ঢাকায় ভূমিকম্পে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য চিহ্নিত ৪৪৫ স্থান
- আপডেট সময় ০৫:১৬:২২ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬
- / ২৭ বার পড়া হয়েছে
রাজধানী ঢাকায় ভূমিকম্পসহ নগর দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রস্তুতি জোরদার করার অংশ হিসেবে ৪৪৫টি নিরাপদ আশ্রয়স্থল চিহ্নিত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এগুলোকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণার প্রক্রিয়াও এগিয়ে নিচ্ছে, যদিও চূড়ান্ত অনুমোদন এখনো প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পর্যায়ে বিবেচনাধীন রয়েছে।
সংসদে মঙ্গলবার এক প্রশ্নোত্তর পর্বে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু জানান, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের বিভিন্ন ওয়ার্ডে এসব স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে দক্ষিণ সিটিতে রয়েছে ২৫৬টি এবং উত্তরে ১৮৯টি আশ্রয়স্থল।
তিনি আরও জানান, বড় ধরনের দুর্যোগের পর দ্রুত উদ্ধার ও সমন্বিত সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ঢাকা মহানগর ও আশপাশ এলাকায় প্রায় এক লাখ স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তুতের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থার তথ্য একত্র করে একটি সমন্বিত ডেটাবেইস তৈরির কাজও চলছে, যা জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সমন্বয় সহজ করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ভূপ্রকৃতিগত অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ ভূমিকম্প ও সুনামির ঝুঁকির বাইরে নয়—এ বাস্তবতা বিবেচনায় সরকার আগাম প্রস্তুতিকে গুরুত্ব দিচ্ছে। এ প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর ও ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের সমন্বয়ে পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা হয়েছে বলে মন্ত্রী জানান।
এছাড়া ভবিষ্যতের নির্মাণকাজে ভূমিকম্প সহনশীলতা নিশ্চিত করতে জাতীয় বিল্ডিং কোড কঠোরভাবে অনুসরণের বিষয়টিও বিশেষভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে, যদিও মাঠপর্যায়ে এর বাস্তবায়ন কতটা কার্যকর হবে—তা সময়ই নির্ধারণ করবে।
ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে ঢাকা শহরের কোন এলাকাকে তুলনামূলক নিরাপদ বলা যায়—এ প্রশ্নের সরাসরি উত্তর নেই বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, কোনো এলাকার নিরাপত্তা নির্ভর করে মূলত ভূতাত্ত্বিক গঠন ও ভবনের কাঠামোগত মানের ওপর। যদিও শক্ত মধুপুরের লাল মাটির ওপর গড়ে ওঠা কিছু এলাকা তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে, তবুও ভবনের নির্মাণমান ও দুর্যোগ-পরবর্তী উদ্ধার ব্যবস্থাই শেষ পর্যন্ত ঝুঁকির মাত্রা নির্ধারণ করে।
কোন এলাকা কতটুকু নিরাপদ তা বুঝতে হলে দুটি দিকে নজর দিতে হবে বলে জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
এক. শহরের ভূতাত্ত্বিক গঠন। দুই. শহরের অবকাঠামো।
এর আগে ভূতত্ত্ববিদ সৈয়দ হুমায়ুন আখতার ভূতাত্ত্বিক বিষয়টিকে বর্ণনা করেছেন এভাবে, ঢাকা ও এর আশেপাশের এলাকার ভূতাত্ত্বিক গঠন প্রায় একই। বেশিরভাগ অংশ, বিশেষ করে উত্তর দিকের মাটি মধুপুরের লাল মাটি। যেটি বেশ শক্ত।
কিন্তু মোঘল আমল থেকে শুরু করে ব্রিটিশ পিরিয়ড, পাকিস্তান আমল এবং স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে উত্তর দিকে এবং বুড়িগঙ্গা নদীকে কেন্দ্র করে শহর খুব দ্রুত সম্প্রসারিত হয়। তখন এই লাল মাটি ‘অকুপাইড’ হয়ে যায়। এরপর শহর বাড়তে শুরু করে পূর্ব-পশ্চিমে। সেখানে নরম পলিমাটি এবং জলাশয় ছিল যা ভরাট করা হয়েছে।
আখতার জানান, শুধু যদি ভূতাত্ত্বিক গঠন বিবেচনা করা হয়, তাহলে মধুপুরের লাল মাটির একই গড়নের যেসব এলাকা রয়েছে যেমন— রমনা, মগবাজার, নিউমার্কেট, লালমাটিয়া, খিলগাঁও, মতিঝিল, ধানমন্ডি, লালবাগ, মিরপুর, গুলশান, তেজগাঁও ইত্যাদি এলাকা তুলনামূলকভাবে নিরাপদ। কিন্তু শুধু ভূতাত্ত্বিক গঠনের ওপর ঢাকার বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নির্ভর করছে না।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারী এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘ঢাকার কোন এলাকা নিরাপদ, কোনটি নয়- এটা বলা মুশকিল। যতক্ষণ না ভবনগুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে, ততক্ষণ বলা যাবে না কোনটা ঝুঁকিপূর্ণ বা ঝুঁকিমুক্ত।’
আনসারীর মতে, আপাতদৃষ্টিতে পুরান ঢাকাকে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ মনে হলেও, নতুন ঢাকা ও পুরান ঢাকার মধ্যে পার্থক্য একটাই। তা হলো পুরান ঢাকার সরু রাস্তা। রাস্তাগুলো সরু হওয়ায় দুর্যোগের সময় মানুষকে দ্রুত সরানো কঠিন হতে পারে।
তিনি এটাও মনে করিয়ে দেন যে পুরনো কিছু ভবন শত বছরেরও বেশি সময় ধরে টিকে আছে। কোনো ভূমিকম্পেও ভেঙে পড়েনি। তাই কাঠামোর মানই বেশি গুরুত্ব পায়।
ঢাকার বিপদ ‘ব্লাইন্ড ফল্ট’
ঢাকার ভেতরে কোনো ফল্ট লাইন নেই। তবে বাংলাদেশের ফল্ট লাইন বা চ্যুতি রেখার জন্য পাঁচটি জায়গা পরিচিত। মিয়ানমার থেকে নোয়াখালী, যাকে বলে প্লেট বাউন্ডারি এক। সেখানে ১৭৬২ সালে আট দশমিক পাঁচ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে।
আরেকটা আছে প্লেট বাউন্ডারি দুই। যেটা নরসিংদীর ওপর দিয়ে চলে গেছে, অতীতে এখানে সাত মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে।
এরপরে প্লেট বাউন্ডারি তিন, যেটা সিলেট থেকে ইন্ডিয়ার দিকে চলে গেছে, এখানে ১৯১৮ এবং ১৯৬৯ সালে সাত দশমিক পাঁচ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে। আর আছে ডাউকি ফল্ট যেখানে ১৮৯৭ সালে আট দশমিক এক মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে। সবশেষ আছে মধুপুর ফল্ট যেখানে ১৮৮৫ সালে সাত দশমিক এক মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে।
গবেষকদের মতে, এগুলোর কিছু জায়গায় ৩৫০ বছর, আবার কিছু জায়গায় ৯০০ বছরের মতো সময় পরে বড় ভূমিকম্প হতে পারে।
তবে এর বাইরেও কিছু ফল্ট লাইন আছে, যেগুলোকে বলে ‘ব্লাইন্ড ফল্ট’। ব্লাউন্ড ফল্ট হলো এমন ধরনের ফল্ট যা ভূ-পৃষ্ঠ পর্যন্ত পৌঁছায় না। তাই ভূ-পৃষ্ঠে কোনো চিহ্ন না থাকায় সাধারণ ভূতাত্ত্বিক মানচিত্রে এটি দেখা যায় না বা শনাক্ত করা কঠিন হয়। এই ধরনের ফল্ট বিপজ্জনক।
বাংলাদেশে দুটো চিহ্নিত ব্লাইন্ড ফল্ট আছে। একটি ময়মনসিংহে, অন্যটি রংপুরে। যেহেতু এই ফল্ট লাইনগুলো শনাক্ত করা কঠিন তাই কোনো সতর্কবার্তাও পাওয়া যায় না। ঢাকার জন্য বিপজ্জনক হতে পারে এই ব্লাইন্ড ফল্টগুলো।
সূত্র: বিবিসি বাংলা।




















