিতে পরিণত করেছিল। বিরোধীদের নির্বাচন নিয়ে অতিরিক্ত উচ্ছসিত এবং আওয়ামিলীগের অতি আস্থাহীনতাই আওয়ামীলীগকে ম্যানেজড নির্বাচনের দিকে নিয়ে যায়।

সেই নির্বাচনে ভোট কারচুপির কৌশলগুলো ছিল আঁতকে ওঠার মতো। প্রথমত, প্রশাসনিক ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে মনোনয়নপত্র দাখিলে বাধা দেওয়া এবং অপহরণের মতো ঘটনা ঘটেছিল। ভোলার জনপ্রিয় নেতা ডা. আজহারউদ্দিনকে অপহরণ করে তোফায়েল আহমেদের আসনটি ‘পরিষ্কার’ করা কিংবা রাজশাহীর এইচএম কামরুজ্জামান ও ময়মনসিংহের রফিকউদ্দিন ভূঞাদের মাধ্যমে বিরোধী প্রার্থীদের মনোনয়ন প্রত্যাহারে বাধ্য করা ছিল সেই ইঞ্জিনিয়ারিংয়েরই অংশ।

হালিম দাদ খান তার “বাংলাদেশের রাজনীতি” বইয়ের ৪৭ নং পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেন ‘রাজশাহীর এইচএম কামরুজ্জামান, ময়মনসিংয়ের রফিকউদ্দিন ভূঞা, কিশোরগঞ্জের সৈয়দ নজরুল ইসলাম, জিল্লুর রহমান ও মনোরঞ্জন ধর বিরোধীপ্রার্থীদের মনোনয়ন প্রত্যাহারে বাধ্য করেন। মাগুরার সোহরাব হোসেন, ফরিদপুরের কেএম ওবায়দুর রহমান, মোতাহার উদ্দিন আহমেদ বিরোধীপ্রার্থীদের মনোনয়ন জমা দিতে দেননি। বিরোধী প্রার্থীকে মনোনয়ন জমা দিতে দেননি ভোলার তোফায়েল আহমেদ।

বইয়ের ৪৩ নং পৃষ্ঠায় বলা হয়, “টাঙ্গাইলের মন্ত্রী আবদুল মান্নান ভাসানী ন্যাপের ড.আলীম আল রাজীর কাছে,বরিশালের হরনাথ বাইন ও আবদুল মান্নান জাসদের মেজর জলিলের কাছে (দুটি আসনে),ক্যাপ্টেন সুজাত আলী অধ্যাপক মোজাফর আহমেদের কাছে পরাজিত হয়েও জয়ী হয়েছেন বলে দেশবাসী মনে করে।।শেখ মুজিব পাশের আসন থেকে কম ভোটে জয়ী হলে সেটা মুজিবের জন্য সম্মানহানি হবে মনে করে প্রাপ্ত ভোট ১লাখ ৫হাজার থেকে বাড়িয়ে ১লাখ ১৪ হাজার ঘোষণা করা হয়।“

মনোনয়ন প্রত্যাহারে বাধ্য করে এমন দুজন সৈয়দ নজরুল ইসলাম প্রবাসী সরকারের উপ রাষ্ট্রপতি ও কামরুজ্জামান স্বরাষ্ট্র, কৃষি,ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু এ ব্যক্তিরাই যাদেরকে জাতীয় চার নেতা হিসেবে ধরা হয় তারাই প্রার্থীদের ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে মনোনয়ন প্রত্যাহারে বাধ্য করেন। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন “১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত যারা মুক্তিযোদ্ধা ছিল-দেশ স্বাধীন করতে প্রাণ দেয়ার জন্য সদা প্রস্তুত থাকতো তারাই ১৬ডিসেম্বরে লুটপাটকারীতে পরিণত হয়”। খান আতাউর তাঁর ‘আবার তোরা মানুষ হ’ ছবিতে সে বিষয়টিই দেখিয়েছেন। এ কারণে ছবিটি ব্যান করা হয়।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক আব্দুল লতিফ মাসুম বিবিসি বাংলার সাক্ষাৎকারে বলেন, পেশায় চিকিৎসক আজহার উদ্দিন বিনা পয়সায় মানুষকে চিকিৎসা সেবা দিতেন। তিনি পাকিস্তান জাতীয় পরিষদেরও সদস্য ছিলেন। ওই এলাকায় জাসদ এতটাই জনপ্রিয় ছিল যে তাকে হারানোর মতো কোনো প্রার্থী ওই অঞ্চলে ছিল না। তখন আজহার সাহেবকে হারানোর জন্য তিনটি আসনের বাইরে বাকেরগঞ্জ ৪ আসনেও প্রার্থী হয়েছিলেন শেখ মুজিব। কিন্তু আজহার সাহেব যাতে শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে না পারেন সে কারণে মনোনয়ন দাখিলের দিন হাইজ্যাক করা হয়েছিল আজহার সাহেবকে।

“জাসদের উত্থান পতনঃ অস্থির সময়ের রাজনীতি” বইয়ের ৪৭ নং পৃষ্ঠায় বলা হয়, “
তোফায়েল আহমেদ ৪৫ বছর পর এবারও ভোলার তাঁর আসনের সবগুলো কেন্দ্র দখল করে নেন। ভোলায় আরেকটি আসনে মনোনয়ন জমা দেয়ার কথা ছিল ডাঃ আজহার উদ্দিনের। তিনি ১৯৭০ সালের নির্বাচনে জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। মনোনয়ন জমা দেয়ার আগে তাঁকে অপহরণ করায় তাঁর মনোনয়ন জমা পড়েনি। ফলে ঐ আসনে আওয়ামিলীগের প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় লাভ করে।“

অলি আহাদ তাঁর “জাতীয় রাজনীতি “বইয়ের ৪৬৪ পৃষ্ঠায় লেখেন “১৯৭৩ এর মার্চের এই সাধারণ নির্বাচনে প্রশাসনিক ক্ষমতার মারাত্মক অব্যবহার, চরম দূর্ণীতির আশ্রয় গ্রহণ, মিডিয়া ক্যু, দলীয় বাহিনীর যথেচ্ছ আগ্রেয়াস্ত্র ব্যবহার ও ঢালাও হুমকির সহায়তায় প্রধানমন্ত্রী ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৯২ টি দখল করেন। এছাড়া বেসরকারিভাবে বিজয়ী ঘোষণা করা চট্টগ্রামে (২৯৪ নং আসন) ন্যাপের প্রার্থী মোশতাক আহমদ চৌধুরীরিকেও ১০মার্চ বেতারে পরাজিত ঘোষণা করা হয়।

দ্বিতীয়ত, ব্যালট বাক্স ছিনতাই এবং ‘মিডিয়া ক্যু’র মাধ্যমে মাঠের ফলাফল বদলে দেওয়ার এক জঘন্য সংস্কৃতি সেদিন থেকেই শুরু হয়। কুমিল্লার দাউদকান্দিতে ন্যাপ প্রার্থী রশিদ ইঞ্জিনিয়ারের কাছে খন্দকার মোশতাক আহমেদের শোচনীয় পরাজয় নিশ্চিত জেনে হেলিকপ্টারে করে ব্যালট বাক্স ঢাকায় উড়িয়ে নিয়ে আসা বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসের সবচেয়ে বড় কালো অধ্যায়। শুধু মোশতাকই নন, অলি আহাদ থেকে শুরু করে ড. আলীম আল রাজী কিংবা মেজর জলিল—অনেকেই স্থানীয়ভাবে জয়ী হয়েও রেডিও-টেলিভিশনের ‘ফরমায়েসি’ ঘোষণায় পরাজিত হয়েছেন।

এই যে রাষ্ট্রীয় প্রচারযন্ত্র ব্যবহার করে জয়ী প্রার্থীকে পরাজিত করার কৌশল তা আধুনিক বাংলাদেশের বিতর্কিত নির্বাচনগুলোর ‘মডেল’ হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে। নির্বাচনের পর খোদ প্রধানমন্ত্রীর মুখে “বাংলাদেশে কোনো বিরোধী দল নেই” এমন ঘোষণা মূলত একটি একদলীয় শাসনের পদধ্বনিই ছিল। সেদিন যদি জাতীয় সংসদে অন্তত ৩০-৪০ জন বিরোধী সদস্যকে প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হতো, তবে হয়তো বাংলাদেশের সংসদীয় ব্যবস্থা আজ এতটা পঙ্গু হতো না, বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

নির্বাচন পরবর্তী অনিয়ম তুলে ধরে সংবাদ সম্মেলন করে প্রতিবাদ করে বিভিন্ন দল।
“নির্বাচনে স্বচ্ছতা নিয়ে অভিযোগ ছিল কমবেশী সব দলেরই। ৯মার্চ সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচন পরবর্তী প্রতিক্রিয়া জানায় জাসদ। আসম আবদুর রব একটা লিখিত বিবৃতিতে বলেন, বিরোধী দলের প্রার্থীদের পরাজিত হতে বাধ্য করা হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে মেজর জলিল বলেন, তাঁর দলকে পোলিং এজেন্ট দিতে দেওয়া হয়নি। জাল ভোট দেয়া হয়েছে, সন্ত্রাস সৃষ্টি করা হয়েছে এবং নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণায় কারচুপি করা হয়েছে” (গণকণ্ঠ, ১০মার্চ ১৯৭৩;জাসদের উত্থান পতনঃঅস্থির সময়ের রাজনীতি, পৃঃ৯৯)

১০মার্চ কমিউনিস্ট পার্টি বিবৃতিতে বলেন ” কতগুলো আসনে যেখানে আওয়ামীলীগ প্রার্থীরা শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্মুখীন হয়, সেই সকল স্থানে আওয়ামী প্রার্থীদের তরফ হইতে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের পরিপন্থী অগণতান্ত্রিক কার্যকলাপ অনুষ্ঠিত হইয়াছে বলিয়া বহু অভিযোগ রহিয়াছে।”(সংবাদ, ১১মার্চ ১৯৭৩;জাসদের উত্থান পতনঃঅস্থির সময়ের রাজনীতি, পৃঃ ৯৯-১০০)

ন্যাপের সভাপতি অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ ও সম্পাদক পঙ্কজ ভট্টাচার্য ৯মার্চ একটি যৌথ বিবৃতিতে বলেন “কমপক্ষে ৭০টি নির্বাচনী আসনে যেখানে ন্যাপ ও অন্যান্য বিরোধী রাজনৈতিক দলের সুনিশ্চিত বিজয়ের সম্ভাবনা ছিল, সেই আসন সমূহে শাসক দল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার, অস্ত্রের ঝনঝনানি,ভয়ভীতি, সন্ত্রাস প্রয়োগ, গুন্ডাবাহিনী ব্যবহার, ভুয়া ভোট, পোলিং বুথ দখল, পোলিং এজেন্ট অপহরণ, বিদেশী সাহায্য সংস্থা, জাতিসংঘ,সরকারি গাড়ি এবং রেডক্রসের গাড়ির অপব্যবহার প্রভৃতি চরম অগণতান্ত্রিক কার্যকলাপের মাধ্যমে উক্ত নির্বাচনী কেন্দ্রসমূহে নির্বাচনকে প্রহসনে পরিণত করিয়াছে এবং বিরোধী দলের প্রার্থীদের জোরপূর্বক পরাজিত করিয়াছে” (সংবাদ, ১০ মার্চ ১৯৭৩; জাসদের উত্থান পতনঃ অস্থির সময়ের রাজনীতি, পৃঃ ৯৯)

গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ বিবিসি বাংলায় দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “স্বাধীনতার পর প্রথম নির্বাচনটি এমনভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হবে তা কেউ ভাবেনি। যে কারণে দেশের নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থাহীনতা সেই শুরু থেকেই জন্ম নিয়েছে”। অথচ তখনকার বাস্তবতা এমন ছিল যে আওয়ামী লীগের অনায়াসে দুইশো আসনে জয়লাভ করে সরকার গঠনের বিষয়টি একেবারেই নিশ্চিত ছিল।

এই লেখকের ভাষ্য, ভোটের দিন এটা যখন স্পষ্ট হতে শুরু করে যে খন্দকার মোশতাক আহমেদ জিতবেন না, তখন ব্যালট পেপার সেখানে গুনতেই দেওয়া হয়নি। সব ব্যালট নিয়ে আসা হয় ঢাকায়। ভোটের পর নির্বাচন কমিশনের আনুষ্ঠানিক ফলাফলে দেখা যায়, খন্দকার মোশতাক আহমেদ ৫২ হাজার ৪১৯ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। আর তার বিপরীতে মি. রশিদের ভোট ছিল ৩৬ হাজার ৬৩০। কুমিল্লার এই আসনের নির্বাচনটি যে কারণে বাংলাদেশের নির্বাচনের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আলোচিত ও সমালোচিত ঘটনা ছিল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তারিক আবেদীন বলেন, ১৯৭৩ সালের সেই জালিয়াতি কেবল সংসদে নয়, সমাজ ও ছাত্রদের মধ্যেও দুর্বৃত্তায়নের বীজ ঢুকিয়ে দিয়েছিল। ডাকসু নির্বাচনে ব্যালট বাক্স ছিনতাই ছিল সেই জাতীয় জালিয়াতিরই একটি ক্ষুদ্র সংস্করণ। ২০১৪/২০১৮/২০১৯/ ২০২৪ এ এসেও তারা ঠিক সেই কাজটি করে যা করেছিল তাদের পূর্ববর্তীরা। এভাবেই যুগ যুগ ধরে তাদের ঐতিহ্য বহন করে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী এ দলটি।

তিনি আরো বলেন, ১৯৭৩ সালের সেই প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনই বাংলাদেশের নির্বাচনী কাঠামোর ওপর মানুষের আস্থাকে প্রথম ধূলিসাৎ করে দেয়। আজকের যে রাজনৈতিক সংকট, মিডিয়া ক্যু আর ভোট চুরির অভিযোগ—তার শেকড় মূলত ৫৩ বছর আগের সেই ৭ই মার্চের মধ্যেই নিহিত। ইতিহাসের এই দায় কোনোভাবেই এড়ানো সম্ভব নয়। গণতন্ত্রকে পুনরুদ্ধার করতে হলে আগে এই আদিপাপ স্বীকার করে সেখান থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি।