সুরক্ষাবলয় পুনর্গঠনে তেহরান
রাশিয়ার কাছে ‘এস-৪০০’ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা চায় ইরান
- আপডেট সময় ০২:৩২:৫৭ অপরাহ্ন, শনিবার, ৭ নভেম্বর ২০২৬
- / ১৭ বার পড়া হয়েছে
তেহরানে অত্যাধুনিক বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহের একটি চুক্তি নিয়ে ইরান ও রাশিয়া উচ্চপর্যায়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে বলে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য টেলিগ্রাফ’ এক অনুসন্ধানে জানতে পেরেছে।
ইরানের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বহু বছর ধরে তেহরানের চেয়ে আসা বহুল প্রতীক্ষিত ‘এস-৪০০’ বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অবশেষে ভ্লাদিমির পুতিন সরবরাহ করবেন—এ বিষয়ে ইসলামিক প্রজাতন্ত্রটি অত্যন্ত ‘আশাবাদী’।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি গত বৃহস্পতিবার তাঁর শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোহসেন রেজাইকে ক্রেমলিনে এক ব্যক্তিগত চিঠি দিয়ে পাঠান। ওই কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, পুতিনের কাছে পাঠানো সেই চিঠির মূল দাবিই ছিল এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা সরবরাহ করা।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এর আগে দাবি করেছিলেন, রাশিয়া ইরানকে ‘মোটেও’ কোনো সাহায্য করছে না। এই অস্ত্র চুক্তির আলোচনার ফলে এ দাবি আদতে নাকচ হয়ে গেল।
মস্কোয় আলোচনার পর মোহসেন রেজাই বলেন, ‘পুতিনের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক বিষয়াবলি নিয়ে আলোচনা হয়েছে এবং যুদ্ধপরবর্তী সময় ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার বিষয়ে উল্লেখযোগ্য কথাবার্তা হয়েছে।’ এছাড়া এই বৈঠকে রাশিয়া ও ইরানের মধ্যে একটি নতুন গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণের বিষয়েও আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধে টিকে থাকতে এবং ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের অস্তিত্ব রক্ষার এক দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সম্প্রতি রাশিয়ার সঙ্গে বেশ কয়েকটি অস্ত্র চুক্তি করেছে ইরান। টেলিগ্রাফ জানতে পেরেছে যে, মার্কিন আগ্রাসন থেকে টিকে থাকার উপায় হিসেবে রুশ সামরিক সম্পর্ক আরও জোরদার করার প্রস্তাব নিয়ে কাজ করছেন ইরানি কর্মকর্তারা।
গোপন নথিপত্র থেকে জানা যায়, আমেরিকান চাপ প্রতিহত করতে নিরাপত্তা কর্মকর্তারা ‘চীন ও রাশিয়ার মতো স্বাধীন পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে কৌশলগত, বিশেষ করে সামরিক সম্পর্ক’ গড়ে তোলার সুপারিশ তৈরি করেছিলেন। গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে যুদ্ধ শুরুর আগেই দেশটির পার্লামেন্টের একটি গোপন কমিটি এই সুপারিশগুলো তৈরি করে; যার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল বিমান প্রতিরক্ষা, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় নিজেদের আকাশসীমা, পারমাণবিক স্থাপনা এবং শীর্ষ নেতাদের সুরক্ষায় যে দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে নতুন এস-৪০০ ব্যবস্থা পাওয়া তেহরানের প্রতিরক্ষা নীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এর আগে হামলায় নিহত হন দেশটির সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি।
বিশ্লেষক ও আঞ্চলিক কর্মকর্তারা জানান, ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার ভয়ে মস্কো বছরের পর বছর ধরে অস্ত্র বিক্রির এই প্রস্তাব ঝুলিয়ে রেখেছিল। তবে বর্তমানে নিজস্ব কারণেই রাশিয়া এই ব্যবস্থা দিতে কিছুটা দ্বিধায় পড়তে পারে। কারণ ইউক্রেনের দূরপাল্লার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় রাশিয়ার নিজস্ব তেল শোধনাগার ও বিমানঘাঁটিগুলো নিয়মিত লক্ষ্যবস্তু হওয়ায় মস্কোর কাছে নিজেদের আকাশ প্রতিরক্ষার জন্যই অতিরিক্ত এস-৪০০-এর সংকট রয়েছে।
এর আগে বৃহস্পতিবার ফাঁস হওয়া রুশ প্রতিরক্ষা শিল্পের নথিতে জানা যায় যে, রাশিয়া ইরানের জন্য হেলিকপ্টার থেকে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে।
নথিপত্র অনুযায়ী, রুশ রাষ্ট্রীয় কারখানাগুলো ‘কে-১০’ সাংকেতিক কোডের আওতায় ইরানের জন্য বিশেষ ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ সরঞ্জাম তৈরি করছে। এর মধ্যে রয়েছে ‘এলএমইউআর’ বা ‘প্রোডাক্ট ৩০৫’ নামের একটি নিখুঁত নিশানাভিত্তিক গাইডেড ক্ষেপণাস্ত্রের লঞ্চিং ইউনিট। ২০২৪ সালের একটি সরবরাহ সূচি অনুযায়ী, ইরানের কাছে হস্তান্তরের জন্য ৯০টি টুইন-রেল লঞ্চারের পাওয়ার ইউনিট ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রস্তুত করার কথা রয়েছে।
এদিকে ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে মস্কোর সঙ্গে ওয়াশিংটনের সরাসরি আলোচনাকে বৈধতা দিতে ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরে রাশিয়া-ইরান সম্পর্ককে খাটো করে দেখানোর চেষ্টা করেছেন। গত ১২ অক্টোবর তিনি বলেছিলেন, ইরানকে চীন ও রাশিয়ার সহায়তার মাত্রা অত্যন্ত নগণ্য এবং তিনি তা বিশ্বাসই করেন না। তবে ফাঁস হওয়া এই চুক্তিগুলো ট্রাম্পের বক্তব্যের উল্টো চিত্র তুলে ধরছে।
টেলিগ্রাফের হাতে আসা ইরানের যুদ্ধ পরিকল্পনার স্মারকপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, বিদেশি চাপের মুখে গত চার দশকের প্রতিরোধ দেখিয়েছে যে ভেতর থেকে ধসিয়ে দেওয়ার কৌশল ইরানে সফল হবে না। স্মারকে বলা হয়, চীন ও রাশিয়ার মতো পরাশক্তিগুলো মার্কিন এজেন্ডা অনুসরণ করতে অস্বীকৃতি জানানোয় আন্তর্জাতিকভাবে ইরানের কৌশলী পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ বেড়েছে।
আমেরিকান কৌশল বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে মোকাবিলার জন্য তেল আয়ের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ‘প্রতিরোধমূলক অর্থনীতি’ গড়ার ওপর জোর দিয়েছে তেহরান। একই সঙ্গে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে সামরিক সম্পর্ক বাড়ানো এবং বিমান প্রতিরক্ষা ও ড্রোন সক্ষমতা বাড়ানোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া হরমুজ প্রণালি, বাব এল-মান্দেব ও সুয়েজ খালের মতো কৌশলগত চোকপয়েন্টগুলোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলা হয়েছে যে পশ্চিম এশিয়া কোনোভাবেই পশ্চিমাদের কাছে গুরুত্ব হারায়নি।
পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা প্রসঙ্গে স্মারকপত্রটিতে বেশ আত্মবিশ্বাসী মনোভাব প্রকাশ করে বলা হয়, নিষেধাজ্ঞার ক্ষতিকর প্রভাব থাকলেও এটি ‘গঠনমূলক’। কারণ জঙ্গিবিমান বা প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ কেনা অসম্ভব হয়ে পড়ায় ইরান বাধ্য হয়ে ‘বাভার-৩৭৩’ বিমান প্রতিরক্ষা প্ল্যাটফর্ম এবং ‘শাহেদ-১৩৬’ ও ‘আবাবিল’-এর মতো নিজস্ব ড্রোন তৈরিতে সফল হয়েছে এবং স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছে।



















