ঢাকা ০৫:১০ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৬, ১৫ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

৬ বছর ধরে বিধবার ভাতা তুলছেন বিএনপি নেতা

ডেস্ক রিপোর্ট
  • আপডেট সময় ০২:৫৩:১৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৬
  • / ২১ বার পড়া হয়েছে

পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে এক অসহায় বিধবা নারীর ভাতার টাকা তার নিজস্ব মোবাইল নম্বরের পরিবর্তে নিজের নগদ অ্যাকাউন্টে নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে মো. আব্দুল খালেক নামে এক ইউপি সদস্যের বিরুদ্ধে। প্রায় ছয় বছর ধরে ওই নারীর ভাতার টাকা নিজের মোবাইল নম্বরে হাতিয়ে নিচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী।

অভিযুক্ত মো. আব্দুল খালেক দেবীগঞ্জ উপজেলার টেপ্রীগঞ্জ ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য। এ ছাড়া তিনি টেপ্রীগঞ্জ ইউনিয়ন বিএনপির সর্বশেষ কমিটিতে সহসভাপতি এবং ৭ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, টেপ্রীগঞ্জ ইউনিয়নের বানেশ্বরপাড়া এলাকার মোছা. রহিমা বেগম সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বিধবা ভাতা কর্মসূচির একজন নিয়মিত সুবিধাভোগী। তিনি সর্বশেষ ২০২০ সালের জুলাই মাসে বিধবা ভাতার টাকা হাতে পান। পরবর্তীতে ২০২০-২১ অর্থবছর থেকে সরকার জিটুপি পদ্ধতিতে সরাসরি মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সুবিধাভোগীদের অ্যাকাউন্টে ভাতার টাকা পাঠানোর ব্যবস্থা চালু করে।

রহিমা বেগমের দাবি, ওই সময় ভাতার টাকা পাওয়ার জন্য তিনি একটি মোবাইল নম্বর জমা দিয়েছিলেন। কিন্তু ২০২০ সালের পর থেকে তিনি আর কোনো টাকা পাননি। দীর্ঘদিন অপেক্ষা করে ভাতা না পেয়ে তিনি উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে যোগাযোগ করলে জানতে পারেন, তার নামে বরাদ্দ করা টাকা নিয়মিত একটি অপরিচিত নগদ নম্বরে পাঠানো হচ্ছে।

ভুক্তভোগীর অভিযোগের প্রেক্ষিতে অনুসন্ধানে জানা যায়, উক্ত নম্বরে টেপ্রীগঞ্জ ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. আব্দুল খালেকের এনআইডির (জাতীয় পরিচয়পত্র) তথ্য ব্যবহার করে নগদ অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে। এ-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় প্রমাণাদি প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, গত প্রায় ছয় বছর ধরে রহিমা বেগমের ভাতার টাকা ওই নম্বরে গেছে এবং প্রতিবারই তা উত্তোলন করা হয়েছে।

ভুক্তভোগী নারীর দাবি, বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর অভিযুক্ত ইউপি সদস্য মো. আব্দুল খালেকের ভাই তার ছেলের হাতে ৭ হাজার টাকা দিয়ে যান এবং বিষয়টি নিয়ে বাড়াবাড়ি না করার জন্য চাপ দেন।

উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ২০২১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত রহিমা বেগমের বিধবা ভাতার টাকা এমআইএস সফটওয়্যারের মাধ্যমে ০১৯১৭-৩৬৭৪৯২ নম্বরে পাঠানো হয়েছে। সর্বশেষ ২০২৬ সালের মে মাসে ১ হাজার ৯৬১ টাকা ওই নম্বরে যায়। অফিস সূত্রে জানা যায়, গত ছয় বছরে ওই অ্যাকাউন্ট থেকে প্রায় ৪০ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়েছে।

ভুক্তভোগী রহিমা বেগম বলেন, আমি বিধবা ভাতা পেতাম। ২০২০ সালের পর থেকে এক টাকাও পাইনি। অফিসে গিয়ে যোগাযোগ করলে তারা একটি নম্বর দিয়ে বলে, এই নম্বরে টাকা যায়; গ্রামে গিয়ে খোঁজ নিয়ে দেখেন নম্বরটি কার। পরে জানতে পারি এটি খালেক মেম্বারের নম্বর। বিষয়টি জানার পর আমি মেম্বার-চেয়ারম্যান কারও কাছে যাইনি। তবে মেম্বারের ভাই আমার ছেলের কাছে নাকি ৭ হাজার টাকা দিয়ে গেছেন।

অভিযোগ প্রসঙ্গে ইউপি সদস্য মো. আব্দুল খালেক বলেন, কীভাবে আমার নম্বর সেখানে গেছে আমি জানি না। আমি তো ওই মহিলার কার্ড করে দিইনি। আর আমার ওই সিমটি ৪ বছর আগে হারিয়ে গেছে।

সিম হারানোর বিষয়ে কোনো জিডি (সাধারণ ডায়েরি) করেছিলেন কি না—জানতে চাইলে তিনি বলেন, না, কোনো জিডি করিনি। তবে এই বিষয়ে আপস করা হয়েছে। এটা নিয়ে কেন এত কথা হচ্ছে? আমি আপনার সাথে সাক্ষাতে কথা বলব।

সিম হারিয়ে গেলে এবং ভাতার টাকা নিজে উত্তোলন না করলে কিসের ভিত্তিতে আপস করলেন—এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো সদুত্তর না দিয়ে ফোন কেটে দেন।

এ বিষয়ে দেবীগঞ্জ উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. আবু রায়হান জানান, ভুক্তভোগী লিখিত অভিযোগ দিলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

দেবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইন্দ্রজীত সাহা বলেন, ঘটনাটি তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

ট্যাগস :

নিউজটি শেয়ার করুন

৬ বছর ধরে বিধবার ভাতা তুলছেন বিএনপি নেতা

আপডেট সময় ০২:৫৩:১৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ৩০ অগাস্ট ২০২৬

পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে এক অসহায় বিধবা নারীর ভাতার টাকা তার নিজস্ব মোবাইল নম্বরের পরিবর্তে নিজের নগদ অ্যাকাউন্টে নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে মো. আব্দুল খালেক নামে এক ইউপি সদস্যের বিরুদ্ধে। প্রায় ছয় বছর ধরে ওই নারীর ভাতার টাকা নিজের মোবাইল নম্বরে হাতিয়ে নিচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী।

অভিযুক্ত মো. আব্দুল খালেক দেবীগঞ্জ উপজেলার টেপ্রীগঞ্জ ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য। এ ছাড়া তিনি টেপ্রীগঞ্জ ইউনিয়ন বিএনপির সর্বশেষ কমিটিতে সহসভাপতি এবং ৭ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, টেপ্রীগঞ্জ ইউনিয়নের বানেশ্বরপাড়া এলাকার মোছা. রহিমা বেগম সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বিধবা ভাতা কর্মসূচির একজন নিয়মিত সুবিধাভোগী। তিনি সর্বশেষ ২০২০ সালের জুলাই মাসে বিধবা ভাতার টাকা হাতে পান। পরবর্তীতে ২০২০-২১ অর্থবছর থেকে সরকার জিটুপি পদ্ধতিতে সরাসরি মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে সুবিধাভোগীদের অ্যাকাউন্টে ভাতার টাকা পাঠানোর ব্যবস্থা চালু করে।

রহিমা বেগমের দাবি, ওই সময় ভাতার টাকা পাওয়ার জন্য তিনি একটি মোবাইল নম্বর জমা দিয়েছিলেন। কিন্তু ২০২০ সালের পর থেকে তিনি আর কোনো টাকা পাননি। দীর্ঘদিন অপেক্ষা করে ভাতা না পেয়ে তিনি উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ে যোগাযোগ করলে জানতে পারেন, তার নামে বরাদ্দ করা টাকা নিয়মিত একটি অপরিচিত নগদ নম্বরে পাঠানো হচ্ছে।

ভুক্তভোগীর অভিযোগের প্রেক্ষিতে অনুসন্ধানে জানা যায়, উক্ত নম্বরে টেপ্রীগঞ্জ ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. আব্দুল খালেকের এনআইডির (জাতীয় পরিচয়পত্র) তথ্য ব্যবহার করে নগদ অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে। এ-সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় প্রমাণাদি প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, গত প্রায় ছয় বছর ধরে রহিমা বেগমের ভাতার টাকা ওই নম্বরে গেছে এবং প্রতিবারই তা উত্তোলন করা হয়েছে।

ভুক্তভোগী নারীর দাবি, বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর অভিযুক্ত ইউপি সদস্য মো. আব্দুল খালেকের ভাই তার ছেলের হাতে ৭ হাজার টাকা দিয়ে যান এবং বিষয়টি নিয়ে বাড়াবাড়ি না করার জন্য চাপ দেন।

উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ২০২১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত রহিমা বেগমের বিধবা ভাতার টাকা এমআইএস সফটওয়্যারের মাধ্যমে ০১৯১৭-৩৬৭৪৯২ নম্বরে পাঠানো হয়েছে। সর্বশেষ ২০২৬ সালের মে মাসে ১ হাজার ৯৬১ টাকা ওই নম্বরে যায়। অফিস সূত্রে জানা যায়, গত ছয় বছরে ওই অ্যাকাউন্ট থেকে প্রায় ৪০ হাজার টাকা উত্তোলন করা হয়েছে।

ভুক্তভোগী রহিমা বেগম বলেন, আমি বিধবা ভাতা পেতাম। ২০২০ সালের পর থেকে এক টাকাও পাইনি। অফিসে গিয়ে যোগাযোগ করলে তারা একটি নম্বর দিয়ে বলে, এই নম্বরে টাকা যায়; গ্রামে গিয়ে খোঁজ নিয়ে দেখেন নম্বরটি কার। পরে জানতে পারি এটি খালেক মেম্বারের নম্বর। বিষয়টি জানার পর আমি মেম্বার-চেয়ারম্যান কারও কাছে যাইনি। তবে মেম্বারের ভাই আমার ছেলের কাছে নাকি ৭ হাজার টাকা দিয়ে গেছেন।

অভিযোগ প্রসঙ্গে ইউপি সদস্য মো. আব্দুল খালেক বলেন, কীভাবে আমার নম্বর সেখানে গেছে আমি জানি না। আমি তো ওই মহিলার কার্ড করে দিইনি। আর আমার ওই সিমটি ৪ বছর আগে হারিয়ে গেছে।

সিম হারানোর বিষয়ে কোনো জিডি (সাধারণ ডায়েরি) করেছিলেন কি না—জানতে চাইলে তিনি বলেন, না, কোনো জিডি করিনি। তবে এই বিষয়ে আপস করা হয়েছে। এটা নিয়ে কেন এত কথা হচ্ছে? আমি আপনার সাথে সাক্ষাতে কথা বলব।

সিম হারিয়ে গেলে এবং ভাতার টাকা নিজে উত্তোলন না করলে কিসের ভিত্তিতে আপস করলেন—এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো সদুত্তর না দিয়ে ফোন কেটে দেন।

এ বিষয়ে দেবীগঞ্জ উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. আবু রায়হান জানান, ভুক্তভোগী লিখিত অভিযোগ দিলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

দেবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইন্দ্রজীত সাহা বলেন, ঘটনাটি তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।