ঢাকা ১০:৪১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬, ১০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

নোবিপ্রবিতে ১০ হাজারের বেশি শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় মনোবিজ্ঞানী মাত্র একজন

নোবিপ্রবি প্রতিনিধি
  • আপডেট সময় ০৭:৫৮:৩৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬
  • / ৫৭ বার পড়া হয়েছে

নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (নোবিপ্রবি) মানসিক স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজনীয়তা দিন দিন বৃদ্ধি পেলেও সেই তুলনায় বাড়েনি প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ হাজারের অধিক শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর মানসিক চিকিৎসায় বর্তমানে পুরো প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র একজন মনোবিজ্ঞানী। ফলে চরম জনবলসংকট ও সীমিত সময়ের কারণে প্রয়োজনীয় সেবা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বিপুলসংখ্যক সেবাগ্রহীতারা।

‎বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে তিনি ইতোমধ্যে এক হাজারের বেশি শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে মনস্তাত্ত্বিক সেবা দিয়েছেন। তবে প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতার কারণে বর্তমানে মাসে সর্বোচ্চ ২০ জন নতুন শিক্ষার্থীকে কাউন্সেলিং দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। সাধারণত একজন শিক্ষার্থীর জন্য ন্যূনতম তিনটি সেশনের প্রয়োজন হয়। ফলে মাসে গড়ে প্রায় ৬০টি সেশন পরিচালনা করা গেলেও তা বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট জনসংখ্যার তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল।

‎‎একজন মনোবিজ্ঞানীকে শুধু কাউন্সেলিং বা সাইকোথেরাপিতেই সীমাবদ্ধ থাকতে হয় না; এর পাশাপাশি মনস্তাত্ত্বিক মূল্যায়ন, কেস বিশ্লেষণ, ট্রিটমেন্ট প্ল্যান প্রণয়ন, নথিপত্র সংরক্ষণ, অ্যাপয়েন্টমেন্ট ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক সনদ প্রদান এবং সচেতনতামূলক কর্মশালা ও সেমিনার পরিচালনার দায়িত্বও একাই সামলাতে হচ্ছে।

‎অফিস সময়সূচি ও সময় ব্যবস্থাপনা
‎‎বর্তমান অফিস সময় শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন রুটিনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে অভিযোগ রয়েছে। শিক্ষার্থীরা সাধারণত সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ক্লাস ও ল্যাবে ব্যস্ত থাকেন। বিকেল ও সন্ধ্যায় টিউশন বা অন্যান্য কাজ শেষে তারা কিছুটা অবসর পান। তবে ওই সময়ে সেবা না পাওয়ায় অনেকেই প্রয়োজন সত্ত্বেও কাউন্সেলিং থেকে বঞ্চিত হন।

‎এছাড়া আগে থেকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়েও হঠাৎ পরীক্ষা বা অ্যাকাডেমিক চাপের কারণে অনেকে নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত হতে পারেন না। এতে একজন শিক্ষার্থীর জন্য বরাদ্দ প্রায় এক ঘণ্টার গুরুত্বপূর্ণ সময় অপচয় হয়। ফলে বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত কাউন্সেলিং সেবা চালু রাখা গেলে এর কার্যকারিতা বহুগুণ বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

‎জনবল বৃদ্ধি ও নারী মনোবিজ্ঞানী নিয়োগের দাবি
‎এক একক ব্যক্তির পক্ষে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের মানসিক স্বাস্থ্য সামলানো তীব্র চ্যালেঞ্জিং। তাই কেন্দ্রীয়ভাবে অতিরিক্ত মনোবিজ্ঞানী ও সহকারী নিয়োগের দাবি উঠেছে। বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের স্বাচ্ছন্দ্য ও সুবিধার কথা বিবেচনা করে অন্তত একজন নারী মনোবিজ্ঞানী নিয়োগকে জরুরি বলে মনে করা হচ্ছে। এ ছাড়া জরুরি সংকট মোকাবিলায় আবাসিক হলগুলোতে পার্ট-টাইম মনোবিজ্ঞানী নিয়োগের সুপারিশও রয়েছে।

‎উলেখ্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩০ জনের বেশি মনোবিজ্ঞানী কর্মরত এবং সেখানে আবাসিক হলগুলোতেও পৃথক সেবার ব্যবস্থা রয়েছে। নোবিপ্রবিতে উদ্যোগটি চালু থাকলেও সক্ষমতার দিক থেকে তা এখনও পিছিয়ে।

‎সামাজিক সংকোচ ও সচেতনতার অভাব
‎মানসিক সমস্যায় ভুগলেও প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক সংকোচের কারণে অনেক শিক্ষার্থী সেবা নিতে দ্বিধাবোধ করেন।
‎নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী বলেন, “পড়াশোনার চাপ, ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন পার করলেও কাউন্সেলিং নেওয়ার বিষয়ে একধরনের সংকোচ কাজ করে। সেবাটি যে চালু আছে, সে বিষয়ে ক্যাম্পাসে আরও প্রচার প্রয়োজন।”

‎আরেক শিক্ষার্থী জানান, “অ্যাকাডেমিক ব্যস্ততার কারণে নির্ধারিত সময়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। সময়সূচি বিকেল বা সন্ধ্যার দিকে হলে আমাদের জন্য বড় সুবিধা হতো।”

‎অন্য এক নারী শিক্ষার্থী বলেন, “মানসিক সমস্যাকে আমাদের সমাজে এখনও স্বাভাবিকভাবে দেখা হয় না। ফলে অনেকে কাউন্সেলরের কাছে যাওয়ার তথ্যটি গোপন রাখতে চান। নারী শিক্ষার্থীদের জন্য নারী মনোবিজ্ঞানী এবং হলে সহজে সেবা পাওয়ার ব্যবস্থা থাকলে পরিস্থিতি অনেকটাই ইতিবাচক হতে পারে।”

‎মূল সংকট সম্পর্কজনিত মানসিক চাপ
‎মনোবিজ্ঞানীর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি আসেন সম্পর্কজনিত টানাপোড়েন থেকে তৈরি মানসিক চাপ নিয়ে। সব ক্ষেত্রে মূল সমস্যা সম্পর্ক না হলেও বিষণ্নতা (ডিপ্রেশন), উদ্বেগ (অ্যাংজাইটি) বা অনিদ্রার নেপথ্যে সম্পর্কজনিত সংকট প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। ‎এছাড়া জেনারালাইজড অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার (জিএডি), মনোযোগের অভাব, অবসেসিভ চিন্তা, ভুলে যাওয়ার প্রবণতা, আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি ও নানা ধরনের ভীতি (ফোবিয়া) নিয়ে শিক্ষার্থীরা পরামর্শ নিতে আসেন।


‎প্রশাসনিক উদ্যোগ ও নতুন প্রস্তাবনা
‎এদিকে ‎ক্যাম্পাসে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে নিয়মিত কর্মশালা ও সেমিনার আয়োজনের অতিব জরুরী বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে নবীন শিক্ষার্থীদের প্রথম বর্ষেই দুই থেকে তিনটি মৌলিক সেশনের আওতায় আনা গেলে তা ঝুঁকি কমাবে, ফলে তারা শুরুতেই চাপ মোকাবিলা ও সেবা প্রাপ্তির সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাবে। ‎একক কাউন্সেলিংয়ের পাশাপাশি বেশিসংখ্যক শিক্ষার্থীকে একসঙ্গে সেবা দিতে মেডিকেল সেন্টারের তৃতীয় তলায় এক বা একাধিক কক্ষ মেডিটেশন বা ওসিডি ক্লিনিক হিসেবে বরাদ্দের প্রয়োজন। এতে গ্রুপ সেশনের মাধ্যমে কম সময়ে অধিক সংখ্যক শিক্ষার্থী সেবা নিতে পারবেন।

‎পাশাপাশি আত্মহত্যার প্রবণতা কমাতে আবাসিক হলগুলোর ভবন নকশা, বারান্দাসহ ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো সুরক্ষিত করে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিতও একটি সময়োপযোগী দাবি।

‎উপাচার্যের আশ্বাস
‎মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা বাড়াতে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে নোবিপ্রবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানী বলেন, “আমি ইতোমধ্যে জনবল বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছি। বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের সুবিধার কথা বিবেচনা করে একজন ফিমেল সাইকোলজিস্ট পাওয়ার চেষ্টা করছি। নির্দিষ্ট জনবলের তালিকা না পেলেও আমি নিজে অলরেডি প্রশাসনিকভাবে কথা বলছি।”

‎তিনি আরও বলেন, “আমার সাইকোলজিস্ট প্রয়োজন, কর্মচারী না পেলেও এই পদটি জরুরি। দরকার হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে নিয়োগ দেবো, যেগেতু এ ব্যাপারে আমি শিক্ষার্থীদের কথা দিয়েছি তাই এটা আমি আনবোই।”

‎কাউন্সেলিংয়ের সময়সীমা পুনর্নির্ধারণ ও হলে সেবা পৌঁছানোর বিষয়ে উপাচার্য বলেন, “শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে কাউন্সেলিংয়ের সময়সীমা বাড়িয়ে বিকেলে বা রাতে করা এবং আবাসিক হলগুলোতে পার্ট-টাইম সাইকোলজিস্ট নিয়োগের বিষয়টি নিয়েও আমরা গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করব।”

দেশের বিভিন্ন ‎বিশ্ববিদ্যালয়গুলােতে দিন দিন আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়ছে উদ্বেগজনক ভাবে। এই অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ নিয়ন্ত্রণে মানসিক চিকিৎসার বিকল্প নেই। নোবিপ্রবিতে মানসিক চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকলেও তা পরিপূর্ণ ও পর্যাপ্ত নয়। শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এই বিষয়ে সুনজর দিলে, দ্রুত মানসিক চিকিৎসার সংকট দূর হয়ে উপকৃত হবে হাজারো শিক্ষার্থী।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

নোবিপ্রবিতে ১০ হাজারের বেশি শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় মনোবিজ্ঞানী মাত্র একজন

আপডেট সময় ০৭:৫৮:৩৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৫ অগাস্ট ২০২৬

নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (নোবিপ্রবি) মানসিক স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজনীয়তা দিন দিন বৃদ্ধি পেলেও সেই তুলনায় বাড়েনি প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০ হাজারের অধিক শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর মানসিক চিকিৎসায় বর্তমানে পুরো প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করছেন মাত্র একজন মনোবিজ্ঞানী। ফলে চরম জনবলসংকট ও সীমিত সময়ের কারণে প্রয়োজনীয় সেবা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বিপুলসংখ্যক সেবাগ্রহীতারা।

‎বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে তিনি ইতোমধ্যে এক হাজারের বেশি শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে মনস্তাত্ত্বিক সেবা দিয়েছেন। তবে প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতার কারণে বর্তমানে মাসে সর্বোচ্চ ২০ জন নতুন শিক্ষার্থীকে কাউন্সেলিং দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। সাধারণত একজন শিক্ষার্থীর জন্য ন্যূনতম তিনটি সেশনের প্রয়োজন হয়। ফলে মাসে গড়ে প্রায় ৬০টি সেশন পরিচালনা করা গেলেও তা বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট জনসংখ্যার তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল।

‎‎একজন মনোবিজ্ঞানীকে শুধু কাউন্সেলিং বা সাইকোথেরাপিতেই সীমাবদ্ধ থাকতে হয় না; এর পাশাপাশি মনস্তাত্ত্বিক মূল্যায়ন, কেস বিশ্লেষণ, ট্রিটমেন্ট প্ল্যান প্রণয়ন, নথিপত্র সংরক্ষণ, অ্যাপয়েন্টমেন্ট ব্যবস্থাপনা, প্রশাসনিক সনদ প্রদান এবং সচেতনতামূলক কর্মশালা ও সেমিনার পরিচালনার দায়িত্বও একাই সামলাতে হচ্ছে।

‎অফিস সময়সূচি ও সময় ব্যবস্থাপনা
‎‎বর্তমান অফিস সময় শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন রুটিনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে অভিযোগ রয়েছে। শিক্ষার্থীরা সাধারণত সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ক্লাস ও ল্যাবে ব্যস্ত থাকেন। বিকেল ও সন্ধ্যায় টিউশন বা অন্যান্য কাজ শেষে তারা কিছুটা অবসর পান। তবে ওই সময়ে সেবা না পাওয়ায় অনেকেই প্রয়োজন সত্ত্বেও কাউন্সেলিং থেকে বঞ্চিত হন।

‎এছাড়া আগে থেকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়েও হঠাৎ পরীক্ষা বা অ্যাকাডেমিক চাপের কারণে অনেকে নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত হতে পারেন না। এতে একজন শিক্ষার্থীর জন্য বরাদ্দ প্রায় এক ঘণ্টার গুরুত্বপূর্ণ সময় অপচয় হয়। ফলে বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত কাউন্সেলিং সেবা চালু রাখা গেলে এর কার্যকারিতা বহুগুণ বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

‎জনবল বৃদ্ধি ও নারী মনোবিজ্ঞানী নিয়োগের দাবি
‎এক একক ব্যক্তির পক্ষে পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ের মানসিক স্বাস্থ্য সামলানো তীব্র চ্যালেঞ্জিং। তাই কেন্দ্রীয়ভাবে অতিরিক্ত মনোবিজ্ঞানী ও সহকারী নিয়োগের দাবি উঠেছে। বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের স্বাচ্ছন্দ্য ও সুবিধার কথা বিবেচনা করে অন্তত একজন নারী মনোবিজ্ঞানী নিয়োগকে জরুরি বলে মনে করা হচ্ছে। এ ছাড়া জরুরি সংকট মোকাবিলায় আবাসিক হলগুলোতে পার্ট-টাইম মনোবিজ্ঞানী নিয়োগের সুপারিশও রয়েছে।

‎উলেখ্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩০ জনের বেশি মনোবিজ্ঞানী কর্মরত এবং সেখানে আবাসিক হলগুলোতেও পৃথক সেবার ব্যবস্থা রয়েছে। নোবিপ্রবিতে উদ্যোগটি চালু থাকলেও সক্ষমতার দিক থেকে তা এখনও পিছিয়ে।

‎সামাজিক সংকোচ ও সচেতনতার অভাব
‎মানসিক সমস্যায় ভুগলেও প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক সংকোচের কারণে অনেক শিক্ষার্থী সেবা নিতে দ্বিধাবোধ করেন।
‎নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী বলেন, “পড়াশোনার চাপ, ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন পার করলেও কাউন্সেলিং নেওয়ার বিষয়ে একধরনের সংকোচ কাজ করে। সেবাটি যে চালু আছে, সে বিষয়ে ক্যাম্পাসে আরও প্রচার প্রয়োজন।”

‎আরেক শিক্ষার্থী জানান, “অ্যাকাডেমিক ব্যস্ততার কারণে নির্ধারিত সময়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। সময়সূচি বিকেল বা সন্ধ্যার দিকে হলে আমাদের জন্য বড় সুবিধা হতো।”

‎অন্য এক নারী শিক্ষার্থী বলেন, “মানসিক সমস্যাকে আমাদের সমাজে এখনও স্বাভাবিকভাবে দেখা হয় না। ফলে অনেকে কাউন্সেলরের কাছে যাওয়ার তথ্যটি গোপন রাখতে চান। নারী শিক্ষার্থীদের জন্য নারী মনোবিজ্ঞানী এবং হলে সহজে সেবা পাওয়ার ব্যবস্থা থাকলে পরিস্থিতি অনেকটাই ইতিবাচক হতে পারে।”

‎মূল সংকট সম্পর্কজনিত মানসিক চাপ
‎মনোবিজ্ঞানীর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি আসেন সম্পর্কজনিত টানাপোড়েন থেকে তৈরি মানসিক চাপ নিয়ে। সব ক্ষেত্রে মূল সমস্যা সম্পর্ক না হলেও বিষণ্নতা (ডিপ্রেশন), উদ্বেগ (অ্যাংজাইটি) বা অনিদ্রার নেপথ্যে সম্পর্কজনিত সংকট প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করে। ‎এছাড়া জেনারালাইজড অ্যাংজাইটি ডিসঅর্ডার (জিএডি), মনোযোগের অভাব, অবসেসিভ চিন্তা, ভুলে যাওয়ার প্রবণতা, আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি ও নানা ধরনের ভীতি (ফোবিয়া) নিয়ে শিক্ষার্থীরা পরামর্শ নিতে আসেন।


‎প্রশাসনিক উদ্যোগ ও নতুন প্রস্তাবনা
‎এদিকে ‎ক্যাম্পাসে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে নিয়মিত কর্মশালা ও সেমিনার আয়োজনের অতিব জরুরী বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে নবীন শিক্ষার্থীদের প্রথম বর্ষেই দুই থেকে তিনটি মৌলিক সেশনের আওতায় আনা গেলে তা ঝুঁকি কমাবে, ফলে তারা শুরুতেই চাপ মোকাবিলা ও সেবা প্রাপ্তির সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাবে। ‎একক কাউন্সেলিংয়ের পাশাপাশি বেশিসংখ্যক শিক্ষার্থীকে একসঙ্গে সেবা দিতে মেডিকেল সেন্টারের তৃতীয় তলায় এক বা একাধিক কক্ষ মেডিটেশন বা ওসিডি ক্লিনিক হিসেবে বরাদ্দের প্রয়োজন। এতে গ্রুপ সেশনের মাধ্যমে কম সময়ে অধিক সংখ্যক শিক্ষার্থী সেবা নিতে পারবেন।

‎পাশাপাশি আত্মহত্যার প্রবণতা কমাতে আবাসিক হলগুলোর ভবন নকশা, বারান্দাসহ ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো সুরক্ষিত করে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিতও একটি সময়োপযোগী দাবি।

‎উপাচার্যের আশ্বাস
‎মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সক্ষমতা বাড়াতে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে নোবিপ্রবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. গোলাম রব্বানী বলেন, “আমি ইতোমধ্যে জনবল বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছি। বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের সুবিধার কথা বিবেচনা করে একজন ফিমেল সাইকোলজিস্ট পাওয়ার চেষ্টা করছি। নির্দিষ্ট জনবলের তালিকা না পেলেও আমি নিজে অলরেডি প্রশাসনিকভাবে কথা বলছি।”

‎তিনি আরও বলেন, “আমার সাইকোলজিস্ট প্রয়োজন, কর্মচারী না পেলেও এই পদটি জরুরি। দরকার হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে নিয়োগ দেবো, যেগেতু এ ব্যাপারে আমি শিক্ষার্থীদের কথা দিয়েছি তাই এটা আমি আনবোই।”

‎কাউন্সেলিংয়ের সময়সীমা পুনর্নির্ধারণ ও হলে সেবা পৌঁছানোর বিষয়ে উপাচার্য বলেন, “শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে কাউন্সেলিংয়ের সময়সীমা বাড়িয়ে বিকেলে বা রাতে করা এবং আবাসিক হলগুলোতে পার্ট-টাইম সাইকোলজিস্ট নিয়োগের বিষয়টি নিয়েও আমরা গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করব।”

দেশের বিভিন্ন ‎বিশ্ববিদ্যালয়গুলােতে দিন দিন আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়ছে উদ্বেগজনক ভাবে। এই অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ নিয়ন্ত্রণে মানসিক চিকিৎসার বিকল্প নেই। নোবিপ্রবিতে মানসিক চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকলেও তা পরিপূর্ণ ও পর্যাপ্ত নয়। শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এই বিষয়ে সুনজর দিলে, দ্রুত মানসিক চিকিৎসার সংকট দূর হয়ে উপকৃত হবে হাজারো শিক্ষার্থী।