ঢাকা ০৮:৪১ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬, ৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

বিএনপি সরকারের ৬ মাসে বেড়েছে হত্যা, নারী ও শিশু নির্যাতন

স্টাফ রিপোর্টার
  • আপডেট সময় ০৬:৩৪:৪৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬
  • / ৩০ বার পড়া হয়েছে
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শেষ ছয় মাসের তুলনায় ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাসে চুরি, ডাকাতি ও অপহরণের মতো অপরাধ কিছুটা কমলেও খুন, দাঙ্গা এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের মতো অপরাধ বেড়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের অপরাধ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা গেছে এ চিত্র। নিউজ দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের
যদিও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে। তবে মানবাধিকারকর্মী ও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আত্মতুষ্টিতে না ভুগে এসব পরিসংখ্যানকে সতর্কবার্তা হিসেবে নিয়ে পরিস্থিতির উন্নয়নে সরকারের উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
দীর্ঘ ১৭ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকার পর চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয় বিএনপি। ওই মাসের ১৭ তারিখ জাতীয় সংসদ ভবনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ অন্যান্য সংসদ সদস্য শপথ নেন।
সরকার গঠনের পর দলটির অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা। সরকার গঠনের পর ১৮ ফেব্রুয়ারি জাতির উদ্দেশে দেওয়া প্রথম ভাষণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছিলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং কঠোরভাবে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জনগণের মনে শান্তি ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনাই বিএনপি সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার।
এরই মধ্যে দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম ছয় মাস পার করেছে বিএনপি সরকার। এ সময়ে মাদক, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বিভিন্ন বিশেষ অভিযান চালানো হয়েছে। তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কতটা উন্নতি হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ছয় মাসে দেশে ছোট-বড় অপরাধ মিলিয়ে মোট ৯৯ হাজার ৯৯২টি মামলা হয়েছে। এর আগে ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত এ সংখ্যা ছিল ৮৯ হাজার ১২টি। অর্থাৎ, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শেষ ছয় মাসের তুলনায় বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাসে সারাদেশে মোট মামলার সংখ্যা বেড়েছে ১০ হাজার ৯৮০টি।
পুলিশের পরিসংখ্যান বলছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শেষ ছয় মাসের তুলনায় বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাসে ডাকাতি, দস্যুতা, চুরি ও অপহরণের মামলা কমেছে। ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত দেশে ডাকাতির মামলা হয়েছে ৩২৮টি, দস্যুতার ৯৬০টি, দ্রুত বিচারসংক্রান্ত ৪৬০টি, অপহরণের ৫৬৩টি, সিঁধেল চুরির ১ হাজার ৬৫৯টি এবং সাধারণ চুরির মামলা হয়েছে ৫ হাজার ১১৩টি।
অন্যদিকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ডাকাতির মামলা হয়েছে ২৫৬টি, দস্যুতার ৯০৪টি, দ্রুত বিচারসংক্রান্ত ৪০৫টি, অপহরণের ৫১২টি, সিঁধেল চুরির ১ হাজার ৫৯১টি এবং সাধারণ চুরির মামলা হয়েছে ৪ হাজার ৮০৮টি।
তবে একই সময়ে খুন, দাঙ্গা, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা বেড়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত সারাদেশে ১ হাজার ৭৮০টি হত্যা মামলা রেকর্ড করা হয়। এর মধ্যে ১৭৮টি হত্যাকাণ্ড এর আগে সংঘটিত হয়েছিল।
অন্যদিকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সারাদেশে ১ হাজার ৭৮৯টি হত্যা মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। অর্থাৎ, বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাসে দিনে গড়ে প্রায় ১০টি হত্যা মামলা রেকর্ড হয়েছে।
এছাড়া বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাসে সারাদেশে ১৩টি দাঙ্গার ঘটনা ঘটেছে, যা আগের ছয় মাসে ছিল ১০টি। নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলাও বেড়েছে। বিএনপি সরকার গঠনের আগের ছয় মাসে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় ১০ হাজার ৯০টি মামলা হয়েছিল। সরকার গঠনের পরের ছয় মাসে তা বেড়ে ১১ হাজার ১৬৫টিতে দাঁড়িয়েছে।
পুলিশের ওপর হামলার ঘটনাও বেড়েছে। আগের ছয় মাসে এ ধরনের ২৭৫টি ঘটনা ঘটলেও পরের ছয় মাসে তা বেড়ে ৩১৭টিতে দাঁড়িয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাসে ঢাকা, খুলনা ও সিলেট মেট্রোপলিটন এলাকা এবং রেলওয়ে রেঞ্জে অপরাধ কমেছে। অন্যদিকে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, রংপুর, বরিশাল, ময়মনসিংহ ও সিলেট রেঞ্জ এবং গাজীপুর, রংপুর, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও বরিশাল মেট্রোপলিটন এলাকায় অপরাধ বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সব মিলিয়ে বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চিত্র একমুখী নয়। প্রচলিত ছোটখাটো অপরাধের কিছু ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণের ইঙ্গিত থাকলেও খুন, নারী ও শিশু নির্যাতন, মব সহিংসতা ও রাজনৈতিক সহিংসতার মতো গুরুতর অপরাধ এখনো বড় উদ্বেগের জায়গা হয়ে রয়েছে। ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি কতটা হয়েছে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
এদিকে সম্প্রতি ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বোমা ও বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধারের ঘটনায় জনমনে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে গণঅভ্যুত্থানের সময় কারাগার থেকে পালানো ও জামিন পাওয়া সন্ত্রাসীরা। কিছু ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অপরাধীদের গ্রেপ্তার করলেও মূল হোতারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। ফলে বড় ধরনের ঘটনার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তবে গত সোমবার (১৭ আগস্ট) সচিবালয়ে এক সভা শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিগত ছয় মাস বা ১৮০ দিনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে। তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সন্তুষ্টির বিষয়টি দেশের জনগণই মূল্যায়ন করবে। জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী পরিস্থিতি আরও সুসংহত করতে কিছুটা সময় প্রয়োজন বলে জানান তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্য একেবারে অস্বীকার করার সুযোগ নেই বলে মনে করেন মানবাধিকারকর্মী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির। তবে তার মতে, “এটিকে নিঃশর্তভাবে মেনে নেওয়ারও সুযোগ নেই। কারণ আইনশৃঙ্খলা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শুধু মোট অপরাধের সংখ্যা নয়, অপরাধের ধরন ও মাত্রাও গুরুত্বপূর্ণ।”
তার মতে, সরকারের উচিত আত্মতুষ্টিতে না ভুগে এসব পরিসংখ্যানকে সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা। তিনি টিবিএসকে বলেন, “আইনশৃঙ্খলার উন্নতি তখনই অর্থবহ হবে, যখন মানুষ শুধু রাস্তায় চুরি-ছিনতাই থেকে নয়, খুন, সহিংসতা ও নারী-শিশু নির্যাতন থেকেও নিরাপদ বোধ করবে। পুলিশের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি অপরাধের রাজনৈতিক ও সামাজিক পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ এবং আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করাই এখন সরকারের সামনে বড় দায়িত্ব।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক টিবিএসকে বলেন, “আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ওঠানামার পেছনে কিছু সাধারণ কারণ কাজ করে। এর মধ্যে আবহাওয়াও একটি বিষয়। গরমের সময়ে মানুষের আচরণে উত্তেজনা ও অসহিষ্ণুতা বাড়ায় ছোটখাটো বিরোধ থেকেও বড় অপরাধের সৃষ্টি হতে পারে। এছাড়া নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সংঘাত, নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব থেকেও বিভিন্ন সময়ে অপরাধ বাড়ে।”
গণঅভ্যুত্থানের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক করতে রাজনৈতিক ভারসাম্য, দায়িত্বশীল আচরণ এবং আইন মেনে চলার ক্ষেত্রে কিছু ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ। তার মতে, অপরাধ বেড়ে গেলে তা অস্বীকার না করে কারণ চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
গুরুতর অপরাধ বাড়ছে কেন—জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি খন্দকার রফিকুল ইসলাম টিবিএসকে বলেন, “খুনের সংখ্যা বেড়েছে, এটা বলা ঠিক হবে না। সাধারণত প্রতি মাসে দেশে প্রায় ৩০০টির মতো খুনের মামলা হয়, কিছুটা কমবেশি হতে পারে। অনেক সময় আগের ঘটনায় পরবর্তী সময়ে মামলা রেকর্ড হয়। এসব বিষয় বিবেচনায় নিলে খুনের প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে—এমনটা বলা যায় না। এছাড়া সামগ্রিকভাবে অপরাধের প্রবণতা অনেকাংশে নিম্নমুখী এবং পরিস্থিতিরও অনেকটা উন্নতি হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “বর্তমানে যেসব অপরাধ ঘটছে, তার অধিকাংশই শনাক্ত হচ্ছে। সে দিক থেকে সামগ্রিকভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অনেক উন্নতি হয়েছে। ভেঙে পড়া ও মনোবল হারানো পুলিশকে ধীরে ধীরে আবার কার্যকর অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হয়েছে। পুলিশ এখন বিভিন্ন মামলায় তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছে।”
তিনি বলেন, “তবে এখনো মানুষের মধ্যে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার একটি প্রবণতা রয়েছে। এ ধরনের ঘটনা প্রতিহত করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছে। এটিও একটি ইতিবাচক দিক।”
ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

বিএনপি সরকারের ৬ মাসে বেড়েছে হত্যা, নারী ও শিশু নির্যাতন

আপডেট সময় ০৬:৩৪:৪৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শেষ ছয় মাসের তুলনায় ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাসে চুরি, ডাকাতি ও অপহরণের মতো অপরাধ কিছুটা কমলেও খুন, দাঙ্গা এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের মতো অপরাধ বেড়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের অপরাধ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা গেছে এ চিত্র। নিউজ দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের
যদিও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে। তবে মানবাধিকারকর্মী ও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আত্মতুষ্টিতে না ভুগে এসব পরিসংখ্যানকে সতর্কবার্তা হিসেবে নিয়ে পরিস্থিতির উন্নয়নে সরকারের উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
দীর্ঘ ১৭ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকার পর চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয় বিএনপি। ওই মাসের ১৭ তারিখ জাতীয় সংসদ ভবনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানসহ অন্যান্য সংসদ সদস্য শপথ নেন।
সরকার গঠনের পর দলটির অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা। সরকার গঠনের পর ১৮ ফেব্রুয়ারি জাতির উদ্দেশে দেওয়া প্রথম ভাষণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছিলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং কঠোরভাবে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জনগণের মনে শান্তি ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনাই বিএনপি সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার।
এরই মধ্যে দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম ছয় মাস পার করেছে বিএনপি সরকার। এ সময়ে মাদক, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে বিভিন্ন বিশেষ অভিযান চালানো হয়েছে। তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কতটা উন্নতি হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ছয় মাসে দেশে ছোট-বড় অপরাধ মিলিয়ে মোট ৯৯ হাজার ৯৯২টি মামলা হয়েছে। এর আগে ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত এ সংখ্যা ছিল ৮৯ হাজার ১২টি। অর্থাৎ, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শেষ ছয় মাসের তুলনায় বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাসে সারাদেশে মোট মামলার সংখ্যা বেড়েছে ১০ হাজার ৯৮০টি।
পুলিশের পরিসংখ্যান বলছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শেষ ছয় মাসের তুলনায় বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাসে ডাকাতি, দস্যুতা, চুরি ও অপহরণের মামলা কমেছে। ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত দেশে ডাকাতির মামলা হয়েছে ৩২৮টি, দস্যুতার ৯৬০টি, দ্রুত বিচারসংক্রান্ত ৪৬০টি, অপহরণের ৫৬৩টি, সিঁধেল চুরির ১ হাজার ৬৫৯টি এবং সাধারণ চুরির মামলা হয়েছে ৫ হাজার ১১৩টি।
অন্যদিকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ডাকাতির মামলা হয়েছে ২৫৬টি, দস্যুতার ৯০৪টি, দ্রুত বিচারসংক্রান্ত ৪০৫টি, অপহরণের ৫১২টি, সিঁধেল চুরির ১ হাজার ৫৯১টি এবং সাধারণ চুরির মামলা হয়েছে ৪ হাজার ৮০৮টি।
তবে একই সময়ে খুন, দাঙ্গা, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা বেড়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত সারাদেশে ১ হাজার ৭৮০টি হত্যা মামলা রেকর্ড করা হয়। এর মধ্যে ১৭৮টি হত্যাকাণ্ড এর আগে সংঘটিত হয়েছিল।
অন্যদিকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সারাদেশে ১ হাজার ৭৮৯টি হত্যা মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। অর্থাৎ, বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাসে দিনে গড়ে প্রায় ১০টি হত্যা মামলা রেকর্ড হয়েছে।
এছাড়া বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাসে সারাদেশে ১৩টি দাঙ্গার ঘটনা ঘটেছে, যা আগের ছয় মাসে ছিল ১০টি। নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলাও বেড়েছে। বিএনপি সরকার গঠনের আগের ছয় মাসে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় ১০ হাজার ৯০টি মামলা হয়েছিল। সরকার গঠনের পরের ছয় মাসে তা বেড়ে ১১ হাজার ১৬৫টিতে দাঁড়িয়েছে।
পুলিশের ওপর হামলার ঘটনাও বেড়েছে। আগের ছয় মাসে এ ধরনের ২৭৫টি ঘটনা ঘটলেও পরের ছয় মাসে তা বেড়ে ৩১৭টিতে দাঁড়িয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাসে ঢাকা, খুলনা ও সিলেট মেট্রোপলিটন এলাকা এবং রেলওয়ে রেঞ্জে অপরাধ কমেছে। অন্যদিকে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, রংপুর, বরিশাল, ময়মনসিংহ ও সিলেট রেঞ্জ এবং গাজীপুর, রংপুর, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও বরিশাল মেট্রোপলিটন এলাকায় অপরাধ বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সব মিলিয়ে বিএনপি সরকারের প্রথম ছয় মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চিত্র একমুখী নয়। প্রচলিত ছোটখাটো অপরাধের কিছু ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণের ইঙ্গিত থাকলেও খুন, নারী ও শিশু নির্যাতন, মব সহিংসতা ও রাজনৈতিক সহিংসতার মতো গুরুতর অপরাধ এখনো বড় উদ্বেগের জায়গা হয়ে রয়েছে। ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি কতটা হয়েছে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
এদিকে সম্প্রতি ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বোমা ও বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধারের ঘটনায় জনমনে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে গণঅভ্যুত্থানের সময় কারাগার থেকে পালানো ও জামিন পাওয়া সন্ত্রাসীরা। কিছু ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অপরাধীদের গ্রেপ্তার করলেও মূল হোতারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। ফলে বড় ধরনের ঘটনার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তবে গত সোমবার (১৭ আগস্ট) সচিবালয়ে এক সভা শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিগত ছয় মাস বা ১৮০ দিনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে। তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সন্তুষ্টির বিষয়টি দেশের জনগণই মূল্যায়ন করবে। জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী পরিস্থিতি আরও সুসংহত করতে কিছুটা সময় প্রয়োজন বলে জানান তিনি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্য একেবারে অস্বীকার করার সুযোগ নেই বলে মনে করেন মানবাধিকারকর্মী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির। তবে তার মতে, “এটিকে নিঃশর্তভাবে মেনে নেওয়ারও সুযোগ নেই। কারণ আইনশৃঙ্খলা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শুধু মোট অপরাধের সংখ্যা নয়, অপরাধের ধরন ও মাত্রাও গুরুত্বপূর্ণ।”
তার মতে, সরকারের উচিত আত্মতুষ্টিতে না ভুগে এসব পরিসংখ্যানকে সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা। তিনি টিবিএসকে বলেন, “আইনশৃঙ্খলার উন্নতি তখনই অর্থবহ হবে, যখন মানুষ শুধু রাস্তায় চুরি-ছিনতাই থেকে নয়, খুন, সহিংসতা ও নারী-শিশু নির্যাতন থেকেও নিরাপদ বোধ করবে। পুলিশের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি অপরাধের রাজনৈতিক ও সামাজিক পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ এবং আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করাই এখন সরকারের সামনে বড় দায়িত্ব।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক টিবিএসকে বলেন, “আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ওঠানামার পেছনে কিছু সাধারণ কারণ কাজ করে। এর মধ্যে আবহাওয়াও একটি বিষয়। গরমের সময়ে মানুষের আচরণে উত্তেজনা ও অসহিষ্ণুতা বাড়ায় ছোটখাটো বিরোধ থেকেও বড় অপরাধের সৃষ্টি হতে পারে। এছাড়া নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সংঘাত, নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব থেকেও বিভিন্ন সময়ে অপরাধ বাড়ে।”
গণঅভ্যুত্থানের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক করতে রাজনৈতিক ভারসাম্য, দায়িত্বশীল আচরণ এবং আইন মেনে চলার ক্ষেত্রে কিছু ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করেন এই বিশেষজ্ঞ। তার মতে, অপরাধ বেড়ে গেলে তা অস্বীকার না করে কারণ চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
গুরুতর অপরাধ বাড়ছে কেন—জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি খন্দকার রফিকুল ইসলাম টিবিএসকে বলেন, “খুনের সংখ্যা বেড়েছে, এটা বলা ঠিক হবে না। সাধারণত প্রতি মাসে দেশে প্রায় ৩০০টির মতো খুনের মামলা হয়, কিছুটা কমবেশি হতে পারে। অনেক সময় আগের ঘটনায় পরবর্তী সময়ে মামলা রেকর্ড হয়। এসব বিষয় বিবেচনায় নিলে খুনের প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে—এমনটা বলা যায় না। এছাড়া সামগ্রিকভাবে অপরাধের প্রবণতা অনেকাংশে নিম্নমুখী এবং পরিস্থিতিরও অনেকটা উন্নতি হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “বর্তমানে যেসব অপরাধ ঘটছে, তার অধিকাংশই শনাক্ত হচ্ছে। সে দিক থেকে সামগ্রিকভাবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অনেক উন্নতি হয়েছে। ভেঙে পড়া ও মনোবল হারানো পুলিশকে ধীরে ধীরে আবার কার্যকর অবস্থায় ফিরিয়ে আনা হয়েছে। পুলিশ এখন বিভিন্ন মামলায় তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছে।”
তিনি বলেন, “তবে এখনো মানুষের মধ্যে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার একটি প্রবণতা রয়েছে। এ ধরনের ঘটনা প্রতিহত করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছে। এটিও একটি ইতিবাচক দিক।”