তিন মাসে দেশে ১৮৩ রাজনৈতিক সহিংসতা, ১৬১ টিতেই বিএনপি জড়িত
- আপডেট সময় ০৫:০৬:২৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬
- / ২৩ বার পড়া হয়েছে
২০২৬ সালের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর, এই তিন মাসে সারাদেশে ১৮৩ টি রাজনেতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। দলীয় কোন্দল ও অন্তর্কোন্দলের এসব ঘটনায় ১৭ জন নিহত এবং ১২২৭ জনের বেশি বিভিন্ন দলের নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষ আহত হয়েছেন।
তাছাড়া, মোট ১৮৩টি এ সহিংসতার ঘটনার ১৬১টিই অর্থাৎ ৮৮ শতাংশই ঘটেছে বিএনপির অন্তর্কোন্দল এবং বিএনপির সঙ্গে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মধ্যে। এছাড়া, নিহত ১৭ জনের মধ্যে বিএনপির ৯ জন (৫৩ শতাংশ), জামায়াতের ২ জন, আওয়ামীলীগের ৩ জন এবং অন্যান্য ৩ জন রয়েছে।
সোমবার (১২ অক্টোবর) মানবাধিকার সংগঠন ‘হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক ত্রৈমাসিক মানবাধিকার পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে আসে। দেশের ১৬টি জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ এবং সংগঠনটির সংগৃহীত তথ্য ও ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং রিপোর্টের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করা হয়।
প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ‘গত তিন মাসে ১৮৩ টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৭ জন এবং আহত হয়েছেন ১২২৭ জন। এর মধ্যে বিএনপির অন্তর্কোন্দলে ৬৯টি ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ৫৪০ জন ও নিহত ৯ জন। ৩১টি বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ৩৩৮ জন ও নিহত ১ জন, ১৬টি বিএনপি-আওয়ামী লীগের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ৮১ জন এবং নিহত হয়েছেন ২ জন। ১৪ টি বিএনপি-এনসিপি মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ৭০ জন, ১টি আওয়ামীলীগের মধ্যে অন্তর্কোন্দলে নিহত হয়েছেন ১ জন, ৩১ টি বিএনপি-অন্যান্য দলের মধ্যে সংঘর্ষে আহত হয়েছেন ৬৯ জন। এছাড়া, বিভিন্ন দলের মধ্যে ১৯টি ঘটনায় আহত হয়েছেন ১২৬ জন এবং নিহত হয়েছেন ৩ জন।’
এতে বলা হয়, ‘সহিংসতার ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ১৮৩ টি সহিংসতার ঘটনার ১৬১টিই (৮৮%) ঘটেছে বিএনপির অন্তর্কোন্দলে ও বিএনপির সাথে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মধ্যে। এছাড়া, নিহত ১৭ জনের মধ্যে বিএনপির ৯ (৫৩%) জন, জামায়াতের ২ জন, আওয়ামীলীগের ৩ জন এবং অন্যান্য ৩ জন।’
এতে আরও বলা হয়, ‘তাছাড়া, উল্লেখিত তিন মাসে নির্বাচনকেন্দ্রিক অন্তত ৬টি সহিংসতার ঘটনায় কমপক্ষে ৪৫ জন আহত হয়েছেন। সহিংসতার ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং পারস্পরিক সংঘর্ষ এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে ৪ টি ঘটনায় অন্তত ৩৬ জন আহত হয়েছেন। বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষে ২টি ঘটনায় অন্তত ৯ জন আহত হয়েছেন।’
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ‘আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক বিরোধ, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন, দলীয় ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল, দখলদারিত্ব এবং চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে অধিকাংশ সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় বাড়িঘর, যানবাহন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের অভিযোগ পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ওপর পৃথক হামলা ও গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা এবং দেশের অনেক জায়গায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের কারণে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।’
এতে আরও উল্লেখ করা হয়, ‘দুষ্কৃতকারীদের দ্বারা রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা-কর্মীদের ওপর হামলার অন্তত ২৩টি ঘটনা ঘটেছে। এসকল হামলায় কমপক্ষে ১০ জন আহত এবং বিএনপির ১০ জন, আওয়ামীলীগের ২ জন, জামায়াতের ১ জন ও অন্যান্য দলের ১ জনসহ মোট ১৪ জন নিহত হয়েছেন। এ সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতায় অন্তত ৪২ রাজনৈতিক ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। এছাড়াও দেশের বিভিন্ন জেলায় আধিপত্য বিস্তার, দখলদারিত্ব, নির্বাচনী সহিংসতা, রাজনৈতিক সহিংসতা ও চাঁদাবাজি কেন্দ্রীক অন্তত ৫১ টি ঘটনায় কমপক্ষে ১৫৩ এর অধিক বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠা, দলীয় কার্যালয়ে সংঘর্ষ, হামলা, লুটপাট, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।’
রাজনৈতিক নেতাকর্মী আটক ও মামলার বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘উল্লেখিত এ সময়ে বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের নামে ১২৬টির অধিক মামলা হয়েছে। এসব মামলায় ২৫৪১ জনের নাম উল্লেখ করে এবং আরও প্রায় ৭৯১৫ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। এছাড়া, এ সময়ে রাজনৈতিক মামলায় কমপক্ষে ২৫৭৭ আওয়ামী লীগ, বিএনপি, ও জামায়াত নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে, যেখানে আওয়ামীলীগের নেতাকর্মী অন্তত ২৪১২ জন, বিএনপির নেতাকর্মী ১১২ জন এবং জামায়াতের ৩৬ জন, এনসিপি ১৭ জন এবং ৩৭ জন চরমপন্থি। পাশাপাশি, সন্ত্রাস, নাশকতা, পরোয়ানাভুক্ত আসামি গ্রেপ্তার এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার লক্ষ্যে নিয়মিত ও বিশেষ অভিযানে ৩৭ সহস্রাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’
মব সহিংসতা ও গণপিটুনীর ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘এ সময়ে সারাদেশ চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, বাক-বিতন্ডা, আধিপত্য বিস্তার, ধর্মীয় অবমাননা, ধর্ষণ ও ধর্ষণ চেষ্টাসহ নানা অভিযোগে গণপিটুনী ও মব সহিংসতার ১৩৭ টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন অন্তত ৫৪ জন এবং আহত হয়েছেন ১৪৫ জন।’
সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনার তথ্য উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ‘গত তিন মাসে অন্তত ৮৮টি নির্যাতনের ঘটনায় কমপক্ষে ১৩৫ জন সাংবাদিক নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এ সকল ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্ততপক্ষে ৬৩ জন, লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন ২৭ জন, হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন ১৮ জন সাংবাদিক। ৯ জন সাংবাদিককে আটক করা হয়েছে। এছাড়া সাইবার সুরক্ষা আইনের আওয়ায় ৪ টি মামলায় ১৮ জন সাংবাদিককে অভিযুক্ত করা হয়েছে।’
সভা সমাবেশ ও মত প্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘গত তিন মাসে ১৮ টি সভা ও সমাবেশ আয়োজনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সরাসরি বা পরোক্ষভাবে বাধা প্রদান করে, এতে ১২৮ জন আহত ও ৮ জনকে আটক করা হয়েছে, যাদের মধ্যে রাজনৈতিক কর্মী, শিক্ষার্থী, শ্রমিক ও সাধারণ পথচারীও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।’
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ‘এই সময়ে সাইবার সুরক্ষা আইন-২০২৬ এর বিভিন্ন ধারার অধীনে পৃথক ১০ টি মামলায় ৩২ জনকে অভিযুক্ত ও ১১ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানক নিয়ে আপত্তিকর পোস্ট দেওয়ায় ৮ জনকে আটক করা হয়েছে এবং অন্যান্য রাজনৈতিক ব্যাক্তির সমালোচনায় আটক ৩ জন ও ৩ টি মামলা হয়েছে। এছাড়া ৭ জনকে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত ও কুরআন অবমাননার অভিযোগে আটক করা হয়েছে, এসব ঘটনায় ৭টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। চলমান রাজনৈতিক ইস্যু, জুলাই ইস্যু, মাদক, বিদ্যুৎ বিভ্রাট, মানহানিকর কন্টেন্ট তৈরি ও কটূক্তির অভিযোগে ৩ জনকে হত্যা ও ২ জনকে নির্যাতন ও ৬ জনকে চাকরীচ্যুত করা হয়েছে। এছাড়া ১৫ জনকে সাইবার বুলিং, ফেসবুকে সমালোচনা ও কটূক্তিসহ অন্যান্য অভিযোগে আটক করা হয়েছে।’
গত তিন মাসে ৭৮৩ জন নারী ও কন্যা শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘নির্যাতিত ৭৮৩ জন নারী ও কন্যা শিশুর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন অন্তত ২৫৩ জন, যাদের মধ্যে ১৫৪ জন (৬১%) ১৮ বছরের কম বয়সী শিশু ও কিশোরী। এটা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয় যে, ৪২ জন (১৭%) নারী ও কন্যা শিশু গণধর্ষনের শিকার হয়েছেন। ধর্ষনের পর হত্যা করা হয়েছে ১২ জন ও ধর্ষিত হয়ে আত্মহত্যা করেছেন ১ জন, এদের মধ্যে ৫ জন শিশু ও কিশোরী । ২২০ জন নারী ও কন্যা শিশু যৌন নিপীড়ণের শিকার হয়েছেন তন্মধ্যে শিশু ১০৩ (৪৭%) জন। যৌতুকের জন্য নির্যাতনের ঘটনায় নিহত ১৩, আহত হয়েছেন ১৭ জন নারী এবং ২ জন নারী আত্মহত্যা করেছেন। পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন ১৩৭ জন, আহত হয়েছেন ৬৮ জন এবং আত্মহত্যা করেছেন ৭২ জন নারী। এছাড়া এসিড সহিংসতায় আহত হয়েছেন ১ জন নারী।’
সার্বিক বিষয়ে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, “এ সময়ে ঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নয়ন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী করতে রাষ্ট্র ও সমাজের সকল স্তরে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি। বিশেষ করে রাজনৈতিক সহিংসতা, মব সহিংসতা ও গণপিটুনি, সাংবাদিক নির্যাতন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, নারী ও শিশু নির্যাতন, সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, শ্রমিকদের নিরাপত্তাহীনতা এবং হেফাজতে ও কারাগারে মৃত্যুর মতো ঘটনাগুলো প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরী। কেননা এসব বিষয় সমাধান করা না হলে মানবাধিকার পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে।”
এসময় সরকারের প্রতি মানবাধিকার রক্ষায় আরও জবাবদিহিমূলক ও দায়িত্বশীল পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানানোর পাশাপাশি সকল নাগরিক, গণমাধ্যমকর্মী, নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকার সংগঠনের প্রতি এইচআরএসএসের পক্ষ থেকে আরও সক্রিয় ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি



















