বিবিসির বিশ্লেষণ
চীনের দিকে ঝুঁকছে বাংলাদেশ
- আপডেট সময় ০৩:১২:০২ অপরাহ্ন, সোমবার, ৬ জুলাই ২০২৬
- / ১৬ বার পড়া হয়েছে
অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করতে চীনের বড় বিনিয়োগ ও অংশীদারিত্ব চাইছে বাংলাদেশের নতুন সরকার। একই সঙ্গে তারা প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গেও সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করছে।
গত মাসে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়া ও চীনে যান। এই সফর ঢাকার পররাষ্ট্রনীতির নতুন দিক নির্দেশ করে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই সফর ঢাকার কৌশলগত অগ্রাধিকার পরিবর্তনের আভাস দেয়। প্রথম সফর মালয়েশিয়ায় হলেও চীনের সফরটিকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে।
সাধারণত দক্ষিণ এশিয়ার নতুন নির্বাচিত নেতারা প্রথমে ভারতে সফরে যান। তারেক রহমানের চীন সফরকে দিল্লির জন্য একটি বার্তা হিসেবে দেখছেন ভারতের কেউ কেউ। দিল্লি বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত নেত্রী শেখ হাসিনার সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছিল।
প্রধানমন্ত্রীর বেইজিং সফরে বেশ কিছু দ্বিপক্ষীয় চুক্তি সই হয়েছে। এর মধ্যে তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা এবং মংলা বন্দরের কাছে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়ন চুক্তিটি বিশেষ নজর কেড়েছে। বাংলাদেশে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় থাকা ভারত ও চীন উভয় দেশই এই বিষয়গুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
২০২৪ সালের আগস্টে গণ-অভ্যুত্থানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর ঢাকা ও দিল্লির সম্পর্ক শীতল হয়। শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে দিল্লিতে আশ্রয় নেন। এরপর ডা. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও কূটনৈতিক সম্পর্কে টানাপোড়েন ছিল। ভারত তখন উচ্চপর্যায়ের সফর এড়িয়ে চলে।
গত ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নিরঙ্কুশ জয় পায়। এরপর তারেক রহমান দায়িত্ব নিলে উভয় পক্ষই সম্পর্ক পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেয়। ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব শ্যাম শরণ বিবিসিকে বলেন, ‘দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা কিছুটা কমেছে এতে কোনো সন্দেহ নেই।’
তিনি জানান, সীমান্ত অর্থনৈতিক কার্যক্রম স্বাভাবিক হচ্ছে এবং ভারত বাংলাদেশিদের ট্যুরিস্ট ভিসা দিচ্ছে।
১৮ মাস বন্ধ থাকার পরে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বাস চলাচল আংশিক শুরু হয়েছে। এখন কলকাতা-ঢাকা এবং ঢাকা-আগরতলা রুটে বাস চলছে। চলতি বছরের শুরুতে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হয়। তখন ভারত ‘ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইন’ দিয়ে বাংলাদেশে হাজার হাজার টন জরুরি জ্বালানি পাঠায়।
গত মাসে ঢাকায় ভারতের নতুন হাইকমিশনার হিসেবে দিনেশ ত্রিবেদী দায়িত্ব নিয়েছেন। দিল্লি তাকে ক্যাবিনেট পদমর্যাদা দিয়েছে, যা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদারের ইঙ্গিত দেয়। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা থাকলেও গত বছর দুই দেশের বাণিজ্য ছিল প্রায় ১৩ বিলিয়ন পাউন্ড। এই বাণিজ্য মূলত ভারতের পক্ষে ছিল।
তবে ঢাকা ও দিল্লির সম্পর্ক যতটা আশা করা হয়েছিল, ততটা সহজ হয়নি। সম্পর্কে এখনো কিছু অস্বস্তি রয়ে গেছে। শেখ হাসিনাকে সমর্থনের কারণে বাংলাদেশে ভারত-বিরোধী মনোভাব তৈরি হয়েছে। এছাড়া ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) যাদের অবৈধ অভিবাসী মনে করে, তাদের বাংলাদেশে পুশ-ইন করার চেষ্টা করছে। এটি ঢাকায় বিতর্ক ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
বাংলাদেশি কর্মকর্তারা বলেন, কোনো আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া ছাড়াই ভারত সাম্প্রতিক বছরগুলোতে হাজার হাজার বাংলাভাষী মুসলিমকে পুশ-ইন করেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য নির্বাচনের সময় হিন্দু-জাতীয়তাবাদী নেতাদের বাংলাদেশ-বিরোধী মন্তব্য ঢাকায় নেতিবাচক বার্তা দিয়েছে।
সাবেক কূটনীতিক হুমায়ুন কবির বলেন, ‘এসব বিষয় বাংলাদেশে জনঅসন্তোষ তৈরি করেছে, যা ঢাকার চিন্তাভাবনায় প্রভাব ফেলেছে।’
গত মে মাসে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির কাছে তৃণমূল কংগ্রেস পরাজিত হয়। এর ফলে সীমান্তে অবস্থিত এই রাজ্যে তৃণমূলের ১৬ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। পশ্চিমবঙ্গের সাথে বাংলাদেশের ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক মিল রয়েছে।
তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনায় চীনের যেকোনো ভূমিকা ভারতের জন্য একটি সংবেদনশীল নিরাপত্তা ইস্যু। ভারত ও বাংলাদেশ এই নদীর পানি শেয়ার করে। তবে পানি বণ্টন চুক্তিটি বছরের পর বছর ধরে ঝুলে আছে। তারেক রহমানের বেইজিং সফরের সময় দুই পক্ষ তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনায় যৌথ কারিগরি সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করতে সম্মত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃষিকাজের জন্য নদীটির ড্রেজিং ও নাব্যতা ফেরানো প্রয়োজন।
শ্যাম শরণ বলেন, ‘আমাদের সীমান্তের কাছে যেকোনো প্রকল্পে চীনের সম্পৃক্ততা সবসময় উদ্বেগের বিষয়। আমরা এটিকে মোটেও স্বাগত জানাব না।’
ভারত ও চীনের মধ্যেও সীমান্ত বিরোধ রয়েছে। ১৯৬২ সালের যুদ্ধে ভারতের পরাজয় হয়েছিল। সাম্প্রতিক সীমান্ত সংঘর্ষেও উভয় পক্ষের প্রাণহানি হয়েছে।
এই প্রকল্পে চীনের ভূমিকা ভারতকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘শিলিগুড়ি করিডোর’ বা ‘চিকেনস নেক’-এর কাছাকাছি নিয়ে আসবে। এই ২২ কিলোমিটারের স্ট্রিপটি ভারতের মূল ভূখণ্ডের সাথে উত্তর-পূর্বের সাতটি রাজ্যকে যুক্ত করেছে।
বাংলাদেশি কর্মকর্তারা বলছেন, আগের সরকারগুলো ভারতকে তিস্তা প্রকল্পে যোগ দিতে বলেছিল। কিন্তু দিল্লি সিদ্ধান্ত নিতে দীর্ঘ সময় নেয়।
তাদের মতে, চীনের এই বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা ও আর্থিক সম্পদ রয়েছে।
তবে বেইজিং ভারতের উদ্বেগ কমানোর চেষ্টা করেছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন বেইজিংয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘চীন-বাংলাদেশ সহযোগিতা কোনো তৃতীয় পক্ষকে লক্ষ্য করে নয়। এটি তৃতীয় পক্ষের প্রভাব থেকে মুক্ত থাকা উচিত।’
চীন ইতোমধ্যে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা সরবরাহকারী দেশ। বাংলাদেশের মোট অস্ত্র আমদানির ৭০ শতাংশের বেশি আসে চীন থেকে। বেইজিংয়ের কাছে ঢাকার দেনা ৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি। সফরকালে চীন ‘চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর’ উন্নয়নের প্রস্তাব দিয়েছে। এটি চীনের ইউনান প্রদেশকে দুই দেশের সাথে যুক্ত করবে।
ভারত দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ এশিয়াকে নিজের প্রভাব বলয় মনে করে। তবে চীন বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপে তার অবস্থান বাড়িয়েছে। নতুন সরকারের সাথে ভারতের সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের প্রচেষ্টা জটিল হচ্ছে শেখ হাসিনার দিল্লিতে অবস্থানের কারণে। ঢাকা তার প্রত্যর্পণ চাইছে। ছাত্র আন্দোলনে শত শত মানুষের মৃত্যুর ঘটনায় শেখ হাসিনাকে ট্রাইব্যুনাল মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে।
শ্যাম শরণ বলেন, ‘যতদিন হাসিনা দিল্লিতে আছেন, রাজনৈতিক কারণে তারেক রহমানের ভারত সফর কিছুটা কঠিন হতে পারে।’
তবে কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন, ভারত বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রতিবেশী। তাই তারেক রহমান দিল্লি সফর করতে পারেন। ভারতও জানে যে, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য বাংলাদেশের সাথে স্থিতিশীল সম্পর্ক জরুরি। সেখানে বেশ কয়েকটি জাতিগত বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে।
সূত্র: বিবিসি



















